আল-কোরানের কাঠগড়ায় বিভক্তিবাদ- ১১

সকল জাতির ঐক্য ফরয বিভক্তি হারামঃ

(شَرَعَ لَكُم مِّنَ الدِّينِ مَا وَصَّىٰ بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَىٰ وَعِيسَىٰ أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ كَبُرَ عَلَى الْمُشْرِكِينَ مَا تَدْعُوهُمْ إِلَيْهِ اللَّهُ يَجْتَبِي إِلَيْهِ مَن يَشَاءُ وَيَهْدِي إِلَيْهِ مَن يُنِيبُ ﴿الشورى: ١٣﴾

তিনি তোমাদের জন্য সেই ধর্ম থেকে বিধান দিচ্ছেন যার দ্বারা তিনি নূহকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, আর যা আমরা তোমার কাছে প্রত্যাদেশ করছি, আর যার দ্বারা আমরা ইব্রাহীমকে ও মূসাকে ও ঈসাকে নির্দেশ দিয়েছিলাম এই বলে — ”ধর্মকে কায়েম করো, আর এতে একে-অন্যে বিচ্ছিন্ন হয়ো না।’’ মুশরিকদের জন্য এ বড় কঠিন ব্যাপার যার প্রতি তুমি তাদের আহ্‌বান করছ! আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছা করেন তাকে তাঁর কারণে নির্বাচিত করেন, আর তাঁর দিকে পরিচালিত করেন তাকে যে ফেরে। (৪২: ১৩)

ব্যাখ্যাঃ- شَرَعَ لَكُم مِّنَ الدِّينِ– তোমাদের জন্য দ্বীন তথা ইসলামকে বিধিবদ্ধ, নির্ধারিত, অবধারিত করে দেয়া হয়েছে। – مَا وَصَّىٰ بِهِ نُوحًا- সে দ্বীন সম্পর্কে প্রথম রাসূল নুহ(আঃ)কে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সেই দ্বীনের অহী শেষ রাসূল মুহাম্মদ (সাঃ) এর নিকট আসে। আর প্রথম ও শেষ রাসূলের মধ্যবর্তি মহিমান্বিত রাসূলগণ তথা ইবরাহীম মুসা ও ঈসা (আঃ) কে সেই দ্বীনের ব্যাপারেই নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সেই নির্দেশটি কি? সেই নির্দেশ হচ্ছে – أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ – (ঐক্যবদ্ধ ভাবে দ্বীন প্রতিষ্ঠা কর কখনো বিভক্ত হয়ো না) অর্থাৎ নুহের (আঃ) মাধ্যমে যে দ্বীনের শুরু হয়েছে যুগে যুগে প্রত্যেক নবী তা প্রতিষ্ঠিত করবেন, এক নবীর উম্মত আরেক নবীর উম্মতের সাথে মতভেদ করবে না, দলে দলে বিভক্ত হবে না বরং সবাই সম্মিলিতভাবে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা করবে। বস্তুত আল্লাহ্‌র দ্বীন একটাই, যুগে যুগে নবীগণ মতভেদ ও বিভক্তি ব্যতিত তা প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থগুলিতে বিকৃতির পর এখনো এর প্রমাণ পাওয়া যায়।

মুফাসসিরানে কেরামের মতামতঃ- – شَرَعَ অর্থ- বিধিবদ্ধ করা, প্রচলন করা, নিয়ম করা, বর্ণনা করা, স্পষ্ট করা ইত্যাদি। دين – অর্থ জীবন ব্যবস্থা অর্থাৎ ইসলাম। – مَا وَصَّىٰ بِهِ نُوحًا- এখানে হযরত আদমের (আঃ) উল্লেখ না করে নুহ (আঃ) এর উল্লেখ করা হয়েছে।কারণ নুহ (আঃ) প্রথম শরীয়তধারি রাসূল ছিলেন। যেমন শাফায়াৎ সম্পর্কিত হাদীসে এসেছে।

أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ فِي حَدِيثِ الشَّفَاعَةِ الْكَبِيرِ الْمَشْهُورِ: (وَلَكِنِ ائْتُوا نُوحًا فَإِنَّهُ أَوَّلُ رَسُولٍ بَعَثَهُ اللَّهُ إِلَى أَهْلِ الْأَرْضِ فَيَأْتُونَ نُوحًا فَيَقُولُونَ لَهُ أَنْتَ أَوَّلُ رَسُولٍ بَعَثَهُ اللَّهُ إِلَى أَهْلِ الْأَرْضِ .. – অর্থাৎ কিয়ামতের ময়দানে লোকেরা যখন রাসূল (সাঃ) এর নিকট আসবে তখন তিনি বলবেন, তোমরা নূহ (আঃ) এর নিকট যাও, তিনিই পৃথিবীবাসির প্রতি আল্লাহর প্রেরিত প্রথম রাসূল। (কুরতুবী)

কিন্তু আদম (আঃ) শরীয়তধারী রাসূল ছিলেন না, তিনি ছিলেন নবী। তার উপর ফরয, হালাল, হারামের কোন বিধান ছিল না, খাওয়া পরা ও জীবন ধারনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাসহ অন্যান্য কিছু বিষয়ের সতর্ক বার্তা তার জন্য প্রযোজ্য ছিল। কিন্তু হযরত নুহের মাধ্যমে আল্লাহ্‌ তা’লা নতুন শরীয়ত প্রবর্তন করেন। হালাল হারামের বিধান দেন, বৈবাহিক সম্পর্কে মাতাগণ ভগ্নিগণ ও কন্যাগণকে হারাম করেন, কর্তব্য নির্ধারিত করে দেন এবং দ্বীনী বিষয়য়ের নিয়ম কানুন নির্দিষ্ট করে দেন। আর এ ধারা রাসূলগণের পরাম্পরায় চলতে থাকে আর প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে, সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মদ (সাঃ) এর মাধ্যমে সেই মিশনের পরিসমাপ্তি হয়।

وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَىٰ وَعِيسَىٰ – আল্লাহ্‌র দ্বীন প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে এখানেও সেই পাঁচজন নবীর উল্লেখ্য করা হয়েছে যাদের কথা সুরা আহযাবে এসেছে। যেমন وَإِذْ أَخَذْنَا مِنَ النَّبِيِّينَ مِيثَاقَهُمْ وَمِنكَ وَمِن نُّوحٍ وَإِبْرَاهِيمَ وَمُوسَىٰ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ۖ وَأَخَذْنَا مِنْهُم مِّيثَاقًا غَلِيظًا [٣٣:٧] = আর স্মরণ কর! আমরা নবীদের থেকে তাঁদের অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম, আর তোমার কাছ থেকেও, আর নূহ ও ইব্রাহীম ও মূসা ও মরিয়ম-পুত্র ঈসার কাছ থেকে, আর তাঁদের কাছ থেকে আমরা গ্রহণ করেছিলাম এক জোরালো অংগীকার — (৩৩/৭)।

বাস্তবেও পৃথিবীতে এ পাঁচজন নবীর উম্মত দেখা যায়। যেমন, নুহের উম্মত= হিন্দু সম্প্রদায় (গবেষকদের মতে)। মুসার উম্মত=ইহুদী জাতি। ঈসার উম্মত= খৃষ্টান জাতি। মুহাম্মদের উম্মত= মুসলমান জাতি। ইব্রাহীমের উম্মত= উপরোক্ত সবাই। উল্লেখ্য যে অথর্ববেদে আব্রাম (ইব্রাহিম (আঃ) কর্তৃক ঈসমাইল (অথর্ব)কে কুরবানী দেয়ার উল্লেখ আছে বিধায় বুঝা যায় হিন্দুরাও তার উম্মতভুক্ত। উক্ত নবী গণের দ্বীন ছিল একই যার মূল বার্তা হচ্ছে আল্লাহ্‌র একত্ববাদ ও তার ইবাদত। আয়াত وَمَا أَرْسَلْنَا مِن قَبْلِكَ مِن رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ [٢١:٢٥] – আর তোমার পূর্বে আমরা কোনো রসূল পাঠাই নি যাঁর কাছে আমরা প্রত্যাদেশ না দিয়েছি এই বলে যে, ”আমি ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই, কাজেই আমারই উপাসনা করো’’।-(২১/২৫) হাদীসে এসেছে “نَحْنُ مَعْشَرَ الْأَنْبِيَاءِ أَوْلَادُ عَلَّاتٍ دِينُنَا وَاحِدٌ”  — আমরা নবীগণ বৈমাত্রেয় ভ্রাতার মত, আমাদের দ্বীন এক। (কুরতুবী/কাছির) সকল নবীর দ্বীন এক হলেও শরীয়ত তথা বিধি বিধান ও পদ্ধতিগত কিছু পার্থক্য রয়েছে। কারণ শরীয়তের বিধান আল্লাহ্‌ তা’লা একসাথে প্রয়োগ করেননি বরং নবীদের পরাম্পরায় ক্রমে ক্রমে পূর্নতা দান করেছেন যা মুহাম্মদ (সাঃ) এর মাধ্যমে সম্পূর্ণ পূর্ণতা প্রাপ্ত হয় এবং সমাপ্তি ঘটে। যেমন – الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا فَمَنِ اضْطُرَّ فِي مَخْمَصَةٍ غَيْرَ مُتَجَانِفٍ لِّإِثْمٍ فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ ﴿المائدة: ٣﴾

আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্মব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গ করলাম, আর তোমাদের উপরে আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম, আর তোমাদের জন্য ধর্মরূপে মনোনীত করলাম ইসলাম। অতএব যে কেউ ক্ষুধার তাড়নায় বাধ্য হয়, — পাপের দিকে ঝোঁকে পড়ে নয়, — তবে নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ হচ্ছেন পরিত্রাণকারী, অফুরন্ত ফলদাতা। (৫: ৩)

أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ – আল্লাহ্‌ তা’লা সকল নবীকে নির্দেশ দেয়েছেন সেই একক দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করতে, যে দ্বীনের মুল বিষয়বস্তু হচ্ছে- কাতাদা বলেন –হালাল-হারাম। হাকাম বলেন- বৈবাহিক সম্পর্কে মাতাগণ ভগ্নিগণ ও কন্যাগণকে হারামকরণ। মোজাহিদ বলেন আল্লাহ্‌ তা’লা যত নবী পাঠিয়েছেন সবাইকেই নামায প্রতিষ্ঠা, যাকাত প্রদান ও আল্লাহ্‌র আনুগত্যের নির্দেশ দিয়ে পাঠিয়েছেন। কাজেই সকল নবীর উম্মত সম্মিলিতভাবে দ্বীন প্রতিষ্ঠা করা ফরয, কিন্তু মতভেদ ও বিভক্তি হারাম। لان الفرقة هلكة و الجماعة ثقة- (কারণ ফিরকাবাজীই ধ্বংস আর ঐক্যই শক্তি) ইমাম কুরতুবি বলেন —

فَكَانَ الْمَعْنَى أَوْصَيْنَاكَ يَا مُحَمَّدُ وَنُوحًا دِينًا وَاحِدًا، يَعْنِي فِي الْأُصُولِ الَّتِي لَا تَخْتَلِفُ فِيهَا الشَّرِيعَةُ، وَهِيَ التَّوْحِيدُ وَالصَّلَاةُ وَالزَّكَاةُ وَالصِّيَامُ وَالْحَجُّ، وَالتَّقَرُّبُ إِلَى اللَّهِ بِصَالِحِ الْأَعْمَالِ، وَالزُّلَفِ إِلَيْهِ بِمَا يَرُدُّ الْقَلْبَ وَالْجَارِحَةَ إِلَيْهِ، وَالصِّدْقِ وَالْوَفَاءِ بِالْعَهْدِ، وَأَدَاءِ الْأَمَانَةِ وَصِلَةِ الرَّحِمِ، وَتَحْرِيمِ الْكُفْرِ وَالْقَتْلِ والزنى والاذاية لِلْخَلْقِ كَيْفَمَا تَصَرَّفَتْ، وَالِاعْتِدَاءِ عَلَى الْحَيَوَانِ كَيْفَمَا دار، واقتحام الدناءات وما يعود بخرم المروءات، فَهَذَا كُلُّهُ مَشْرُوعٌ دِينًا وَاحِدًا وَمِلَّةً مُتَّحِدَةً، لَمْ تَخْتَلِفْ عَلَى أَلْسِنَةِ الْأَنْبِيَاءِ وَإِنِ اخْتَلَفَتْ أَعْدَادُهُمْ، وَذَلِكَ قَوْلُهُ تَعَالَى:” أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ” —

– كَبُرَ عَلَى الْمُشْرِكِينَ مَا تَدْعُوهُمْ إِلَيْهِ – রাসূল (সাঃ) তাওহীদের দিকে আহ্বান করেছেন, কিন্তু মুশরিকদের পক্ষে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর সাক্ষ্য প্রদান করা এবং মূর্তিপূজা ত্যাগ করা খুবই কঠিন বিষয়। শয়তান এবং তার বাহিনী এ কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এজন্যই ( أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ) ঐক্যবদ্ধভাবে দ্বীন প্রতিষ্ঠা করা মুশরিকদের উপর কঠিন। এ কথা বলাই বাহুল্য যে, কোরানের প্রতিটি আয়াত সার্বজনিন ও সবর্কালিন। কাজেই চৌদ্দশত বছর আগে যে প্রেক্ষাপট ও কার্যকারনের উপর যে সব আয়াত নাযিল হয়েছিল কিয়ামত পর্যন্ত সেই প্রেক্ষাপট যেখানে পাওয়া যাবে সেই আয়াত সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। সুতরাং ইহুদী-খৃষ্টানদের যে কার্যকারণে কোন আয়াত নাযিল হয়েছে সেই কার্যকারণ যেখানে পাওয়া যাবে সেই আয়াত সেখানে প্রযোজ্য হবে। যেমন উক্ত আয়াতে বলা হয়েছে ঐক্যবদ্ধভাবে আল্লাহ্‌র দ্বীন প্রতিষ্ঠা করা মুশরিকদের জন্য কঠিন, কারণ তাদের একেক দল একেক নবী বা দেবতা বা অবতারের অনুসারী। ঠিক অনুরূপভাবে বর্তমান মুসলামানরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে খোদার দ্বীন প্রতিষ্ঠা করা খুবই কঠিন, কারণ তারাও বিভিন্ন মনিষীর অনুসারী অর্থাৎ নিজ নিজ ফিরকার মুরুব্বিদের নবীর মত অনুসরণ ও শ্রদ্ধা করে। কাজেই ইহুদী খৃষ্টানের ন্যায় বর্তমান মুসলমানরাও মুশরিক। এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা সামনে আসছে।

اللَّهُ يَجْتَبِي إِلَيْهِ مَن يَشَاءُ وَيَهْدِي إِلَيْهِ مَن يُنِيبُ – যে হেদায়েতের যোগ্য, সত্য অন্বেষন করে আল্লাহ্‌ তাকে হেদায়েত দান করেন। যেমন – (وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ ﴿العنكبوت: ٦٩﴾ পক্ষান্তরে যারা আমাদের জন্য সংগ্রাম করে, আমরা অবশ্যই তাদের পরিচালিত করব আমাদের পথগুলোয়। আর আল্লাহ্ নিশ্চয়ই সৎকর্মীদের সাথেই রয়েছেন। (২৯: ৬৯) কিন্তু যে সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে আল্লাহ্‌ তাকে অন্ধকারের দিকেই চালিত করেন।

আয়াতের প্রথামাংশে আল্লাহ্‌ তা’লা নির্দেশ দিয়েছেন বিভক্তি না করে ঐক্যবদ্ধভাবে দ্বীন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আর একাজে যারা সচেষ্ট থাকে আল্লাহ্‌ তা’লা তাদেরকে মনোনিত করেন, দ্বীন প্রতিষ্ঠার পথে পরিচালনা করেন এবং সাহায্য করেন। কাজেই দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করা প্রতিটি মুসলমানের উপর ফরয। আর দ্বীন প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত এবং মূল উপদান হচ্ছে ঐক্য। কারণ ঐক্য ব্যতিত দ্বীন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এ জন্যই আল্লাহ তা’লা দ্বীন প্রতিষ্ঠার নির্দেশের সাথে সাথে দ্বিতীয় নির্দেশ দিয়েছেন বিভক্ত না হয়ে ঐক্যবদ্ধ থেকে দ্বীন প্রতিষ্ঠা করতে। এখন ঐক্যের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে যে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করবে সেই আল্লাহ্‌র মনোনিত বান্দা, আল্লাহ্‌ তাকে সঠিক পথ দেখাবেন, সাহায্য করবেন। আর তার জন্য রয়েছে ইহকালে সম্মান এবং পরকালে মহা পুরুষ্কার — فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ ) যুগে যুগে এ মহান দায়িত্ব পালনকারী একটি দলকে সচেষ্ট দেখা যায়। যেমন আধুনিক কালে জামাল উদ্দিন আফগানি থেকে নিয়ে বর্তমান পর্যন্ত অনেকেই এ কর্তব্য সম্পাদন করে যাচ্ছেন। এরাই হচ্ছে ৭৩ দলের নাজাত প্রাপ্ত দল। পক্ষান্তরে যারা বিভক্তি ও দলাদলি করছে, তাতে লিপ্ত রয়েছে তারা দুইদল। একদল যারা ঐক্য ফরয এবং বিভক্তি হারাম জেনেও তাতে লিপ্ত রয়েছে, তারা কবীরা গুনায় লিপ্ত। আর যারা এরূপ বিশ্বাস করে না, ঐক্য প্রচেষ্টা চালায় না, ঐক্যের চেতনাও পোষণ করে না তারা কাফের, মুরতাদ। এরা আকাশের নিচে মর্তের উপরে নিকৃষ্টতর প্রাণী, আল্লাহ-রাসূলের শত্রু, মুসলিম জাতির দুশমন, ইসলামের চূড়ান্ত শত্রু। এরা আল্লাহ-রাসূলের নির্দেশ অমান্য করে প্রকারান্তরে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। কোরানের নির্দেশ অনুসারে এদের সাথে যুদ্ধ করা, হত্যা করা আবশ্যক, তা সে যত বড় আলেম, ফাযেল, বুজুর্গই হউক না কেন। তাদের জন্য রয়েছে ইহকালে লাঞ্চনা পরকালে যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি। যেমন আল্লাহ তা’লা বলেন– إِنَّمَا جَزَاءُ الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَن يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُم مِّنْ خِلَافٍ أَوْ يُنفَوْا مِنَ الْأَرْضِ ذَٰلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ ﴿المائدة: ٣٣﴾

যারা আল্লাহ্‌র ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে আর দেশে গন্ডগোল বাঁধাতে তৎপর হয় তাদের একমাত্র প্রাপ্য হচ্ছে — তাদের কাতল করো অথবা শূলে চড়াও অথবা তাদের হাত ও তাদের পা বিপরীত দিকে কেটে ফেলো অথবা তাদের দেশ থেকে নির্বাসিত করো। এটি হচ্ছে তাদের জন্য ইহলোকে লাঞ্ছনা আর তাদের জন্য পরকালে রয়েছে কঠোর শাস্তি (৫: ৩৩)

রাসূল (সাঃ) বলেছেন – فقهاء ذلك الزمان شر فقهاء تحت ظل السماء،منهم خرجت الفتنة،و إليهم تعود – আখেরী যমানার আলেম-ফকীহরা হবে আকাশের ছায়ার নিচে নিকৃষ্টতর ফকীহ। তাদের থেকেই ফিতনার সূত্রপাত হবে এবং তাদের দিকেই ফিরে আসবে। তিনি আরো বলেন — علماؤهم أشر خلق الله على وجه الأرض)- তখন তাদের আলেমরা হবে ভূপৃষ্ঠে খোদার সৃষ্টির নিকৃষ্টতম জীব। (এর বাস্তবতা হচ্ছে, দেওবন্দী ও জামায়াতিরা ইসলামের মূল ধারা। কিন্তু ফিরকাবাজির কারণে অর্থাৎ দুর্বলতার সুযোগে তাদেরকে শাপলা চত্বরে, পথে ঘাটে, মাঠে, প্রান্তরে, আদালতে হত্যা করা হচ্ছে। এটাই হল আলেমদের ফিতনা তাদের প্রতি ফিরে আসার নমুনা। অথচ তারা ঐক্যবদ্ধ থাকলে তারাই সরকারে থাকত )।

বিধানঃ আয়াতে – أَقِيمُوا অনুজ্ঞা, আর – لَا تَتَفَرَّقُوا – নিষেধাজ্ঞা। আর – الامر للوجوب والنهي للحرام- এর সুত্রানুসারে ঐক্যবদ্ধভাবে দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ফরয, আর বিভক্ত হওয়া-বিচ্ছিন্ন হওয়া হারাম।

বাস্তব প্রয়োগঃ সৃষ্টির সূচনা থেকে প্রলয় পর্যন্ত মানব জাতির জন্য আল্লাহ্‌র মনোনিত দ্বীন বা জীবন ব্যবস্থা একটাই- ইসলাম। যুগে যুগে আল্লাহ্‌ তা’লা বিভিন্ন নবী রাসূলদের পর্যায়ক্রমে ইসলাম প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন, এভাবে মুহাম্মদ (সাঃ) এর মাধ্যমে দ্বীন পূর্ণতা লাভ করে এবং সমাপ্ত হয়। দ্বীন যেহেতু একটাই তাই আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে সকল উম্মতের উপর দায়িত্ব হচ্ছে ঐক্যবদ্ধ ভাবে দ্বীন প্রতিষ্টা করা। কিন্তু অন্যান্য উম্মতরা রাসূল বা আরবদের প্রতি বিদ্বেষবশত রাসূলের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে ইসলাম থেকে দুরে সরে যায়। কাজেই এখন ঐক্যবদ্ধভাবে দ্বীন প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব মুসলিম উম্মাহর উপর অর্পিত হয়ে যায়। তদুপরি অন্যান্য উম্মতের সাথে ইসলামের মূল ভিত্তি তাওহীদের উপর ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়াও মুসলিম উম্মাহর দায়িত্ব। যেমন (قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَىٰ كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَلَّا نَعْبُدَ إِلَّا اللَّهَ وَلَا نُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا وَلَا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّهِ فَإِن تَوَلَّوْا فَقُولُوا اشْهَدُوا بِأَنَّا مُسْلِمُونَ ﴿آل‌عمران: ٦٤﴾  – বলো — ”হে গ্রন্থপ্রাপ্ত লোকেরা, আমাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে পরস্পর সমঝোথার মাঝে এসো, যেন আমরা আল্লাহ্ ছাড়া আর কারো এবাদত করবো না, আর তাঁর সাথে অন্য কিছুকে শরীক করবো না, আর আমরা কেউ আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কাউকে মনিব বলে গ্রহণ করবো না।’’ কিন্তু তারা যদি ফিরে যায় তবে বলো — ”সাক্ষী থাকো, আমরা কিন্তু মুসলিম।’’ (৩: ৬৪)

কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যায়, অন্যান্য নবীর উম্মত- ইহুদী, খৃষ্টান, হিন্দু ইত্যাদির সাথে ঐক্যবদ্ধভাবে দ্বীন প্রতিষ্ঠা তো দুরের কথা, মুসলিম উম্মাহ নিজেরাই ঐক্যবদ্ধভাবে দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বাদ দিয়ে নিজেদের ভাঙ্গন ও বিভক্তির ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ইসলামের প্রথম যুগেই তারা শিয়া সুন্নী দুভাগে ভাগ হয়ে যায়। প্রত্যেকটি ফেরকার মধ্যে আবার গানিতিক হারে ভাঙ্গন শুরু হয়, শত শত ফেরকার জন্ম হয়। শুধুমাত্র উপমহা দেশের সুন্নী হানাফী মুসলমানরাই ইংরেজ আমলে বেরেলভী, দেওবন্দী, জামাতি, তাবলীগি ইত্যাদি ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। তাদের মধ্যে আবার হিজবুত তাওহীদ, হিজবুত তাহরীর, জাকির নায়েকী, তালেবান, হুজি, জে এম বি, আইসিস, আনসারুল্লাহ ইত্যাদি শত শত ফেরকার জন্ম হচ্ছে। উম্মতের মধ্যে গানিতিক হারে, চক্রবৃদ্ধিহারে ভাঙ্গন ও বিভক্তি ছড়িয়ে পড়েছে। এদের সম্পর্কে রাসূল (সাঃ) বলে গেছেন, শিকার ভেদ করে তীর যেমন দ্রুত গতিতে বেরিয়ে যায় এদের থেকে ঈমান তেমনি দ্রুত গতিতে বেরিয়ে যাবে।বস্তুত প্রত্যেকটি বিভক্তিবাদী দল বাতিল ফিরকা, মুরতাদ। কারণ তারা কোরানের অনুজ্ঞা ও নিষেধাজ্ঞা মেনে চলছে না, তওবা করছে না, ঐক্যের পথে ফিরে আসছে না। কাজেই হযরত আবু বকরের (রাঃ) সময়ে মুনকিরিনে যাকাতের ন্যায় এদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা ওয়াজিব যতক্ষণ না তারা ঐক্যের পথে ফিরে আসে। আর যদি একান্তই ঐক্যের পথে না আসে তবে মুরতাদ হিসাবে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা ওয়াজিব। এক কথায় মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিভক্তির কোন সুযোগ নাই। যারাই তা করেছে বা করবে তাদেরকে মুরতাদ হিসাবে মেরে ফেলতে হবে। উল্লেখ্য যে, উম্মাহর মধ্যে ঐক্য অস্বিকার কারী ফিরকাবাজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা, হত্যা করা ওয়াজিব- এ সংক্রান্ত কোরআন, হাদীস, ইজমা (সাহাবা), কিয়াস ও সাহাবায়ে কেরামের উক্তি ইত্যাদি বিস্তারিত দলীল-আদিল্লা গ্রন্থের শেষ দিকে আলোচনা করা হবে ইনশাল্লাহ।

আমাদের করনীয়ঃ- আল্লাহ্‌র রহমতে আমরা ঐক্যবদ্ধ হব। শিয়া সুন্নীর মধ্যে কোন দল কোন ফেরকা ঐক্যের বাইরে থাকতে পারবে না। মুসলিমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে অন্যান্য উম্মতকে তাওহীদের ভিত্তির উপর ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। তারপর দ্বীন প্রতিষ্ঠা করতে হবে, খিলাফত তথা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। (ধারাবাহিক)

Leave a Reply