দ্যা ওল্ডেস্ট রাইভাল : সাটান ভার্সাস হিউম্যান

“প্রকৃতপক্ষে যারা মুত্তাকী, তাদেরকে যদি কখনো শয়তানের প্রভাবে অসৎচিন্তা স্পর্শও করে যায়, তাহলে তারা তখনই সতর্ক হয়ে ওঠে, তারপর তারা নিজেদের সঠিক কর্মপদ্ধতি পরিষ্কার দেখতে পায়।”(৭:২০১)

মসজিদেই সাধারণত বড় ধরনের মুনাজাত হয়।তো সেখানে একটা কথা খুব কমন থাকে।“হে আল্লাহ,শয়তান থেকে আমাদের দূরে রাখো”!বিষয়টা বেশ কিছুদিন ধরেই মাথায় ঘুড়পাক খাচ্ছে।আজকে তাই লিখতেই বসলাম।

আলোচনায় যাওয়ার আগে কিছু কথা বলে রাখা প্রয়োজন বলে মনে করছি।এই সিরিজের এইটা ৪র্থ নোট।অনেকের কাছ থেকে অনেক রকম পরামর্শ এবং ফিডব্যাক পেয়েছি।অনেকে আমাকে বলেছেন একটা রেগুলার বেসিসে কন্টিনিউ করে যেতে।আসলে সেটা আমার লক্ষ্য না।তাই সেভাবে নিজেকে জোড় করে বিষয়টা এগিয়ে নেয়ার ইচ্ছে নেই আপাতত।আমি গোটা বিষয়টা আল্লাহর ইচ্ছায় ছেড়ে দিয়েছি।আমার লেখাটা মুলত আমার অভিজ্ঞতা থেকে।যারা পর্যাপ্ত ইসলামী জ্ঞান/চর্চা রাখেন,তাদের জন্য আমার লেখাগুলি নয়।যারা আমার মতই revert হতে চাচ্ছেন,আমি তাদের জন্য শুধুমাত্র আমার চিন্তা,ব্যাখ্যা,অভিজ্ঞতা ইত্যাদি শেয়ার করার চেষ্টা করছি আমি এই লেখাগুলির মাধ্যমে নিজেকে এবং সেই সাথে যারা আমার পর্যায়ে আছেন,তাদের কে বুস্ট-আপ করার চেষ্টা করছি মাত্র।অন্ধকার জগতের মোটামুটি সব পর্যায়ে বিচরণ শেষ করে যেহেতু আমি উঠে আসার চেষ্টা করছি,আমার বিশ্বাস,যারা আমার মত পর্যায়ে ছিলেন বা আছেন,তারা গোটা ব্যাপারটা বুঝতে পারবেন।এবং লেখাগুলি তাদের কাজে লাগবে ইনশাল্লাহ।

যাই হোক,আলোচনায় ফিরে আসি।“শয়তান থেকে দূরে রাখো”-কথাটা কেমন জানি লাগে আমার কাছে।শয়তান থেকে দূরেই যদি রাখার প্ল্যান আল্লাহ-তায়ালার থাকতো,সেটা তো তিনি শুরুতেই করতে পারতেন।তিনি তো তা করেননি।আবার কোরআন হাদীসে বহুবার এসেছে যে দুনিয়া আমাদের জন্য পরীক্ষা।এখন আল্লাহ যদি আমাদের দোয়া কবুল করেই নেন,শয়তানকে দূরে সরিয়েই দেন,তাহলে আসলে পরীক্ষা কিভাবে হবে?অনেকে বলতে পারেন,ধন-সম্পদ দিয়ে,অনেকে বলতে পারেন আরো অনেক পার্থিব বিষয়ের কথা।কোরআনেও একথা আছে।কিন্তু এগুলি কি সত্যিই আসল পরীক্ষা?চিন্তা করে দেখুনতো,আমাদের জন্মের পর থেকে মৃত্য পর্যন্ত পরীক্ষা।জন্মের পর থেকে মৃত্য পর্যন্ত আমাদের প্রতিটা সাজানো সুন্দর দিনকে নানারকমভাবে ডাইভার্ট করে?শয়তান।শয়তান মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কখনোই আমাদের ছেড়ে যায় না।যাবে না।বাবা মা,ধন সম্পদ,স্ত্রী-সন্তান জীবনের একটা পার্ট-জুড়ে আসে,থাকে। শয়তানের হাত থেকে মুক্তি চাওয়া বিষয়টা আমার কাছে দুর্বল ঈমান মনে হয়,শয়তানের সাথে যুদ্ধ করাই সত্যিকারের ঈমান।এর যুদ্ধের সব রসদ তো আল্লাহ আমাদের দিয়েই দিয়েছেন।

দিনের শুরু হয় ফজর দিয়ে।এলার্ম দিয়ে রাখি।কখনো ঘুম ভাঙ্গে,কখনো নানা রকম ছুতো মাথায় আসে!৫ মিনিট,১০ মিনিট পরেই উঠি কিংবা কাযা পরে নিবোনে,আল্লাহ তো জানেনই আমার ইচ্ছা ছিল,কিন্তু অনেক টায়ার্ড!উনি মাফ করে দিবেন!অর্থাত আমাদের সকালের শুরুটাই হয় শয়তানের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করে।কেউ শুরুতেই আত্মসমর্পণ করেন,কেউ করেন না।এরপর সারাদিনে কতরকম ভাবে আমরা মন কে বোঝাই,মনকে বোঝানোর পুরোটাই হচ্ছে শয়তানের কুমন্ত্রণা।বিবেক আল্লাহর কাছ থেকে একদম সিলগালা করে আসা।সবচেয়ে নিষ্ঠুর এবং বাজে লোকের বিবেক আর সবচেয়ে ভালো লোকের বিবেক কোনো পার্থক্য নাই!কারণ বিবেক নিয়ন্ত্রণ করা যায় না,বিবেকের কথা সময় মতন বুঝে নিতে হয়।শয়তানের বিবেকের উপরে কোনই হাত নেই।তাহলে শয়তানের হাতটা কোথায়?নিয়ন্ত্রণ টা?ঠিক যেই যায়গায় আমাদের ও নিয়ন্ত্রণ।আমাদের মন।এজন্যই আমি শিরোনামে বলেছি আযাযিল vs আশরাফুল মাখলুকাত।যুদ্ধটা আসলে আমাদের সাথে শয়তানের।শয়তানের সাথে আল্লাহর না।

চিন্তা করেন,একটা ক্লাশে কত রকম ছাত্র থাকে।ভালো-মন্দ(আমার মতন)।যারা ভালো,শিক্ষকরা তো জানেন তারা ভালো।যারা মন্দ,তাদের খবরো জানেন।কিন্তু তারপরেও একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা কেন হয়?একই সময় ধরে?আচ্ছা,পরীক্ষাটাই বা কেন হয়?স্যারেরা তো সব জানেনই।কিন্তু না।একেকটা পরীক্ষা দিয়েই আমরা পরের ধাপে যাই।আমাদের জীবনটা যদি পরীক্ষা হয়,সে পরীক্ষায় পাশ করার একমাত্র বাধা অর্থাৎ প্রশ্নপত্রটাই হচ্ছে শয়তান!তাহলে কোন ছাত্র যদি শিক্ষকের কাছে বলে,স্যার আপনি তো সব ই জানেন,আমি রেগুলার ক্লাশ করেছি,হোমওয়ার্ক ও করেছি,আমাকে প্লিজ প্রশ্ন ছাড়া পরীক্ষা নেন!সম্ভব?নাহ।

এবার আরেকটা এঙ্গেল থেকে চিন্তা করি আসেন।ধরেন,আপনার আজকের দিনটা খুব ভালো কেটেছে।সব কিছুই পজিটিভ।নামাযে দাঁড়ায় আপনি তওবা করার মতন কিছু খুজেই পাচ্ছেন না!আপনি তো মহা খুশী।ভুল।ঐ মুহুর্তটাই আপনার সবচেয়ে খারাপ মুহুর্ত।যখন আপনার মনে হবে শয়তান আপনাকে সারাদিন কুমন্ত্রণা দেয় নি,এর মানে আপনি শয়তানের কব্জায় চলে গেছেন,শয়তান আপনাকে নিয়ে আর ভাবেই না!এবং শয়তানের কব্জায় পুরোপুরি চলে গেছেন বলেই শয়তান আপনার দিকে ফিরে তাকায় নি,আপনিও ভালোমতন দিন শেষ করেছেন।এবার ভুল শুধরে হিসেব করতে বসেন,মাথা ঘুড়ে যাবে।দেখবেন সারাদিনে আসলে আপনি একটাও ভালো কাজ করেননি,করলেও অসংখ্য ভুলে ভরা।এটা কি কখনো সম্ভব যে আপনি প্রশ্ন না দেখে না জেনেই খাতায় উত্তর লিখে ফেলেছেন!

আসেন,দেখি কোরআন কি বলে,সুরা আনকাবুত এ যাই চলেন,২ থেকে ৬ নম্বর আয়াতে একটু চোখ বুলাই,

“লোকেরা কি মনে করে রেখেছে, “আমরা ঈমান এনেছি” কেবলমাত্র একথাটুকু বললেই তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে, আর পরীক্ষা করা হবে না?অথচ আমি তাদের পূর্ববর্তীদের সবাইকে পরীক্ষা করে নিয়েছি,আল্লাহ অবশ্যই দেখবেন কে সত্যবাদী এবং কে মিথ্যুক। আর যারা খারাপ কাজ করছে,তারা কি মনে করে বসেছে তারা আমার থেকে এগিয়ে চলে যাবে? বড়ই ভুল সিদ্ধান্ত তারা করছে। যে কেউ আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করার আশা করে (তার জানা উচিত) , আল্লাহর নির্ধারিত সময় আসবেই।আর আল্লাহ‌ সবকিছু শুনেন ও জানেন। যে ব্যক্তিই প্রচেষ্টা- সংগ্রাম করবে সে নিজের ভালোর জন্যই করবে।আল্লাহ অবশ্যই বিশ্ববাসীদের প্রতি মুখাপেক্ষিতাহীন।”(২৯:২-৬)

আলোচনার শুরুতেই সুরা আরাফের একটা আয়াত দিয়ে শুরু করেছিলাম।এ আয়াত থেকে এটা বোঝা যায়,মুত্তাকীদেরও শয়তানের প্ররোচনার স্বীকার হতে হয়।একথা ভাবার কোনো কারণ নাই যে তাদের কম যুদ্ধ করতে হয় শয়তানের সাথে।বরং বেশীই যুদ্ধ করতে হয়।কারণ তাদেরকে ভাঙ্গাই সবচেয়ে কঠিন,আর শয়তানের কাছে অজেয় যায়গাও সেটা।তাই শয়তান সেখানে চেষ্টার ত্রুটি করে না।

মজার কথা শুনুন,একেক দিন তো একেকভাবে যায়,তবে শয়তানের একটা ধোকায় আমরা কম বেশী সবাই পড়ি,দৈনিক ৫ বার!অবাক হচ্ছেন?দৈনিক ৫ বার তো নামায পড়ী,ধোকা কখন খাই!নামায পড়ে আমরা যখন বের হই,তখন আমরা কোন কাজটা করি?মনে পড়ে?এক পায়ে দাঁড়িয়ে আরেকপা তুলে কাপড়ের ভাজটা সোজা করে দেই!বিষয়টা খুব সাধারণ মনেই কিন্তু করি।কিন্তু এটাতো নিষেধ!কতটা সুক্ষভাবে শয়তান চাল দেয়,খেয়াল করেই দেখি না আমরা।

আমাদের বরং সাহস আনা উচিত।আত্মবিশ্বাসী হওয়া উচিত।শয়তান থেকে মুক্তি না চেয়ে বরং শয়তানের সাথে যুদ্ধ করে জিতে যাওয়ার লক্ষ্যে এগোনো উচিত।আর এজন্যই আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া উচিত।আল্লাহ যাতে সেই ধৈর্য দেন,সেই সাহস দেন আর তার নির্দেশিত পথ ভালোভাবে বুঝে চলার তৌফিক দেন।

আমি সাধারণত এই সিরিজটা লিখতে বসার আগে দুই রাকাত নফল নামায পড়ে তারপর বসি।আজকে এশার নামাযের পর বসে ছিলাম,নফল পড়বো।তারপর লিখতে বসবো।হঠাত মন বলে উঠলো,আরে তোমার তো ভীষণ মাথা ব্যাথা।সারাদিন বাইরে ঘুড়ছো।তুমি আজকে লেখা বাদ দাও।খানিক্ষণ যুদ্ধ চললো।তারপর মন একটু নরম হলো,আচ্ছা লিখো,কিন্তু আবার দুই রাকাত নফল কেন?আল্লাহর জন্যই লেখতেছো,ভালো কাজ করতেছো,সেটাই তো যথেষ্ঠ!আবার যুদ্ধ,এবার মন একটূ কঠোর অবস্থানে,ছোটবেলা থেকেই তো পরীক্ষা দিতে যাওয়ার আগে নফল পড়তা,লাভ হইছে কোনো?এইগুলা মনকে বোঝানো,আর কিছু না!যাও,তাড়াতাড়ি লিখে শুয়ে পড়ো।লেখা কেমন হইছে,মানুষের রেস্পন্সেই বুঝবা।আমি কিন্তু চাইলেই দাঁড়িয়ে নামায পড়তে পারি,কিন্তু আমার এই জিনিসটা বেশ উপভোগ্য মনে হচ্ছিল।তাই বসেই ছিলাম।দেখিনা,শয়তান কতটূকু বুঝাইতে পারে আমাকে!এরকম আরো কিছুক্ষণ যুদ্ধের পর হাসতে হাসতে দাড়িয়ে গেলাম নামাযে।অমনি শয়তান দৌড়।

আল্লাহ হাফিয

2 Responses

  1. আবু সাইফ
    আবু সাইফ at |

    আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ……

    সুন্দর বলেছেন, ভালো লাগলো! লিখতে থাকুন!

    শয়তানের সাথে লড়াই তো করতেই হবে- বিকল্প নেই! কিন্তু জিততে হলে অবশ্যই আল্লাহতায়ালার সাহায্য দরকার!
    এজন্যই আল্লাহতায়ালা তাগিদ দিয়েচেন তাঁর কাছে আশ্রয় ও সাহায্য চাইতে,
    রসূলুল্লাহ ﷺও অনেক দোযা শিখিয়ে দিয়েছেন
    আমরা যেন কখমোই নিজের সামর্থের উপর নির্ভর না করি!
    কারণ সেটা হবে অহংকার- যার পরিণতি ভয়াবহ!! নাউযুবিল্লাহ…..

    জাযাকাল্লাহ

    Reply
    1. আবু সাইফ
      আবু সাইফ at |

      সংশোধনী
      দিয়েচেন >> দিয়েছেন
      কখমোই >> কখনো-ই

      Reply

Leave a Reply