আল-কোরানের কাঠগড়ায় বিভক্তিবাদ- ১৩

ফিরকাবাজদের বিভক্তির কারণ পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ

﴿وَمَا تَفَرَّقُوا إِلَّا مِن بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْعِلْمُ بَغْيًا بَيْنَهُمْ ۚ وَلَوْلَا كَلِمَةٌ سَبَقَتْ مِن رَّبِّكَ إِلَىٰ أَجَلٍ مُّسَمًّى لَّقُضِيَ بَيْنَهُمْ ۚ وَإِنَّ الَّذِينَ أُورِثُوا الْكِتَابَ مِن بَعْدِهِمْ لَفِي شَكٍّ مِّنْهُ مُرِيبٍ﴾

মানুষের কাছে যখন জ্ঞান এসে গিয়েছিল তারপরই তাদের মধ্যে বিভেদ দেখা দিয়েছে৷ আর তা হওয়ার কারণ তারা একে অপরের বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি করতে চাচ্ছিলো৷ একটি নিদিষ্ট সময় পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মূলতবী রাখা হবে একথা যদি তোমর রব পূর্বেই ঘোষণা না করতেন তাহলে তাদের বিবাদের চুড়ান্ত ফায়সালা করে দেয়া হতো৷ প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে, পূর্ববর্তীদের পরে যাদের কিতাবের উত্তরাধিকারী করা হয়েছে তারা সে ব্যাপারে বড় অস্বস্তিকর সন্দেহের মধ্যে পড়ে আছে৷(শুরা/ ১৪)

যোগসুত্রঃ- পূর্বের আয়াতে আল্লাহ্‌ তা’লা নির্দেশ দিয়েছেন . أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ. অর্থাৎ বিভক্ত না হয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে দ্বীন প্রতিষ্ঠা কর। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আল্লাহ্‌র নির্দেশ সত্ত্বেও ইহুদী, নাসারা, হিন্দু, বৌদ্ধরা এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে মুসলমানদের মধ্যে দেওবন্দী, বেরেলভী, সুফিবাদী, জামাতী, সালাফী, তাবলিগী, ব্রাদার হুড ইত্যাদিরা বিভক্ত হয়ে আছে কেন, তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে আল্লাহ্‌র নির্দেশ পালন করছে না কেন? এর উত্তরে আল্লাহ্‌ তা’লা বলেন তারা বিভক্ত হয়েছে এজন্য নয় যে, তাদের কাছে কোন দলীল প্রমাণ নেই বরং পূর্বের জাতি গুলোর কাছে দলীল- প্রমাণ তো আছেই আর মুসলিম ফেরকাগুলির কাছে তা উত্তম রূপেই আছে, কারণ কোরআন তাদের সামনে। কিন্তু তারা পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ, অহমিকা নেতৃত্ব ইত্যাদি কারণে বিভক্ত হয়েছে এবং ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে না। কারণ ইহুদীরা প্রতিক্ষায় ছিল শেষ নবী তাদের মধ্যে আসবেন, নাসারারা প্রতিক্ষায় ছিল প্যারাক্লিট তাদের মধ্যে আসবেন, হিন্দুরা অপেক্ষায় ছিল কল্কি, নরাসংশ (মুহাম্মদ সাঃ) তাদের মধ্যে আসবেন, বৌদ্ধরা প্রতিক্ষায় ছিল অন্তিম বুদ্ধ- মৈত্রেয় বুদ্ধ (মুহাম্মদ সাঃ) তাদের মধ্যে আসবেন। কিন্তু যখন তিনি আরবদের মধ্যে আসলেন-তখন তারা সবাই মুখ ফিরিয়ে নিল এবং হিংসা-বিদ্বেষ ও নেতৃত্বের কারণে বিভক্ত হয়ে পড়ল। আর মুসলিম ফিরকাগুলিও পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ ও একে অন্যের নেতৃত্বের প্রতি কুপিত থাকার কারণে বিভক্ত হয়ে আছে। যেমন দেওবন্দীরা জামাতী, তরিকতী ও অন্যান্যদের নেতৃত্ব মেনে নিবে না। তদ্রুপ জামাতী তরীকতীরাও দেওবন্দী বা অন্যদের নেতৃত্ব মেনে নিবে না। কে কাকে মানবে, কে কার নেতৃত্বে যাবে- একমাত্র এ অহংকারে তারা ঐক্যবদ্ধ হতে পারছে না। অথচ অনৈক্যের কারনে শাপলা চত্বরে হেফাজতের এবং আদালত থেকে নিয়ে পথে, ঘাটে, মাঠে জামাতের কর্মি সমর্থকদের হত্যা করা হচ্ছে। ঐক্য থাকলে এ হত্যাকাণ্ডের সম্ভাবনা ছিল না বিধায় এর সম্পূর্ন দায় সংশ্লিষ্ট দলের নেতা ও মরুব্বিদের।কাজেই আল মা’দানু জিবার ওয়াল বি’রু জিবার উক্ত হাদীসের মাফহুম অনুযায়ী হেফাজত হত্যাকান্ডের জন্য তাদের নেতাদের উপর জামাতি হত্যাকান্ডের জন্য তাদের নেতাদের উপর কিসাস ন্যুনতম দিয়ত ওয়াজিব হয়েছে। কারণ তাদের অহংকার ও অপকর্মের কারণেই এসব হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে। যাই হউক এখন প্রশ্ন হলো, তাহলে আল্লাহ্‌ তা’লা এসব বিভক্তিবাদিদেরকে শাস্তি দিচ্ছেন না কেন ? উত্তরে আল্লাহ্‌ তা’লা বলেন, এ বিষয়ে তার প্রতিশ্রুতি রয়েছে যে, অবাধ্যদের দুনিয়াতে শাস্তি দিবেন না। পরকালে তাদের বিচার করবেন এবং শাস্তি দিবেন। যেমন إِنَّمَا أَمْرُهُمْ إِلَى اللَّهِ ثُمَّ يُنَبِّئُهُم بِمَا كَانُوا يَفْعَلُونَ নিঃসন্দেহ তাদের ব্যাপার আল্লাহ্‌র কাছে, তিনিই পরকালে তাদের জানাবেন যে তারা কী করেছিল। (৬: ১৫৯)

وَمَا تَفَرَّقُوا إِلَّا مِن بَعْدِ = তারা অজ্ঞতা বশতঃ বিভক্ত হয়নি বরং- الفرقة الضلالة – বিভক্তি গুমরাহি এ কথা জানার পর বিভক্ত হয়েছে। আর এ বিভক্তির কারণ হচ্ছে পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ, নেতৃত্ব, দুনিয়ার লোভ, অহমিকা ইত্যাদি। ইবনে আব্বাস বলেন, এখানে উদ্দেশ্য কুরাইশরা, তারা মুহাম্মদ (সাঃ) এর প্রতি বিদ্বেষবশতঃ বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। অথচ তারা জানত যে, তিনি সত্য নবী। যেমন وَكَانُوا يَتَمَنَّوْنَ أَنْ يُبْعَثَ إِلَيْهِمْ نَبِيٌّ، دَلِيلُهُ قَوْلُهُ تَعَالَى فِي سُورَةِ فَاطِرٍ:” وَأَقْسَمُوا بِاللَّهِ جَهْدَ أَيْمانِهِمْ لَئِنْ جاءَهُمْ نَذِيرٌ” [فاطر: 42] يُرِيدُ نَبِيًّا. وَقَالَ فِي سُورَةِ الْبَقَرَةِ:” فَلَمَّا جاءَهُمْ ما عَرَفُوا كَفَرُوا بِهِ” [البقرة: 89] কেউ কেউ বলেন, এখানে আহলে কিতাব উদ্দেশ্য, পূর্ববর্তী নবীগণের উম্মতরা উদ্দেশ্য। যখন তাদের মধ্যে অনেক সময় অতিক্রান্ত হয়ে যেত তখন তারা মতভেদে লিপ্ত হয়ে পড়ত, কেউ ঈমান রাখত কেউ কুফুরি করত। যাই হউক, ইহুদী, নাসারা, কুরাইশ, মুশরেক ইত্যাদিরা সবাই মুহাম্মদ (সাঃ)-এর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করত, এজন্যই তারা বিভক্ত হয়ে গেছে। এমন নয় যে, দলীল প্রমাণের অভাবে তারা বিভক্ত হয়েছে।

وَلَوْلَا كَلِمَةٌ سَبَقَتْ مِن رَّبِّكَ = এখানে বিভক্তিবাদিদের শাস্তি বিলম্বিত করে কিয়ামত দিবসে আযাবের কথা বলা হয়েছে . ” بَلِ السَّاعَةُ مَوْعِدُهُمْ(কিয়ামতই তাদের শাস্তির প্রতিশ্রুত সময়কাল) কারণ দুনিয়াতেই ফ্য়সালা হয়ে গেলে মানব জাতির পরীক্ষা অর্থহীন হয়ে পড়ে। কেউ কেউ বলেন, আল্লাহ্‌ তা’লা দুনিয়াতেই তাদের জন্য শাস্তির সময় নির্ধারণ করেছেন অর্থাৎ যুদ্ধের মাধ্যমে তাদের হত্যা, বন্দি, লাঞ্চনা, উচ্ছেদ ইত্যাদির মাধ্যমে তাদের ফয়সালা করা হবে। কেউ কেউ বলেন, তাদের মধ্যে ফয়সালা হবে এভাবে যে, কাফেরদের প্রতি আযাব নাযিল করবেন আর মুমিনদেরকে নাজাত দিবেন।

وَإِنَّ الَّذِينَ أُورِثُوا الْكِتَابَ.= এখানে উদ্দেশ্য পূর্ববর্তী ইহুদী নাসারাদের বংশধররা যারা কোরআন বা মুহাম্মদ (সাঃ)-এর প্রতি সন্দেহে নিমজ্জিত থাকার কারণে ঈমান আনয়ন করে নি। কেউ কেউ বলেন, এখানে আরবের মুশরিকরা উদ্দেশ্য যারা আহলে কিতাবের পরে কোরআনের উত্তরাধিকারী হয়েছে। মুজাহিদ বলেন এখানে .من بعدهم. অর্থ قبلهم من – অর্থাৎ মক্কার মুশরিকদের পূর্বে ইহুদী নাসারারা কিতাবের উত্তরাধিকারী হয়েছিল। আর তারা নিজেরাই নিজেদের কিতাবের ব্যপারে সন্দিহান। (বগবি, ফতহুল কাদির, কুরতুবি , তাবারি)

বাস্তব প্রয়োগঃ বস্তুত আল্লাহ তা’লা ইহুদী, খৃষ্টান, মুশরিক ইত্যাদিদের বিভিন্ন অপকর্ম উপমা হিসাবে কোরানে উল্লেখ করেছেন মুসলমানদের উপদেশ প্রদানের উদ্দেশ্যে । যাতে মুসলমানরা সেসব অপকর্ম, তাদের গোমরাহির পথ-পদ্ধতি- প্রক্রিয়া ও বিষয়গুলি জেনে উপদেশ গ্রহণ করতে পারে এবং সেগুলি থেকে বেঁচে থাকতে পারে। কাজেই নেতিবাচক সেসব আয়াত ইহুদী নাসারার সাথে সংশ্লিষ্ট না করে ব্যাপকার্থে প্রয়োগ করতে হবে। কিন্তু এখন বিষয়টি মহাবিপত্তি হয়ে উঠেছে এবং আজ উম্মাহ ধ্বংসের প্রধান কারণ হয়ে দাড়াচ্ছে। মুসলমানরা কোরআনের বিধান গ্রহণ করতে পারছেনা, উপকৃত হতে পারছেনা। কারণ আলেম সমাজ নেতিবাচক আয়াতগুলিকে ইহুদী নাসারাদের শানে নাযিল হয়েছে, এখানে ইহুদী নাসারা উদ্দেশ্য, এটা ইহুদী নাসারা বা মুশরিকদের জন্য খাস ইত্যাদি বলে কোরআনকে বর্জন করছেন যা- স্পস্টত কুফুরি। এভাবে বিভক্তিবাদসহ অন্যান্য বিষয়ের অসংখ্য আয়াত পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। আলেমগণ এগুলি ইহুদী নাসারার সম্পত্তি গন্য করে বর্জন করে চলেছেন। এজন্যই আজ উম্মাহর এত দুর্গতি। আর এ কারণেই রাসূল (সাঃ) আল্লাহ্‌র দরবারে নালিশ করবেন – (٣٠ ( وَقَالَ الرَّسُولُ يَا رَبِّ إِنَّ قَوْمِي اتَّخَذُوا هَٰذَا الْقُرْآنَ مَهْجُورًا ﴿الفرقان:আর রাসূল বলছেন-”হে আমার প্রভু ! নিঃসন্দেহ আমার স্বজাতি এই কুরআনকে পরিত্যাজ্য বলে ধরে নিয়েছিল।(২৫: ৩০) অথচ কোরআনের মূলনীতি হচ্ছে-যে কোন আয়াত ইহুদী নাসারাদের উদ্দেশ্যে হউক বা অন্য যে কোন ইল্লত বা প্রেক্ষাপটে নাযিল হউক না কেন কিয়ামত পর্যন্ত সেই অবস্থা যেখানে পাওয়া যাবে সেই আয়াত সেখানেই প্রযোজ্য হবে। কোরআন সার্বজনিন ও সর্বকালীন।

সুতরাং বক্ষমান আয়াতটি বর্তমান মুসলিম উম্মাহর ক্ষেত্রে অতি উত্তমরূপে প্রযোজ্য। এমনকি বাস্তবতায় মনে হয় উম্মাহর বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষাপটেই আয়াতটি নাযিল হয়েছিল। কারণ বর্তমানে মুসলমানরা শত শত ফিরকায় বিভক্ত হয়ে আছে শুধুমাত্র হিংসা বিদ্বেষের বশবর্তি হয়ে, যৌক্তিক কোন কারণের উপর ভিত্তি করে নয়। ইসলামের মূলনীতি হলো বুনিয়াদি বিষয়ে এখতেলাফ করা যাবে না, ফুরুয়ি বা শাখাগত বিষয়ে এখতেলাফ জায়েয তবে এফতেরাক (বিভক্তি) হারাম। আর বুনিয়াদি বিষয়ে এখতেলাফ করেছে শিয়াদের মধ্যে বাহায়ি ও সুন্নিদের মধ্যে কাদিয়ানী- এ দুইদল উম্মাহ থেকে খারিজ হয়ে গেছে-তারা অমুসলিম। কিন্তু সাধারণ শিয়া ও সুন্নিরা বুনিয়াদি বিষয়ে এখতেলাফ করেনি বিধায় তাদের মধ্যে এফতেরাক হারাম। আর বুনিয়াদী বিষয় হচ্ছে ঈমানে মুফাসসাল। যেমন, امنت بالله و ملاءكته و كتبه و رسله—— অর্থাৎ আল্লাহ, ফিরিস্তা, কিতাবসমূহ, রাসূলগণ, কিয়ামত দিবস, তাকদীরের ভাল- মন্দ এবং মৃত্যুর পর পুনরুত্থান- এই হচ্ছে ঈমানের শর্ত, এগুলোতে যে বিশ্বাস করবে সে পূর্নাঙ্গ মুমিন। তার সাথে ঐক্য ফরয বিভক্তি হারাম। আর শিয়া- সুন্নী নির্বিশেষে মুসলিম দাবীদার কেউ উক্ত বিষয় গুলিতে মতভেদ করে না বিধায় তাদের মধ্যে বিভক্তির সুযোগ নেই।

কিন্তু তারা ফুরুয়ি বিষয়ে এখতেলাফ করে এফতেরাক হয়ে গেছে। যেমন শিয়ারা বলে হযরত আলী খেলাফতের প্রথম হকদার, পূর্বের তিন খলিফা সেই হক ছিনতাই করেছেন। এ মতবাদ ফাসেকি হতে পারে কিন্তু কুফূরি নয় বিধায় এফতেরাকের সুযোগ নেই। কারণ শরীয়তে সাহাবা রাজীয়াল্লাহু আনহুমের মা’সুমিয়্যতের বিষয়ে ঈমান আনার কোন বাধ্য-বাধকতা নাই। আবার সুন্নীরা তো আরো জঘন্য। কারণ তারা তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়ে এখতেলাফ করে এফতেরাক হয়ে গেছে। যেমন কেউ বলতেই পারে সাহাবায়ে কারাম মি’য়ারে হক নয় অথবা মি’ইয়ারে হক। কেউ বলতেই পারে রাসূল (সাঃ) নূরের সৃষ্টি অথবা মাটির সৃষ্টি। কেউ বলতেই পারে মাযার যিয়ারত, মিলাদ-কিয়াম জায়েয অথবা জায়েয নয়। এগুলি সাধারণ গুনাহ-খাতার বিষয়, মৌলিক কোন বিষয় নয়। তবে এসব মতান্তর থেকে দূরে থাকা উত্তম। কারণ এসব বিষয় ইবাদত-বন্দেগী, শিক্ষা-দিক্ষা,চাকরি, বিয়ে-শাদি ইত্যাদি কোন ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কোন বিষয় নয়, শুধুমাত্র উম্মাহ ধ্বংসের উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কারণ এসব ফুরুয়ি বিষয়ে এখতেলাফের উপর ভিত্তি করে ইসলামের শস্য ভাণ্ডার ভারত বর্ষের মুসলমানরা বেরেলভী, দেওবন্দী, জামাতী, তরিকতী ইত্যাদি পরস্পর বিদ্বেষী ফেরকায় বিভক্ত হয়ে গেছে। ফলে ভারত বর্ষে এমনকি সমগ্র বিশ্বে মুসলিম উত্থানের সম্ভাবনাকে আতুর ঘরেই গলা টিপে হত্যা করা হচ্ছে। আর এসব ফিরকাবাজরা পরস্পরের প্রতি এতটাই হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করে যে, তারা ইহুদী-খৃষ্টান, হিন্দু-বৌদ্ধের সাথে ঐক্য করতে রাজি আছে, তাদেরকে ডেকে এনে প্রতিপক্ষ ফিরকাকে সাইজ করতে প্রস্তুত আছে কিন্তু নিজেদের মধ্যে ঐক্য স্থাপন করতে মোটেও প্রস্তুত নয়। যেমন, আরব বিশ্ব ইসরাইলের সহায়তায় ব্রাদারহুড ও ইরানকে শায়েস্তা করার চেস্টায় আছে। সুতরাং এসব বিভক্তিবাদিরা বায়্যিনাহ আসার পর অর্থাৎ কোরআন হাদীসে বিভক্তি সম্পর্কে নিষেধাজ্ঞা ও কঠোর ধ্মকি আসার পরেও বিভক্তির সৃষ্টি করেছে। কাজেই বলতে হচ্ছে এসব ফিরকাবাজদের উদ্দেশ্যে দেড় হাজার বছর পূর্বে উক্ত আয়াতটি নাযিল হয়েছে।

সংশয় নিরসনঃ মাযহাব ও তাকলিদ ফিরকাবাজি নয়। কারণ সরাসরি কোরআন হাদীস থেকে মাসয়ালা উদ্ভাবন করে আমল করা সাধারণ আলেম বে-আলেম নির্বিশেষে কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। এজন্যই তাকলিদ ব্যতিত গত্যন্তর নেই। আর আয়িম্মায়ে মুজতাহিদীন অক্লান্ত পরিশ্রম করে কোরআন সুন্নাহর ভিত্তিতে ফিকহ শাস্ত্র প্রনয়ন করেন গেছেন- যাতে সাধারণ মানুষ সহজে আমল করতে পারে। চারটি মাযহাব উম্মতের কাছে গ্রহনীয় ও স্বীকৃত হয়েছে। আর এসব মাযহাবের ইমামগণ একে অন্যকে হক্ক হিসাবে সম্মতি ও স্বীকৃতি দিয়ে গেছেন। কাজেই যে কোন একটির অনুসরণ করলে সে হকপন্থি বলে গন্য হবে। তদুপরি মাসলা মাসায়েল তথা আমলে যিন্দেগি সংক্রান্ত এসব মাযহাব পরস্পরকে স্বীকৃতি দেয়, ঐক্য ও খিলাফতের প্রতি উৎসাহ দেয় বিধায় এগুলি ফেরকা হিসেবে গন্য হবে না। কিন্তু তাকলীদের ক্ষেত্রে এ আক্বিদা থাকতে হবে যে, ঈমামগণ ভুলের উর্ধ্বে ছিলেন না। কাজেই মযহাবে কোন ভুল পাওয়া গেলে কোরআন হাদীসের ভিত্তিতে সংশোধন করে নিতে হবে। যেমন, সাম্প্রতিক কালে আহলে হাদীস ও সালাফীরা হানাফীদের সম্পর্কে বিভিন্ন আপত্তি উত্থাপন করছে, তারা যুক্তি দিচ্ছে হানাফী ফিকহ সংকলন কালে তাদের পক্ষে সকল হাদীস বর্তমানের মত একসাথে পাওয়া সম্ভব ছিল না বিধায় হানাফী ফিকাহ-এ ভুল ভ্রান্তি আছে। খুবই যৌক্তিক কথা। আর উপমহাদেশের মুসলিম সাধারণতঃ সুন্নী হানাফী। কাজেই হানাফী আলেমগণের কাছে নিবেদন –মাযহাব মুসলমানদের মুখ্য উদ্দেশ্য নয়, আসল উদ্দেশ্য আল্লাহ ও রাসূলের সন্তুষ্টি। কাজেই ভুল- ত্রুটি থাকলে কোরান হাদীসের আলোকে সংশোধন করে নিন। অন্যথায় এ পাপের দায়ভার তো আলেমদেরই বহন করতে হবে।

পক্ষান্তরে আহলে হাদীস ও সালাফী ভায়েরা বলেন হানাফী ফিকাহ পড়ার চেয়ে ন্যাকেট ছবি দেখা ভাল। হানাফীরা বেহেস্তে গেলে কুকুরও বেহেস্তে যাবে, আরো অনেক কথা। আবার মধ্যপ্রাচ্য থেকে কোটি কোটি টাকা এনে হানাফীদের সালাফী বানাতে ব্যস্ত। অর্থাৎ হানাফীরা যেন কাফের, তাদেরকে মুসলমান বানাতে চাচ্ছে। এখন আমাদের কথা হল, হানাফীদের ভুল আছে নাকি আহলে হাদীসের তা আলেমগণ দেখবেন। তবে বাস্তবতায় আমরা দেখি এদেশে কোন খৃষ্টান ছিল না, অথচ আজ দেশের সীমান্ত অঞ্চল গুলিসহ পাবর্ত্য চট্টগ্রামে ব্যাপক ধর্মান্তর চলছে। পাবর্ত্য এলাকায় খৃষ্ট রাজ্য স্থাপনের ষড়যন্ত্র চলছে। আপনারা এত পারেন, এত টাকা ঢালতে পারেন-তাহলে ঐসব সমস্যার সমাধান করছেন না কেন ? একটা মুসলিম দেশের মুসলমানসহ অন্যদের খৃষ্টান বানানো হচ্ছে আর আপনারা হানাফীদের পিছু লেগে আছেন- তাদেরকে মুসলমান বানাবেন। ওদিকে মুসলমান খৃষ্টান হয়ে যাচ্ছে সেদিকে আপনাদের কোন দৃষ্টি নেই। ভণ্ডামির একটা সীমা থাকা চাই। বস্তুত মুসলিম জাতির প্রতিটি ফিরকার কাজ হলো নিজেদের মধ্যে খোচাখোচি করে হানাহানির সৃষ্টি করা আর বিধর্মীদের সামনে জী হুযুরী করা। খিলাফত প্রতিষ্ঠা ব্যতিত এই অভিশাপ থেকে মুক্তির উপায় নেই।

وَلَوْلَا كَلِمَةٌ سَبَقَتْ مِن رَّبِّكَ = এর বাস্তব প্রয়োগঃ রাসূল (সাঃ) দোয়া করে গেছেন, তার উম্মতকে যেন পাপের কারণে আদ-সামুদ ইত্যাদি সম্প্রদায়ের ন্যায় সমূলে ধ্বংস না করা হয়। আল্লাহ্‌ তা’লাও পরকালের শাস্তি নির্ধারণ করে ইহকালে ধ্বংস না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তবে সতর্কতামূলক কিছু কিছু শাস্তি দিবেন। আর মুসলিম জাতির উপর এ শাস্তির নযির সমগ্র বিশ্বেই দেখা যাচ্ছে। বিশেষতঃ বিভক্তির ফলস্বরূপ মধ্যপ্রাচ্য তো আগ্নেয়গিরিতে পরিণত হয়েছে। আর বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট হচ্ছে –শাপলা চত্বরে তরিকতী ও অন্যান্যদের সমর্থনে মুসলমান মুসলমানদের হত্যা করেছে। দেওবন্দী, তরিকতী ও অন্যান্যদের সমর্থনে মুসলমানরাই জামাতকে আদালতে, পথে-ঘাটে, মাঠে-প্রান্তরে হত্যা করে চলেছে। এসব হলো আল্লাহ্‌র চূড়ান্ত সতর্কবার্তা। এখনো যদি বিভক্তিবাদিদের হুস না আসে, তারা যদি ঐক্যবদ্ধ না হয় তাহলে আল্লাহ্‌ তা’লা চূড়ান্ত গযব ঢেলে দিবেন। আল্লাহ্‌র গযব হিসেবে বার্মা বাংলাদেশকে ধ্বংস করে দিবে, ভারত পাকিস্তান ধ্বংস করে দিবে, ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্য ধ্বংস করে কথিত প্রমিজল্যান্ড বৃহত্তর ইসরাইল গঠন করবে (প্রভু আমাদের ভুমিগুলি হেফাজত করুন)। কাজেই ঐক্য ব্যতিত এ জাতির মুক্তির দ্বিতীয় পথ নেই। যারা ঐক্যের অন্তরায় তারা শয়তান বিধায় তাদেরকে হত্যা করে হলেও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। অন্যথায় এ জাতির ধ্বংস কেউ রুখতে পারবেনা।

وَإِنَّ الَّذِينَ أُورِثُوا الْكِتَابَ.= যারা ইহুদী খৃষ্টান বা আরবের কাফেরদের পরে কিতাবের উত্তরাধিকারী হয়েছে তারা কিতাব সম্পর্কে সন্দেহে নিপতিত। এখন বাস্তবতা হচ্ছে উল্লেখিত কাফেরদের পরে কিতাবের উত্তরাধিকারী হয়েছি আমরা। আর আমরাই কোরআন সম্পর্কে চরম সন্দেহের দোলায় নিমজ্জমান। আমাদের প্রগতিশীলরা মনে করে কোরানি আইন দিয়ে রাষ্ট্র চালানো সম্ভব না, কোরআনে মজবুত কোন অর্থ ব্যবস্থা ও বিচার ব্যবস্থা নাই। আর এজন্যই তারা পশ্চিমা দাজ্জালি মতবাদের অনুসরণ করছে। অথচ কোরআনের বিধান কত ইনসাফপূর্ন কত মানবিক তা তারা অনুধাবন করার চেষ্টাও করে না (বিস্তারিত খিলাফত ইশতিহার)। আবার বিভিন্ন ফেরকায় বিভক্ত আলেম সমাজ মনে করে কোরআন মুসলিম জাতিকে রক্ষা করার সামর্থ রাখে না।এজন্যই মুসলিম জাতির এ পতন, বিশ্বময় তারা মার খাচ্ছে। কিন্তু এ পতনের মূলে যে আলেম সমাজ দায়ী, তাদের সৃষ্ট ফিরকা বিভক্তিই যে উম্মাহর ধ্বংস ডেকে আনছে এ কথা তারা বুঝে না। বিভক্তিবাদ সম্পর্কে কোরআনের আয়াতগুলি তারা দেখে না, অর্থ বুঝে না, বুঝতে চায় না। সুতরাং এভাবেই মুসলিম জাতি কোরানের ব্যাপারে সন্দেহে নিমজ্জিত হয়ে স্বহস্তে নিজেদেরকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছে।   (ধারাবাহিক)

Leave a Reply