আল-কোরানের কাঠগড়ায় বিভক্তিবাদ- ১৪

প্রমাণ আসার পর ফিরকাবাজরা বিভক্ত হয়-

﴿وَمَا تَفَرَّقَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ إِلَّا مِن بَعْدِ مَا جَاءَتْهُمُ الْبَيِّنَةُ﴾

প্রথমে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছিল তাদের মধ্যে তো বিভেদ সৃষ্টি হলো তাদের কাছে ( সত্য পথের ) সুস্পষ্ট প্রমাণ এসে যাওয়ার পর। (বায়্যিনা/ ৪)

ব্যখ্যাঃ- অর্থাৎ ইতিপূর্বে আহলি কিতাবরা বিভিন্ন ভুল পথে পাড়ি জমিয়ে যেসব বিভিন্ন দল ও উপদলের উদ্ভব ঘটিয়েছিল তার কারণ এ ছিল না যে , মহান আল্লাহ নিজের পক্ষ থেকে তাদেরকে পথ দেখাবার জন্য সুস্পষ্ট প্রমাণ পাঠাবার ব্যাপারে কোন ফাঁক রেখেছিলেন। বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে পথনির্দেশনা আসার পর তারা নিজেরাই এ কর্মনীতি অবলম্বন করেছিল। কাজেই নিজেদের গোমরাহীর জন্য তারা নিজেরাই দায়ী ছিল। কারণ তাদেরকে সঠিক পথ দেখাবার জন্য পূর্ণাংগ ব্যবস্থা অবলম্বন করে প্রমাণ পূর্ণ করা হয়েছিল। অনুরূপভাবে এখন যেহেতু তাদের সহীফাগুলো পাক-পবিত্র ছিল না এবং তাদের কিতাবগুলো একেবারে সত্য সঠিক, শিক্ষা সম্বলিত ছিল না, তাই মহান আল্লাহ একটি সুস্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে নিজের একজন রাসূল পাঠিয়ে এবং তাঁর মাধ্যমে পুরোপুরি সত্য – সঠিক শিক্ষা সম্বলিত পাক পবিত্র সহীফা পেশ করে আবার তাদের উপর প্রমাণ পূর্ণ করে দিলেন।ফলে এর পরেও যদি তারা বিক্ষিপ্ত হয়ে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয় তাহলে এর দায়িত্ব তাদের উপরই বর্তাবে । আল্লাহর মোকাবেলায় তারা কোন প্রমাণ পেশ করতে পারবে না । কুরআন মজীদের বহু জায়গায় একথা বলা হয়েছে । (তাফহীম)

বাস্তব প্রয়োগঃ- অত্র আয়াতের ভিত্তিতে একটি সরল প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে, আল্লাহ ও রাসুলের প্রতি কে বড় গাদ্দার ইহুদি, খৃষ্টান নাকি উম্মাহর আলেম সমাজ? বাস্তবতা বলছে আলেম সমাজ। কারন আহলে কিতাবরা রাসুলের প্রতি ঈমান না আনার পিছনে অন্তত কিছুটা হলেও খোড়া যুক্তি কার্যকর ছিল। যেমন তাদের ধর্ম গ্রন্থ গুলিতে রাসুলের বিবরন অনেকটা রুপকাকৃতিতে ছিল, যেমন মৈত্রেয় বুদ্ধ, কল্কি, নরাশংস, উস্ট্রারোহি, ফারানের ভাববাদি, পারাক্লিট ইত্যাদি। ২) স্বার্থ পুজারি পোরুহিতরা এসব বর্ননার অপব্যাখ্যা করে সাধারণ জনগনকে রাসুলের প্রতি ঈমান আনার দাওয়াতের পরিবর্তে ক্ষেপিয়ে তুলেছিল। ৩) ঐসব ধর্ম গ্রন্থ নাযিলের হাজার হাজার বছর পর রাসুলের আগমন ঘটে। এ ছাড়া গোত্র ও জাতিগত হিংসা বিদ্বেষ ও অহংকার ইত্যাদি তো ছিলই। কাজেই আহলে কিতাবরা রাসুলের প্রতি ঈমান না আনার এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ে বিভক্ত হওয়ার পিছনে ক্ষীণ হলেও একটা যুক্তি আছে। পক্ষান্তরে আলেম সমাজ, গলায় ঝুলিয়ে, পকেটে, পেটে মস্তিস্কে কোরআন নিয়ে চলাফিরা করে। আর এই কোরআনের শত শত আয়াত দ্বারা ঐক্য ফরয করা হয়েছে বিভক্তি হারাম করা হয়েছে। তদুপরি অসংখ্য হাদিসে এ বিষয়ে কঠোর হুমকি এসেছে এমনকি ফিরকাবাজদের হত্যার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর ইসলামের বিধান সমুহের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন এবং কঠোর বিধান হচ্ছে উম্মাহর ঐক্য এবং ফিরকাবাজির নিষেধাজ্ঞা। অথচ আলেমরা কোরআন বগলদাবা রেখে আল্লাহ ও রাসূলকে থোরাই কেয়ার করে উম্মাহকে শত শত ফিরকায় বিভক্ত করে ধ্বংস করে দিয়েছে। কাজেই সাধারণ মুসলমানদের আকলে সলিম-সুস্ট বিবেক সিদ্ধান্ত দিবে আল্লাহ ও রাসুলের বড় শত্রু কারা, আহলে কিতাবরা নাকি আলেম সমাজ। যদি আলেম সমাজ হয়, তাহলে দেড়শ কোটি মুসলমানের বিবেকের আদালতে মুকাদ্দমা দায়ের করা হল সেই মুজরিমদের বিচার ফয়সালা করার জন্য।

ফিরকার পরিমানঃ উম্মাহর মধ্যে ফেরকার সংখ্যা কত? মুসলমানদের মধ্যে যতটা দর্গা মাজার পীর- মাশায়েখ ও বড় আলেম আছে ফিরকার সংখ্যাও ঠিক ততটাই।সঠিক সংখ্যাটা কত হবে তা কোন পরিসংখ্যানবিদের পক্ষে বলা সম্ভব নয়। তবে বহুল প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ কিছু ফিরকার নাম উল্লেখ করছি। কিন্তু প্রাচীন ফিরকা গুলি এখন আর নাই বিধায় আধুনিক কিছু ফিরকার নাম বলছি। যেমন, বাহায়ি, কাদিয়ানী, কাদিয়ানী লাহোরি গ্রুপ, চুন বিশ্ব ইশ্বর ও তার দ্বীনদার আঞ্জুমান, আগাখানী, খাকছার পার্টি, মুনকিরিনে হাদিস, পারভেজী মতবাদ, চকরালবী ফিরকা, মাহদবিয়া সম্প্রদায়, জৌনপুরী মতবাদ, যিকরী সম্প্রদায়, আহলে হাদীস, ন্যাচারিয়া দল ইত্যাদি। আবার দেশিয় কিছু ফিরকা, সুরেশ্বরী, এনায়েতপুরী, আটরশী, চন্দ্রপুরী, দেওয়ানবাগী, রাজারবাগী, মাইজভান্ডারী, রেজবী বা রেজাখানী, বে শরা পীর-ফকীর, বাউল সম্প্রদায়, আজানগাছি, সর্বেশ্বরবাদ/ সর্বখোদাবাদ ইত্যাদি।

অনন্তর যার মধ্যে প্রকৃত ঈমান আছে এমন কোন মুসলমান এসব ফিরকার আক্বিদা- বিশ্বাস সম্পর্কে জানলে মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যাবে, আর তাদের অপকর্ম সম্পর্কে জানলে হার্ট ফেল করবে। এরা কিভাবে ইসলাম ধ্বংস করছে আর ইসলাম নিয়ে কত জঘন্য বানিজ্য করছে তা পর্যবেক্ষন করলে বুঝা যায় আল্লাহ ও রাসুল কেন এসব ফিরকাবাজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ও হত্যা করা ওয়াজিব করেছেন। ইহুদি খৃষ্টানরা নিজেদের ধর্মে যতটা বিকৃতি করেছে এসব ফিরকাবাজরা ইসলামের মধ্যে তার চেয়েও কয়েক হাজার গুন বেশি করে ফেলেছে। কাজেই ঐক্য ব্যাতিত এ অভিশাপ থেকে মুক্তির উপায় নেই। কারণ ঐক্যের মাধ্যমে খিলাফত প্রতিষ্ঠা ছাড়া এসব অপকর্ম নির্মুল করার অন্য কোন পন্থা নেই।

আমাদের আহবানঃ আলেম সমাজই হচ্ছেন ইসলামের ধারক বাহক। ইসলামের ভাল মন্দ তাদেরকেই বুঝতে হবে। কাজেই সকল আলেম ঐক্যবদ্ধ হয়ে খিলাফত প্রতিষ্ঠার পর ইসলাম বিধ্বংসী সকল অপকর্মের মুলুৎপাটন করতে হবে। অন্যথায় ইসলাম ধ্বংসের সকল দায় মাথায় নিয়ে তাদেরকে আল্লাহর দরবারে কঠিন জবাবদিহি করতে হবে। আর দেওবন্দী, তাবলীগী, জামাতী, সালাফী, ব্রাদারহুড ইত্যাদি যেসব ফিরকার আমি সমালোচনা করছি বস্তুত ফিরকাবাজি ও অন্যান্য কিছু বিদাত ছাড়া এরাই হচ্ছে ইসলামের মুল ধারা। আর এরাই ইসলামের মুল দায়িত্বশিল বিধায় আমি সমালোচনা করছি। কাজেই প্রথমে এসব ফিরকার আলেমদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে তারপর বাকীদের ঐক্যের উপর বাধ্য করতে হবে। আল্লাহ সবাইকে তাওফিক দান করুন।    (ধারাবাহিক)

Leave a Reply