মওদুদীর “সংস্কার তত্ত্ব” ও জামায়াত-শিবিরের “বিপ্লব তত্ত্ব”!

শিরোনাম দেখে কপালে একটু ভাঁজ পরে যেতে পারে! মওদুদী সাহেব বিপ্লবের কথা বলেন নি?! হ্যা আমিও তার ব্যাতিক্রম ছিলাম না!
আসলে “সংস্কার তত্ত্ব” ও “বিপ্লব তত্ত্ব” দুইটা আলাদা জিনিস, সে আলোচনা এখানে করলাম না। মওদুদী সাহেব “সংস্কার তত্ত্বে” বিশ্বাসী ছিলেন। যদিও এখন আমরা দেখতে পাই তার দল জামায়াত-শিবির “বিপ্লব তত্ত্বে” বিশ্বাসী!
একটা শ্লোগান আমরা জামায়াতী ভাইদের কাছে হর-হামেসাই শুনে থাকিঃ- “বিপ-বিপ-বিপ্লব, ইসলামী বিপ্লব” তা ছারা জমায়াত-শিবিরের সিলেবাসের একটি মৌলিক বই মওদুদী সাহেবের লিখিত ” ইসলামী বিপ্লবের পথ”! আসলে এই নামটি মওদুদী সাহেবের দেয়া না বরং বাংলার বিপ্লবী ভাইদের দেয়া!
কারণ এই বইয়ের নাম মওদুদী সাহেব রেখেছিলেন “ইসলামী হুকুমত কেসতরাহ কায়েম হোতি হায়?” এর সরল অনুবাদ হলো, ইসলামী রাষ্ট্র কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়?!
আমার এ দাবীর প্রমান দেখুন মওদুদী সাহেবের লিখিত “জাতীয় পুনর্গঠনের সঠিক পন্থা” নামক আর্টিকেলে –
“উভয়ের পেরণা ও কর্মপন্থায় রয়েছে মৌলিক পার্থক্য। সংস্কার প্রচেষ্টর সূচনা হয় চিন্তা ভাবনা থেকে। সেখানে শান্ত মনে ভেবে চিন্তে মানুষ অবস্থা পর্যালোচনা করে’ বিকৃতি ও বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধান করে, বিকৃতির চৌহদ্দি পরিমাপ করে, তার নিরসনের পন্থা উদ্ভাবন করে এবং তা দূর করার জন্যে যতোটা ধ্বংসাত্বক শক্তির প্রয়োগ একান্ত অপরিহার্য, কেবল ততোটুকু শক্তিই প্রয়োগ করে। পক্ষান্তরে বিপ্লবের সূচনা হয় প্রবল রোষাগ্নি ও তীব্র প্রতিহিংসা পরায়ণতা থেকে। তাতে এক বিকৃতির জবাবে অন্য এক বিকৃতি আমদানি করা হয়। যে অ-মিতাচারের ফলে বিকৃতির উদ্ভব হয়েছিলো, তার মোকাবিলা করা হয় অন্য অ-মিতাচারের দ্বারা যে অ-মিত্যাচার অকল্যাণের সাথে সাথে কল্যাণেকেও নিশ্চিহ্ন করে ছাড়ে।”
“সংস্কারবাদী প্রথমেই অনুমান করে নেয় যে, বিকৃতি কোথায় এবং তার পরিধি কতোটুকু। অতপর বিকৃতি দূরীকরণের জন্যে যতোটা প্রয়োজন, ঠিক ততোটুকু পরিমাণেই সে অস্ত্র পয়োগ করে। পরন্তু অস্ত্রপচারের পূর্বে সে ঘা শুকাবার ওষধের ব্যবস্থা করে রাখে। কিন্তু বিপ্লববাদী তার ক্রোধের অতিশয্যে একেবারে অন্ধভাবে অস্ত্র চালাতে থাকে। এবং ভালো-মন্দ নির্বিশেষে সবকিছুই সে কেটে চলে যায়। এভবে যখন অনেক কাটা ছেঁড়া করা হয় এবং দেহে একটি বেশ সুস্থ অংশ বিলুপ্ত করার পর নিজের ভ্রান্তি অনুভব করতে পারে, তখনি হয়তো তার ঔষধের কথা মনে আসে।” “বিপ্লববাদীরা যখন জয়লাভ করে, তখন সত্য মিথ্যা, ভলো মন্দ নির্বিশেষে রক্ষণশীলদের প্রতিটি জিনিসকেই ধ্বংস করে ছাড়ে। বস্তুত বিপ্লব ঠিক বন্যার বেগে এগিয়ে চলে। ভাল মন্দ নির্বিচারে সবাইকে সে ভাসিয়ে নিয়ে যায়,ঠেলে দেয় বিলুপ্তির মুখে।”
“এভাবে ঐ বিকৃতাবস্থার পরিবতনের জন্যই বিভিন্ন দল (জামায়াত সেই পথে নয় তো!) উপদল গজিয়ে উঠেছে। কিন্তু তাদের আগ্রহ আকর্ষণটা সংস্কারের দিকে নয়, বরং বিপ্লবের দিকে। তারা শান্ত মনে চিন্ত‍া করেই দেখেনি, আসল বিকৃতিটা কি? কোথায় তার উৎস? বিকৃতির পরিধি কতটুকু এবং তার নিরসনের সঠিক পন্থা কি? নিছক অনুমানের সাহায্যেই এটা ধরে নেয়া হয়েছে যে, বিকৃতির অস্তিত্ব রয়েছে। আর তা দূরীকরণের জন্যে উম্মতের দেহে অস্ত্র প্রয়োগ করা হচ্ছে। এর ফলে রোগের সঙ্গে রোগীর ও যে সবর্নাশ ঘটতে পারে, এটুকু তলিয়ে চিন্তা করা হচ্ছেনা।”
“এখানে প্রথমত কোনো বিপ্লবী কার্যক্রমের প্রয়োজন নেই। কারণ এখানে এমন কোন প্রচন্ড ও শক্তিশালী প্রতিবন্ধকতার আশঙ্কা নেই, যার মোকবিলায় একটি ‍ভারসাম্যপূণ সংস্কার আন্দোলন সফলকাম হতে পারেনা। দ্বিতীয়ত, কোনো বিপ্লবী কার্যক্রম শুরু এবং তা সফলকাম হলে দীর্ঘকাল পযন্ত তার ভারসাম্যের পথে আসবার কোনো সম্ভাবনা থাকে না। কারণ বিপ্লবের ঝান্ডাবাহীদের কোনোবাধ্য বাধকতা পূণ দায়িত্বভার ন্যস্ত হবে না, যা তাদের প্রান্তিকধমিতাকে ভারসাম্যের দিকে ঘুরিয়ে দিতে পারে। কাজেই এখানে কোনো বিপ্লবী কাযক্রম যথাথ নয়। বরং সত্য বলতে গেলে নানা ধরণের বিপ্লবী কাযক্রম বেশি দিন জারী থাকলে তার পরিণতি অত্যন্ত মারাত্মক হয়ে দাঁড়াবে। ফলে যে ভিত্তি ভুমির উপর মুসলিম সমাজটি দাঁড়িয়ে আছে, তা টলমলিয়ে উঠবে এবং তার পরিবতে এমন কোনো সুদৃঢ় ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করা যাবে না, যার ওপর একটি নয়া সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। পরন্তু যে জাতি আগে থেকেই পরাধীনতা ও নিবীযতার মধ্যে রয়েছে, তার সমাজ ব্যবস্থাকে এভাবে চুরমার করে ফেলা হলে নৈতিক অধপাতের কোন গভীর অতলে সে নিক্ষিপ্ত হবে, তাও ভেবে দেখবার বিষয়।”
“এ কারণেই আমরা কখনো কখনো রক্ষণশীলদের চাইতে ও বেশি কঠোরতার ‍সাথে বিপ্লববাদীদের মোকাবেলা করতে বাধ্য হই।”
“আমাদের মতে, এই গতিশীলতা সৃষ্টির জন্য ইসলামী রীতিনীতি বজন করে ফিরিঙ্গীপনা আকড়ে ধরা কোনো নিভুল পথ নয়”
জামায়ত-শিবির কি সেই ফিরিঙ্গীপনা মুক্ত আছে?
বিষয়টি অন্তত তাদের পুনর্বিবেচনা করা উচিৎ!

3 Responses

  1. আবু সাইফ
    আবু সাইফ at |

    আসসালাম…..
    *””মওদুদী সাহেব “সংস্কার তত্ত্বে” বিশ্বাসী ছিলেন। যদিও এখন আমরা দেখতে পাই তার দল জামায়াত-শিবির “বিপ্লব তত্ত্বে” বিশ্বাসী!””*
    জামায়াত-শিবির যে “বিপ্লব তত্ত্বে” বিশ্বাসী তার কোন প্রমান উপস্থাপিত হয়নি!
    কিন্তু তাদের কর্মসূচী কি বিপ্লবের, নাকি সংস্কারের?
    সেটা এ আলোচনায় বিবেচনায় নেয়া হলোনা কেন??

    মূলতঃ এটি নিছক শব্দ নিয়ে বিতর্ক মনে হলো !!! মন্দ নয়!!
    যখন “চরিত্র” বিবেচনায় না এনে শুধু “নাম” নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয় তখন সেটাকে, আর যাই হোক, সদুদ্দেশ্যরূপে গ্রহন করা কঠিন হয়ে পড়ে!!
    যাঁরা জামায়াত-শিবিরকে “পাশ্চাত্য গণতন্ত্রের অনুসারী” বলে অভিযুক্ত করতে চান তাঁরাও এ কর্মটিই করে থাকেন!!

    কোন কোন বিষয়ে “ইসলামী রীতিনীতি বর্জন করে ফিরিঙ্গীপনা আঁকড়ে ধরা”-র অপরাধে এ প্রশ্নটি “জামায়াত-শিবির কি সেই ফিরিঙ্গীপনা মুক্ত আছে?” করা হয়েছে সেটা সুনির্দিষ্টভাবে বলা উচিত ছিল !!

    আশা করি লেখক বিস্তারিত আলোচনা করে জামায়াত-শিবিরের সংশোধন বা জবাবের পথটা প্রশস্থ করবেন!

    Reply

Leave a Reply