আল-কোরানের কাঠগড়ায় বিভক্তিবাদ- ১৬

তাওহীদের উপর ঐক্যের নির্দেশ এবং মুরুব্বীদের রব হিসাবে আনুগত্যের নিষেধাজ্ঞা-

قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَىٰ كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَلَّا نَعْبُدَ إِلَّا اللَّهَ وَلَا نُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا وَلَا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّهِ ۚ فَإِن تَوَلَّوْا فَقُولُوا اشْهَدُوا بِأَنَّا مُسْلِمُونَ [٣:٦٤]

বলুনঃ ‘হে আহলে-কিতাবগণ! একটি বিষয়ের দিকে আস-যা আমাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে সমান-যে, আমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করব না, তাঁর সাথে কোন শরীক সাব্যস্ত করব না এবং একমাত্র আল্লাহকে ছাড়া কাউকে পালনকর্তা বানাব না। তারপর যদি তারা স্বীকার না করে, তাহলে বলে দাও যে, ‘সাক্ষী থাক আমরা তো অনুগত।(৩/ ৬৪)

ঈমাম কুরতুবী বলেন, এখানে তিনটি আলোচনা রয়েছে। (১) قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ এখানে আহলে কিতাব দ্বারা ইবনে যায়েদ, হাসান ও সুদ্দীর মতে নাজরানের প্রতিনিধি দলকে সম্ভোধন করা হয়েছে। কাতাদা, ইবনে জুরাইজ ও অন্যান্যদের মতে মদীনার ইহুদীদের সম্ভোধন করা হয়েছে। কারণ আনুগত্যের ক্ষেত্রে তারা নিজেদের ধর্মগুরুদের রব হিসাবে গ্রহণ করেছিল। কেউ কেউ বলেন, এখানে ইহুদী, নাসারা সবাই উদ্দেশ্য।

কিন্তু ইমাম তাবারী বলেন فالواجب أن يكون كل كتابيّ معنيًّا به. لأن إفرادَ العبادة لله وحدَه، وإخلاصَ التوحيد له، واجبٌ على كل مأمور منهيٍّ من خلق الله. واسم”أهل الكتاب”، يلزم أهل التوراة وأهل الإنجيل، فكان معلومًا بذلك أنه عني به الفريقان جميعًا

ফতহুল কাদির গ্রন্থকার বলেন, لِأَنَّ هَذِهِ دَعْوَةٌ عَامَّةٌ لَا تَخْتَصُّ بِأُولَئِكَ الَّذِينَ حَاجُّوا رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عليه وَسَلَّم. আয়াতের আহ্বান ব্যাপকার্থক বিধায় উহাকে নাজরানের প্রতিনিধিদের সাথে খাস করা যাবে না বরং ব্যাপকার্থেই প্রয়োগ করতে হবে।

ইমাম বগবী বলেন, উক্ত আয়াতের মাধ্যমে রাসূল (সাঃ) রুম সম্রাটকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলেন। যেমন–

“بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ. مِنْ مُحَمَّدٍ عَبْدِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ، إِلَى هِرَقْلَ عَظِيمِ الرُّومِ، سَلَامٌ عَلَى مَنِ اتَّبَعَ الْهُدَى، أَمَّا بَعْدُ: فَإِنِّي أَدْعُوكَ بِدِعَايَةِ الْإِسْلَامِ، أَسْلِمْ تَسْلَمْ، أَسْلِمْ يُؤْتِكَ اللَّهُ أَجَرَكَ مَرَّتَيْنِ، فَإِنْ تَوَلَّيْتَ فَإِنَّمَا عَلَيْكَ إِثْمُ الْأَرِيسِيِّينَ {يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَى كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَلَّا نَعْبُدَ إِلَّا اللَّهَ وَلَا نُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا وَلَا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَقُولُوا اشْهَدُوا بِأَنَّا       مُسْلِمُونَ}

উল্লেখ্য যে পাঠকদের কিছুটা বাড়তি অবগতির জন্য উক্ত (বুখারী শরীফের ৬নং) হাদীসটির প্রথমার্ধের তরজমা তুলে ধরা হল। আবুল ইয়ামান হাকাম ইব্ন নাফি’ (র) ……… আবদুল্লাহ্ ইব্ন ‘আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, আবূ সুফিয়ান ইব্ন হরব তাকে বলেছেন, বাদশাহ হিরাক্লিয়াস একবার তাঁর কাছে লোক পাঠালেন। তিনি কুরাইশদের কাফেলায় তখন ব্যবসা উপলক্ষে সিরিয়ায়  ছিলেন। সে সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা) আবূ সুফিয়ান ও কুরাইশদের সাথে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সন্ধিবদ্ধ ছিলেন। আবূ সুফিয়ান তার সঙ্গীদের সহ হিরাক্লিয়াসের কাছে এলেন এবং তখন হিরাক্লিয়াস জেরুযালেমে অবস্থান করছিলেন। হিরাকল তাদেরকে তাঁর দরবারে ডাকলেন। দোভাষীকে ডাকলেন। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এই যে ব্যক্তি নিজেকে নবী বলে দাবী করে—তোমাদের মধ্যে বংশের দিক দিয়ে তাঁর সবচেয়ে নিকটাত্মীয় কে?’ আবূ সুফিয়ান বললেন, ‘আমি বললাম, বংশের দিক দিয়ে আমিই তাঁর নিকটাত্মীয়।’ তিনি বললেন, ‘তাঁকে আমার খুব কাছে নিয়ে এস এবং তাঁর সঙ্গীদেরও কাছে এনে পেছনে বসিয়ে দাও।’ এরপর তাঁর দোভাষীকে বললেন, ‘তাদের বলে দাও, আমি এর কাছে সে ব্যক্তি সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসা করবো, সে যদি আমার কাছে মিথ্যা বলে, তবে সাথে সাথে তোমরা তাকে মিথ্যাবাদী বলে প্রকাশ করবে।’ আবূ সুফিয়ান বলেন, ‘আল্লাহর কসম! তারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলে প্রচার করবে-এ লজ্জা যদি আমার না থাকত, তবে অবশ্যই আমি তাঁর সম্পর্কে মিথ্যা বলতাম।’ এরপর তিনি তাঁর সম্পর্কে আমাকে প্রথম প্রশ্ন করেন তা হচ্ছে, ‘তোমাদের মধ্যে তাঁর বংশমর্যাদা কেমন?’ আমি বললাম, ‘তিনি আমাদের মধ্যে অতি সম্ভ্রান্ত বংশের।’ তিনি বললেন, ‘তোমাদের মধ্যে এর আগে আর কখনো কি কেউ একথা বলেছে?’ আমি বললাম, ‘না।’ তিনি বললেন, ‘তাঁর বাপ-দাদাদের মধ্যে কি কেউ বাদশাহ ছিলেন?’ আমি বললাম, ‘না।’ তিনি বললেন, ‘তারা কি সংখ্যায় বাড়ছে, না কমছে?’ আমি বললাম, ‘তারা বেড়েই চলেছে।’ তিনি বললেন, ‘তাঁর দ্বীন গ্রহণ করার পর কেউ কি নারায হয়ে তা পরিত্যাগ করে?’ আমি বললাম, ‘না।’ তিনি বললেন, ‘নবূয়তের দাবীর আগে তোমরা কি কখনো তাঁকে মিথ্যার দায়ে অভিযুক্ত করেছ?’ আমি বললাম, ‘না।’ তিনি বললেন, ‘তিনি কি চুক্তি ভঙ্গ করেন?’ আমি বললাম, ‘না।’ তবে আমরা তাঁর সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট সময়ের (হুদায়বিয়া) চুক্তিতে আবদ্ধ আছি। জানি না, এর মধ্যে তিনি  কি করবেন।’ আবূ সুফিয়ান বলেন, এ কথাটুকু ছাড়া নিজের পক্ষ থেকে আর কোন কথা সংযোজনের সুযোগই আমি পাইনি।’ তিনি বললেন, ‘তোমরা কি তাঁর সাথে কখনো যুদ্ধ করেছ?’ আমি বললাম, ‘হাঁ।’ তিনি বললেন, ‘তাঁর সঙ্গে তোমাদের যুদ্ধ কেমন হয়েছে?’ আমি বললাম, ‘তাঁর ও আমাদের মধ্যে যুদ্ধের ফলাফল কুয়ার বালতির ন্যায়। কখনো তাঁর পক্ষে যায়, আবার কখনো আমাদের পক্ষে আসে।’ তিনি বললেন, ‘তিনি তোমাদের কিসের আদেশ দেন?’ আমি বললাম, ‘তিনি বলেনঃ তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাঁর সঙ্গে কোন কিছুর শরীক করো না এবং তোমাদের বাপ-দাদার ভ্রান্ত মতবাদ ত্যাগ কর। আর তিনি আমাদের সালাত আদায় করার, সত্য কথা বলার, নিষ্কলুষ থাকার এবং আত্মীয়দের সাথে সদ্ব্যবহার করার আদেশ দেন।’ তারপর তিনি দোভাষীকে বললেন, ‘তুমি তাকে বল, আমি তোমার কাছে তাঁর বংশ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছি। তুমি তার জওয়াবে উল্লখ করেছ যে, তিনি তোমাদের মধ্যে সম্ভ্রান্ত বংশের। প্রকৃতপক্ষে রাসূলগণকে তাঁদের কওমের উচ্চ বংশেই প্রেরণ করা হয়ে থাকে। তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি, এ কথা তোমাদের মধ্যে ইতিপূর্বে আর কেউ বলেছে কিনা? তুমি বলেছ, ‘না।’ তাই আমি বলছি যে, আগে যদি কেউ এ কথা বলে থাকত, তবে অবশ্যই আমি বলতে পারতাম, এ এমন ব্যক্তি, যে তাঁর পূর্বসূরীর কথারই অনুসরণ করছে। আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি, তাঁর পূর্বপুরুষের মধ্যে কোন বাদশাহ ছিলেন কি না? তুমি তার জবাবে বলেছ, ‘না।’ তাই আমি বলছি যে, তাঁর পূর্বপুরুষের মধ্যে যদি কোন বাদশাহ থাকতেন, তবে আমি বলতাম, ইনি এমন এক ব্যক্তি যিনি তাঁর বাপ-দাদার বাদশাহী ফিরে পেতে চান। আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি- এর আগে কখনো তোমরা তাঁকে মিথ্যার দায়ে অভিযুক্ত করেছ কি না? তুমি বলেছ, ‘না।’ এতে আমি বুঝলাম, এমনটি হতে পারে না যে, কেউ মানুষের ব্যাপারে মিথ্যা ত্যাগ করবে অথচ আল্লাহর ব্যাপারে মিথ্যা কথা বলবে। আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি, শরীফ লোক তাঁর অনুসরণ করে, না সাধারণ লোক? তুমি বলেছ, সাধারণ লোকই তাঁর অনুসরণ করে। আর বাস্তবেও এরাই হন রাসূলগণের অনুসারী। আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি, তারা সংখ্যায় বাড়ছে না কমছে? তুমি বলেছ বাড়ছে। প্রকৃতপক্ষে ঈমানে পূর্ণতা লাভ করা পর্যন্ত এ রকমই হয়ে থাকে। আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি, তাঁরা দ্বীনে দাখিল হওয়ার পর নারায হয়ে কেউ কি তা ত্যাগ করে? তুমি বলেছ, ‘না।’ ঈমানের স্নিগ্ধতা অন্তরের সাথে মিশে গেলে ঈমান এরূপই হয়। আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি তিনি চুক্তি ভঙ্গ করেন কি না? তুমি বলেছ, ‘না।’ প্রকৃতপক্ষে রাসূলগণ এরূপই, চুক্তি ভঙ্গ করেন না। আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি তিনি তোমাদের কিসের নির্দেশ দেন। তুমি বলেছ, তিনি তোমাদের এক আল্লাহর ইবাদত করা ও তাঁর সাথে অন্য কিছুকে শরীক না করার নির্দেশ দেন। তিনি তোমাদের নিষেধ করেন মূর্তিপূজা করতে আর তোমাদের আদেশ করেন সালাত আদায় করতে, সত্য কথা বলতে ও কলুষমুক্ত থাকতে। তুমি যা বলেছ তা যদি সত্য হয়, তবে শীঘ্রই তিনি আমার এ দু’পায়ের নীচের জায়গার (রুমের) মালিক হবেন। আমি নিশ্চিত জানতাম, তাঁর আবির্ভাব হবে; কিন্তু তিনি যে তোমাদের মধ্যে থেকে হবেন, এ কথা ভাবিনি। যদি জানতাম, আমি তাঁর কাছে পৌঁছাতে পারব, তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য আমি যে কোন কষ্ট স্বীকার করতাম। আর আমি যদি তাঁর কাছে থাকতাম তবে অবশ্যই তাঁর দু’খানা পা ধুয়ে দিতাম। এরপর তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর সেই পত্রখানি আনতে বললেন, যা তিনি দিহ্য়াতুল কালবীর মাধ্যমে বসরার শাসকের কাছে পাঠিয়েছিলেন। তিনি তা পাঠ করলেন। তাতে লেখা ছিলঃ বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম (দয়াময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে)। আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল (সা) এর পক্ষ থেকে রোম সম্রাট হিরাকল এর প্রতি। –শান্তি (বর্ষিত হোক) তার প্রতি, যে হিদায়াতের অনুসরণ করে। তারপর আমি আপনাকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি। ইসলাম গ্রহণ করুন, নিরাপদে থাকবেন। আল্লাহ্ আপনাকে দ্বিগুণ পুরষ্কার দান করবেন। আর যদি মুখ ফিরিয়ে নেন, তবে সব প্রজার পাপই আপনার উপর বর্তাবে। হে আহলে কিতাব! এস সে কথার দিকে, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই; যেন আমরা আল্লাহ্ ব্যতীত আর কারো ইবাদত না করি, কোন কিছুকেই তাঁর শরীক না করি এবং আমাদের কেউ কাউকে আল্লাহ্ ব্যতীত রব রূপে গ্রহণ না করি। যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে বলো, ‘তোমরা সাক্ষী থাক, আমরা মুসলিম’ (৩:৬৪)।

 

تَعَالَوْا إِلَىٰ كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ অর্থ হল হে আহলে কিতাবের লোকেরা! তোমাদেরকে যে সঠিক ও ন্যায়সঙ্গত কথার দিকে আহ্বান করা হচ্ছে তাতে সাড়া দাও। আর সেই কথাটি হল আমরা একমাত্র আল্লাহ্‌র ইবাদত করব, তার সাথে কোন কিছু শরীক করব না। ইমাম তাবারী বলেন . كَلِمَةٍ سَوَاءٍ.অর্থ কলেমায়ে আদল, আর কলেমায়ে আদল অর্থ আমরা আল্লাহ্‌র এককত্বে বিশ্বাস করব। একমাত্র তারই ইবাদত করব, তিনি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য থেকে মুক্ত থাকব, তার সাথে কোন কিছু শরীক করব না।

(২)দ্বিতীয় আলোচনা হচ্ছে.. وَلَا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّهِ ۚ.এর অর্থ হল আমরা কোন জিনিস হালাল ও হারাম করণের ক্ষেত্রে একমাত্র আল্লাহ্‌র বিধান ছাড়া অন্য কাউকে অনুসরণ করব না। অর্থাৎ ইহুদী নাসারারা তাদের ধর্মগুরুদের যেসব বিষয় হালাল ও হারাম করণের ক্ষেত্রে রবের স্থলে অধিষ্ঠিত করেছিল যেগুলি আল্লাহ্‌ তা’লা হালাল ও হারাম করেন নি। এ সম্পর্কে (اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّهِ) আয়াতে বিস্তারিত আলোচনা গত হয়েছে। ইমাম তাবারীর মতে এর অর্থ হল আল্লাহ্‌র অবাধ্যতার বিষয়ে কেউ হুকুম করলে আমরা তার আনুগত্য করি না, আল্লাহকে যেভাবে সিজদা করা হয়, সেভাবে আমরা কাউকে (মাযারে) সিজদা করি না। ইবনে জুরাইজ বলেন, আল্লাহ্‌র অবাধ্যতায় আমরা একে অন্যের আনুগত্য করি না। আর রব হিসাবে গ্রহণ করা অর্থ তাদের উদ্দেশ্যে নামায পড়া নয় বরং ইবাদতের বাইরে অন্যান্য ক্ষেত্রে নেতা ও সর্দারদের আনুগত্য করা।

(৩)তৃতীয় আলোচনা হচ্ছে.. فَإِن تَوَلَّوْا فَقُولُوا اشْهَدُوا بِأَنَّا مُسْلِمُونَ.ঈমাম তাবারী এর ব্যাখ্যায় বলেন ইহুদী নাসারারা যদি . كَلِمَةٍ سَوَاءٍ. এর ডাকে সাড়া না দেয়, কুফুরী করে, তাহলে হে মুসলিমরা তোমরা বল, তোমরা তাওহীদ ও একনিস্ট ইবাদত থেকে পলায়ন করলে অথচ তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নাই, তার কোন শরীক নাই। তোমরা সাক্ষ্য থাক যে, আমরা আত্মসমর্পনকারী এবং জিহ্বা ও অন্তরে তার আনুগত্যকারী।

ইমাম কুরতুবী বলেন, যে তাওহীদের দিকে তোমাদেরকে দাওয়াত দেয়া হচ্ছে- তা থেকে যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তাহলে সাক্ষ্য থাক যে, আমরা মুসলিম, আত্মসমর্পনকারী। ইসলামের গুণে গুণান্বিত। সেসব বিধানের অনুসারী যেগুলি আল্লাহ্‌ তা’লা অনুগ্রহ ও নিয়ামত স্বরুপ আমাদেরকে প্রদান করেছেন। আর আমরা কাউকে রব হিসাবে গ্রহণ করি না, যেভাবে তোমরা ঈসা, উযায়র ও ফেরেস্তাদেরকে রব হিসাবে গ্রহণ করেছ। কারণ তারাও আমাদের মতই মানুষ, আমাদের মতই খোদার সৃষ্ট জীব। সর্বোপরি আমরা কোন ধর্মগুরুকে এমন রব হিসাবে গ্রহণ করি না যে আমাদের উপর তা হারাম করবে যা আল্লাহ্‌ হালাল করেছেন আবার তা হালাহ করবে আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন। আর এরূপ করলে তো আমরাও তোমাদের ( ইহুদী নাসারা) ন্যায় ধর্মগুরুদের রব হিসাবে গ্রহণ করে নিলাম।

বাস্তব প্রয়োগ ও ব্যাখ্যাঃ বর্তমানের আলেম সমাজ এ জাতীয় আয়াতগুলি ইহুদী খৃষ্টানদের সম্পত্তি সাব্যস্ত করে বর্জন করে চলেছেন। অথচ এসব আয়াতে আল্লাহ্‌ তা’লা পূর্ববর্তী উম্মতদের দৃষ্টান্ত পেশ করে মুসলমানদের উপদেশ দিচ্ছেন যে, ইহুদী-খৃষ্টানরা যেভাবে আল্লাহ্‌কে বাদ দিয়ে নিজেদের পোরুহিত ও ধর্ম গুরুদের প্রভু হিসাবে গ্রহণ করে এবং খৃষ্টানরা যিশুকে খোদার ব্যাটা হিসাবে গ্রহণ করে মুশরিক হয়ে গেছে তদ্রুপ মুসলমানরাও যেন ধর্মগুরুদের রব হিসেবে গ্রহণ করে মুশরিকে পরিণত না হয়। আমরা জানি কোরআন সার্বজনিন ও সর্বকালিন। কাজেই এসব আয়াত ইহুদী-খৃষ্টান ও মুশরিকদের শানে নাযিল হলেও সংশ্লিষ্ট অবস্থা মুসলমানদের মধ্যে পাওয়া গেলে তাদের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। দেড় হাজার বছর পর মুসলমানরা ইসলামের মধ্যে কতটুকু বিকৃতি ঘটিয়েছে, তারা মুসলমান আছে নাকি ইহুদী খৃস্টানের ন্যায় মুশরিকে পরিণত হয়েছে- বর্তমান প্রেক্ষাপটে উক্ত আয়াতগুলির আলোকে পর্যালোচনা করতে হবে। পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে, নবী রাসূল ব্যতীত কারো নিঃশর্ত আনুগত্য করাও এক প্রকার শিরক। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যায়, মুসলমানদের প্রত্যেকটি ফিরকা স্ব স্ব ফিরকা বা মুরুব্বীদের নিঃশর্ত আনুগত্য করছে, নবী রাসূলের মত অনুসরণ করছে, উক্ত আয়াতের ভাষায় ধর্মগুরুদের প্রভু হিসাবে গ্রহণ করেছে। যেমন, আল্লাহ রাসূল ঐক্য ফরয ও বিভক্তি হারাম করেছেন, কিন্তু প্রত্যেক ফেরকার মুরুব্বীরা ঐক্য হারাম আর বিভক্তি হালাল করেছেন। আর তাদের অনুসারীরাও কোনরুপ বাদ-প্রতিবাদবিহীন তা মেনে নিয়ে অসংখ্য ফিরকায় বিভক্ত হয়ে ইহুদী খৃষ্টানের ন্যায় আয়াতের বাস্তবতা প্রতিপাদন করছে। যেমন —

বেরেলভী ধারাঃ আ’লা হযরত আহমদ রেজা খান (রঃ) তিনটি বিদাতের জন্ম দিয়ে গেছেন। ১) রাসূল (সাঃ) নূরের সৃষ্টি এবং গায়েব জানেন। ২) দেওবন্দীদের কাফের বলে ফতোয়া বাজী করেছেন। ৩) সকল উলামায়ে কেরাম বৃটিশ ভারতকে দারুল কুফর ঘোষণা দেয়ার পর তিনি ভারতকে দারুল আমান ঘোষণা দিয়ে আলেম সমাজের বিরোধিতা করেন এবং ইংরেজ তোষণ নীতি অবলম্বন করেন। অথচ তখন হিন্দু, মুসলিম, শিখ, মারাঠা সবাই ইংরেজ বিরোধি আন্দোলনে লিপ্ত। এভাবে তিনি “করে শত্রুর সাথে গলাগলি ধরে মিত্রের সাথে পাঞ্জা” নীতি গ্রহণ করে নতুন ফিরকার জন্ম দিয়ে মুসলিম জামাত থেকে বেরিয়ে গেলেন। তার অনুসারীরা গুরুর মতাদর্শ অনুসারে রাসূল (সাঃ) নূরের সৃষ্টি, গায়েব জানেন, দেওবন্দীরা কাফের ইত্যাদি বিতর্কিত বিষয়গুলি প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় সর্ব শক্তি নিয়োগ করছে। গুরুর প্রতিটি কথা প্রমাণ ও বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। কিন্তু গুরুর ভুলগুলি সংশোধন করার, অন্যদের সাথে আপোস করার মত মন মানসিকতা দেখাচ্ছে না, কোরান-হাদীসের নির্দেশ মানছে না। অথচ উক্ত তিনটি বিষয়ের মধ্যে রাসূল (সাঃ) গায়েব জানেন কথাটি শিরকী মতবাদ। কারণ কোরআন হাদীস থেকে কয়েকশ দলীল দেয়া যাবে যে, রাসূল (সাঃ) গায়েব জানতেন না। কাজেই প্রমাণিত হলো যে, বেরেলভীরা আ’লা হজরতের নিঃর্শত আনুগত্য করছে এবং – اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّه) এর প্রমাণ রাখছে।

দেওবন্দী ধারাঃ দেওবন্দ মূলত মুসলিম মিল্লাতের প্রাচীন শিক্ষা ও সভ্যতার উত্তর ধারক। এ ধারাটি ১০৫০ সালে উযির নিযামুল মূলক কর্তৃক ইমাম গাযযালির মাধ্যমে প্রণিত এবং বাগদাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে গৃহিত দরসে নিজামী সিলেবাসের অনুসারী। এটা একটি শিক্ষা ও সংস্কার মূলক আন্দোলন, কোন ব্যক্তি কতৃক প্রতিষ্ঠিত ফিরকা বা দল নয়। কাজেই এর প্রতিষ্ঠাতাগণ বা পরবর্তী মুরুব্বীদের দোষ ত্রুটি থাকলে এর দায় সংশ্লিষ্ট মুরুব্বীর, প্রতিষ্ঠানের উপর সে দায় চাপানোর কোনই যৌক্তিকতা নাই। কারণ দেওবন্দ গোটা দুনিয়া, বিশেষত ভারত বর্ষে ইসলামী শিক্ষা সংস্কার, প্রচার-প্রসার, তাবলীগ ইত্যাদির প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান, কাজেই এর মধ্যে ভুল ত্রুটি থাকলে পরবর্তীরা তা সংশোধন করে নিবে এটাই ইসলামের দাবী। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে অনুসারীরা দেওবন্দ ও তার মুরুব্বীদের নিঃর্শত আনুগত্য করছে। যেমন দেওবন্দের সিলেবাসে প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞানের কোন অস্তিত্ব নাই। দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা থেকে বর্তমান পর্যন্ত দেড় শত বছর ধরে এভাবেই চলছে। ফলে এখান থেকে বড় বড় আলেম বের হচ্ছে বটে তবে তারা বিজ্ঞান ও রাষ্ট্র পরিচালনা সম্পর্কে কিছুই জানে না। আর এ সুযোগে বস্তুবাদী শিক্ষিতরা রাষ্ট্রক্ষমতায় জেঁকে বসেছে। ফলে এ ভোগবাদী পুঁজিবাদীদের শাসনে-শোষণে সামাজিক বৈষম্য বিকট আকার ধারন করেছে, সর্বত্র হাহাকার ও যুলুম নির্যাতনের জন্য মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। কিন্তু যোগ্য ও সৎ আলেম সমাজ রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকলে পৃথিবী এতটা বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতনা। বিশেষতঃ বাংলাদেশে যেখানে ৭% হিন্দু জনসংখ্যা, সেখানে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রনের মূল ঘাটি বিচার, সচিবালয় ও পুলিশ বিভাগের উচ্চ পর্যায়ে ৭৫% পদ দখল করে আছে। আর তারা ইংরেজ আমলে মুসলমানদের সাথে যে আচরণ করেছে এখন কি অন্যথা আশা করা যায় ? এর প্রমাণ ইসলাম বিরোধি আইন পাশ হচ্ছে। ইসলাম পন্থীদের ধ্বংস করা হচ্ছে, নাস্তিক মুর্তাদদের প্রাধান্য ছড়িয়ে পড়ছে। অথচ বিশাল দেওবন্দী ধারা চাকরিতে ঢুকলে এ পরিস্থিতির উদ্ভব হত না। কিন্তু দেওবন্দ অনুসারীরা এ বিষয়ে সতর্ক নয়, পরিবর্তনের কোন চিন্তা চেতনাও তাদের মধ্যে নেই। সেই প্রাচীন মান্দাতার আমলের সিলেবাস নিয়েই তারা পরে থাকবে।

(২) দেওবন্দীরা উপমহাদেশে ইসলামের প্রধান ধারক-বাহক। আর বড়দের ভুলও বড় হয়। কাজেই তাদের দুটি বিদাত ইসলাম ধ্বংসের প্রধান কারণ। একটি হচ্ছে বিজ্ঞান থেকে ধর্ম শিক্ষা আলাদা করণ অন্যটি ইসলামকে ভিক্ষা বৃত্তির উপর নির্ভরশীল করে দেয়া। ফলে পাশ্চাত্য ধারার শিক্ষিতরা রাষ্ট্র ক্ষমতাসহ সকল সুযোগ- সুবিধা ভোগ করছে আর আলেমরা জনপদে জনপদে ঘুরছে আর হাঁকছে- ভিক্ষে দাও পুরবাসী ভিক্ষে দাও, আল্লাহ ও রাসূল না খেয়ে আছেন। এ সম্পর্কে আমি খিলাফত ইশতেহার ও সত্যের ক্ষেপনাস্ত্র গ্রন্থদ্বয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। তবে সংক্ষেপে মূল কথাটা বলে দেই-সকল ইসলামী দল ঐক্যবদ্ধ হয়ে খিলাফত প্রতিষ্ঠার পর জ্ঞান বিজ্ঞানের সকল শাখা আরবীতে ভাষান্তর করে আফগান থেকে আরাকান পর্যন্ত সকল কওমী ও আলিয়া মাদরাসায় পাঠ্য করে দিতে হবে।

(৩)উপনিবেশিক আমলে দেওবন্দ প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে প্রণিত উসুলে হাশতেগানা ষষ্ট মূলনীতি আজো অনুসৃত হয়ে আসছে যা নিঃশর্ত আনুগত্যের প্রমাণ। অথচ স্বাধীনতার পর এ উসুল বহাল থাকার কথা নয়, উচিতও নয়। (৪) দেওবন্দের গর্ভজাত তাবলীগ জামাত ধীরে ধীরে খারেজীদের ন্যায় রূপান্তরিত হতে যাচ্ছে। অথচ দেওবন্দীরা এর লাগাম টেনে ধরছেনা, সংস্কার করছে না।

(৫) তাদের সম্পর্কেও অন্যান্য ফিরকা যেমন আহলে হাদীস-সালাফীদের আপত্তি আছে। আরো অন্যান্য বিষয়াবলীর পর্যালোচনা করলে বুঝা যায়, দেওবন্দীরাও আকাবিরে দেওবন্দ ও দেওবন্দী শিক্ষা ব্যবস্থার নিঃশর্ত আনুগত্য করছে। ফলে তারাও একটি বাতিল ফিরকায় পরিণত হয়েছে।

তাবলীগ জামাতঃ বৃটিশ ভারতে মুসলিম জাতি যখন অস্তিত্ব সঙ্কটের মুখোমুখি তখন হিন্দুরা মুসলমানদেরকে হিন্দু বানানোর আন্দোলন শুরু করল। ওদিকে মিশনারিরা বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠান খুলে খৃষ্টান বানানোর জোর প্রচেষ্টা চালালো। হিন্দু ও মিশনারীদের ধমার্ন্তর করণ এবং মুসলিম সমাজে অনুপ্রবিষ্ট শিরক বিদআত ও অশিক্ষা কুশিক্ষা ইত্যাদির মোকাবিলায় মুসলিম জাতিকে রক্ষার উদ্দেশ্যে মাওঃ ইলিয়াস (রঃ) তাবলীগের প্রবর্তণ করেন। আর তদীয় জামাতা শায়খুল হাদীস মাওঃ যাকারিয়া (রঃ) তাবলীগী নেসাব “ফাসায়েলে আমল” প্রণয়ন করেন। তাবলীগের উদ্দেশ্য ছিল অশিক্ষিত প্রান্তিক জনগোষ্টির কাছে ইসলামের দাওয়াত ও শিক্ষা পৌঁছে দেয়া। আর ফাযায়েলে আমল রচনার উদ্দেশ্য ছিল অশিক্ষিত মুসলমানদেরকে ইসলামের প্রাথমিক জ্ঞানদান করা। আর এ জন্য মাওঃ যাকারিয়া (রঃ) কোরান হাদীস বিভিন্ন কিসসা কাহিনী উপমা ইত্যাদির সমন্বয়ে অতীব সহজ করে গ্রন্থটি রচনা করেন যাতে অশিক্ষিত লোকেরা তা হজম করতে পারে। এ কারণেই তাতে দেখা যায় অনেক জয়ীফ ও মওজু হাদীস রয়েছে। কাউকে আলেম বানানোর জন্য গ্রন্থটি রচিত হয়নি বিধায় নিরেট কোরান হাদীসের ভিত্তিতে গ্রন্থটি রচনা করলে কঠিন হয়ে যেত যা থেকে সাধারণ মুসলমানরা উপকৃত হতে পারত না। মাশাল্লাহ, এখন তাবলীগ বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষিত, অশিক্ষিত আলেম দলমত নির্বিশেষে সবাই তাবলীগের দিকে ঝুকছে। কিন্তু সেই সাথে তাবলীগ খারেজীদের ন্যায় একটি বাতিল ফেরকায় পরিণত হয়েছে। কারণ—

১। তাবলীগ ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা, অর্থব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা, জিহাদ ইত্যাদি ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলি বাদ দিয়ে শুধুমাত্র নামায, রোযা ও তাবলীগ সংশ্লিষ্ট কিছু বিষয়ের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে এবং এটাকেই পূর্নাঙ্গ ইসলাম মনে করছে। সুরা তওবাসহ জিহাদের আয়াতগুলি সম্পূর্ণ বর্জন করেছে। তদুপরি জিহাদ সংক্রান্ত নসগুলির অপব্যাখ্যা করে তাবলীগের কাজে লাগিয়ে দিয়েছে। ইসলামের একটি খন্ডাংশ অবলম্বন করে মুসলিম জামাত থেকে বেরিয়ে গিয়ে বাতিল ফেরকায় পরিনত হয়েছে।

২। ফাযায়েলে আমলকে কোরানের উপর প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। মসজিদে যোগ্য আলেম থাকা সত্ত্বেও কোরান তা’লীম না করে ফাযায়েলে আমলের তালীম হচ্ছে। এমনও দেখা গেছে, ইমাম সাহেব তা’লীমের জন্য কোরান নিয়ে বসেছেন, কিন্তু তাবলীগীরা অনিহাভরে তার হাত থেকে কোরান টেনে নিয়ে তালীমের জন্য ফাযায়েলে আমল দিয়েছে।

৩। অন্যরা তো বটেই এমনকি দেওবন্দী আলেমগণও তাবলীগের দোষ-ত্রুটিগুলির সমালোচনা করেন। দেওবন্দী ধারার বর্তমান প্রধান মুরুব্বী পাকিস্তানের আল্লামা তকী উসমানী তিরমিযীর ব্যাখ্যা গ্রন্থ দরসে তিরমিযিতে তাবলীগের সমালোচনা করেছেন। দেওবন্দীদের নিয়ম হলো তারা তাবলীগ ও জামাতে ইসলামী এ উভয় সংগঠনের সমালোচনা করেন বটে কিন্তু তাবলীগের সমর্থন ও সহযোগিতা করেন, কিন্তু জামাতের বিরুদ্ধাচরন করেন। দেওবন্দী অদেওবন্দী সকল আলেম তাবলীগী নেসাবের যয়ীফ, মওজু হাদীস ও কল্প কাহিনীর সমালোচনা করেন কিন্তু তারা কেউ এগিয়ে এসে এগুলি সংশোধন করেন না।

৪। আর তাবলীগীদের অবস্থা হলো তারা মাওঃ ইলিয়াস (রঃ) ও অন্যান্য মুরুব্বীদের নিঃশর্ত আনুগত্য করে। এর প্রমাণ হলো, তাবলীগী আলেমগণ ভাল করেই জানেন যে, তারা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা তথা খিলাফত, জিহাদ ইত্যাদি বাদ দিয়ে দিয়েছে, তাবলীগী নেসাব যয়ীফ ও মওজু হাদীস এবং কল্প-কাহিনীতে ভরপুর। এসব জানা সত্ত্বেও তারা এগুলো সংশোধন করছেন না, এরূপ কোন চেতনাও দেখা যাচ্ছে না বরং তারা এটাকেই পূর্নাংগ দ্বীন মনে করছে। তারা মাওঃ ইলীয়াস (রঃ) কে রাসূলের মত এবং ফাযায়েলে আমলকে কোরানের মত অনুসরণ করছে। এমনকি মুরুব্বীদেরকে তারা হযরতজী বলে ডাকে অথচ সাহাবায়ে কেরামের সম্মানেও তারা “জী” শব্দ ব্যবহার করে না। তদুপরি মুরুব্বীদের কথা মালাকে “মালফুজাত” নামকরণ করে হাদীসের চেয়েও গুরুত্ব সহকারে পঠিত হয় এবং পকেট বুক আকারে ছাপিয়ে অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে পকেটে রাখা হয়। অথচ রাসূল (সাঃ) এর চল্লিশ হাদিস, পাঞ্জে সুরা ইত্যাদি কখনো তাদের পকেটে স্থান পায় না। হায় সবর্নাশ। এসব কী হচ্ছে? তাবলীগ কোথায় যাচ্ছে? দেওবন্দী আলেমগণ, তাবলীগী মুরুব্বীগণ হুসে আসুন, আল্লাহ্‌র ওয়াস্তে হুসে আসুন। তাবলীগ ও উহার নেসাবে সংশোধনি এনে উম্মাহকে বাঁচান, নিজেদের পরকাল শঙ্কামুক্ত করুন।কারণ এজন্যই রাসূল (সাঃ) অভিযোগ করবেন, (( وَقَالَ الرَّسُولُ يَا رَبِّ إِنَّ قَوْمِي اتَّخَذُوا هَٰذَا الْقُرْآنَ مَهْجُورًا আর রাসূল (সাঃ) বলছেন — ”হে আমার প্রভু! নিঃসন্দেহ আমার স্বজাতি এই কুরআনকে পরিত্যাজ্য বলে ধরে নিয়েছিল।(২৫: ৩০) এসব কিছু মুরুব্বীদের নিঃশর্ত আনুগত্য ও ইসলাম থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রমাণ( اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّهِ)

বস্তুত অন্যান্য ফিরকার চেয়ে তাবলীগ জামাত ইসলামের জন্য অধিক ক্ষতিকারক হয়ে দাড়িয়েছে। তবে এর দ্রুত বস্তৃতির কারণ হচ্ছে তাবলীগীরা রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠা তথা খিলাফতের কথা কিছু তো বলেই না বরং তারা রাজনীতি হারাম মনে করে। এজন্যই পশ্চিমা পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক দাজ্জালী সভ্যতার সাথে তাদের কোন সংঘাত নাই। এ সুবাদে মুসলিম অমুসলিম প্রতিটি দেশে তারা রাজনৈতিক আনুকুল্য পাচ্ছে এবং সর্বত্র দাওয়াতী কার্যক্রম চালাতে কোন বাধার সম্মুখীন হচ্ছেনা-যেখানে ইসলামী দলগুলি প্রতিকুলতার সম্মুখীন হয়। আর সাধারণ মানুষ ধর্ম-কর্ম করার জন্য সংঘাত-সংঘর্ষহীন কোন সংগঠনই পছন্দ করে বিধায় তাবলীগের দিকে ঝুকছে। কাজেই ইসলামের খেদমতগার এই বৃহৎ সংগঠনটির জন্য এখন আবশ্যক হচ্ছে নিজেদের ভুল ত্রুটিগুলি শুধরে নিয়ে মুসলিম জামাতের সাথে ঐক্যবদ্ধ ভাবে কাজ করা, এটাই ইসলামের মূল বার্তা এবং ফরয কাজ।

ওহাবী মতবাদঃ- মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব নজদী (রঃ) (১৭০৩-১৭৯২) শিরক বিদাতের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন যা উম্মাহর কাছে প্রশংসিত হয়। কিন্তু এ বিষয়ে তারা এতটা বাড়াবাড়ি করল যে, শিরক বিদাতের আশংকায় রাসূল (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামের স্মৃতি বিজরিত স্থানগুলি ধ্বংস করে দিল। শিরক বিদাতের ব্যাপারে তারা অত্যন্ত কঠোরতা অবলম্বন করে এবং নিন্মোক্ত ছয়টি বিষয়কে তারা হারাম মনে করে। ১।তাকলিদ বা মাজহাব অনুসরণ।২।তাসাউফ বা সুফীবাদ বা পীর মুরিদি।৩।দোয়ার মধ্যে অসিলা মানা।৪। তাবিজ কবজ ব্যবহার করা। ৫। — تبرك بالمكان = অর্থাৎ নবী রাসূল, সাহাবায়ে কেরাম, বুজোর্গানে দ্বীন ও অলি আউলিয়াদের মাযার বা স্মৃতি বিজরিত স্থান থেকে বরকত লাভ করা। আর এ কারণেই তারা রাসূল (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামের স্মৃতি চিহ্নগুলি বিলুপ্ত করে দেয়। এমনকি তারা রাসূল (সাঃ) এর পবিত্র রওজাকে পর্যন্ত অজ্ঞাত স্থানে স্থানান্তরের আগ্রহ প্রকাশ করেছিল।৬। রওজায়ে আতহার জিয়ারতের নিয়তে ভ্রমণ করা। অর্থাৎ শুধু রওজা যিয়ারতের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করা জায়েয নেই। তবে মসজিদে নববীতে নামাজের নিয়তে ভ্রমণ করে প্রাসঙ্গিক ক্রমে রওজা শরীফের যিয়ারত জায়েয আছে। সম্ভবত এ মতটি ঠিক নয়। কারণ রাসূল (সাঃ) বলেছেন..من زار قبري وجبت له شفاعتي = অর্থাৎ যে আমার রওজা যিয়ারত করল, তার জন্য আমার শাফায়াত ওয়াজিব হয়ে গেল)। যাই হউক, শিরক বিদাতের ব্যাপারে ওয়াহাবী-সালাফীরা জিরো টলারেন্স দেখায়। এর কারণ হচ্ছে, ইবনে ওয়াহহাবের সময়কালে আরব জগত শিরক বিদাতের আখড়ায় পরিণত হয়েছিল। এজন্যই তারা এ বিষয়ে কুঠার হস্ত। তবে ওয়াহবীরা বাড়াবাড়ি করলেও সম্ভবত তারা কোরআন হাদীস ভিত্তিক সত্যের খুব কাছাকাছি। الله اعلم

এখানে উল্লেখ্য যে, ওহাবী ও সুফীবাদীদের যাতাকলে পড়ে দেওবন্দীদের মাথায় শাখের করাত। কারণ তারা মাযার সংশ্লিষ্ট শিরক বিদাতের সমালোচনা করে বিধায় সুফীরা তাদেরকে ওহাবী বলে গালি দেয়। আবার উপরুল্লেখিত ছয়টি বিষয় দেওবন্দীরা জায়েয (শর্ত সাপেক্ষে) মনে করে বিধায় ওয়াহাবীরা তাদেরকে বিদাতি বলে গালি দেয়। যাই হউক, সালাফীরা ইবনে ওয়াহহাব ও ইমাম তাইমিয়ার অন্ধ অনুসরণ করে ও কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করে।

জামাতে ইসলামীঃ ইংরেজ আমলে বেরেলভী এবং মাজার পন্থী কিছু লোক মুসলিম জামাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর বিশাল মুসলিম জন গোস্টি ইসলামের মূল ধারার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। সম্ভবত! এমূল ধারাটির কেন্দ্রবিন্দু ছিল দেওবন্দ। তারপর এ মূল ধারা থেকে দুটি ফিরকা বের হয় তাবলীগ ও জামাতে ইসলামী। তাবলীগ এখনো দেওবন্দের সাথে যুক্ত থাকলেও জামাত ও দেওবন্দ সাংঘষির্ক অবস্থানে চলে যায়। বুনিয়াদি বিষয়ের উপর মতভেদের ভিত্তিতে এসব ফিরকা-বিভক্তির সৃষ্টি হয়নি বরং তুচ্ছাতিতুচ্ছ, অতীব নগন্য বিষয়ে মতভেদের ভিত্তিতে তারা বিভক্ত হয়ে সাংঘষির্ক অবস্থানে চলে যায়। যেমন সাহাবায়ে কেরাম মি’য়ারে হক কিনা, অনুসরণীয় কিনা, ইসলামি ব্যাংকিং ইত্যাদি অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে মতভেদের অবতারণা করে তারা ফেরকা বাজিতে লিপ্ত হয়। অথচ ফুরুয়ি বিষয়ে মতভেদ জায়েয কিন্তু বিভক্তি হারাম। এভাবে তারা জায়েয কাজের জন্য হারামে লিপ্ত হয়ে গেল। মাওঃ মওদূদী (রঃ) কে বলা হয় ক্ষুরধার লেখনীর অধিকারী, অনন্য প্রতিভাধর ব্যক্তিত্ব। পাশ্চাত্যের সর্বগ্রাসি বস্তুবাদি শিক্ষা সভ্যতা ও সাংস্কৃতিক তুফান যখন মুসলিম দুনিয়া গ্রাস করতে উদ্যত তখন তিনি কলমের সাহায্যে সেই তুফান রুখে দেন এবং পৃথিবীর সকল মতবাদের উপর ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেন। গত শতকে যে মানুষটি ইসলামের উপর সব চেয়ে বেশি লেখালেখি করেছেন তিনি হলেন মাওঃ মওদুদী (রঃ)। কাজেই যে বেশি কথা বলবে তার বেশি ভুল হবে, যে বেশি লিখবে তার বেশি ভুল হবে, এটাই বাস্তব কথা, যুক্তির কথা। একজন লেখকের অনেক প্রকারের ভুল হয়। প্রথমে চিন্তগত ভুল, তারপর চিন্তার বিন্যাসে ভুল, তার শব্দ চয়ন ও বাক্য গঠনে ভুল, আরো অনেক প্রকারের ভুল হয়। আর মানুষ তো ভুলের জাতক, প্রথম মানব (আদম) প্রথম ভুল করেছেন, তাই মানুষ ভুল করে, করবে, করতে বাধ্য। ভুল করেন না নবী রাসূলগণ। অনন্তর মাওঃ মওদুদী নবী-রাসূল ছিলেন না, সাধারণ মানুষ হিসাবে তিনি ভুল করেছেন, করতে বাধ্য। যদি কেউ এটা বিশ্বাস না করে এবং তাকে ভুলের উর্ধেব মনে করে তবে তাঁর ঈমান থাকবে না। অথচ বাস্তবতায় মনে হয়, জামাত মাওঃ মওদুদী (রঃ) কে নিঃশর্ত আনুগত্য করে এবং ভুলের উর্ধ্বে মনে করে।

প্রতিষ্ঠাকালিন জামাতে দেওবন্দী ধারার বড় বড় আলেম সংশ্লিষ্ট ছিলেন। যেমন, আবুল হাসান আলী নদভী (রঃ), মনযুর নোমানী (রঃ), শামছুল হক ফরিদ পুরী (রঃ), আঃ রহীম (রঃ) প্রমুখ আরো অনেক। কিন্তু তারা মওদুদী (র:) এর ভুল ও দলের আভ্যন্তরীন ত্রুটি বিচ্যুতি দেখে তা সংশোধনের প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে অবশেষে দল ছেড়ে চলে এসেছেন। তারপর তাদের অনেকেই মওদুদী (রঃ) এর রচনাবলির ভুল এবং দলের মেনুপেস্টু-এর ভুলগুলি চিহ্নিত করে গ্রহ্ন রচনা করেন এবং জামাতকে সংশোধনের উদ্যোগ নেন। যেমন মনজুর নোমানী (রঃ) লেখলেন- মাওঃ মওদুদী কে সাথ মেরী রেফাক্বত কী সরগুযাস্ত আওর আব মেরা মওকফ (মাওলানা মওদুদির সাথে আমার সাহচর্যের ইতিবৃত্ত)। ফরীদপুরী (রঃ) লেখলেন “ভুল সংশোধনী” আরো অন্যান্য আলেমগণ অসংখ্য গ্রহ্ন রচনা করেন। কিন্তু জামাত নেতৃবৃন্ধ সে সব প্রত্যাখ্যান করে পালিয়ে বেড়ালেন এবং ভুল আঁকড়ে ধরে থাকলেন।

অনন্তর বাংলাদেশে হাফেজ্জী হুজুর (রঃ), ফরীদ পুরী (রঃ) এবং অন্যান্য প্রধান প্রধান দেওবন্দী আলেমগণ জামাত নেতৃবৃন্দকে বারবার ডেকেছেন, আনুষ্ঠানিক ভাবে বসার দাওয়াত দিয়েছেন, ভুলগুলি সংশোধন করে একসাথে ঐক্যবদ্ধভাবে ইসলামী আন্দোলন করার লক্ষে। কিন্তু জামাত আসেনি, বসার তারিখ দিয়েও বসেনি। এভাবে জামাত কারো কথা না শুনে গোয়ার্তুমি করে একলা চলো নীতি অবলম্বন করল। মুসলিম জামাত থেকে বেরিয়ে গেল। অথচ মওদুদী (রঃ) এমন কখনো বলেননি যে, আমি কোন ভুল করিনি, যা লিখেছি সবই ঠিক, তোমরা শর্তহীনভাবে আমার আনুগত্য করবে।

যাই হউক, এভাবেই উপমহাদেশে মুসলিম উম্মাহর মূল ধারাটি দেওবন্দ, তাবলীগ ও জামাত এ তিনটি বিপরীত মুখি সাংঘর্ষিক ধারায় বিভক্তি হয়ে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহকে দুর্বল করে দিল। এমনকি উম্মাহ ধ্বংসের রাজপথ তৈরী করে দিল। ফলে হিন্দু ও অন্যান্য জাতি শক্তিশালী হয়ে উঠল আর মুসলমানরা পরস্পর ভ্রাতৃঘাতি হানাহানিতে লিপ্ত হয়ে ক্ষিন থেকে ক্ষিনতর সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়ে গেল। সুতরাং জাতি ধ্বংস এবং নিজেদেরকে ধ্বংসের দায় প্রথমে বর্তাবে জামাতের উপর তারপর দেওবন্দীদের উপর। কারণ জামাত অন্যদের শুধরে দেয়া নিজেদের ভুলত্রুটি গুলি তো সংশোধন করলোই না বরং নতুন ফেরকা সৃষ্টি করে উম্মত থেকে বেরিয়ে গেল এবং মওদুদী (রঃ) এর নিশর্ত আনুগত্য করল। (اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّهِ) এর প্রমাণ হচ্ছে তারা মওদুদীর (রঃ) ভুলগুলি তো সংশোধন করেইনি বরং সেগুলো সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা করছে, অন্যদের থেকে গোপন রাখছে। মওদুদী রচনাবলির অন্ধ অনুসরণ করছে অথচ অন্যদের রচনাকে পাত্তাই দিচ্ছে না, তাদের সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত করছে না। ইত্যাদি কারণে প্রধানতঃ জামাত দায়ী, দ্বিতীয়তঃ দায়ী দেওবন্দীগণ। কারণ জামাত ইসলামের বুনিয়াদি বিষয় নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেনি, ফরুয়ী বিষয়ে তাদের সাথে দেওবন্দীদের মতান্তর ঘটে। আর ফুরুয়ী বিষয়ে এখতেলাফ জায়েয। এখন এই জায়েয বিষয়ের উপর ভিত্তি করে আপোস না করে নিজেদেরকে একমাত্র ইসলামের টীকাদার ভেবে কাউকে মুসলিম জামাত থেকে বের করে দেয়া, ফেরকাবাজি করা, দলাদলির সৃষ্টি করা হারাম, সম্পূর্ণ হারাম যা দেওবন্দীরা করেছেন। কাজেই উক্ত হারাম কাজে জামাতী ও দেওবন্দী উভয় শ্রেনী সমান দোষী। এজন্যই এই দুই শ্রেনী আল্লাহ্‌র গজবের পাত্র হয়েছে। বাস্তবতায় মনে হয় নিম্নোক্ত আয়াতটি তাদের উদ্দেশ্যেই নাযিল হয়েছে। -(وَضُرِبَتْ عَلَيْهِمُ الذِّلَّةُ وَالْمَسْكَنَةُ وَبَاءُوا بِغَضَبٍ مِّنَ اللَّهِ দারিদ্রতা ও লাঞ্চনা তাদের ভাগ্যলিপির শামিল করে দেয়া হল আর তারা আল্লাহ্‌র রোষ টেনে আনল (২:৬১) দেওবন্দীদের উপর আল্লাহ দারিদ্রতা ও লাঞ্চনা ভাগ্যলিপির শামিল করে দিয়েছেন। তারা জাতির ভিক্ষুক শ্রেনী এবং প্রত্যেক সরকার তাদেরকে শাপলা চত্বরসহ বিভিন্ন জায়গায় হত্যা করেছে এবং কোণঠাসা করে রাখছে। তদুপরি তাদেরকে মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদ অপবাদ দিয়ে সমাজ, রাষ্ট্র ও জাতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। আর জামাতে ইসলামী ইহুদীদের ভাগ্যবরণ করেছে। কারণ ইহুদীদের পৃথিবীর সবাই মারত এবং ঘৃণা করত, দলমত নির্বিশেষে জামাতের সাথেও সবাই একই আচরণ করে চলেছে। তারা ইহুদীদের ন্যায় টাকা জামিয়েছে কিন্তু সেই টাকা নেতাদের জীবন বাঁচাতে ঘুষ দিচ্ছে বা দেশে বিদেশে লবিং গ্রুপিং করার মত অবৈধ খাতে ব্যয় করছে, অথচ দারিদ্র বিমোচন ও অন্যান্য বৈধ খাতে ব্যয় করছে না। এসবই আল্লাহ্‌র ক্রোধের প্রমাণ। অথচ মূল ধারার এ দুটি বৃহৎ ফেরকা যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে যায় তাহলে তারা এ দুর্গতি থেকে মুক্তি পাবে এবং উপমহাদেশসহ বিশ্ব নেতৃত্ব তাদের হাতের মুঠোয় চলে আসবে। আর এ কাজটি করার জন্যই আমরা মাঠে নেমেছি। আল্লাহ ভরসা।

আয়াতের শিক্ষাঃ উম্মাহর মধ্যে তো বটেই এমনকি আহলে কিতাবের একত্ববাদীদের সাথে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে ভূপৃষ্ঠে আল্লাহ্‌র সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আর কোরআন হাদীস ডিঙ্গিয়ে কোন মুরুব্বী বা মুরুব্বীর রচনাবলীর অনুসরণ করে ঘোড়া ডিঙ্গিয়ে ঘাস খাওয়া যাবে না। ফিরকা ও মুরুব্বী মাড়িয়ে কোরানের নির্দেশ ঐক্য ফরয ও বিভক্তি হারাম- এর বাস্তবতায় ফিরে আসতে হবে।

আমাদের দাবীঃ- এখন প্রত্যেক ফেরকার কাছে আমাদের প্রশ্ন- কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল ? কোরানের অনুসারীদের ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য নাকি এর উপর এখতেলাফ করে বিভিন্ন ফিরকায় বিভক্ত হয়ে পরস্পর কামড়া কামড়ি করে ধ্বংস হওয়ার জন্য? আবার রাসূল (সাঃ) কোরানের ভিত্তিতে আরবদের ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন নাকি বিভক্ত করেছিলেন? আবার কোরআন নাযিল কি ভুল হয়েছে? (নাউযুবিল্লাহ) কারণ কোরআন না থাকলে তো এসব ফিরকা বিভক্তি হত না। আবার কোরআন কি কারো বাপ দাদার তালুকদারী যে, যার যেখানে যেভাবে ইচ্ছা খোড়াখুড়ি শুরু করবে ? উত্তর যদি কোনটা হাঁ বাচক না হয়- তাহলে আমাদের এক কথা এক দাবী ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। যারা রাসূলকে বাদ দিয়ে মওদুদী, রেজা খান, ইলিয়াস, নানুতবী, হাসান বান্না ইত্যাদি রাসূলের গোলামদের অনুসরণ করছে এরা কুলাঙ্গার, আল্লাহ ও রাসূলের দুশমন, ইসলামের শত্রু, আত্মসম্ভ্রমহীন অমানুষ। অমানুষ এ জন্য যে, সাধারণ মানুষকে সিজদা করা যেমন ঘৃণার কাজ- তদ্রুপ কোরআন সুন্নাহর নির্দেশ বাদ দিয়ে নবী রাসূল নয় এমন মানুষের নিঃশর্ত আনুগত্য করাও ঘৃণার কাজ। তাদের কোন আত্মসম্ভ্রম নাই।এদের সম্পর্কে আল্লাহ্‌ তা’লা বলেন. ( ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمُ اتَّبَعُوا مَا أَسْخَطَ اللَّهَ وَكَرِهُوا رِضْوَانَهُ فَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُمْ ﴿محمد: ٢٨﴾ এইটিই! কেননা আল্লাহ্‌কে যা অসন্তুষ্ট করে তারা তারই অনুসরণ করে আর তাঁর সন্তষ্টিলাভকে তারা অপছন্দ করে, সেজন্য তিনি তাদের আমলসমূহ ব্যর্থ করে দেন। (৪৭: ২৮) ধারাবাহিক

Leave a Reply