উসমানী খিলাফাতের ইতিহাস (১)

তুর্কীদের আসলভূমি ও ক্রমবিকাশ
মাওয়ারাউন নামক নদীর দেশে অবস্থিত আজকের তুর্কিস্তান নামক অঞ্চল এবং মঙ্গোলিয়া থেকে উত্তর চীন পর্যন্ত এবং পশ্চিম থেকে কাস্পিয়ান সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত, উত্তর সার্বিয়া থেকে নিয়ে দক্ষিন ভারত এবং ইরান পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল এলাকা জুড়ে ওউজ (Oğuz) নামক বিভিন্ন গোত্র বসবাস করত যাদেরকে তুর্ক নামে পরিচিত ছিল।
পরবর্তীতে এই গোত্রসমূহ খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে তাদের আসল বাসভুমি ছেড়ে অভিবাসিত হয়ে ছোট এশিয়াতে (Anatoliya) তে চলে আসতে শুরু করে। তারা কেন সেখান থেকে অভিবাসিত হয়ে চলে এসেছিল এ ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। কোন কোন ঐতিহাসিক বলেন মূলত অর্থনৈতিক কারনেই তারা চলে এসেছিল।অব্যাহত ভাবে দুর্ভিক্ষ বেড়ে যাওয়া, খরার কারণে এবং জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণে এই সকল গোত্র সমূহ তারা নিজেদের দেশ ত্যাগে বাধ্য হয়।এবং তারা সহজেই তাদের জীবিকা সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে থাকে।
অন্যান্য ঐতিহাসিকগণ বলে তারা মুল রাজনৈতিক কারণে তাদের মাতৃভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিল।তাদের চেয়ে জনবল এবং অর্থবলে শক্তিশালী মোগল গোত্রদের অব্যাহত চাপ এবং জুলুমের কারণে সেখান থেকে তারা চলে আসতে বাধ্য হয়। তুর্কিরাও একটি নিরাপদ এবং স্থায়ী বাসস্থান গড়ে তুলতে পারবে এমন একটি জায়গা খুঁজে পাওয়ার আশায় সেখান থেকে চলে আসতে থাকে। ডঃ আব্দুল লাতিফ আব্দুল্লাহ বিন দাহিশ এই মতামতকে অত্যধিক গ্রহনযোগ্য মত বলে অবিহিত করেছেন।
এই গোত্রসমূহ ধীরে ধীরে পশ্চিমে চলে আসে এবং জেইহুন নদীর তীরে আবাস্থল গড়ে তুলে।কিছু কিছু গোত্র এক সময়ে তাবারিস্তান এবং জুরজান নামক এলাকায় বসতি গড়ে তুলে এবং নিজেদেরকে তারা ইসলামী অঞ্চলের কাছাকাছি আবিস্কার করে। নিহাবেন্দ যুদ্ধ এবং ইরানের সাসানী সাম্রাজ্যের পরতনের পর ৬৪১ সালে মুসলমানগণ এই অঞ্চলও বীজয় করে নেন।

মুসলিম বিশ্বের সাথে যোগসূত্রতা

৬৪২ সালে (হিজরী ২২) মুসলিম বাহিনী আরও পশ্চিমের অঞ্চলসমুহকে বীজয় করার জন্য অভিযান পরিচালনা করে। সেই সমস্ত অঞ্চলে সেই সময়ে তুর্কিরা বসবাস করত।
সেখানে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি আব্দুর রাহমান বিন রাবিয়ার সেনাবাহিনী তুর্কিদের বাদশাহ শাহিবরাজ এর মুখোমুখী হয়।সে আব্দুর রাহমান বিন রাবিয়ার কাছে সন্ধির প্রস্তাব দেয় এবং আর্মেনীয়দের বিরুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর সাথে মিলেমিশে যুদ্ধ করার ইচ্ছা পোষণ করে। এটা শুনে আব্দুর রাহমান তাকে মূল সেনাপতি সুরাকা বিন আমরের নিকট পাঠায়।শাহিবরাজ, সুরাকার কাছে গিয়েও একই কথা বলেন এবং তার কথা সুরাকা সাদরে গ্রহন করেন। এবং এই সকল অবস্থা জানিয়ে খলিফা উমর (রাঃ)তিনি একটি চিঠি লেখেন।তারা যা করছে তিনিও সেটা মঞ্জুর করে নেন।এর পর তারা উভয় পক্ষ সন্ধিচুক্তিতে সাক্ষর করেন। ফলশ্রুতিতে মুসলমানদের সাথে তুর্কিদের কোন প্রকার যুদ্ধ সংগঠিত হয়নি।বরং তারা একে অপরের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আর্মেনিয় অঞ্চলকে বিজয় করে সেখানে ইসলামের পতাকা উত্তোলন করে সেখানে ইসলামের প্রচার প্রসারের জন্য যাত্রা শুরু করে।
ইসলামের দাওয়াতকে সকলের নিকট পৌঁছে দেওয়ার জন্য ইসলামী সেনাবাহিনী পারস্য অঞ্চল বিজয় করার জন্য উত্তরপূর্ব দিকে যাত্রা শুরু করে।হ্যাঁ অবশ্যই এটা, পারস্য সাম্রাজ্যে ইসলামী সেনাবাহিনীর নিকট পরাজয়ের পরেই সম্ভব হয়।এই সকল ভূমিতে ইসলামী বাহিনীর সামনে অনেক কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিল। এই সকল চ্যালেঞ্জকে সফলতার সাথে মোকাবেলা করতে সক্ষম হওয়ায় ইসলামী সেনাবাহিনী তার লক্ষ্য পানে পৌঁছাতে সক্ষম হয়। এই সকল দেশে বসবাস কারী জনসাধারণের তুর্কিরাও ছিল। এই ভাবে সমগ্র তুর্কি জাতী ইসলামের সন্ধান পেয়ে ইসলামের সাথে মিশে যায়।তুর্কিরা ইসলামকে মনেপ্রানে গ্রহন করে নেয় এবং আল্লাহ তায়ালার কালিমাকে বুলন্ত করার লক্ষ্যে ইসলামী সেনাবাহিনীর সাথে যোগদান করে বীর মুজাহিদে পরিণত হয়।
ইসলামের তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ)এর সময়ে তাবারিস্তানও বিজিত হয়। এর পর ৬৫১ সালে (হিজরি ৫১) মুসলমানগণ জেইহূন নদীকে অতিক্রম করে মাওয়ারাউন নদীর আশে পাশের এলাকা সমূহকে দখল করে নেয়।ফলশ্রুতিতে সেখানে বসবাস তুর্কিদের বিশাল একটি অংশ দ্বীন ইসলামে প্রবেশ করে, ইসলামকে রক্ষা করার জন্য এবং আলাহ তায়ালার দ্বীনকে বিশ্বব্যাপী পৌঁছেদেওয়ার জন্য তারা দলে দলে ইসলামী সেনাবাহিনীতে অংশগ্রহন করে।
এবং পরবর্তীতেও এই সকল এলাকায় ইসলামের বিজয় অব্যাহত গতিতে চলতে থাকে।এইভাবে আমীর মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রাঃ) এর সময়ে বুখারা বিজিত হয়। দ্বিকবিজয়ী এই বাহিনী ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে সমরকন্দের দিকে যাত্রা করে এই অঞ্চলকেও বিজয় করে নেয়। অবশেষে সেখানে ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। মাওয়ারাউন নদীর তীরে অবস্থিত সমগ্র শহর ন্যায়ের ভিত্তিতে পরিচালিত ইসলামী অনুশাসনের অধীনে আসে এবং সেখানের সকল গোত্র এই মহান সভ্যতার অধীনে সুখে শান্তিতে বসবাস করতে থাকে।

আব্বাসী খিলাফাতের সময়ে তুর্কিদের সংখ্যা অনেক বেড়ে যায় এবং তারা আস্তে আস্তে গবর্নর, সেনাপতি এবং শাসকের দায়িত্ত্ব পেতে থাকে।তারা পরিপূর্ণভাবে ইসলামের অনুশাসনে চলে আসায় এবং খলিফার প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করার কারণে সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হতে থাকে।
আব্বাসী খলিফা মুতাসীম তিনি তারা সময়ে তার দরজা তুর্কিদের জন্য সম্পূর্ণ ভাবে উম্মুক্ত করে দেন। তাদেরকে রাষ্ট্রের শাসন কর্তা নিযুক্ত করেন।মুতাসিমের মূল রাজনীতি ছিল তার শাসনে পারস্যদের প্রভাব কমিয়ে আনা।খলিফা মামুনের সময় থেকে আব্বাসী খিলাফাতে পারস্যদের প্রভাব ছিল চোখে পড়ার মত।
তুর্কি দেরকে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার কারণে জনসাধারণ এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে এক মারাত্মক ক্রোধের সৃষ্টি হয়। ফলশ্রুতিতে খলিফা মুতাসিম তার প্রতি জনগনের এই ক্রোধকে ভয় পেয়ে যান।এর পর তিনি নতুন একটি শহর (সামিরা) প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেখানে তুর্কি সেনাবাহিনীকে সেখানে স্থানান্তর করেন। এইভাবে তিনি তাদেরকে বাগদাদ থেকে দূরে সরিয়ে নেন। ১২৫ হিজরিতে এই ঘটনা সংগঠিত হয়েছিল।
তুর্কিরা এইভাবে ইসলামের সাথে পরিচয়ের পর বিশাল এক ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। সেলজুক নামক এই রাষ্ট্রটি আব্বাসী খিলাফতের অধীনে ছিল।

সেলজুক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাঃ
indir (1)
মুসলিম আরব অঞ্চলের পূর্ব দিকের এই ভূমিতে সেলজুকদের বহিঃপ্রকাশের পেছনে উপযোগী রাজনৈতিক শর্ত এবং সুযোগ সুবিধা ছিল।এই অঞ্চলে সুন্নি আব্বাসী খিলাফতের সাথে শিয়া ফাতিমী খিলাফতের দন্দ ছিল।
সেলজুকরা, এই বিশাল তুর্কি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করেছিল হিজরী ৫ম শতকে। এই রাষ্ট্র খোরাসান, মাওয়ারাউন নদীর পার্শ্ববর্তী এলাকা, ইরাক, ছোট এশিয়া (এনাতলিয়া)এবং শাম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। প্রথমে ইরানের রেই, পরবর্তীতে ইরাকের বাগদাদ এই বিশাল সেলজুক রাষ্ট্রের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়।সেই সময়ে খোরাসানের মাওয়ারাউন নদীর এলাকায় (কিরমান সেলজুক), শামে(সিরিয়ান সেলজুক) এবং ছোট এশিয়াতে ( এনাতলিয়ান সেলজুক) দের মত ছোট ছোট সেলজুক রাষ্ট্র গড়ে উঠে। এই ছোট ছোট রাষ্ট্র গুলি বাগদাদের খলিফার আনুগত্য করত এবং তাদের নির্দেশ মেনে চলত। ইরান এবং ইরাকে শিয়া মাজহাবের প্রভাব ক্ষুণ্ণ করার জন্য তারা আব্বাসী সুন্নিদেরকে সাহায্য করে।এবং তারা ফাতিমীদের কাছ থেকে মিশর এবং শাম কে তাদের শাসনাধীনে নিয়ে আসে। এইভাবে তারা শাম এবং মিশরের উপর তাদের একচ্ছত্র কতৃত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করে এবং সেখান থেকে ফাতেমী খিলাফত উচ্ছেদ করে।
সেলজুকদের নেতা তুউরুল, বুভেয়হীদের রাষ্ট্রকে হিজরি ৪৪৭ সালে উচ্ছেদ করে এই অঞ্চল থেকে ফিতনা দূরীভূত করতে সক্ষম হন। যারা মসজিদের দরজায় সাহাবীদেরকে গালী দিয়ে বিভিন্ন ধরনের লেখা টাঙাত তাদেরকে তিনি সমুলে উৎখাত করতে সক্ষম হন। এই ব্যাপারে সব চেয়ে বেশি সীমা লঙ্ঘন কারী রাফেজি শায়েখ আবু আব্দুল্লাহ আল জ্বালাবীকে তিনি হত্যা করেন।

বাগদাদের আব্বাসী খলিফার উপর এই বুভেয়হীদের প্রচণ্ড চাপ ছিল।সেলজুকগণ এই বুভেয়হী রাষ্ট্রের বিলুপ্তি ঘটিয়ে তাদেরকে বাগদাদ থেকে অপসারণ করে। সেলজুকের সুলতান তুউরুল, আব্বাসী খিলাফতের রাজধানী বাগদাদে গেলে তৎকালীন আব্বাসী খলিফা কাইম বি আমরিল্লাহ তাকে সাদর সম্ভাষণ জানান এবং তাকে সুলতান রুকুনুদ্দীন তুউরুল নামক উপাধীতে ভূষিত করেন। তাকে তার নিজের আসনের পাশে বসান এবং অনেক সম্মানে ভূষিত করেন।তার নামে মুদ্রাঙ্কিত করেন এবং বাগদাদ সহ অন্যান্য অঞ্চলের মসজিদে খুতবার সময় তার নাম উল্লেখ করা হয়। এইভাবে সেলজুকদের মান-মর্যাদা আরও অনেক বেড়ে যায়।
সেই সময়ের পর থেকে সেলজুকরা, বূভেয়হীদের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠা আব্বাসী খলিফাদেরকে সব চেয়ে বড় সাহায্য করেন এবং খলিফা সহজে তার কার্যক্রম পরিচালনা করতে সক্ষম হন।

সুলতান তুউরুল, একজন ব্যক্তিত্ত্বশালী , অসাধারণ মেধাবী এবং সাহসী একজন সেনাপতি ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন দীনদার এবং আবীদ। আর এই কারনেই তিনি তার জাতীর কাছ থেকে অনেক বড় সমর্থন এবং সাহায্য পেয়েছিলেন।তিনি ‘’সুলজুকি তুর্ক’’ নামক শক্তিশালী একটি সেনাবাহিনী গঠন করেন এবং ‘’শক্তিশালী রাষ্ট্র’’ এই শ্লোগান দিয়ে এগিয়ে যান।

আব্বাসী খলিফা কাইম বি আমরিল্লাহর সাথে পরবর্তীতে সুলতান তুউরুল সম্পর্ক আরও বৃদ্ধি পায় এবং এই সম্পর্কের জের ধরে খলিফা সুলতান তুউরুলের বড় ভাই চেফরি সাহেবের মেয়েকে বিয়ে করেন। হিজরি ৪৪৮ সালে (১০৫৬ খ্রিঃ) এই বিবাহ সংগঠিত হয়। পরবর্তিতে হিজরি ৪৫৪ সালে সুলতান তুউরুল খলিফার মেয়ের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। কিন্তু এঁর পর সুলতান তুউরুল বেশী দ্বীন হায়াত পাননি। হিজরী ৪৫৫ সালে পবিত্র রমজান মাসের শুক্রবার রাতে ৭০ বছর বয়সে মৃত্যুবরন করেন।

সুলতান তুউরুলের মৃত্যুর পর সেলজুকগন, খোরাসান, ইরান, উত্তর – পূর্ব ইরাক অঞ্চলে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেন।

Leave a Reply