একটি নতুন স্লোগান এবং পুরনো ফিতনার মাথাচাড়া দিয়ে উঠা

অফিসের হাসিখুশি সহকর্মী একদিন হাসতে হাসতে বললেন, পুজোর দাওয়াত ছিলো। খেয়ে এলাম। বললাম, আপনিও পুজোতে যান নাকি! তিনি অবাক হয়ে বললেন, কেন জানেন না, ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। আমার ধর্ম আমার কাছে। তাই বলে কী পুজোতে যেতে নেই! পুজোতে আরও অনেক সহকর্মী-সহপাঠীদেরই যেতে দেখেছি। কিন্তু এমন স্লোগানটা আগে শুনেছি বলে মনে পরে না। ভয়ঙ্কর এ স্লোগান একটা পুরনো ফিতনাকেই যেনো নতুন রূপে একটানে সামনে নিয়ে এলো।

শয়তান যে মানুষের প্রকাশ্য শত্রু একথা বার বার কুরআনে বলা হয়েছে (সুরা বাকারা: ১৬৮, সুরা ফাতির: ৬ আরও নানা স্থানে)। কিন্তু এই প্রকাশ্য শত্রুর স্বরূপ কী! সে কিভাবে মানুষকে আক্রমণ করবে? সুরা আরাফে শয়তানের কর্মপদ্ধতির কথা আল্লাহ তায়ালা বর্ণনা করেছেন। জান্নাত থেকে শয়তানকে বের করে দেওয়ার পর সে বলছে, “তুমি যেমন আমাকে গোমরাহীতে নিক্ষেপ করেছো তেমনি আমিও এখন তোমার সরল-সত্য পথে এ লোকদের জন্য ওঁত পেতে বসে থাকবো, সামনে-পেছনে, ডানে-বায়ে, সবদিক থেকে এদেরকে ঘিরে ধরবো এবং এদের অধিকাংশকে তুমি শোকর গুজার পাবে না।” (সুরা আ’রাফ: ১৬-১৭) শয়তানের এ চ্যালেঞ্জে আল্লাহও সুরা আ’রাফের ঠিক পরের আয়াতেই বলেছেন, “বের হয়ে যা এখান থেকে লাঞ্ছিত ও ধিকৃত অবস্থায়। নিশ্চিতভাবে জেনে রাখিস, এদের মধ্য থেকে যারাই তোর অনুসরণ করবে তাদেরকে এবং তোকে দিয়ে আমি জাহান্নাম ভরে দেবো।” শয়তানের কর্মপদ্ধতি এতই সূক্ষ যে তা অতি বড় আলেমের জন্যও অনুধাবন করা কষ্টকর। কখন কোন দিক দিয়ে শয়তান মানুষের কলবকে কলুষিত করবে, তা বলা মুশকীল। তবে আল্লাহ যেমন সুরা হিজরের ৪২ নম্বর আয়াতে বলেছেন, ”অবশ্যি যারা আমার প্রকৃত বান্দা হবে তাদের ওপর তোমার কোন জোর খাটবে না। তোমার জোর খাটবে শুধুমাত্র এমন বিপথগামীদের ওপর যারা তোমার অনুসরণ করবে।”

উপরের আয়াতগুলো থেকে শয়তান মানুষকে যে সহজেই ধোঁকা দিতে পারে তা জানা যায়। তবে যারা আল্লাহ তায়ালার প্রকৃত বান্দা তাদেরকে শয়তান ধোঁকা দিতে পারে না। এখন দেখা যাক, শয়তানের ধোঁকা দেওয়ার পদ্ধতিটা কেমন। আল্লাহ যেমন বলে দিয়েছেন, শয়তান মানুষকে ডান-বাম আর সামনে-পিছন থেকে আক্রমণ চালিয়ে পথভ্রষ্ট করার চেষ্টা করবে। আর মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য শয়তান সরল-সঠিক পথের মাথায় বসে থাকবে। ভালো ভালো চিন্তার মধ্য দিয়েও শয়তান মানুষের কলবকে অপবিত্র করতে পারে। যেমন ”ধর্ম যার যার, উৎসব সবার” স্লোগানটা শুনতে ভালোই মনে হয়। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা সুরা কাফিরুনে এবং ‘‘লানা আ’মালুনা অলাকুম আ’মালুকুম‘ আয়াতের মধ্য দিয়ে বিষয়টা স্পষ্ট করে দিয়েছেন। এখানে কুফরের সকল ধরণের কাজকে ইসলামি তেহজিব-তমদ্দুন থেকে পূর্ণাঙ্গরূপে আলাদা করে দেওয়া হয়েছে। সৌজন্যের খাতিরে পুজোতে ফুল দিতে যাওয়াটা কতটা ঠিক হবে?

এবার একটা পুরনো সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা যাক। সম্রাট আকবর বহু বছর আগে (১৫৮২ সালে) এক নতুন ধর্ম নীতির প্রচলন করেছিলেন। অনেকেই বলে, এর মধ্য দিয়ে আকবর মূলত সমসাময়িক ধর্মীয় বিরোধগুলো দূর করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আমরা ইতিহাস থেকে জানতে পারি, একজন সম্রাট হিসেবে আকবর ইসলামের গতিকে রুখবার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। ইসলামী সংস্কৃতির নানান বিষয় পরিবর্তন করেই কেবল থেমে থাকেননি একটা সময় নতুন কালেমাও প্রচলন করেছিলেন (দেবিস্তান-ই-মাজাহিব)। আকবরও প্রথম বলেছিলেন, সব ধর্মই সত্য। সুতরাং সব ধর্মকেই মানতে হবে। কোনো ধর্মই এককভাবে চিরন্তন সত্য হওয়ার দাবি করতে পারে না। এসব বক্তব্য আকবরের সমসাময়িক ঐতিহাসিক আবুল ফজল এবং বাদাউনি বিস্তৃত আকারে লিখে গেছেন। আকবরের কণ্ঠে যে সুর ছিলো, বর্তমানে কিছু কিছু মানুষের মধ্যেও একই সুর শোনা যায়। অদ্ভূত ব্যাপার হলো, আকবরের সময়ও আলেম সমাজ নানা দল-উপদলে বিভক্ত ছিলো। বর্তমানেও আমরা তাই দেখি। কেউ বলে, তুমি তো আহলে হাদীস। লা মাজহাবি নাকি! তাহলে তো তুমি মুসলমানের কাতারেই নেই। শিয়া-সুন্নীর বিতর্কের কথা নাই বা বললাম। এতসব বিতর্কের মধ্যে যদি ”ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ টাইপের স্লোগান সামনে আসে, অতি সাধারণ সরল-মনা মুসলমানরা এটাকে ভালো একটা বিষয় হিসেবে গ্রহন করতেই পারে। কিন্তু এর মধ্যে যে কী ভয়ানক শয়তানি ষড়যন্ত্র লুকিয়ে আছে তা গভীরভাবে ভেবে দেখা একান্ত প্রয়োজন।

Leave a Reply