আরাফাতের ময়দানে তুরস্কের সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রফেসর ডঃ নাজমুদ্দিন এরবাকানের ঐতিহাসিক ভাষণ

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। আজ সোমবার, ৩১শে মে ১৯৯২ সাল। আল্লাহ তায়ালার মেহমান হাজীদের সাথে পবিত্র স্থান জাবালে রহমতে এসে একত্রিত হয়েছি।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের শুকরিয়া আদায় করছি যে, তিনি আমাদেরকে পবিত্র এই দিনে এই পবিত্র স্থানে একত্রিত হয়ে তার কাছে দোয়া করার সুযোগ দান করেছেন। আমরা কেন আজ এখানে একত্রিত হয়েছি? কেন হজ্জে এসেছি? আজ আমি এই সম্পর্কে আপনাদের সামনে কিছু কথা রাখতে চাই।
আমরা সকলেই একথা জানি যে, আদম এবং হাওয়া (আঃ) যখন জান্নাত থেকে নেমে দুনিয়ায় এসেছিলেন তখন তারা এই আরাফার ময়দানে (জাবালে রহমত) এসেই একত্রিত হয়েছিলেন।হযরত আদম (আঃ) এখানে পোঁছে দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনও তার তওবা কবুল করে রাতের মধ্যেই হযরত হাওয়া (আঃ) এর সাথে তাকে এই পাহাড়ে সাক্ষাৎ করান।
এই পবিত্র স্থানেই আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সঃ) বিদায় হজ্জের ভাষণ দেন। মুহাম্মাদ (সঃ) এই চুড়ায় উঠেন এবং তার সেই মহামূল্যবান ভাষণের একটি এখান থেকে দেন।
তিনি বলেন, “সুদকে হারাম করা হয়েছে, সকল সুদ আমার পায়ের নিচে”
তিনি এই পবিত্র স্থানে দাঁড়িয়ে, এই জাবালে রহমতে দাঁড়িয়ে তিনি এই কথা বলেছিলেন। যে স্থানে দাঁড়িয়ে রাসুল (সঃ) এই কথা গুলি বলেছিলেন মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে সেই একই স্থানে সমবেত হওয়ার সুযোগ দান করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ।।
আমরা সকলেই মুসলমান আলহামদুলিল্লাহ্‌। এই মুসলিম নামটি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনই আমাদেরকে দিয়েছেন। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআনে বলেছেন “তোমরা মুসলিম”। এই কথা বলে তিনি সকলের থেকে আমাদেরকে আলাদা করেছেন। আচ্ছা অন্যরা কারা? অন্যরা হল তারা যারা নফসের গোলাম, যারা নফসের চাওয়া অনুযায়ী যাপন যাপন করে তারা।
আলহামদুলিল্লাহ্‌, আমরা মুসলমান। মুসলমান কাকে বলে? যত কঠিনই হোক না কেন, অথবা আমাদের মনপুত হোক বা না হোক, “মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যা নির্দেশ করেছেন, যে তার সেই নির্দেশের অনুগামী হয় সেই মুসলমান”।
আমরা সকলেই একথা জানি যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য এই দুনিয়াতে প্রেরন করেছেন। আমাদের নিঃশ্বাস বায়ু সীমিত। সকল জীবকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহন করতেই হবে। এই জন্য আমাদের উচিত হল, আমাদের এই সীমিত সময়কে সবচেয়ে ভাল কাজে ব্যয় করে, এই দুনিয়ার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া।
আচ্ছা, আমাদের মহান রব কিভাবে এই পরীক্ষা নেন?
আমাদের মহান রব, “হক্ব ও বাতিলের” সংঘাতের মাধ্যমে এই পরীক্ষা করে থাকেন। এই পরীক্ষায় সব চেয়ে সম্মান জনক স্থান হল, “সত্য দ্বীনকে প্রতিষ্ঠার জন্য জান-মাল দিয়ে কাজ করা”।
এই পরীক্ষায় নিজেকে ‘ভাল মানুষ’ হিসাবে প্রমানিত করতে হলে, সর্বপ্রথম কর্তব্য হল। অপর মানুষের কল্যাণ ও মঙ্গল কামনা করা। দেখুন, আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) কে বিশ্ব জাহানের জন্য রহমত স্বরূপ প্রেরণ করা হয়েছে। নবী করীম (সঃ) একটি হাদীসে বলেছেন, خير الناس من ينفع الناس অর্থাৎ মানুষের মধ্যে উত্তম হল সেই ব্যক্তি, যে মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করে। এই জন্য দ্বীন ইসলাম এসেছে মানুষের কল্যাণ সাধনের জন্য।
ইসলাম, সমগ্র মানবতার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ কামনা করে। একজন মানুষকে মুসলমান হতে হলে, لا اله إلا الله محمد رسول الله এই কালেমার বানীটি অর্থ বুঝে, বিশ্বাসের সাথে এবং মৌখিক স্বীকৃতির মাধ্যমে পড়তে হয়।
আচ্ছা, لا اله إلا الله محمد رسول الله ( লা ইলাহা ইল্লালাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ) এই কালিমাটি যখন আমরা পড়ি,তখন আমরা আসলে কিসের স্বীকৃতি দান করি?
আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (সঃ) তার রাসুল। আমরা এই কথা বলি বলেই মুসলমান হয়ে থাকি।
আচ্ছা, ‘আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই’, এর অর্থ কি?
‘ইলাহ’ শব্দটি একটি আরবী শব্দ। এই দুনিয়াতে যত ভাষা আছে তার মধ্যে সব চেয়ে সমৃদ্ধ ভাষা হল আরবী ভাষা। এর অর্থ এবং এর ব্যাকরনকে সম্মনিত আলেমগন গানিতের মত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের দিক থেকেও এই ভাষা সব চেয়ে সমৃদ্ধ একটি ভাষা। আরবী ভাষার এই ‘ইলাহ’ শব্দটিতে চারটি মৌলিক অর্থ লুকায়িত আছে।
১। মানুষ তার গোলামী করবে, এই অর্থ বুঝায়
যখন আমরা বলি, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ তখন আমরা মূলত একথা স্বীকার করি যে, ‘ইয়্যাকা না’বুদু’। অর্থাৎ ‘ইয়া রাব্বী আমরা কেবলমাত্র তোমারই ইবাদত করি’ ।
২। তার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি। এই অর্থে,
‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর অপর একটি অর্থ হল, ‘ইয়্যাকা নাস্তায়ীন’। অর্থাৎ ‘ইয়া রাব্বী আমরা কেবলমাত্র তোমারই কাছেই সাহায্য চাই’।
৩। তার সন্তুষ্টির প্রত্যাশা করা, অর্থে।
‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এই বাক্যের মধ্যে ‘ ওয়া রিজাকা মাতুলবী’। অর্থাৎ ইয়া রাব্বী আমাদের আকাংখা হল তোমার সন্তুষ্টি, এই অর্থটিও নিহিত রয়েছে।
৪। আইন প্রনেতা, অর্থে।
‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এর অর্থ হল, ‘ইয়া রাব্বী হক্ব, বাতিল এবং আদালত এগুলোকে একমাত্র তুমিও সুক্ষভাবে নিরূপণ করতে পার। কোন বিধান মানুষের সাফল্য বয়ে নিয়ে আসবে কেবলমাত্র তুমিই জান’। মানবতার মুক্তির জন্য তুমি তোমার সেই বিধানকে তোমার প্রিয় রাসুল এবং প্রিয় বান্দা মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সঃ) মাধ্যমে পাঠিয়েছ। এই জন্য কোরআনে পাকে বর্ণিত ‘হক্ব ও আদালতের বিধান’ তুমিই তোমার প্রিয় রাসুলের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করিয়েছ। আমরা আল্লাহ তায়ালাকে কথা দিয়েছি যে, ‘ তোমার বিধানকে এই দুনিয়ার বুকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আমরা জান-মাল দিয়ে প্রচেষ্টা চালাব’, এই জন্যই আমরা মুসলমান। উপরে বর্ণিত সকল অর্থই ‘লা ইলাহা ইল্লাহ’ এই বাক্যটির মধ্যে পাওয়া যায়।
কোরআনে কারীমে বর্ণিত, ‘হক্ব ও ন্যায়ের বিধান’ দুনিয়ার বুকে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে পরিচালিত সংগ্রামকে জিহাদ বলে। এই জন্য একজন মুসলিম যখন কালেমায়ে তাওহীদের বানী উচ্চারন করে,তখনই সে জিহাদ করবে বলে আল্লাহ তায়ালার কাছে ওয়াদা করে।
“ ইয়া রাব্বী, আমি আমার সকল শক্তি দিয়ে জিহাদ করব। সমগ্র মানবতার কল্যাণের জন্য তোমার প্রেরিত হক্ব ও আদালতের এই বিধানকে দুনিয়ার বুকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য আমার সকল যোগ্যতা দিয়ে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাব”।
“লা ইলাহা ইল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসুল্লাহ” এই বাক্যের মূল কথা হল এটি।
যে ব্যক্তির জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হেদায়েত নাসিব করেছেন। সে ব্যক্তি যদি অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করে এবং অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝে কালেমায়ে তাওহীদ মুখে উচ্চারন করে তাহলেই সে মুসলমান হিসাবে গণ্য হবে। এমন মুসলমানের উপরেই হজজ ফরজ হয়েছে।
আচ্ছা, হজ্জ কি?
প্রথমত আমাদের দায়িত্ত্ব হল, আল্লাহর দেওয়া বিধানকে দুনিয়ার বুকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য সর্বাত্মক ভাবে প্রচেষ্টা চালাব। আল্লাহ বলেছেন “তোমরা একটি উম্মত হিসাবে, এক সাথে জিহাদ করবে”। আমরা এই কথার উপর বিশ্বাস করেই মুসলমান হয়েছি এবং আল্লাহর করুনায় “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” র এই বিশাল সমাবেশ হজ্জে এসে উপস্থিত হয়েছি।
আমরা কেন এই ফরজ হজ্জকে অন্য স্থানে আদায় করতে পারি না? মদীনা কিংবা বাইতুল মুকাদ্দাসে না গিয়ে কাবায় এসে সমবেত হই? কেননা কাবা হল এমন স্থান, যেখানে আমাদের আদি পিতা, সর্ব প্রথম মানব হযরত আদম (আঃ) এই কাবাতে এসে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এই বানীটি উচ্চারন করেছিলেন। অর্থাৎ মানব কর্তৃক এই পৃথিবীতে সর্বপ্রথম কালেমায়ে তাওহীদের এই বানী এই কাবাতেই উচ্চারিত হয়। তাওহীদের মূলনীতির উপর ভিত্তি করে সর্বপ্রথম ইবাদত গৃহ হল এই কাবা, যা দুনিয়ার বুকে প্রতিষ্ঠিত সর্বপ্রথম মসজিদ। এই জন্য এই কাবা হল “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” র প্রতীক। এই জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আমরা মুসলমানরা এসে এই মহাপবিত্র স্থানে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” র পতাকা তলে সমবেত হই।
কাবা শরীফকে তাওয়াফ করি।আলহামদুলিল্লাহ আমাদের মহান প্রভু আমাদেরকে ফরজ পালনের সুযোগ করে দিয়েছেন। এখন আমরা কাবার বাগান হিসাবে পরিচিত আরাফাতে অবস্থান করছি। আরাফাত হল, জিহাদী বাহিনীর মিলনস্থল। এখানে আমরা ৩০ লক্ষ মুসলমান আজ এক পতাকা তলে সমবেত হয়েছি।
আচ্ছা এই সমাবেশের উদ্দেশ্য কি?
এই সমাবেশ হল, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ” র সমাবেশ। অর্থাৎ আমরা এই সমাবেশে এসে আমাদের মহান প্রভুকে এই কথা দিচ্ছি যেঃ “হে আল্লাহ তোমার প্রেরিত বিধান আল কোরআনের রাজকে এই দুনিয়ার বুকে কায়েম করার জন্য আমরা আমাদের সকল শক্তি দিয়ে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাব”। আমি যখন মুসলমান হয়েছিলাম তখনও তোমাকে আমি এই কথা দিয়েছিলাম। আজ আমি ৩০ লক্ষ ইসালামী সেনাবাহিনীর এই সৈন্য সমাবেশে সমবেত হয়ে একজন সৈনিক হিসাবে একই কথা ঘোষণা করছি। এই লক্ষের ইসলামী সৈন্য বাহিনী দেড়শকোটি মুসলমানের প্রতিনিধিত্ব করছে। তোমার প্রেরিত সত্য বিধানকে এই দুনিয়ার বুকে প্রতিষ্ঠিত করব এই ওয়াদা দেওয়ার জন্য তোমার ডাকে সাড়া দিয়ে আজকের এই সমাবেশে এসে হাজির হয়েছি। আমরা যে কাজ করছি তা হল মূলত এই কাজ। এই জন্য আমরা যখন এখানে সমবেত হই, তখন
لبيكَ اللَّهمّ لبّيك،
لبّيك لا شريك لك لبّيك،
إن الحمد والنعمة لك والمُلْك،
.شريك لك لا
লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক
লাব্বাইক লা শারিকালাকা লাব্বাইক
ইন্নাল হামদা, ওয়ান নিয়’মাতা লাকা ওয়াল মূলক
লা শারীকা লাকা।
এই শ্লোগান দিয়ে দিয়ে এখানে সমবেত হই।
আচ্ছা, আমরা যে কথা গুলো মুখে উচ্চারণ করছি এর অর্থ কি?
প্রথমে একবার “লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক” আদেশ কর ইয়া রাব্বী। তোমার জিহাদের সৈন্য বাহিনীর একজন সৈন্য হিসাবে এখানে এসে হাজির হয়েছি। কালেমায়ে তাওহীদের এই সমাবেশে এসে হাজির হয়েছি। “ লাব্বাইক! আল্লাহুম্মা লাব্বাইক!” যখন জোর দিয়ে বলি তখন এর অর্থ দাড়ায়। ‘আমি কেবলমাত্র তোমার গোলামী করার জন্যই হাজির হয়েছি। তুমি আদেশ কর, আমি কেবলমাত্র তোমারই গোলাম। কেবল তোমার আদেশেরই অনুগামী হব’।
এর পর আমরা কি বলি? আমরা বলি যে, “ লাব্বাইক লা শারিকা লাকা লাব্বাইক”। লা শারিকা লাকা এর অর্থ কি? এর অর্থ হল, ‘ ইয়া রাব্বী, তোমার কোন শরীক নেই। তুমি একমাত্র প্রভু’। কোন বিধান মানবতার কল্যাণ বয়ে আনবে এটা কেবলমাত্র তুমিই জান, আর কেউ নয়। তুমি আমাদেরকে যে কোরআনী বিধান দিয়েছ কেবলমাত্র এর মাধ্যমেই মানবতা মুক্তি পেতে পারে। মানব রচিত আইন কোন দ্বীন মানবতার কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। মানব রচিত বিধান মানুষকে ধংসের দিকে ধাবিত করে।
দেখুন, কম্যুনিজমের পতন হয়েছে। খেয়াল করে শুনুন, আমাদের নবী মানবতার মুক্তির দূত মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সঃ) এই আরাফাতের ময়দানে তার শেষ ভাষণে কি বলেছেন। তিনি বলেছেন “জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র থেকে ’সুদ’ কে চির দিনের জন্য হারাম ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হল। সকল সুদ আমার পায়ের নিচে”। কেন তিনি ১৪১৪ বছর পূর্বে আমাদেরকে এই কথা বলেছেন? তিনি এই জন্য বলেছেন যে, কম্যুনিজমের পতন হয়েছে বলে তোমরা সুদ-ভিত্তিক পুঁজিবাদের দিকে ঝুকে পড়োনা।“সুদে কোন প্রকার কল্যাণ নেই” এই কথা তিনি আমাদেরকে এত আগে বলে দিয়েছেন। এই সতর্কবানী যাতে সকলেই খুব সতর্কতার সাথে গ্রহন করে সেই জন্য তিনি এই কথা বলার সময় উটের পীঠ থেকে নেমে পড়েছিলেন।
সাবধান, এটা মনে রেখ যে সুদ থেকে কোন কল্যাণ আসতে পারে এটা ধারনাও করো না। এটা কেবলমাত্র মানুষকে নির্যাতন করতে পারে। এই জন্য সকল ধরণের সুদকে রহিত করা হল, সকল সুদ আমার পায়ের নিচে। সাবধান সুদকে কোন কিছু মনে করে এই পথে অগ্রসর হয়ো না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কোরআনে কারীমের মাধ্যমে যে সিরাতে মুস্তাকিমের পথ দেখিয়েছেন সেই পথে চল। কেবল মাত্র এই কোরআনের বিধানের মাধ্যমেই তোমরা নিজেরা সফলতা লাভ করতে পারবে, দেড়শ কোটি মুসলমান সফলতা লাভ করবে এবং সর্বোপরি সাতশত কোটি মানুষ সফলতা লাভ করবে।
এই জন্য আমরা যখন এইখানে ‘ লাব্বাইক!আল্লাহুম্মা লাব্বাইক!’ বলতে বলতে দৌড়িয়ে এসে উপস্থিত হই তখন আমরা একথা বলি যে, “ হে আল্লাহ আমরা কেবলমাত্র তোমারই গোলামী করি”। যখন বলি ‘লা শারিকালাকা লাব্বাইক’ তখন আমরা বলি যে, “ হে আল্লাহ তুমি যে বিধান পাঠিয়েছ আমরা কেবলমাত্র সেটার মাধ্যমেই সফলতা লাভ করতে পারি, অন্য কোন বিধান আমাদেরকে কল্যাণের পথ দেখাতে পারে না। তোমার কোন শরীক নেই”। এই কথা আমরা বার বার উচ্চারণ করে থাকি।
এর পর বলি যে, “ওয়া নিয়’মাতা লাকা ওয়াল মূলক” সকল নিয়ামত এবং সম্পত্তির মালিক কেবলমাত্র তুমি। এই জন্য আমরা যখন সাহায্য চাই তখন কেবলমাত্র তোমার কাছেই সাহায্য চাই।
এর পড় আমরা বলি যে, “লা শারিকা লাকা” ইয়া রাব্বী, তোমার কোন শরীক নেই।
এই বাক্যগুলো মূলত “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” র তাফসীর। পূর্বে আমি “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” র যে ছারটি অর্থ উল্লেখ করেছি সে চারটি অর্থই হজ্জের এই “ লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইক লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নিয়’মাতা লাকা ওয়াল মূলক, লা শারিকা লাকা” তালবিয়ার মধ্যে পাওয়া যায়। কালেমায়ে তাওহীদের চারটি অর্থই আমরা সকাল থেকে বার বার উচ্চারণ করছি।
আচ্ছা, আমি কেন আপনাদের সামনে এসে এই বিষয়ে কথা বলতেছি?
দেখুন আপনারা আল্লাহর ফজলে আরাফাতে এসেছেন, এখানে হজ্জ করতে এসে ইসলামী সৈন্য বাহিনীর সৈনিকে পরিণত হয়েছেন। আল্লাহ আপনাদের রক্ষা করুন আপনারা কেও যেন দেশে ফিরে সুদকে সমর্থন না করেন।সাবধান আপনারা দেশে ফিরে গিয়ে যালিমদেরকে সমর্থন করবেন না। যদি দেশে গিয়ে যারা সুদ ভিত্তিক পুজিবাদকে সমর্থন করে এমন দলকে সমর্থন করেন তাহলে আপনার এই হজ্জের অর্থটা কি থাকল? দেখুন আমি এখানে রাজনীতি করছি না। আমি আপনাদের একজন ভাই হিসাবে আপনাদের শুভাকাংখি হিসাবে এই কথা বলছি। আপনাদের হজ্জ যাতে কবুল হয়, অর্থপূর্ণ হয় এই জন্য আপাদের সামনে এই কথার মর্মার্থকে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। একজন মুসলিম হিসাবে এটা আমার দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। তাছাড়া আপনি এখানে হজ্জ করতে এসে, তিন দিন, পাঁচ দিন, দশ দিন, এক মাস সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত “লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা, ওয়ান নিয়’মাতা, লাকা ওয়াল মূলক লা শারিকা লাকা” পড়বেন এর পর ফিরে গিয়ে মানব রচিত বিধান থেকে সফলতা আশা করবেন।তাহলে তো আপনার সেই হজ্জের কোন মর্যাদাই রইল না।আপনি কাবায় এসে বললেন এক কথা আর গিয়ে করতেছেন ভিন্ন কাজ! এই জন্য আমরা এখানে কেন আসছি, এই কথা ভালোভাবে বুঝতে হবে। এইখানে এসে আমরা যখন হজ্জের এই তালবিয়া পাঠ করি, তখন আমরা “লা ইলাহা ইল্লাহ” কালেমায়ে তাওহীদের এই বানীর মর্মার্থ আরও ভাল ভাবে বুঝতে পারি।
প্রতি বছর সমগ্র দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মুসলমানরা এসে এই সম্মেলনে অংশগ্রহন করে। যাতে মুসলিম উম্মাহর অন্তরে এই চেতনা চির জাগরূক থাকে। মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি যে, তিনি আমাদেরকে এই সুযোগ দান করেছেন এবং “ইসলামের এই আধ্যাত্মিক সৈন্যবাহিনীতে” একজন সৈন্য হিসাবে অংশগ্রহন করার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহর নিকট তালবিয়া পাঠ করেছি। “ হে আল্লাহ তুমি আমকে নির্দেশ কর, আমি তোমার এই জিহাদী কাফেলার একজন সৈনিক। তোমার প্রেরিত বিধানকে দুনিয়ার বুকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আমি আমার সকল শক্তি ও যোগ্যতা দিয়ে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাবো”। আল্লাহকে আমরা এই কথা দিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ি। কেন? যাতে করে আমরা দুনিয়ার সকল স্থানে মহান রাব্বুল আলামীন কর্তৃক প্রেরিত সেই বিধানকে বাস্তবায়ন করতে পারি।
আমি আবারও বলছি যে, যারা সুদ কে প্রশ্রয় দিয়ে দেশ পরিচালনা করে তাঁদের থেকে কখনও কল্যাণ আসবে না। দেখুন!আল্লাহর রাসুল এই বিদায় হজ্জের ভাষণেই এই কথা বলেছেন। সাবধান, কম্যুনিজম থেকে মানবতার কল্যাণ আসবে না বলে, মুক্তির আশায় সুদ-ভিত্তিক পুঁজি বাদী অর্থ ব্যবস্থার দিকে ছুটে চল না। পবিত্র কোরআনের বিধান ছাড়া এবং আল্লাহ ও তার রাসুল (সঃ) প্রদর্শিত পথ ছাড়া মুক্তির আর কোন পথ নেই। আলহামদুলিল্লাহ্‌ সকাল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত আমরা এই কথায় বারংবার উচ্চারন করছি। এই সত্যটি আমাদের মনের মধ্যে গেঁথে নিয়ে পৃথিবীর সকল জায়গায় ছড়িয়ে যাচ্ছি।
আমরা এখানে ফরজ হজ্জ আদায় করলাম। এর পর আমরা যেখানেই যাব দাওয়াত ও তাবলীগের যে ফরজ আমাদের উপর আরোপিত হয়েছে সেটাও আদায় করব। আমাদের সামনে যারাই আসবে, যাদেরকেই আমরা কাছে পাব তাঁদের সামনেই এই সত্যকে তুলে ধরব। মানুষকে দাওয়াত দিয়ে বলব “ সত্য ও সুন্দরের শাশ্বত এই বিধানকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য তুমিও আমাদের সাথে আস”। আমাদের উপর যে জিহাদ ফরজ এই ফরজটিকেও আদায় করব। সকলেই মিলে দুনিয়ার বুকে হক্ব ও আদালতকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাব। যদি আজকের দেড়শ কোটি মুসলমান হজ্জের এই মর্মার্থ বুঝতে সক্ষম হয় এবং এই অনুযায়ী কাজ করে তাহলে অতীতের মত পৃথিবীতে আবারও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠিত হবে সমগ্র মানবতা এই জুলুম নির্যাতন থেকে মুক্তি পাবে। কিন্তু দুঃখ জনক হলেও সত্য যে, মুসলমানদেরকে এই সত্য সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া হয় না। মুসলমানের সত্যিকারের দায়িত্ত্ব ও কর্তব্য কি এটা শিক্ষা দেওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বাতিল শক্তি মানবতাকে শোষণ করার জন্য তার এবং দুনিয়ার বুক থেকে ইসলামকে বিলীন করার জন্য তার সকল শক্তি দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। অপর দিকে মুসলিম গণ যাতে ইসলামের মূল শিক্ষা না পায় সেই জন্য সকল প্রকার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এই জন্য সে বলে যে আমি মুসলমান, কিন্তু পড়ে গিয়ে সুদী মহাজনদের সমর্থন দেয়। মুসলমান হওয়ার অর্থ কি এটাই সে জানে না। এখানে হজ্জ করতে আসে হজ্জ থেকে ফিরে গিয়ে সুদ কে সমর্থন করে এমন পার্টিকে সাপোর্ট করে। সে ধারনা করে যে, আমি মুসলমানও হব আবার সুদী মহাজন ও হব। না তা হতে পারে না। আমি আবার বলছি। রাসুল (সঃ) বলেছেন “ সকল ধরণের সুদ রহিত করা হল, সকল সুদ আমার পায়ের নিচে”।
সাব্ধান!যারা সুদ-ভিত্তিক পুঁজিবাদকে বাস্তবায়ন করতে চায় তাঁদেরকে সমর্থন করবে না!
সাব্ধান!যারা পাশ্চাত্য সভ্যতার দালাল তাঁদের পেছনে ছুটে বেড়াবে না!
এই সতর্ক বানী যেখানে উচ্চারিত হয়েছিল আজ আমরা সকলেই সেখানে। এই জন্য এর অর্থকে আমাদের খুব ভাল ভাবে উপলব্ধি করতে হবে। যদি পৃথিবীতে বসবাস কারী দেড়শ কোটি মুসলমান এর অর্থ উপলব্ধি করতে সক্ষম হত তাহলে সমগ্র দুনিয়ায় আজ যে জুলুম নির্যাতন তা অবশিষ্ট থাকত না। দেখুন!আজ বসনিয়াতে আমাদের মুসলিম ভাইদের উপর গণহত্যা চালানো হচ্ছে আমাদের মা-বোনদের ধর্ষণ করা হচ্ছে। কেন মুসলিম দেশ গুলো আজ একত্রিত হয়ে এই জুলুম বন্ধে কোন পদক্ষেপ নিতে পারছে না? কেন বলছে না যে আমরা আমাদের এই ভাইদের উদ্ধার করার জন্য আমরাও অভিযান চালাবো? দেখূন জার্মানি বলছে যে, “ক্রয়েশিয়ানরা ক্যাথলিক এদের গায়ে হাত তুলে দিব না” । তারা ক্রোয়েশিয়াকে উদ্ধার করেছে। তাহলে আমরা কেন দেড়শ কোটি মুসলিম জীবিত থাকতে আজ আমাদের ভাইদের এই ভাবে হত্যা করা হচ্ছে, আমাদের মা-বোনদের ধর্ষণ করা হচ্ছে। সাগরে ডুবে আমার কোমলমতি শিশুরা মারা যাচ্ছে। কেন আমরা আজও আমাদের বসনিয়ার ভাইদের রক্ষা করার জন্য কোন যৌথ উদ্যোগ নিতে পারলাম না? কেননা আজ একজন মুসলিম নিজেকে মুসলিম দাবী করে ঠিকই কিন্তু দেড়শ কোটি মুসলমানের অধিকাংশই আজ জানে না যে মুসলিম হিসাবে তার দায়িত্ত্ব কর্তব্য কি?
মুসলমানরা বলে যে, “ আমরা পাশ্চাত্যের সাথে মিশে যাব, ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রবেশ করব, আমাদের আইন কানুন হবে ইউরোপীয়ানদের আইন ও কানুনের মতই, তখন আমরা বেশী ভাল থাকতে পারব”। দেখুন এ কেমন গাফলতি, এ কেমন বুদ্ধিহীনতা। যারা এমন কথা বলে এরকম লোকদেরকেই আজ অনেকেই সমর্থন দিচ্ছে। না তুমি পারবে না এমন কাউকে সমর্থন করতে। ইসলামকে পরিপূর্ণভাবে শিক্ষা করা সকল রোগের মহাঔষধ। এই জন্যই এখানে আসি এই জন্যই সত্যটা তুলে ধরার চেষ্টা করি। আজ ফিলিস্তিনের দিকে তাকিয়ে দেখুন সেখানে ৪০ বছর যাবত জুলুম নির্যাতন চালানো হচ্ছে। কাশ্মীর, আজারবাইজানের দিকে তাকিয়ে দেখুন। এই সকল সমস্যার একমাত্র সমাধান হল ইসলাম এবং ইসলাম। যদি দেড়শ কোটি মুসলমান চায় তাহলে বসনিয়াকে রক্ষা করতে পারে। আলবেনিয়ার প্রেসিডেন্ট জেদ্দার ইসলামিক কনফারেন্সে এসে তার বক্তৃতায় বলেন “বসনিয়ার গণহত্যার পর সিরিয়াল আমাদের”। এই মুসলিম দেশের নেতৃবৃন্দ আপনারা কোথায়? তিরানা এয়ারপোর্ট আপনাদের হাতে। ১০০ টি বিমান পাঠান দেখেন ১৫ মিনিটের মধ্যেই জালিম সার্বিয়াকে শায়েস্তা করে বসনিয়ান ভাইদের মুক্ত করতে পারবে। কিন্তু মুসলিম বিশ্বের উদাসীন নেতৃবৃন্দ বলে যে, “আমরা আপনাদের প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে পারব না। কেননা পাশ্চাত্য এরকম কাজ পছন্দ করবে না” । এসকল নেতারা বলতে চায় যে, “আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি নয় পাশ্চাত্যের সন্তুষ্টি চাই”
তারা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর” অর্থ জানে না বলেই এমন আচরন করছে। “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর” অর্থ হল “আমি কেবল মাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টিই চাই”। যদি এই চেতনাকে লালন করে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মুসলিম দেশ গুলি তিরান এয়ারপোর্ট থেকে কয়েকশ বিমান পাঠায়, তাহলে এই যালিম সার্বিয়ানরা পালিয়ে যাওয়ার জন্য গুহা খুঁজে বেড়াবে। ফলশ্রুতিতে বসনিয়ার গণহত্যাও বন্ধ হবে, মুসলিম উম্মাহও শান্তি ফিরে পাবে। এটি একটি উদাহরণ হিসাবে বললাম। এটা বর্তমানের একটি বিষয় হওয়ার কারণে এমন উদাহরণ দিলাম। এরকম জরুরি অবস্থায় আমরা এমন পদক্ষেপ নিতে বাধ্য। সকল সমস্যার মূল সমাধান হল ইসলামকে পরিপূর্ণ ভাবে জানা এবং সে অনুযায়ী আমল করা। সচেতন মুসলমান হিসাবে সব কিছু খেয়াল করা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে আমাদের দায়িত্ত্ব পালন করার তওফিক দান করুন। আল্লাহর দ্বীনকে দুনিয়ার বুকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সর্বাত্মক ভাবে প্রচেষ্টা চালানোর তওফিক দান করুন। এই আরাফাতের যে শিক্ষা এই শিক্ষাকে বুকে ধারণ করে চলার তওফিক দান করুন।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআনে বলেছেন, “তোমরাই হলে শ্রেষ্ঠ জাতি”। অর্থাৎ এই মানবতা তোমাদের হাতে আমানত। মানবতার কল্যাণের জন্য এবং দুনিয়াতে আল্লাহর দ্বীনকে কে প্রতিষ্ঠা করার জন্য কাজ করবে। এই পবিত্র স্থানে দাঁড়িয়ে মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে দোয়া করছি যে, হে আল্লাহ তুমি মুসলিম উম্মাহকে ইসলামের সঠিক বুঝ দান কর। তাঁদেরকে চেতনা সম্পন্ন হওয়ার তওফিক দান কর। দুনিয়ার বুকে তোমার দেওয়া দ্বীন দ্বীন ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য আমাদেরকে তওফিক দান কর।
অনুবাদঃ বুরহান উদ্দিন

Leave a Reply