আগামীর দিন ইসলামের

মূলঃ সাইয়েদ কুতুব শহীদ (রঃ)
অনুবাদঃ বুরহান উদ্দিন

সমগ্র মানবতা আজ বস্তূবাদী সভ্যতার জিঞ্জীরে আবদ্ধ , মানব বিধ্বংসী মতবাদ সমুহ মানবতাকে ঘিরে রেখেছে চতুর্দিক থেকে, এই বহুমুখী সমস্যায় হুমকীর সম্মুখীন এই মানবতাকে কেবলমাত্র ইসলামই রক্ষা করতে পারে। আর কেবলমাত্র ইসলামই মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণে সক্ষম এবং মানুষের ফিতরাতের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ একটি বিধান। আর ইসলামই শুধুমাত্র একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা যা মানুষের শারীরিক চাহিদার মধ্যে সমন্বয় সাধন করার পাশাপাশি আধ্যাত্মিক অগ্রগতির গতিশীলতায় প্রত্যাশিত গতির সঞ্চার করে। ইসলাম মানুষের জন্য এমন এক জীবন ব্যবস্থা পেশ করেছে যে, মানুষ পৃথিবীর ইতিহাসে তার তুলনা খুঁজে পাবে না।
এই সকল বিষয়কে জানার পরেও এবং এমন একটি পদ্ধতির জন্য আকাঙ্ক্ষী হওয়া সত্ত্বেও, মিঃ ডুল্লেস এর মত মানুষ যিনি এই সিস্টেমের প্রতিষ্ঠার জন্য সাহায্য কামনা করতেন – এমন একটি পদ্ধতিকে যারা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে চান সেই ইসলামী রেনেসাঁ আন্দোলনকে দুনিয়ার সর্বত্রই চরম ভাবে নির্যাতিত হতে হচ্ছে। বিভিন্ন মিথ্যা অপবাদ দিয়ে এবং প্রোপ্যাগান্ডা চালিয়ে এই বিধানকে দূরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে এবং মানুষের মন থেকে এই কালজয়ী সভ্যতাকে মুছে ফেলার জন্য বাতিল শক্তি তার সকল শক্তি দিয়ে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মানবতার মুক্তির সনদ এই ইসলামের উপর তারা যে কত জঘন্য আক্রমন পরিচালনা করছে, ধীরে ধীরে তা আজ সকলের সামনে উম্মোচিত হচ্ছে।
পাশ্চাত্যের একজন প্রখ্যাত বিজ্ঞানীর কথা অবশ্যই এখানে প্রণিধান যোগ্য, তিনি বলেছেন, ‘মানুষের সত্যিকারের প্রয়োজনের এবং ফিতরাতের বিপরীত এই আধুনিক সভ্যতা মানবতাকে এক ভয়াবহ বিপদের সম্মুখীন করেছে। বস্তুবাদী দর্শনের যুক্তির মাধ্যমে মানবতাকে হুমকী দেওয়া হচ্ছে, যা সুস্পষ্টভাবে একটি ধ্বংসযজ্ঞ।‘ মিঃ ডুল্লেস এক্ষেত্রে সতর্কতা সরুপ বলেছেন যে, বস্তুবাদী সভ্যতার মরীচিকা দেখিয়ে আজ সমগ্র মানবতাকে ধ্বংসের কিনারে নিয়ে আসা হয়েছে। মানুষ আজ সারা দুনিয়াতে মানবতার শত্রুদের সকল পরিকল্পনা এবং ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। তাঁদেরও জানা থাকা উচিত যে, তাঁদেরকে এই অবস্থা থেকে কেবলমাত্র মুক্তি দিতে পারে ইসলাম।
কিন্তু এই বিশ্বাসকে নস্যাৎ করার জন্য ইসলামের বিরুদ্ধে আজ চতুর্মুখী ষড়যন্ত্র চালানো হচ্ছে। আমরা তাঁদের এই সকল ষড়যন্ত্রের জবাবে বলতে চাই, আগামীর দিন যে ইসলামের এই ব্যাপারে আমাদের যে বিশ্বাস এবং আস্থা রয়েছে এই বিশ্বাসে বিন্দু মাত্র সন্দেহ সৃষ্টি করতে পারবে না।
ইসলাম যে আজ সকল জায়গায় বাতিলের ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের শিকারে পরিনত হচ্ছে এবং সংঘাতে লিপ্ত হচ্ছে এটা নতুন কিছু নয়। ইসলাম তার সুদীর্ঘ ইতিহাসে এর পূর্বেও আরও অনেক ষড়যন্ত্রের এবং ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছে । ইসলাম সব সময় তার নিজের শক্তিতে বলিয়ান। তার জন্য অন্য কোন শক্তির প্রয়োজন নেই। যেই দেশ এবং জাতি এর পক্ষাবলম্বন করেছে তারাই বিজয়ী হয়েছে এবং সম্মানের সাথে টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছে।
এই ইসলামই তাতার দের আক্রমন থেকে মুসলমানদের রক্ষা করেছে। ক্রুসেডাররা যেমনি ভাবে আন্দালুসিয়ায় এবং ইয়াহুদিরা ফিলিস্তিনে বিজয় লাভ করেছে যদি তাতাররা সেই সময়ে মুসলিম দের উপরে পরিপূর্ণ ভাবে বিজয় লাভ করতে সক্ষম হত তাহলে না আজ আরব জাতী থাকত, না থাকত আরবী ভাষা ও আরব দেশ।
প্রাচীন আন্দালুসিয়া এবং বর্তমানের ফিলিস্তিন এই কথার সাক্ষ্য বহন করে যে, ইসলাম যদি কোথাও থেকে মুলোৎপাটিত হয় তাহলে না সেখানে কোন জাতী থাকে আর না থাকে কোন ভাষা।
এই অঞ্চলকে (আরবঅঞ্চল) তাতারদের আক্রমন থেকে রক্ষাকারী মামলুকীগণ, তারা কিন্তু আরব ছিল না।বরং তারা মূলত ছিল তাতার। মূলত তারা ইসলামকে রক্ষা করার জন্য তাঁদের বংশধরদের আক্রমণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। কারন তারা ছিল মুসলিম। তারা ইসলামী আকিদা এবং বিশ্বাসকে রক্ষা করার জন্য প্রতিরোধ গড়ে তুলেন। এই লক্ষে তারা ইমাম ইবনে তাইমিয়ার দলে যোগদান করেন। যিনি সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করেন এবং বাহ্যিক ও আধ্যাত্মিক ভাবে এই আন্দোলনের নেতৃত্ব প্রদান করেন।
সালাহ উদ্দিন আয়ুবী আরব ছিলেন না, তিনি ছিলেন কুরদিশ। এর পরও তিনি এই অঞ্চলের আরব এবং আরবী ভাষা রক্ষা করার জন্য যুদ্ধ করেছেন। ক্রুসেডারদের জুলুম নির্যাতন থেকে এই অঞ্চলের ইসলাম এবং মুসলমানদের রক্ষা করার সময় আরবী ভাষাকেও ক্রুসেডারদের আক্রমন থেকে রক্ষা করেন। যেই চেতনা তাকে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে করতে প্রেরণা যুগিয়েছিল তা ছিল ইসলাম এবং ঈমানের চেতনা। যাহির বায়বারস, মুযাফফের কুতুয এবং মালিক নাসির যে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এর মুলেও ছিল ইসলাম। আলজেরিয়াতে যে ১৫০ বছর ধরে যুদ্ধ হয়েছিল এর মুলেও ছিল ইসলাম। ইসলাম সেখানে আরব জাতীকে স্থায়িত্ত্ব দান করেছে। ফ্রাস্ন আলজেরিয়াতে আরবী ভাষা শিক্ষাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। আরবীর ভাষার কারণে যতদিন পর্যন্ত তাঁদের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সেই চেতনা বিদ্যমান ছিল ততদিন তারা ফরাসীদের বিরুদ্ধে তাঁদের যুদ্ধ চালিয়ে যায়। এর পর ইসলাম তাঁদেরকে চেতনা যোগায় এবং এই সংগ্রামের পথে প্রেরণার সৃষ্টি করে। দীর্ঘ এই সংগ্রামে আলজেরিয়ান মুসলিমদেরকে যে শক্তিটি টিকে থাকতে সাহায্য করেছিল তা ছিল ইসলাম। এই ইসলামের বদৌলতেই তারা ফরাসী কাফিরদেরকে পরাজিত করে এবং তারা কোন দিন এই ক্রুসেডারদের কাছে মাথানত করেনি। শুধুমাত্র ইসলামের কারণেই প্রতিরোধের এই রুহটি অব্যাহত ছিল। ফলশ্রুতিতে আব্দুলহামিদ বিন বাদিসের নেতৃত্বে যে ইসলামী আন্দোলন শুরু হয়েছিল তা মুসলমানদেরকে পুনরায় একত্রিত করে জাগিয়ে তুলতে এক অবিস্মরণীয় ভুমিকা পালন করে। এই জন্যই এই গাফিল এবং পথভ্রষ্টরা এই কথা জানার কারণে এই ইসলামকে ধ্বংস করতে চায়।
তারা ইসলামের এই শক্তি সম্পর্কে অবহিত ছিল। তারা জানত যে ইসলামের এই বিপ্লবী শক্তি এবং রুহ দ্বারা মুসলমানরা পুনরায় জেগে উঠবে এবং তাঁদেরকে পরাজিত করবে। এই জন্য তারা তাঁদের এই যুদ্ধকে শুধুমাত্র আরব কিংবা আলজেরিয়ানদের বিরুদ্ধে ঘোষণা করেনি। বরং সমগ্র মুলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে তারা এই যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল।
এই ইসলাম সুদানিদেরকেও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জাগ্রত করেছিল। ইসলামী শক্তিতে বলিয়ান হয়ে তারা মেহদি কাবিরের নেতৃত্বে প্রথমে তারা উত্তরের অংশকে উদ্ধার করে এবং পরে দক্ষিনের অংশকে উদ্ধার করে। আমরা যখন মেহদি কাবিরের বক্তব্যসমূহ এবং উসমান ডিউক ও অন্যান্যদের চিঠিপত্র সমুহকে বিশ্লেষণ করি তখন এটাই দেখতে পাই।
বারাকা এবং ত্রাবলুসে যে ইতালিয়ানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছিল এর মুলেও ছিল ইসলাম। সানুসি যাবিয়াতে (তরিকতের নাম) বেড়ে উঠা মহাবিপ্লবী উমার মুখতারের জিহাদের কারনও ছিল ইসলাম। এই ইসলামই চেতনায় উমার মুখতারকে মহাবীরে পরিনত করেছে।
মেরাকেশে যে মহাবিপ্লব সংগঠিত হয়েছিল এর পিছনেও বড় শক্তি যুগিয়েছে ইসলাম। ১৯৩১ সালে ফরাসীগণ সেখানে বসবাসরত আরবদেরকে শরীয়ত থেকে দূরে সরিয়ে মূর্তিপুজার দিকে ধাবিত করতে চেয়েছিল। কিন্তু সেখানের মুসলিমগণ তাঁদের এই অপচেষ্টার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান এবং তাঁদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন।
যখন ইসলামের হাতে কোন বৈষয়িক শক্তি সামর্থ ছিল না ইসলাম তখনও তার সংগ্রামকে দুর্বার গতিতে অব্যাহত রেখেছে। কেননা ইসলামের শক্তি অস্রে নয়, ইসলামের শক্তি জনবলে নয় বরং ইসলামের শক্তি তাঁদের নিজের কাছেই নিহিত, ইসলাম মানেই শক্তি, তার চরিত্রে রয়েছে সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভার। ইসলাম ব্যাপক ও পরিপূর্ণ হওয়ায় এবং মানুষের ফিতরাতের সাথে সঙ্গতি পূর্ণ হওয়ায় এবং সকল প্রশ্নের জবাব দানে সক্ষম হওয়ার কারণে এতে নিহিত রয়েছে এক প্রবল শক্তি। ইসলাম, মানুষকে মানুষের গোলামী থেকে মুক্ত করে সকল মানুষকে এক আল্লাহর গোলাম বানাতে চায়। ইসলাম সকল মানুষকে কেবলমাত্র এক আল্লাহর আনুগত্যের দিকে আহ্বান জানায় এবং দুনিয়ার সকল শক্তিকে অস্বীকার করে কেবল মাত্র তার দিকে রুজু হওয়ারই দাওয়াত প্রদান করে। জালিম শাসকের নিকট আত্মসমর্পণে নয় বরং জালিমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার মধ্যেই সকল শক্তি নিহিত। জালিমের জুলুম যত বেশী তীব্র থেকে তীব্রতর হয় মুমিনের হৃদয়েও তার জন্য তত বেশী ঘৃণার জন্ম নিয়ে জালিমের জুলুম থেকে মুক্তির জন্য তার সংগ্রাম তত বেশী তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। এই জন্য ইসলাম যতদিন পর্যন্ত এই আধ্যাত্মিক ও বৈষয়িক শক্তি অর্জন অব্যাহত রাখবে তত দিন পর্যন্ত ইসলাম পরাজিত হবে না। বিভিন্ন সময়ে ইসলাম বৈষয়িক দৃষ্টিকোন থেকে পরাজিত হলেও আধ্যাত্মিক দিক থেকে ইসলাম কোন দিন পরাজয় বরণ করেনি।
ইসলামের এই বৈশিষ্টের কারণেই ইসলামের দুশমনরা তার বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। কেননা ইসলাম তাঁদের পথকে রোধ করে দেয়। তাঁদের শোষণমুলক ঔপনিবেশবাদকে ইসলাম যেমনিভাবে বাধা প্রদান করে তেমনি ভাবে তাঁদের জুলুম নির্যাতন এবং অবাধ্যতাকেও প্রতিহত করে। ইসলামের এই কালজয়ী বৈশিষ্টের কারণে এর শত্রুরা একে খারাপভাবে উপস্থাপন করার পাশাপাশি একে ধ্বংস করার জন্য গণহত্যা এবং নিপীড়নের পথকেও বেছে নেয়।
ইয়াহুদিগণ এবং ক্রসেডাররা এই কালজয়ী সভ্যতা থেকে মুক্তির জন্য এবং এই অসমাপ্তিমূলক আদর্শিক যুদ্ধকে সমাপ্ত করার জন্য ইসলামকে তারা বিভিন্ন ভ্রান্ত চিন্তার বেড়াজালে আবদ্ধ করে একে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করতে চায়।
ইসলামের বৈশিষ্ট সমূহের অন্য একটি বৈশিষ্ট হল, যারা ইসলামী দেশ সমুহকে নিজেদের শাসনের অধীনে নিতে চায়, সেই ইসলাম দুশমনরা ইসলামের বিরুদ্ধে চরম শত্রুতা পোষণ করে থাকে। আসলে যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য হল এটাই। তার আসল উদ্দেশ্য এই সকল বিষয়ের মধ্যেই লুকায়িত।
**********************************
কিন্তু এতকিছুর পরেও, এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই যে ‘আগামীর দিন ইসলামের’
এই দ্বীনের জন্য যে রূপরেখা অঙ্কিত করা হয়েছে এবং সমগ্র মানুষের মুক্তির জন্য এর বাহিরে অন্য কোন বিধান না থাকার ফলে আমরা অত্যন্ত দৃঢতার সাথে বিশ্বাস করি যে, ‘আগামীর দিন এই দ্বীনের’। দুশমনরা চাহুক বা না চাহুক, এই পৃথিবীতে এমন অন্য কোন আদর্শ নেই যা তার প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। ইসলাম পৃথিবীকে যেভাবে সজ্জিত করতে চায় অন্য কোন আদর্শ সে স্থান পূর্ণ করতে সক্ষম নয়। মানব রচিত আদর্শত নয়ই। এই বইয়ের শুরুতেও যেমনিভাবে বলেছি যে, সমগ্র মানবতা তাঁদের সেই কাঙ্ক্ষিত সমাজের জন্য আর খুব বেশী দিন অপেক্ষা করবে না।
এই বাস্তবতাকে প্রমান করার জন্য আর খুব বেশী কথা বলার প্রয়োজন নেই। ইসলামের ইতিহাসে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা ও এর শিক্ষাকে বর্ণনা করেই এই বিষয়ের ইতি টানব। আশা করি এই উদাহরণটি শিক্ষা গ্রহনের দিক থেকে যথযথ একটি উদাহরণ।
রাসুল (সঃ) যখন তার অন্তরঙ্গ বন্ধু আবু বকর (রাঃ) নিয়ে কোরাইশদের চোখকে ফাকি দিয়ে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করতেছিলেন, তখন সুরাকা বিন নওফেল তাঁদেরকে ধরার জন্য পিছু পিছু অনুসরণ করে আসতেছিল। সুরাকা এই জন্যই এসেছিল যে, সে যদি আল্লাহর রাসুল (সঃ) সম্পর্কে খবর দিতে পারে অথবা কুরাইশদেরকে ধরিয়ে দিতে পারে তাহলে সে তাঁদের ওয়াদা অনুযায়ী অনেক বড় একটি পুরস্কার পাবে। কিন্তু সে যতই কাছা কাছি আগাচ্ছিল তার ঘোড়ার খুড় মাটিতে দেবে যাচ্ছিল। এই অবস্থা দেখে সূরা রাসুল (সঃ) এর কাছে ক্ষমা চাইল, সে মুক্তি পেলে পুনরায় সে রাসুলকে হত্যা করতে উদ্যত হল, এই অবস্থা দেখে রাসুল (সঃ) তাকে প্রশ্ন করলেন,
يا سراقة. كيف بك وسوارى كسرى؟
হে সুরাকা! কিসরার কঙ্কন (সোনার চুড়ি) সম্পর্কে তোমার কি ধারনা? এই কথা বলে তিনি তাকে পারস্য সাম্রাজ্যের সম্রাটের কঙ্কনের ওয়াদা দেন।
এমন নিরাপত্ত্বাহীন ভাবে শুধুমাত্র একজন সাথী নিয়ে গোপনে হিজরত কারী এমন এক ব্যক্তির মুখে এমন কথা শুনে সুরাকার মাথায় কি এসেছিল সেটা কেবলমাত্র আল্লাহ তায়ালাই জানেন।
কিন্তু বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সঃ) তার কাছে সে সত্য রয়েছে তার শক্তি সম্পর্কে এবং জাহিলরা সেই দিন তাঁদের যে বাতিল মতবাদ নিয়ে তাকে বাধা দিচ্ছিল সে সম্পর্কেও তিনি পূর্ণ অবহিত ছিলেন। তিনি এই বিষয়ে নিশ্চিত ছিলেন যে, তার কাছে যে সত্য রয়েছে এই সত্য একদিন সকল বাতিল মতবাদের উপর বিজয়ী হবেই হবে। তিনি এই ব্যাপারেও নিশ্চিত ছিলন যে, তার সাথে যে হক্ব রয়েছে তা খুব বেশী সময় এমন দুর্বল অবস্থায় থাকবে না এবং বাতিল আজ যে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে মানুষকে শোষণ করছে এই বাতিলও বেশী টিকে থাকতে পারবেনা। আজকে যে অবস্থা রয়েছে তা অবশ্যই অবশ্যই পরিবর্তিত হবে।
একটি পুরাতন গাছে যত সারই দেওয়া হোক না কেন তা নতুন করে বর্ধিত হতে পারে না। কেননা সে এতটাই জরাজীর্ণ যে তাকে মূলোৎপাটিত করে সেখানে পরিস্কার করতে হয়। অপর দিকে তার হাতে যে বীজ ছিল তা এমন ছিল যে, তা রোপণ করা মাত্রই ফুলে ফলে সুশোভিত হয়ে উঠবে। এই জন্য তিনি ছিলেন আত্মবিশ্বাসী এবং তার অবস্থায় তিনি ছিলেন অবিচল।
আজ আমরাও, আমাদের ভালো খারাপ ও চতুরপার্শ্বের জাহেলিয়াতকে নিয়েও একই অবস্থায় আছি। এই জন্য এই সকল মরীচিকা আমাদেরকে পরিবেষ্টন করে রাখলেও, আমাদের চারপাশের সব কিছুই যে সাক্ষ্য দিচ্ছে এবং অবশ্যম্ভাবী ফলাফল থেকে আমাদের নিরাশ হওয়া জায়েজ হবে না।
আজ সমগ্র মানবতার জন্য ইসলামী বিধানের যে প্রয়োজনতা, সেদিনের তুলনায় তা কোন অংশে কম নয়। আজ মানুষের কাছে সে সকল মতবাদ ও নিয়ম পদ্ধতি রয়েছে তার সাথে যদি ইসলামকে তুলনা করা হয়, তাহলে সে দিন ইসলামের যে মূল্য ও গুরত্ত্ব ছিল তার তুলনায় কোন অংশে কম নয়।
এই জন্য এইরকম পরিস্থিতিতে যে ঘটনা একবার ঘটেছে তা যে পুনরায় ঘটতে পারে এই ব্যাপারে কোন সন্দেহে নিপতিত হওয়া উচিত নয়। আমাদের চারপাশের অবস্থা দেখে এবং সারা দুনিয়ায় ইসলামী আন্দোলনের উপর যে ভয়াবহ জুলুম নির্যাতন চালানো হচ্ছে তা দেখে এবং বস্তু বাদী সভ্যতার চোখ ধাঁধানো উন্নতি দেখে, আমাদের মনের কোনায় বিন্দুমাত্র সন্দেহর স্থান দেওয়া জায়েজ নয়।বাতিল যতই শক্তি শালী হোক না কেন এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না।সমস্যা সমাধানের শক্তি, সত্যের শক্তিতে নিহিত। এবং এর প্রতিরোধ শক্তি কিভাবে কার্যকর হচ্ছে তার মধ্যে।
আমরা একা নই। আমাদের সাথে আছে প্রকৃতিকে সৃষ্টি কারী এবং এর রক্ষা কারী। মানুষের ফিতরাতের সৃষ্টিকারী এবং এই মহাবিশ্বকে সুন্দর করে পরিচালনা কারী। সভ্যতার চাইতে ফিতরাত অনেক বেশী শক্তিশালী, সভ্যতা ফিতরাতকে যতই কবু করতে চাহুক না কেন ফিতরাত
সব সময় তার নিজস্ব সত্তা নিয়ে টিকে থাকে। ফিতারাতের সাথে যখন সভ্যতার দ্বন্দ শুরু হয় তখন এই দ্বন্দ দীর্ঘ হোক বা স্বল্প সময়ের জন্য হোক না কেন বিজয় সর্বদায় ফিতরাতেরই হয়ে থাকে।

একটি বিষয়কে সব সময় আমাদের সামনে রাখতে হবে। ফিতরাতকে সকল প্রকার সমস্যা থেকে মুক্ত করে সমস্যা সৃষ্টিকারীর উপর এই ফিতরাতকে বিজয়ী করা একটি কঠিন, সমস্যা সংকুল এবং দীর্ঘ সংগ্রামের কাজ।এই জন্য আমাদের উচিত হল, পরিপূর্ণ এবং দীর্ঘ একটি সংগ্রামের রূপরেখা দাড় করা।
এই দ্বীনকে সকল দিনের উপর বিজয়ী করার জন্য আমাদেরকে সেই পরিকল্পনা করতে হবে।
আল্লাহকে ভালো করে চেনার মাধ্যমে এবং মযবুত ঈমানের মাধ্যমে আমরা আমাদের দ্বীনের বিজয় ছিনিয়ে আনতে পারব। আমরা যদি সত্যিকার অর্থে মহান আল্লাহ তায়ালাকে চিনতে না পারি তাহলে আমরা সত্যিকার অর্থে ঈমানদার হতে পারব না। একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদাতের মাধ্যমে আমরা আমাদের ঈমানের স্তরকে উন্নত করতে পারি। আমরা যদি সত্যিকার ভাবে তার ইবাদত না করি তাহলে আমরা তাকে পরিপূর্ণভাবে চিনতে পারব না।
আমরা যদি আমরা আমাদের পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে ভালোভাবে বুঝতে পারি এবং আমাদের যুগজিজ্ঞাসার জবাবকে উত্তম ভাবে পেতে পারি তাহলে আমরা তাকে উন্নীত করতে পারব। আল্লাহ সেই ব্যক্তির উপর রহম করুন যিনি তার সময়কে চিনেছেন এবং সেই পথের উপর অবিচল থেকেছেন।
আমাদের উচিত হল আমাদের বর্তমান সময়ের সভ্যতা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ভালোভাবে জানা। আমরা যদি এই সংস্কৃতি এবং সভ্যতাকে ভালভাবে জানতে না পারি তাহলে আমরা এটাকে ঢেলে সাজাতে পারব না। আমরা যদি অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান দিয়ে তাকে পরিপূর্ণ ভাবে বুঝতে না পারি তাহলে আমরা তার থেকে কোনটা গ্রহন করব আর কোনটা ছেড়ে দিব সে সম্পর্কে কোন সিন্ধান্ত নিতে পারব না। কেননা পছন্দ করার শক্তি কেবল মাত্র জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করার মাধ্যমেই সম্ভব।
পরিবর্তিত সময়ে এবং পরিস্থিতিতে মানুষের কি প্রয়োজন সেটাকে ভালো ভাবে উপলব্ধি করতে হবে এবং মানব জীবনের চরিত্র সম্পর্কে জেনে সেটাকে আমরা উন্নত করতে পারব। এই ভাবে এই বাতিল সভ্যতার যেটাকে ছুড়ে ফেলতে হবে সেটা আমরা ছুড়ে ফেলে দিব আর যেটা আমাদের সভ্যতা ও ফিতরাতের সাথে সঙ্গতি পূর্ণ সেটাকে আমরা গ্রহন করব।
এটা এক কঠিন সংগ্রাম, এটা এক দীর্ঘ সংগ্রাম, কিন্তু এটাই আসল এবং সত্যিকারের সংগ্রাম।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সাথে আছেন।
وَاللَّهُ غَالِبٌ عَلَىٰ أَمْرِهِ وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ
আল্লাহ তাঁর কাজ সম্পন্ন করেই থাকেন, কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না৷ (ইউসুফ ২১)
এই লেখাটি শহীদ সাঈদ কুতুব (রঃ) বিখ্যাত গ্রন্থ “আগামীর দিন ইসলামের” গ্রন্থের একটি প্রবন্ধের অনুবাদ।

Leave a Reply