ওহাবিবাদ এবং সৌদি পেট্রো রিয়াল ফিতনা।

ওহাবিবাদ এবং সৌদি পেট্রো রিয়াল ফিতনা।

আজকের লেখাটা লেখার চিন্তা করছিলাম গত রমজান মাস থেকে। শিরোনাম দেয়ার একটা ইচ্ছা ছিল “তারাবীর নামাজ কত রাকাত পড়েছেন”। তারাবীর নামাজ ৮ রাকাত নাকি ২০ রাকাত এ নিয়ে গত বছর বা এর আগের কয়েক বছর থেকে যে ফিতনা দেখে আসছিলাম। তারপর দেখে আসছিলাম আমিন জোরে বলা আস্তে বলা, নাভির নীচে হাত বাধবেন নাকি উপরে, তার উপর তো আছে কেয়াম বেকেয়াম, দাঁড়িয়ে মিলাদ নাকি বসে মিলাদ, মিলাদ না দুরুদ। দোয়াল্লিন আর জোয়াল্লিন এর আরেক জ্বালা তো আছেই।  এক হুজুর আরেক হুজুর কে গালাগালি,  আর কান ধরে, গলা ধাক্কা দিয়ে মসজিদ থেকে বের করে দেয়ার হুমকি। অপরদিকে এক আলেম বেশধারী আরেক আলেম বেশধারীকে ইহুদীর দালাল ইত্যাদি বলে গালাগাল আমরা সবাই দেখেছি এবং শুনেছি। অবস্থা এত নীচে গেছে যে এই মুলভিরা একজন আরেকজনকে লুচ্চা, বাটপার, বলে গালি দিতেও লজ্জা করেনি। বাংলাদেশ কি হচ্ছে তা সম্ভবত কাউকে ব্যাখ্যা করে বলার প্রয়োজন নেই। কিছু একটা হলেই গালাগালি, এক গ্রুপ আরেক গ্রুপকে। 

সমস্যাটা কিন্তু আসলে তারাবীর নামাজ কত রাকাত, কিংবা আমিন জোরে বলা বা আস্তে বলা, চাঁদ দেখা লোকাল মুন সাইটিং নাকি গ্লোবাল, কিংবা মিলাদ কেয়াম নিয়ে নয়, সমস্যাটা অন্য জায়গায়। আজ সে বিষয়েই একটু আলোচনা করবো। 

আমি ফিকাহ এবং উসুলে ফিকাহর গুরুত্ব সম্পর্কে অনেক দিন থেকে লিখে আসছি। বলা বাহুল্য আজ থেকে প্রায় সিকি শতাব্দী আগে (১৯৯৫ সালে) মালয়েশিয়ার ইন্টেরন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভারসিটিতে আমার থিসিস ছিল প্রাসঙ্গিক আধুনিক যুগে শরিয়া আইনের প্রায়গিক প্রেক্ষাপটে, এবং এর উপর আমার একটি বই আছে “Shari’ah: the misunderstood and misinterpreted notion” এই শিরোনামে যা আমাজনে (amazon.com) পাওয়া যায়।  

আমার একই প্রাসঙ্গিক বিষয়ে লেখার প্রেক্ষাপটে প্রায় বছর খানেক আগে ছোট্ট একটি লেখায় ওহাবিবাদ নিয়ে সামান্য একটু লিখেছিলাম, যেখানে মন্তব্য করেছিলাম ওহাবিবাদ হল আজকের যুগের সবচেয়ে বড় ফিতনা। তখন স্বভাবতই আমার বেশ কিছু বন্ধু বান্ধব এবং স্বজন চমকে উঠেছিলেন। অনেকে মন্তব্য করেছিলেন, প্রশ্ন করেছিলেন। আমার আবাল্য ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং সহপাঠী ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগ্য প্রফেসর আহসান উল্লাহ ফয়সাল এবং বন্ধুবর  প্রিন্সিপ্যাল এনামুল হক সহ অনেকে প্রশ্ন করেছিলেন, আমরা যতদূর জানি ওহাবিবাদ তো দ্বীনের সংস্কারেরই কাজ করেছেন, তাহলে আমি হঠাত কেন ওহাবি বাদের সমালোচনায় নামলাম। তখন আমি সে সময় সংক্ষিপ্ত যে উত্তর দিয়েছিলাম, আমি জানতাম সে উত্তর যথেষ্ট ছিলোনা, তবে বলেছিলাম সময় পেলে এ ব্যাপারে লিখব। আজ এ ব্যাপারে দুকলম লেখার অভিপ্রায় করছি ইনশাআল্লাহ। 

ওহাবি বাদ বলতে আসলে কিছু আছে নাকি? পৃথিবীতে এমন কেউ আছেন যিনি নিজেকে ওহাবি বলে দাবী করেন? না, আমার জানা মতে পৃথিবীতে এমন কোন ব্যাক্তি বা গ্রুপ নাই যিনি বা যারা নিজকে বা নিজের দল বা গ্রুপকে ওহাবি বলে দাবী করেন। তাছাড়া ওহাবি বলতে সুনির্দিষ্ট গ্রুপ ও কিন্তু পাওয়া যাবে না। যদিও এটা ঠিক ওহাবি পরিভাষাটির ব্যাবহার আছে । কিন্তু কে যে কাকে ওহাবি বলেন তা সুনির্দিষ্ট করা কঠিন। এবং সে আলোচনায় যাওয়ার প্রয়োজন বা ইচ্ছা আমার নাই, এবং আজকে প্রয়োজন আছে বলেও মনে করিনা। তাহলে প্রশ্ন করবেন, আমি কেন এটা ব্যাবহার করলাম, এবং ওহাবিবাদকে সমস্যা হিসাবে উল্লেখ করলাম। আসলে ব্যাপারটা সিম্বোলিক। বাংলায় একটা কথা আছে “কান ধরলে মাথা আসে” অর্থাৎ কোন কোন সময় আমরা যদি মাথা ধরতে চেয়ে ও মাথার নাগাল না পাই তখন কান ধরে টান দিলে মাথায় টান পড়ে। যেমন বাংলাদেশে কেউ যদি জামাতের উপর ক্ষিপ্ত হন তখন জামাতকে মওদুদিবাদ বলে খোঁচা মারেন। যদিও প্রকৃত অর্থে জামাত কখনো নিজেদেরকে মওদুদিবাদ বলে মনে করেন না বা দাবী করেন না। তবে না, আমি যে ওহাবি মতবাদ জাতীয় কারো উপর ক্ষিপ্ত হয়েছিলাম ব্যাপারটা তাও নয়। 

ব্যপারটাতে কিছু অস্পষ্ট বিষয় আছে তাই নিনামা বা অজ্ঞাত এক অসুরকে ঠেলা দিয়েই শুরু করলাম। 

তবে এর সাথে সৌদি রাজতন্ত্রের পেট্রো ডলারের তেলেসমাতি যে রয়েছে সে জন্য ওহাবিবাদ শব্দটা ব্যাবহার একেবার‍্য অযৌক্তিক হবে না। এখানে ওহাবি বলতে আমি  রাজতন্ত্রবাদি সৌদি পেট্রো রিয়ালকে বুঝাতে চেয়েছি সে কথা বললে একেবারে অত্যুক্তি হবে না। 

আমরা যদি সমাজ বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে যাই, যে কোন সমস্যা সমাধানের জন্য সমস্যার উৎসের মূলে যেতে হবে। সমস্যাটা আসলে আসছে কোথা থেকে। রোগের উৎস বের করতে না পারলে পৃথিবীর সকল ঔষধ দিলে ও কোন কাজ হবে না। যে কোন সমস্যান মূল কারণ বা রুট কজ ( Root cause)  বের করতে হবে। 

বাংলাদেশের এই সমস্যাগুলোর পেছনে কারণটা কি। হ্যাঁ কারণ অনেকগুলো পাওয়া যাবে। যেমন জ্ঞানের অভাব আছে, মুল্যবোধের অভাব, জাতীয় নৈতিক অধঃপতন, তবে সবচেয়ে বর কারণ বা উৎস হল এই ফিতনাগুলো ছড়ানোর পেছনে রিয়াল (সৌদি মুদ্রা) আর পেট্রডলারের কেরামতি । 

বাংলাদেশে কিছু মানুষ হঠাত যে আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ শুধু নয় বটগাছ হয়ে গেছেন তাঁর পেছনে কেরামতিটা কি। একথা অনেকেরই জানা বাংলাদেশে অনেকেই প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে সৌদি আরবের সরাসরি বেতনভুক্ত কিংবা বিভিন্ন প্রজেক্টের মাধ্যমে অর্থ আয় করেন আর আর ধর্মীয় ওয়াজ নসিহতের নামে এসব বিতর্ক এবং ফিতনা অনেক ক্ষেত্রে সৌদি বেতনভুক এসব বক্তারাই সৃষ্টি করেন। 

প্রথমেই আসুন তারাবীর প্রসঙ্গে। তারাবীর নামাজ আসলে কত রাকাত? তারাবীর নামাজটাই বা কি? ৮ রাকাত না ২০ রাকাত এই মারামারি আর গালাগালি করার চেয়ে আমি যদি তারাবী নাই পড়ি তাহলে কি কবিরা গুনাহ, শিরক বেদাত করে ফেলব? ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাব? কিংবা আমি যদি সারা রাত ৩০-৪০ রাকাত পড়ি আমার কি গুনাহ হবে?

প্রশ্ন হল, হঠাত বাংলাদেশে এই সমস্যা এত বড় আকারে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল কেন। শত শত কিংবা হাজার বছর ধরে বাংলাদেশে যেহেতু হানাফি মাজহাবের অনুসারী বেশি,  বাংলাদেশ হানাফি মাজহাবের মসজিদ্গুলুতে ২০ রাকাত তারাবী পড়া হয়ে আসছে শত শত বছর ধরে, খতমে তারাবী হয়ে আসছে, অপরদিকে আহলে হাদিস মসজিদগুলোতে ৮ রাকাত তারাবী পড়া য়ে আসছে। শত বছরেও কোন ফিতনা হয়নি এখন কেন সৃষ্টি হচ্ছে?

কোন মসজিদে তারাবী যদি ২০ রাকাত পড়া হয়, মুসুল্লিরা যদি ২০ রাকাত তারাবী পড়েন আপনি ৮ রাকাত পড়তে চাইলে যে মসজিদে ৮ রাকাত পড়া হয় সেখানে জান, বা এই মসজিদে মসজিদের মুসুল্লি হলে আপনি যদি ৮ রাকাত পড়তে চান, পড়ুন,তারপর চলে জান, অন্যরা বাধা দিবে কেন? আবার অন্যরা যদি ২০ রাকাত পড়তে চান আপনি মাথা ঘামাবেন কেন। 

গত কয়েক বছরে আব্বাসি, মাদানি, ইউসুফি আজহারি অনেকের অনেক ওয়াজ আওয়াজ আমরা শুনে আসছি, দেখে আসছি কোরআনের একই আয়াত, একই হাদিসকে একেক জন একেকভাবে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। যার যার মতবাদ অনুযায়ী ব্যাখ্যা করছেন। এই সমস্ত ব্যাখ্যা এবং অপব্যাখ্যা সীমা ছাড়িয়ে গেছে। একজন লম্বা দাঁড়ি লম্বা জুব্বা ওয়ালা বক্তা যদি হাজার হাজার মানুষের সামনে স্টেজে বসে আরেকজন বক্তাকে লক্ষ্য করে যদি লুচ্চা আর বাটপার বলতে পারেন তাহলে এরা যে কত নীচে নেমেছে সেটা বলার বা বুঝার কোন কিছু বাকি নাই।

আজকের আলোচনার  অংশ হিসাবে একটা মোলিক প্রশ্ন এবং এর উত্তর আমাদেরকে জানতে হবে। প্রশ্নটা হলো,  মাজহাব মানা কি ফরয। হ্যাঁ  এটা একটা মোলিক প্রশ্ন। তবে কোন মাজহাবের কথা বলছেন? ইসলামে স্বীকৃত সেই চার মাজহাবের কথাই তো। গতকাল মতিউর রহমান মাদানির একটা আলোচনা শুনছিলাম, সেখানে তিনি বলেছেন মাজহাব মানার কথা নাকি আজকালকার মোল্লারা বলছেন। না, মতিউর রহমান সাহেব আপনার কথাটা ঠিক নয়, আপনি জানেন এবং স্বীকার ও করবেন মাজহাব এসেছে এবং অনুসরণ করা হয়ে আসছে এক হাজার বা বার শত বছর ধরে। 

হ্যাঁ, মাজহাব মানা কি ফরজ? এ প্রশ্নটা আজকের আলোচনার সাথে সংশ্লিষ্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন। 

এ প্রশ্নের উত্তর পাবার আগে আরও একটি প্রশ্ন জানা এবং বুঝা খুবই জরুরি। সে প্রশ্নটি হল, অজু করা কি ফরজ? না, অজু করা ফরজ নয়, চমকে উঠলেন না তো?  হ্যাঁ, শুধু অজুর জন্য অজু করা ফরজ নয়, তবে নামাজ পড়তে হলে অজু করা ফরজ। কথাটা ভাল করে বুঝুন, শুধুমাত্র অজু করা ফরজ নয়। কিন্তু নামাজ পড়তে হলে অজু করা ফরজ। এটাকে বলা হয় ইবাদতে গাইরে মাকসুদা। অজু করার জন্য অজু করা কোনও ইবাদত নয়, ইবাদত করার জন্য অজু করাটা ইবাদাত এবং ফরজ।

মাজহাব মানা ফরজ নয়, তবে কোরআন হাদিস নিজে না বুঝলে কারো সাহায্য নিয়ে কোরান হাদিস বুঝা ফরজ। আর একজন জ্ঞানী তথা ফকিহ এবং ইমামের সাহায্য নেয়াটাই মূলত মাজহাব। পৃথিবীর কোটি কোটি মুসলমান হাজার বছর ধরে এই মাজহাবই মেনে আসছেন। আপনারা যারা মাজহাবের বিরোধিতা করে ফিতনা সৃষ্টি করছেন, তাঁরাও কিন্তু নিজেরা চার মাজহাবের বাইরে আরও এক বা একাধিক মাজহাবের অনুসরণ এবং সৃষ্টি করছেন। আপনারা যে সব ইমাম বা ওলামাদের রেফারেন্স দিচ্ছেন তাঁরা সবাই কি সব মাসালার ব্যাপারে একমত ছিলেন। সাহাবায়ে কেরামের সবাই কি সব মাসালার ব্যাপারে একমত ছিলেন, সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে কি দ্বিমত ছিলনা? তাহলে সাহাবাদের যুগে মাজহাব ছিলনা তা বলবেন কিভাবে? ফিকহি বিষয়ে সাহাবাদের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল, তাবেঈদের মাঝে ছিল। এখনো ওলামায়ে কেরাম এবং ফোকাহাগন কেউ ইবনে আব্বাস আবার কেউ ইবনে মাসুদের মত গ্রহণ করেন। ওলামাদের ইজমা, ইজমায়ে উম্মাহ শরিয়তের উৎসের অংশ। 

এবং মজার ব্যাপার হল যারা মাজহাবের বিরুদ্ধে কথা বলছেন তাঁরাও কিন্তু একটা মাজহাব অনুসরণ করে আসছেন। তাঁরা হানাফি শাফেয়ী মালেকি হাম্বলি এই চার মাজহাবের কোনটা অনুসরণ করছেন না, কিন্তু তাঁরা অন্য মাজহাব অনুসরণ করছেন, সেটা আহলে হাদিস হতে পারে, কোন হাদিসের ইমাম হতে পারে কিংবা তাঁদের নফসের মাজহাব ও হতে পারে। নফসের মাজহাব হল যখন যে মাজহাবে যে মাসালা সহজ এবং সুবিধা একটু বেশি তখন সে মাসালা সে মাজহাব অনুসরণ করা সে অনুযায়ী হাদিস এনে দলিল দিয়ে তা জায়েজ করে নেয়া। 

মাজহাব অনুসরণ করা ফরজ নয় সে ব্যাক্তির জন্যই প্রযোজ্য হতে পারে যিনি কোরআন হাদিসের সকল উসুল জানেন, উসুলে তাফসির, উসুলে হাদিস, হাদিসের সকল প্রকার, যেমন সহি, হাসন, দইফ, মউজু/মউদু বা জাল হাদিস, ফিকাহ এবং উসুলে ফিকাহ জানেন, বালাগাত ফাসাহাত জানেন। আরবি ভাষার পণ্ডিত, আরবী ভাষার বিভিন্ন পরিভাষা বাগধারা বাগবিধি জানেন, আরবি সাহিত্যের পরিভাষা জানেন, তিনি দাবী করতে পারেন যে তার জন্য কোন মাজহাব অনুসরণ করা জরুরি নয়। কারণ তিনি ফিকাহ এর ইমামদের চেয়ে ভাল বোঝেন বা বুঝেছেন। 

আর আপনি যদি এই লেভেলের পণ্ডিত না হন তা হলে আপনি মূর্খের মতই মাজহাবের বিরোধিতা করছেন। কারণ আপনি যখন বলেন আমি কোরআন হাদিস মানব, কিন্তু আপনি তো নিজে কোরআন হাদিস বুঝেন না, আপনি অন্য একজনের অনুবাদ পড়ছেন। আর আপনি যদিও এই চার মাজহাবের অনুসারী নন কিন্তু আপনি ও আরেকটা মাজহাব অনুসরণ করছেন জেনে বুঝে হক কিংবা না জেনে না বুঝে হোক। সেটা হয়তো কোন পীর কিংবা শায়েখ, কিংবা আমীর, কিংবা দীনি ভাই। প্রত্যেকটি মানুষই মাজহাব অনুসরণ করে। কেউ তাদের পীরের মাজহাব, কেউ আমিরের মাজহাব, কেউ মুরুব্বিদের মাজহাব কেউ তাঁদের বুজুর্গদের মাজহাব, কেউ সংগঠনের মাজহাব অনুসরণ করেন। আপনি যে অনুবাদ নিয়ে লাফালাফি করছেন চিৎকার করে বেড়াচ্ছেন যে আপনি কোরান হাদিস মানেন আর কিছু মানেন না। জানতে পারি কি আপনার সেই কোরান হাদিস কোনটি। কে অনুবাদ করেছেন। কার অনুবাদ পড়ে লাফালাফি করছেন। আর আপনি যদি মনে করেন আপনি আরবি জানেন, আসলে আপনি কিছু শব্দের অর্থ  মুখস্ত করে নিয়েছেন মাত্র। কিন্তু একটা ভাষায় একটা শব্দের অনেক ধরনের অর্থ হতে পারে। অনেক পরিভাষা থাকতে পারে। সে পার্থক্য বুঝতে হলে সে ভাষার সাহিত্য সংস্কৃতি আরবি ভাষায় যেটা উসুলে হাদিস, উসুলে তাফসির, উসুলে ফিকাহ, বালাগাত ফাসাহাত, নাহু সারাফ, তাজ বীদ। 

ফিকাহর ইমামগণ ফিকাহ এর ইমামই। কেউ তাদেরকে নবীর মর্যাদা দেন না। এক ইমামের দেয়া মাসাঅ্যালার বাইরে আর কোন ইমামের মত গ্রহনযোগ্য নয় এমনটি কোন মাজহাবের কোন আলেম কিংবা সচেতন ব্যক্তি মনে করেন না বা করতে পারেন না। পৃথিবীর প্রতিটি দল গ্রুপ, ধর্ম, মতবাদে কিছু চরমপন্থি থাকে, যারা মূলত মূর্খতা আর অজ্ঞতার কারণেই শুধু নিজদের জগতেই বাস করেন আর সকলকেই পাপী বা জাহান্নামি ভাবেন। সব মাজহাবে যেমন এমন মূর্খ আছে লা মাজহাবীদের মাঝে এমন মূর্খ লোক আছেন। 

বাংলাদেশে মাজহাব বা হানাফিদের সাথে সাথে আহলে হাদিস ভাইদের কাজকর্ম শত শত বছর ধরে চলে আসছে। আমি ব্যাক্তিগত ভাবে অনেক সালাফি এবং আহলে হাদিস ভাইয়ের সাথে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। আহলে হাদিস এবং সালাফি ভাইদেরকে আমি ইসলাম অনুসরণের ক্ষেত্রে খুব সিরিয়াস দেখেছি। হাদিস কোরানকে অনুসরন করতে দেখেছি। সুতরাং এখানে সমস্যাটা আহলে হাদিস বা সালাফিদেরকে নিয়ে নয়। সমস্যাটা হল কিছু ব্যাক্তি বাড়াবাড়ি করছেন তাদেরকে নিয়ে। বাংলাদেশের একজন আলেম যখন আহলে হাদিস ভাইদেরকে আহলে খবিস বলে গালি দেন সেটা তিনি তার অজ্ঞতারই পরিচয় দেন। বাংলাদেশের এই ফিতনার জন্য আহলে হাদিস বা প্রকৃত সালাফি ভাইয়েরা দায়ী নন, দায়ী হল বিদেশি বেতনভুক অতি উৎসাহী, চরমপন্থি নব্য গজে উঠা আলেম বেশধারী ফিতনাবাজগন। যারা উসুলে তাফসির উসেলে হাদিস বা ফিকাহ, উসুলে ফিকাহ কিছুই জানেন না। 

আমার এই জীবনে প্রায় সকল ধরনের ইসলামপন্থি ভাইদের সাথে কাজ করার সুযোগ আল্লাহ পাক আমাকে করে দিয়েছেন। দেওবন্দি জামাতী, তাবলীগী,  সুফি, সালাফি, নকশবন্দি, বেরলভি, ফুলতলি, শরশিনা, চরমোনাই প্রায় সকলেরই ঘনিষ্ঠ হবার সুযোগ হয়েছে। বিদেশে সফর এবং বসবাসের সুবাদে আমার ঘনিষ্ঠতার এই পরিসর আরও বড় হয়েছে। 

আহলে হাদিসের আমার বেশ কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধু রয়েছেন, সহপাঠী ছিলেন অনেকেই। আমার একান্ত সহপাঠী, বন্ধুবর এমনকি খণ্ডকালিন রুমমেট ডঃ মাওলানা সামিউল হক ফারুকি বা এধরনের অনেকেই। তেমনি ভাবে সালাফিদের অনেকের সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা ছিল। ১৯৯৮-৯৯ এর দিকে  আমি যখন মিশিগানের এন আরবরে ছিলাম যেখানে  সৌদি ভিত্তিক সালাফিদের বেশ তৎপরতা ছিল,  IANA (Islamic Association of North America) তাদের একটা সংগঠন ছিল। এন আরবরে আমি স্কুল শিক্ষক থাকার কারণে এবং শিশু কিশোরদের সাথে আমার কাজ করার বেশ সুনাম ছিল। তখন সালাফিদের এ সংগঠন  সে বছর তাঁদের সম্মেলনে শিশু কিশোরদের কিছু তৎপরতায় তাদেরকে সহগিতার জন্য আমাকে তাঁদের সম্মেলনে নিয়ে গিয়েছিল।   

বাংলাদেশ একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশ। বাংলাদেশী মুসলমানদের বেশি ভাগি হানাফি মাজহাবের অনুসারী, বাংলাদেশের মত হানাফি মাজহাবের আরো অনুসারী আছেন তুরকিস্তান, বলকান, সিরিয়া  ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, উজবেকিস্তান,তাজিকিস্তান মিলিয়ে উত্তর পশ্চিম চীন, মধ্য এশিয়ার দেশগুলো মোটামুটি হানাফি মাজহাবের অনুসারী। মোটামুটি ভাবে বলা যায় যে দেশগুলো এক সময় ওসমানীয় খেলাফত বা অটোমান এম্পায়ার এবং মোগল সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল সে দেশগুলোর মুসলমানরা হানাফি মাজহাবের অনুসারী। এ ছাড়া সিরিয়া, ইরাক, লেবানন, জর্ডান সহ মধ্য প্রাচ্যের অনেক মুসলিম দেশে হানাফি মাজহাবের অনুসারী রয়েছে। অপরদিকে উত্তর আফ্রিকার দেশ গুলোতে মালেকি মাজহাবের অনুসারীদের সংখ্যা বেশি। মালয়েশিয়া ইন্দোনেশিয়াতে এবং পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলোতে শাফেয়ী মাজহাবের অনুসারী বেশি। সৌদি আরবে হাম্বলি মাজহাবের অনুসারী বেশি। 

পৃথিবীর কোন মানুষই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়, দোষ ক্রুটি নিয়েই মানুষ, এজন্যই আমি কোন মানুষকে মাথায় তোলারও পক্ষপাতী নই কিংবা কাউবে পায়ের নিচে ফেলার ও পক্ষপাতী নই। তবে বর্তমান বিশ্বে সৌদি আরব এবং সৌদি পেট্রো রিয়াল কিছু ফিতনার সৃষ্টি করছে যা দিবালোকের মত সত্য। বাংলাদেশে এই ফেতনাগুলোর নতুন করে সৃষ্টি করার পেছনে সৌদি পেট্রো ডলারের ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশে যারা এসব বিতর্কিত ওয়াজ করছেন তাঁরা অনেকেই প্রত্যক্ষ এবং পক্ষভবাবে সৌদি আরবের অর্থনৈতিকভাবে মদদপুস্ট। তাঁরাই ফিতনা গুলো নতুনভাবে সৃষ্টি করছেন।

কোন মাজহাবের পক্ষে ওকালতি করার ইচ্ছা আমার ছিলোনা কিংবা সেটা আমার মূল লক্ষ্য নয়। মাজহাব অনুসরণ করা সরাসরি ফরজ না হলেও শরিয়তের মাসআলা বুঝা ফরজ, সেটা বুঝার জন্য কোরান হাদিস জানেন বুঝেন এমন কারো শরণাপন্ন হয়ে কোরান হাদিস বুঝার চেষ্টা করা ফরজ। মাজহাব বা ইমামদেরকে অনুসরণ এতটুকুই।

বাংলাদেশের অধিকাংশ মুসলমান যেহেতু হানাফি, বাঙ্গালদেশি মুসলমানরা শত শত বছর ধরে তারাবীর নামাজ ২০ রাকাত পড়ে আসছে, তাঁরা যদি এখন ২০ রাকাত তারাবীর পড়ে তারাবীর মাধ্যমে কোরআন খতম দেয় আল্লার ওয়াস্তে তাদেরকে তাঁদের মত থাকতে দেন। তাদেরকে নতুন করে মুসলমান বানানোর চেষ্টা করবেন না।  নতুন করে ফিতনা সৃষ্টি করার কোন প্রয়োজন নাই। 

Leave a Reply