উসুল এবং ফিকহ প্রসঙ্গে

উসুল এবং ফিকহ প্রসঙ্গে

বেশ কিছুদিন আগে উসুল এবং উসুলে ফিকাহ প্রসঙ্গে লিখেছিলাম। 

এ ব্যপারটা নিয়ে এ মুহূর্তে আলোচনা একান্ত প্রয়োজন মনে করছি এ কারণে যে, আজকের যুগে ইউটুবের মাধ্যামে, ইউটিউবের অপব্যবহারে, যিনি-তিনি কোরআনের ব্যাখ্যা শুরু করেন, হাদিসের তাফসির শুরু করেন। যার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভুলে ভরা। আমি আগেও  লিখেছিলাম, উসুল না যেনে মন গড়া কিংবা নোট মুখস্ত করা তাফসির করা, ব্যাখ্যা করা শুধু ভুল নয়, জঘন্য এবং অন্যায়  । 

প্রথমেই আসা যাক উসুল, ফিকাহ কিংবা উসুলে ফিকাহ কি এ প্রশ্নে। কেনই বা এর এত গুরুত্ব। আসলে সংক্ষেপে বলতে এখানে চারটি মৌলিক বিজ্ঞান মূল তত্ত্ব বা ফাউন্ডেশন। উসুল এর খুব সহজ বাংলা অর্থ করা যেতে পারে ফাউন্ডেশন বা ভিত্তি। চারটি মূল ভিত্তি বলতে, প্রথমটা হল কুরানের তত্ত্ব বা উসুল তাফসীর এবং উলুম আল কুরআন, দ্বিতীয়টি হল উসুল আল হাদিস, তৃতীয়টি হল ফিকহ আর চতুর্থটি হলও উসুল আল ফিকহ। এগুলো নিয়ে একদিনে বিস্তারিত পরিসরে আলোচনা করতে গেলে মাথা গুলিয়ে যাবে। তাই, চেষ্টা করবো যতোটা সহজে সংক্ষেপে আলোচনা কড়া যায়। তাই আজকের আলোচনায় মূলত ফিকাহ সম্পর্কে কথা বলব আর প্রাসঙ্গিক উসুলে ফিকাহ। 

ফিকাহ শব্দকে সরাসরি বাংলায় অনুবাদ করা কঠিন। বুঝ, সমজ, বুদ্ধিমত্তা এই সকল অর্থের মাঝে “প্রজ্ঞা” শব্দটিকে সবচে অর্থবহ বলে মনে হতে পারে। সহজ বাংলা অর্থ হল ‘গভীর অনুধাবনের মাধ্যমে কিছু বুঝা’।

পবিত্র কোরানের সুরা আরাফে এই ফিকাহ সম্পর্কে আল্লাহ বলছেন,   لَهُمْ قُلُوبٌ لَّا يَفْقَهُونَ بِهَا

অর্থাৎ তাদের কালব বা অন্তর আছে কিন্তু তারা সে অন্তর দিয়ে বুঝেনা । তাতে বুঝা গেল, ফিকাহ এর বুঝাটা যেই সেই বুঝা নয়,হৃদয়ঙ্গম করে ভাল করে বুঝা। তাফসীরে তাবারী উপরোক্ত আয়াতের প্রসঙ্গে বলেছেন তারা বুঝেনা অর্থ হল অর্থাৎ তারা চিন্তা বা ফিকির করেনা। (قلوب لا يتفكرون بها)  তাবারী  ফিকির শব্দ ব্যাবহার করেছেন। অর্থাৎ ভাল করে বুঝতে হলে চিন্তা করতে হয়। ইমাম শাফেয়ী এবং ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি উভয়েই ফিকাহ সম্পর্কে গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন ফিকাহ হল العلم بأحكام الشريعة অর্থাৎ ফিকাহ হল শরিয়তের হুকুম আহকামের জ্ঞান। 

ইমাম গাযালি রহঃ বলেছেন ফিকাহ হল শারিয়াহ সম্পর্কে আপনার জ্ঞানের অভিব্যাক্তি বা বহি প্রকাশ। অর্থাৎ ফিকাহ দ্বারাই বুঝা যাবে দ্বীন বা শরিয়া সম্পর্কে আপনার জ্ঞান কতটুকু আছে। 

ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন বলেছেন ফিকাহ হল আল্লাহর আইন সমূহের জ্ঞান। 

সুরা তাওবার ১২২ নম্বর আয়াতে আয়াতে আল্লাহর দ্বীনকে বুঝার জন্য ফিকহের অসীম গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। 

উভয় বুখারি এবং মুসলিম শরিফে একটি হাদিস বর্ণনা করা হয়েছে যা হজরত মুয়াবিয়া রা কর্তৃক বর্ণিত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম বলেছেন। “আল্লাহ পাক যদি কার কল্যাণ চান তবে তাঁকে  দ্বীনের ফিকাহ দান করেন। দ্বীনের সমজ দান করেন। ““”من يرد الله به خيراً يفقهه في الدين

হাদিস শরিফে এসেছে একদিন নবী করিম সাঃ তড়িৎ বাথরুমে গেলেন কিন্তু সাথে পানির বদনা বা লোটা নিয়ে যাননি, তখন একজন তরুন সাহাবি (রেওওায়েত  মতে তিনি ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস), একটা লোটা বা বদনা পানি পূর্ণ করে বাথরুমের কাছে নিয়ে রেখে আসেন। রাসুল সাঃ বাথরুম থেকে বের হয়ে জানতে চাইলেন কে করেছে এই বুদ্ধিমত্তার কাজ, উত্তর শুনে তিনি দোয়া করেছিলেন “ اللهم فقهه في الدين.”

হে আল্লাহ তুমি তাকে দ্বীনের ফিকাহ দান কর। দ্বীনের প্রজ্ঞা দান কর। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের এই কাজটা নিঃসন্দেহে একটি বুধিমত্তার কাজ এবং প্রজ্ঞার পরিচায়ক।  

অন্য একটি হাদিস রয়েছে যাতে বলা হয়েছে (خيارهم في الجاهلية خيارهم في الإسلام إذا فقهوا.)

যারা ইসলাম গ্রহণ করে জাহেলইয়াতে যারা ভাল তারা ইসলামে এসে ভাল যদি ফিকাহ অর্জন করে। 

কোরান হাদিসকে বুঝা, এবং সে অনুযায়ী শরিয়তের নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে যুগে যুগে ওলামায়ে কেরাম এবং ফোকাহাগন অনেকগুলু মানদণ্ড এবং নীতিমালা প্রণয়ন করে রেখে গিয়েছেন। ইমাম আবু হানিফা রাহ একটা মানদণ্ডে জোর দিয়েছেন সেটা ইমাম আবু হানিফাহ রাহ ভাষায় বলা হয়েছে “ইসতিহসান”। ইসতিহসান এর অর্থ হল, সর্বোত্তম, বা কল্যাণময়। অর্থাৎ কোরআন হাদিসের ব্যাখ্যা কিংবা শরিয়েতের নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে মানবকল্যান কে প্রাধান্য দিতে হবে। অপরদিকে ইমাম শাফেয়ী রাহঃ  ইমাম আবু হানিফার পরিভাষাকে গ্রহন না করে তিনি তাঁর  মোলিক গ্রন্থ ‘আর রিসালাহ’ কিতাবে নতুন পরিভাষা ব্যাবহার করেছেন তা হল “ইসতিসলাহ” যেটার বাংলা অনুবাদ হতে পারে সমস্যা “সমাধান”। ইমাম গাযালি এবং ইমাম মালেক সহ অন্য অনেক ইমামগণ “মাসলাহা আল মুরসালাহ” নামে আরও একটি পরিভাষা ব্যাবহার করেছেন। ইমাম আবু হানিফার ব্যাবহৃত পরিভাষা ইসতিহসানের সাথে যুক্তি বা তাঁর ভাষায় “ইল্লাহ” অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। উপমহাদেশের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস এবং আলেম শাহ ওয়ালি উল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী রহঃ তাঁর বিখ্যাত কিতাব “হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ” গ্রন্থে “ইল্লাহ” বা যুক্তির উপর ব্যাপক আলচনা করেছেন এবং গুরুত্ব দিয়েছেন। 

এবার একটু যুক্তির বিচারে বুঝা যাক, ফিকাহ বা উসুল জানা কেন প্রয়োজন। পৃথিবীর কোন ভাষাকেই সে ভাষার সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং পরিভাষা জানা ছাড়া সঠিক অনুবাদ করা সম্ভব নয়। প্রতিটি ভাষাতেই একটি শব্দের একাধিক অর্থ হতে পারে। একেক শব্দের অর্থ ব্যাবহার অনুযায়ী ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে। 

বাংলা ভাষায় ‘হাত’ শব্দের অনেকগুলো অর্থ রয়েছে। কার সাথে কার “হাত আছে” সেখানে হাতের যে অর্থ আবার কেউ কাউকে “এক হাত দেখিয়ে দেয়া” বলা হলে সে হাতের অর্থ দাঁড়ায় ভিন্ন। কিংবা কারো  “মাথায় হাতছানি” দেয়ার অর্থ অন্য একটি। বাংলা বাঘধারা “অনুরোধে ঢেঁকি গেলা” এর অর্থ এই নয় যে কেউ সত্যি সত্যি ঢেঁকি গিলছে। কিংবা “অমাবস্যার চাঁদ” বলতে কেউ কোনদিন অমাবস্যায় চাঁদ উঠেছে বুঝান না। 

এ জন্য আমরা দেখি কোরান হাদিসের শব্দ ব্যাবহারের মর্মার্থ বুঝার জন্য ফিকাহবিদ বা মুফাসসিরগন শানে নুযূল, সাহাবিদের সময়কার তাফসির, সে সময়ের সাহিত্য, এমনকি কখন কখনো প্রাচীন আরবি সাহিত্যে ইমরুল কাইস বা মুতানাব্বির কবিতার উদাহরণ টেনেছেন। একটা শব্দ কি কি অর্থ বহন করে, এই আয়াতের সমর্থনে আর কি আয়াত বা হাদিস রয়েছে, কোরান বুঝার ক্ষেত্রে শানে নুযূল বা ঐ আয়াত নাজিলের প্রেক্ষাপট, জানা জরুরি মনে করেছেন। তেমনি ভাবে হাদিস বুঝার ক্ষেত্রে শানে উরুদ বা হাদিসের সময় এবং প্রেক্ষাপট জানা। উদাহরণ স্বরূপ আমরা জানি হাদিসের জিবরীল এবং হাদিসে ওয়াফদে আব্দুল কাইসএর হাদিসে নবী করিম সাঃ ইসলামের সংজ্ঞায় দু রকম সংজ্ঞা দিয়েছেন। সেটাও ছিল প্রেক্ষাপট। আব্দুল কাইস গোত্রের কি প্রয়োজন ছিল সে অনুযায়ী নবী করিম সাঃ উত্তর দিয়েছিলেন। অনেক সময় রাসুল সাঃ একই প্রশ্নের উত্তর দুজনকে দুভাবে দিয়েছেন তাঁদের সময় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী। কোন সাহাবিকে মায়ের সেবার উপর জোর দিয়েছেন, কাউকে রাগ দমনের উপর জোর দিয়েছে। এভাবে হাজারো উদাহরণ পাওয়া যাবে। 

পবিত্র কুরানের আয়াতের ক্ষেত্রে অনেকগুলো নীতিমালা রয়েছে। উসুলে ফিকাহ বা উসুল না জেনে শুধুমাত্র টেক্সট বা ভাষা দেখে কোন কোন আয়াত বা হাদিস বুঝা সম্ভব নয়। অনেক ক্ষেত্রেই ওলামা এবং ফোকাহাদের আলোচনা পর্যালোচনার পর তারা একটা অনুবাদ বা ব্যাখ্যায় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আমরা সে অনুবাদই দেখি।  যেমন উদাহরণ স্বরূপ, শুধুমাত্র টেক্সট বা শব্দ দেখে পবিত্র কোরানের সুরা বাকারার ২২৮ নম্বর আয়াতে “কুরু” শব্দের অর্থ কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। যারা উসুলে ফিকাহ পড়েছেন তারা জানেন এই একটি মাত্র শব্দ “কুরু” শব্দটি সঠিক অর্থ বের করতে ইমাম আবু হানিফাহ, আবু ইউসুফ, শাফেয়ী বা অন্যান্য ইমামদের মধ্যে কত গভীর এবং সুচিন্তিত আলোচনা পর্যালোচনা হয়েছে। 

শুধু তাই নয়, আরবি ভাষা সবচে সংক্ষিপ্ত পরিসরে লিখিত ভাষাগুলোর অন্যতম, অথচ যা গভীর অর্থ বহন করে। আপনি একটা বাক্য বা প্যরাগ্রাফ আরবিসহ পাশাপাশি বা উপর নীচ করে কয়েকটি ভাষায় অনুবাদ করলে দেখবেন যে আরবি ভাষা সবচে কম স্থান দখল করে। আরবি ভাষায় একটি অক্ষর না লিখে তার মাথাটা ব্যাবহার করেই লেখা হয়। এমনকি সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল জবর যের বা ধাম্মা কাসরাহ না লিখে ও পড়তে হয় এবং এই অলিখিত জবর জেরের কারণে অর্থের পার্থক্য হয়ে যেতে পারে রাত দিন। শুধুমাত্র স্বরবর্ণ ব্যাবহার করেই অর্থের অনেক হেরফের কড়া যায়, যা অন্য কোন ভাষাতে সম্ভব নয়, উদাহরণ স্বরূপ কোরানের যে আয়াতের ভিত্তিতে আমরা অজু করি এবং সে অজু দিয়ে নামাজ পড়ি। সুরা মায়েদার ৬ নম্বর আয়াতে “আরজুলাকুম” শব্দটিকে “আরজুলাকুম” এর বদলে আরজুলেকুম পড়লে অর্থ কি দাঁড়াবে। আর আরজুলাকুম ই বা কেন পড়বেন? আরজুলাকুম এর ওয়াও অক্ষরটির “আতফ” কোথায় হবে সেটা নিয়েই আসল প্রশ্ন। 

আন নাহলের ৬৮ নম্বর আয়াতের অনুবাদ বা ব্যাখ্যায় উসুল না জেনে অহি শব্দের ভুল অর্থ করতে পারেন।  

কোরান হাদিস বুঝা ক্ষেত্রে এবং তাঁর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে শরিয়তের মাসালাম মাসায়েল প্রণয়নে যুগ যুগ থেকে ওলামায়ে কেয়ারম উসুলে ফিকাহের কিছু নিতিমাল নিতিমাল প্রণয়ন করেছেন। যে নীতিগুলো সর্বজন গৃহীত। অর্থাৎ মাসালা মাসাএলের বিষয়ে মাজহাবে মাজহাবে মতপার্থক্য বা বিতর্ক রয়েছে কিন্তু উসুলের এই নীতিমালার ব্যাপারে সকল ইমাম ফকিহ এবং আলেমদেরই অবদান এবং স্বীকৃতি রয়েছে, একদিকে ওলামায়ে দেওবন্দ বা দেওবান্দি সিলিসিলার আলেমগণ এসব উসুলই কিতাব প্রণয়নে ভূমিকা রেখেছেন অপরদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বা আল আজহার কিংবা মদিনা, কিংবা উম্মুল কুরা ভিত্তিক উলামাগন ও এসব উসুলে ভূমিকা রেখেছেন। বিশ্ব খ্যাত আলেমে দীন আল্লামা ইউসুফ আল কারজাভি রাহ এই উসুলের উপর অনেকগুলু কিতাব লিখেছেন এর অন্যতম হল   كيف نتعامل مع القرآن العظيم

প্রায় একই শিরনামে আরেকটি কিতাব লিখেছেন মোহাম্মাদ আল গাযালি كيف نتعامل مع القرآن

ইউসুফ আল কারজাভির আরেকটি কিতাব আছে উসুলে হাদিসের উপর كيف نتعامل مع السنة النبوية

এছাড়া উসুল তথা উসুলে হাদিস এবং উসুলে ফিকাহ এর উপর ডক্টর তাহা জাবের আলোয়ানির অনেকগুলো কিতাব রয়েছে। হানাফি ওলামা কিংবা ওলামায়ে দেওবন্দের ও উসুলের উপর অনেকগুলো কিতাব রয়েছে, এবং এর অনেক গুলো কাওমি মাদ্রাসাগুলোতে পড়ানো হয়ে থাকে। যেমন আল মানার, নুরুল আনঅওার, উসুলে শাসি প্রমুখ। উপরে যে  আরবী কিতাবগুলোর নাম ব্যাবহার করা হয়েছে কিংবা নীচে কিছু ফিকহি পরিভাষা ব্যবহার কর হয়েছে যার কোনটিতেই কিন্তু হারাকাত বা জবর যের বা স্বরবর্ণ  ব্যাবহার করা হয়নি, অথচ প্রতিটি শব্দই কিন্তু হারাকাত দিয়েই পড়া হবে এবং ভিন্ন হরকত দিয়ে পড়লে ভুল হবে। অর্থের বিকৃতি ঘটতে পারে।

আরবি ভাষায় শরিয়তি বিষয়ের নিয়ম নীতির জন্য রয়েছে উসুল। উসুলে তাফসীর, উসুলে হাদিস, উসুলে ফিকাহ। অপরদিকে ইসলামী শরিয়ার নীতিমালা ছাড়াও আরবি ভাষার পাণ্ডিত্যের রয়েছে আরও কিছু নীতিমালা যেগুলোকে বলা হয় “বালাগাত এবং ফাসাহাত”। যেগুলো আরবি ভাষার পাণ্ডিত্যের সাথে জড়িত। যেটার আরবি ভাষার সাহিত্য নিয়ে মূলত সম্পৃক্ত। আরবি ভাষার ব্যাকরণের জন্য রয়েছে ইলম আন নাহু, আর শব্দ বিন্যাস এবং শব্দ প্রয়োগে বিজ্ঞানের জন্য রয়েছে “ইলম আল সারফ”। অপরদিকে আরবি উচ্চারণবিধি এবং ছন্দ বিন্যাসের জন্য রয়েছে “ইলম আল তাজবিদ”। বালাগাত, ফাসাহাত, ইলম নাহু, ইলম আল সারফ কিংবা ইলম আল তাজবীদ বিষয়গুলো যদিও সরাসরি ইসলামী শরিয়ার সাথে সম্পৃক্ত নয় কিংবা শর্তযুক্ত নয় তথাপি এগুলো ছাড়া ইসলামী শরিয়ার প্রায়গিক দিক সম্ভব নয়। অজু নিজে ইবাদাত না হলেও নামাজ পড়ার জন্য যেমন অজু ফরজ তেমনিভাবে ইসলামী শরিয়ায়র মূল সূত্র কোরান হাদিস বুঝার জন্য এই ইলমগুলো জরুরি। উজু সহি না হলে কেরাত যত ভালই হোক নামাজ হবেনা, তেমনিভাবে ইবাদাতে গাইরে মাকসুদার বিষয়গুলা ঠিকমত না হলে মাকসুদ ইবাদাতগুলো সহি হবে না। 

উসুলের ফরি’ অর্থাৎ শাখাগত কিছু বিষয়ে হানাফি আলেমগণ এবং মালেকি মাজহাবের আলেম গনের মধ্যে কিংবা দেওবন্দি এবং নন দেওবন্দি আলেমদের মধ্যে কিছু মত পার্থক্য আছে তবে ‘আসলি’ বা মৌলিক বিষয়ে সবাই একমত এবং এই উসুল গুলো তৈরি করার ক্ষেত্রে সবাই ভূমিকা রেখেছেন। 

উসুলে ফিকাহ এর কিছু বিষয় অতি সংক্ষিপ্ত আকারে নিন্মরূপঃ 

আমরা সবাই জানি বা জানার কথা ইসলামী শরিয়ার মূল উৎসগুলো হচ্ছে (১) কোরান (২) সুন্নাহ বা হাদিস (৩) ইজমা এবং (৪) কিয়াস 

কোরানের আয়াত কিংবা হাদিস কিংবা  নিঃসৃত শরিয়ার আহকামগুলো বুঝা এবং প্রয়োগ বিচারে চারটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়েছে।

১ প্রথম হল আরবি ভাষা ব্যকরন, এবং ছান্দিক প্রেক্ষাপটে। এই প্রেক্ষাপটে এটি আবার ৪ প্রকার: 

(১) নির্দিষ্ট (خاص)

(২) সাধারণ (عام)

(৩) কমন ( مشترك)

(৪) অনুমোদিত (مؤول)

অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট বিষয়টি কি একটি বিষয়কে বুঝান হয় না কি একাধিক বিষয়, সেটা বুঝার জন্য কোন ব্যখার প্রয়োজন আছে কিনা। 

২) দ্বিতীয় হল বর্ণনার দিক থেকে। অর্থাৎ অর্থ এবং ভাব প্রকাশের দিক থেকে।  এই প্রেক্ষাপটেও আবার ৪ প্রকারঃ 

(১) সুস্পষ্ট (ظاهر)

(২) পুস্তকি বা আক্ষরিক (نص)

(৩) সংহিতবদ্ধ (আইনকৃত) ( محكم)

(৪) ব্যাখ্যাকৃত (مفسر)

পক্ষান্তরে অপর ৪ টি দিক রয়েছে তা হল 

(১) গোপন (خفي)

(২) দুর্বোধ্য (مشكل)

(৩) সারসংক্ষেপ (synopsis) ( مجمل)

(৪) অনুরূপ (متشابه)

প্রায়গিক দিক থেকে আবার ৪ প্রকার 

(১) প্রকৃত (حقيفت)

(২) রূপক অর্থে (مجاز)

(৩) স্পষ্টভাবে  ( صريح)

(৪) লক্ষণ বা চিহ্ন বিবেচনায় (كنايه)

ইমাম শাতেবি নামে একজন ইমাম “আল মুয়াফাকাত” নামে একটি বিশাল গ্রন্থ রচনা করেছেন ইমাম শাতেবির এই গ্রন্থের মূল বিষয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল তিনি শরিয়েতের বিষয়গুলো নির্ধারণের জন্য কোরান হাদিসের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে “মাকাসিদ আল শারিয়াহ” বা শরিয়তের উদ্দেশ্যটা কি সেটা বুঝার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি মানব জীবনের প্রয়োজনের তিনটি দিক আলোচনা করেছেন 

১) অপরিহার্য (ضروريات

(২) প্রয়োজন তবে না হলেও চলে (حاجيات) 

(৩) বিলাসিতা (تحسنيات) 

মানব জীবনের ৫ টি অপরিহায্য বিষয় চিহ্নিত করেছেন। সে গুলোর মধ্যে রয়েছে 

  1. জীবনের নিরাপত্তা (حفظ النفس)
  2. সম্পদের নিরাপত্তা (حفظ المال)
  3. পরিবারের নিরাপত্তা (حفظ النسل)
  4. ধর্মীয় নিরাপত্তা (حفظ الدين)
  5. চিন্তার স্বাধীনতা (حفظ العقل)
  • أصول الفقه الإسلامي: منهج بحث ومعرفة

·      قمر الأقمار على نور الأنوار شرح المنار

  • الموافقات للشاطبي

·      حجة الله البالغة

·      الإتقان في علوم القرآن

  • كيف نتعامل مع القرآن العظيم

·      كيف نتعامل مع السنة النبوية

Leave a Reply