কুরআনের সংকীর্ণ ব্যাখ্যা, ইসলামের সংকীর্ণ / পার্শিয়াল রেপ্রিজেন্টেশান
প্রায় প্রতিটা গ্রুপই কমবেশি এই কাজ করে থাকে। নিজেদের অবস্থান ও কর্মকাণ্ডকে justify করার জন্য কুরআন–হাদীস থেকে কিছু রেফারেন্স তুলে ধরে। সহিংস–সশস্ত্র গ্রুপগুলো কুরআন থেকে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু জিহাদ ও কিতাল সংক্রান্ত আয়াত উপস্থাপন করে, সেইসাথে প্রাসঙ্গিক হাদীস নিয়ে আসে। কেউবা আবার কুরআন থেকে “আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরা” ও সংঘবদ্ধ হয়ে থাকার রেফারেন্স এনে তাদের দলে টানার চেষ্টা করে। এগুলো সবই কুরআনের সংকীর্ণ ব্যাখ্যা, ইসলামের partial representation. সাধারণ মুসলমান যেহেতু কুরআন না পড়লেও এর উপর আস্থাশীল, তাই এই আস্থার সুযোগ নিয়ে কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের ভুল / সংকীর্ণ ব্যাখ্যা করে নিজেদের দল ভারী করার চেষ্টা করে যাচ্ছে বিভিন্ন গ্রুপগুলো।
একই কাজ কিন্তু ইসলামবিরোধীরাও করে থাকে। যেমন, “তাদেরকে যেখানে পাও হত্যা করো”, এই কথাটি, যেটা পুরো একটা আয়াতও নয়, বরং আয়াতের একটি অংশ, সেটা তুলে দিয়ে তারা বলে যে ইসলাম সন্ত্রাসের ধর্ম, ইসলাম বিধর্মীদের গণহারে হত্যা করার আদেশ দিয়েছে। সকল মুসলিম গ্রুপ–ই ইসলামবিরোধীদের এই কমন অভিযোগকে অস্বীকার করে এবং বলে যে একটি আয়াতকে সংকীর্ণভাবে তুলে ধরা হয়েছে। অথচ ইসলামী বিভিন্ন দল /মতের লোকেরা নিজেরাও একই কাজ করে যাচ্ছে, শুধু নিজেদের পক্ষের আয়াতগুলো তুলে ধরছে!
এদের বেশিরভাগই নিজেরাই জানে না, কুরআন কী জিনিস, মানব–রচিত গ্রন্থ থেকে ঐশী কিতাব কুরআনের বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য কী, এবং কুরআন পড়ার উপায়–ই বা কী। কুরআন থেকে তাৎপর্য গ্রহণেরই বা উপায় কী। কুরআনের কোনো অর্থ না বুঝলে হাদীসের সহায়তা নিতে হবে, নাকি আক্বল (বিচারবুদ্ধি, reason) দ্বারা সেটা সমাধান করতে হবে (পরিশিষ্ট – ১ এ আলোচনা করা হবে)? ধর্মীয় বিষয়ে অথরিটির পর্যায়ক্রমই বা কী (পরিশিষ্ট – ১ এ আলোচনা করা হবে)?
মৌলিক বিষয়গুলির সমাধান না করে, মৌলিক বিষয়ের পরিপূর্ণ অকাট্য জ্ঞান অর্জন না করে উপরের স্তরে গেলে তখন বিভক্তি, মতবিরোধ ও শত্রুতা, ইত্যাদি সৃষ্টি হয়। অতএব, যখন কুরআন–হাদীসের সংকীর্ণ ব্যাখ্যা করে সকল গ্রুপই তাদের নিজেদের দিকে ডাকছে, তখন সবার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে চিন্তামগ্ন হওয়া উচিত যে, ইসলামের নামে এসব কী হচ্ছে? ইসলাম আসলে কী? আক্বল, তাওহীদ, আখিরাত, রিসালাত, ইমামত, কিতাবুল্লাহ ইত্যাদি মৌলিক বিষয়ে দৃঢ় জ্ঞান অর্জন করা প্রয়োজন।
বিদ্বেষ/ বিরোধিতাপ্রসূত জ্ঞান অর্জনের সমস্যা : anti-ism
কোনো দল বা গ্রুপের বিরোধিতা করার উদ্দেশ্যে যখন কেউ ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করে, তখন সেটা আংশিক ও পক্ষপাতদুষ্ট জ্ঞান হয়ে যায়। তরুণদেরকে মোটিভেট করা অপেক্ষাকৃত সহজ, একারণে দেখা যায়, খুব সহজেই তারা বিভিন্ন ধর্মীয় দলে ভিড়ছে। এরপর কোনো কারণে যদি সে এক দল ছেড়ে আরেক দলে গিয়ে যোগ দেয়, তখন প্রথম দলের দোষ–ত্রুটি প্রচারে বিরাম রাখে না। এমনকি দেখা যায় যে, এতদিন নিজে যেই দল করতো, এখন সে–ই হয়েছে ঐ দলের সবচে বড় শত্রু, ঐ দলের সবচেয়ে বড় বিরোধিতাকারী। এরকম উদাহরণ চারপাশে তাকালেই দেখা যাবে, বিশেষতঃ তরুণ সমাজের মাঝে।
তখন দেখা যায় ইসলামকে মূল লক্ষ্য করার পরিবর্তে তার মূল লক্ষ্য–উদ্দেশ্য হয়ে যায় তারই অতীত দলটার সমালোচনা করা, ঐ দলটাকে দমন করা। এ ধরণের anti-ism দ্বারা মোটিভেটেড হয়ে যেসব কর্মকাণ্ড করা হয়, তা যদিওবা ইসলামের খোলসে হয়, তা আসলে শয়তানের হাতিয়ার। একটা সহজ উদাহরণ হলো, শিয়া–সুন্নি বিরোধ। কেউ যখন সুন্নি সমাজে বড় হয়ে ওঠে, এবং একজন শিয়া মুসলমানের যুক্তির মুখোমুখি হয়, তখন সে বিরোধিতা করার উদ্দেশ্যেই শিয়া–সুন্নি ইস্যু নিয়ে পড়াশুনা শুরু করে। যেহেতু তার উদ্দেশ্যেই শিয়াদের বিরোধিতা করা, তখন সে আসলে আর নিরপেক্ষ নাই, বরং পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে পড়েছে। এরপর সে যতই পড়াশুনা করুক না কেনো, তার অর্জিত জ্ঞান হবে পক্ষপাতদুষ্ট, এবং সেখানে প্রকৃত সত্য উঠে আসবে না। একারণে দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের অনুপ্রেরণা আসতে হবে নিরপেক্ষভাবে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে, মানব সত্তার গভীর হতে উৎসারিত হয়ে, নিজের উৎসের সন্ধানের তাড়না থেকে, স্রষ্টাকে জানার ব্যাকুলতা থেকে। এছাড়া অন্য কোনো কিছু দ্বারা মোটিভেটেড হয়ে কেউ যদি ইসলামী জ্ঞান অর্জন করে, তাহলে নিরপেক্ষ সত্যে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তার নেই বললেই চলে।
ধর্মপ্রচারে দল পদ্ধতির সমস্যা : introduction of new concept
ইসলামের ইতিহাস হাজার বছরের পুরনো। কিন্তু বিশ্বে ইসলাম প্রচারে দল পদ্ধতির উদ্ভব ঘটেছে সাম্প্রতিককালে। একটি ব্যানার তৈরী করে তার নিচে বিভিন্ন মানুষ সমবেত হয়ে বিভিন্ন ইসলামী কর্মকাণ্ড করছে। এটা সুস্পষ্ট যে, ইসলাম প্রচার কিংবা ইসলামী কর্মকাণ্ড করার জন্য মুহাম্মদ (সা.) কোনো নাম দিয়ে দল তৈরী করেননি। অর্থাৎ, বর্তমানে আমরা যে ইসলামী দলগুলো দেখি, অনুরূপ concept আল্লাহর রাসূল (সা.) প্রণয়ন করেননি। আল্লাহ রাসূল(সা.) যা করেননি, যা বিগত হাজার বছরেও প্রয়োজন হয়নি, এখন হঠাৎ কেনো তা প্রয়োজন হচ্ছে? যারা ইসলামের নামে বিভিন্ন দল প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং সেই দলের নেতা–কর্মী, তারা অবশ্যই এর পক্ষে নানান যুক্তি উপস্থাপন করবেন। স্পষ্টতঃই সেগুলো কুরআন–হাদীস–ইসলামের সংকীর্ণ ব্যাখ্যা, partial representation, ইসলামের প্রাথমিক স্তরসমূহের কমপ্লিট আন্ডারস্ট্যান্ডিং না থাকা ও জ্ঞান অর্জনের সঠিক পন্থা অনুসরণ না করার ফসল। প্রতিটা গ্রুপই নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য কুরআন–হাদীসের সংকীর্ণ ব্যাখ্যা (বা অপব্যাখ্যার) রেফারেন্সিয়াল যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার আহবান জানায়, এবং মানুষের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে নিজের মতকে বাহ্যিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। অথচ ইসলামের দ্বীন হিসেবে পরিপূর্ণতা মানে কী? দ্বীন হিসেবে ইসলামের পরিপূর্ণতার মানে হলো, concept হিসেবে ইসলাম পরিপূর্ণ। এখন, এই কনসেপ্ট স্থান–কাল–পাত্র–পরিবেশ–সভ্যতা ইত্যাদি ভেদে একই থাকবে। যেমন, মুহাম্মদ (সা.)ইসলাম প্রচার করেছেন। সেই যুগে মাইক ছিলো না, তিনি প্রয়োজনে পাহাড়ের উপরে উঠে মানুষকে ডেকে কথা বলেছেন। এই যুগে মাইক্রোফোন আছে, টিভি–ইন্টারনেট–ভিডিও স্ক্রিন ইত্যাদি আছে, কিন্তু এগুলো ব্যবহার করেও আমরা কনসেপ্টটাকে সমুন্নত রাখতে পারি, আর তা হলো : একজন ধর্মপ্রচারক কথার মাধ্যমে মানুষকে সরাসরি ইসলামের দিকে, আল্লাহর দিকে আহবান করবেন। তিনি ইসলামের জন্য কোনো নাম দিয়ে দল তৈরী করেননি, এবং মানুষকে সেই দলের পতাকাতলে সমবেত হবার আহবান জানাননি। অর্থাৎ দলের কনসেপ্ট আল্লাহর রাসূল (সা.) ইন্ট্রোডিউস করেননি।
নবীজি যুদ্ধের কনসেপ্ট দিয়ে গেছেন। সেই যুগের সভ্যতায় যুদ্ধের কনসেপ্ট ঘোড়া, তলোয়ার, তীর ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে কাজ করেছে। বর্তমান যুগে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রকে কেন্দ্র করে কাজ করবে, কিন্তু কনসেপ্ট একই থাকবে।
এখানে স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা দরকার যে, নবীর দায়িত্ব–কর্তব্য কী। নবী তাঁর দায়িত্ব, অর্থাৎ ইসলাম প্রচার যেই পন্থায় পালন করেছেন, সেই পন্থা পরিপূর্ণ, এবং সেই পন্থার সংস্করণের প্রয়োজন বা এখতিয়ার, কোনোটিই আমাদের নেই। কিন্তু অন্যান্য বিষয়, যেমন অস্ত্র তৈরী বা গৃহনির্মাণ, ইত্যাদি যেগুলো নবীর মূল দায়িত্ব নয়, সেক্ষেত্রে নবীর গৃহীত পদ্ধতি অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক নয়। এবং এক্ষেত্রে নতুন পদ্ধতি (গৃহনির্মাণ পদ্ধতি, অস্ত্র তৈরী ও চালনা পদ্ধতি ইত্যাদি) আমরা উদ্ভাবনও করতে পারি, এবং পুরনো পদ্ধতির সংস্কারও করতে পারি। কিন্তু নবীর মূল যে দায়িত্ব, সেই পদ্ধতিতে, সেই কনসেপ্টে হাত দেয়ার এখতিয়ার আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে দেননি। কেউ যদি তা করে, অর্থাৎ নবীর যে দায়িত্ব ছিলো, সেই একই দায়িত্ব দ্বীন প্রচারে নবীর অনুসৃত মূলনীতি, পন্থা, কনসেপ্ট অনুসরণ না করে, তবে সে নবীর চেয়ে আগ বাড়িয়ে কাজ করবে, যা স্পষ্ট নিষেধ, যা কিনা নবীর জ্ঞানকে অসম্পূর্ণ মনে করা, দ্বীন হিসাবে ইসলামের কমপ্লিটনেসকে অস্বীকার করা।
আসলে ইসলামের মৌলিক বিষয়ের জ্ঞান এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ যে, শাখা–প্রশাখাগত সব বিষয় বাদ দিয়ে আগে মৌলিক বিষয় সম্পর্কে নিশ্চিত জ্ঞান অর্জন করা উচিত। কেউ যখন নবীকে পরিপূর্ণভাবে না চেনে, তখন সে নবীর চেয়ে আগ বাড়িয়ে কাজ করে। কিংবা নবীর আদেশের তুলনায় কম কাজ করে। দুটোই আল্লাহ তায়ালা নিষেধ করেছেন। শেষ নবী, যাঁর মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর দ্বীনকে পূর্ণ করে দিয়েছেন, তাঁকে চিনতে হবে আগে!
যারা ইসলামের নামে বিভিন্ন নাম দিয়ে দল প্রতিষ্ঠা করেছেন, এবং সেটার পক্ষে বিভিন্ন রেফারেন্স এনে ইসলামের সংকীর্ণ ব্যাখ্যা করছেন, তাদের চিন্তা করে দেখা উচিত যে, আল্লাহর রাসূল (সা.) কি দলীয় কাঠামো সম্পর্কে জানতেন না? দলের কনসেপ্ট কি তাঁর ছিলো না? Conceptually ইসলামের পরিপূর্ণতার মানে হলো এই যে, ইসলাম ও ইসলাম সংক্রান্ত যত কর্মকাণ্ড, যা একজন নবীর দায়িত্ব–কর্তব্য, সেগুলোর conceptual পরিপূর্ণতা। অর্থাৎ, নীতিগতভাবে, পদ্ধতিগতভাবে মুহাম্মদ (সা.) যা করেছেন, কেয়ামত পর্যন্ত একই কনসেপ্ট ব্যবহার করা যাবে, যুগের সাথে সেই কনসেপ্ট অকার্যকর হয়ে পড়বে না। কনসেপ্ট হিসেবে ইসলামের পরিপূর্ণতা বুঝতে না পারলে তখনই মানুষ ইসলাম প্রচারের জন্য এমন নতুন পন্থা আবিষ্কার করে, যা আল্লাহ রাসূল (সা.) করেননি।
সাময়িকভাবে দলীয় পদ্ধতিতে ইসলামের প্রচার–প্রসার যদি সাফল্য এনেও দেয়, তবুও সেটাকে পরিহার করতে হবে এই যুক্তিতে যে, নবী তাঁর দায়িত্ব পালনে যেই পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন, যেই কনসেপ্টের অনুসরণ করেছেন, সেই একই দায়িত্ব পালনে আমরা ভিন্ন কোনো কনসেপ্ট ব্যবহারের অধিকার রাখি না। ইসলাম প্রচার করা নবীর দায়িত্ব ছিলো, অতএব এই কাজটি তিনি যেভাবে করেছেন, হুবহু একই কনসেপ্ট আমাদেরকে অনুসরণ করতে হবে। এর কম–বেশি করা যাবে না। এর কম–বেশি করার অর্থই হলো নবীর জ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ করা, আর নবীর জ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ করা মানে আল্লাহর জ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ করা। আল্লাহ তা‘আলা যখন কুরআনকে শেষ ঐশী কিতাব করেছেন, মুহাম্মদ (সা.)কে যখন শেষ নবী করেছেন এবং ইসলামকে যখন পূর্ণতা দান করেছেন, তখন এসবেরই অর্থ হলো এই যে, কেয়ামত পর্যন্ত ঐ কনসেপ্টগুলো ব্যবহার–উপযোগী থাকবে, যুগের সাথে কিংবা স্থান–কাল–পাত্র–পরিবেশ ইত্যাদি ভেদে অকার্যকর হয়ে যাবে না। এবং তার চেয়ে উন্নত কোনো কনসেপ্টও কখনো থাকা সম্ভব নয়; দ্বীনের কাজ করার জন্য নবীজির অনুসৃত পন্থার চেয়ে উন্নততর কোনো পন্থা থাকা সম্ভব নয়। তবে এই আধুনিক যুগে নতুন এমন কী অবস্থার উদ্ভব ঘটলো যে, শেষ নবী যেই কনসেপ্ট, যেই পদ্ধতি অনুসরণ করে নবীজি দ্বীনের কাজ করেছেন, সেই পদ্ধতি অকার্যকর হয়ে গেলো? কিংবা তার চেয়েও উত্তম কোনো পদ্ধতি আমরা সাধারণ মানুষেরা, যারা সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে ওহী–ও পাই না, সেই সাধারণ মানুষেরা আবিষ্কার করবো?
এ ধরণের কাজ তখনই সম্ভব, যখন কেউ নবীকে চেনে না, নবীকে চিনলেও নবুওয়্যাতের সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান রাখে না, কিংবা তা হলেও কনসেপ্ট হিসেবে ইসলাম, কুরআন ও মুহাম্মদের (সা.) কথা–কর্মের আধুনিকতা বোঝে না। ইসলামের যত বড় পণ্ডিতই হোক না কেনো, কেউ যদি শেষ নবীর যে দায়িত্ব ছিলো, সেই ইসলাম প্রচারের কাজে শেষ নবীর অনুসৃত কনসেপ্ট এর বাইরে অন্য কোনো কনসেপ্ট আবিষ্কার করে বা অনুসরণ করে, তখন অবশ্যই তিনি ইসলামের, কুরআনের ও শেষ নবীর কথা–কর্মের আধুনিকতা, সর্বজনীনতা ও স্থান–কালের–উর্ধ্ব কনসেপ্ট হওয়াকে পরিপূর্ণ অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এরপর সেই দলের যদি লক্ষ–কোটি অনুসারীও হয়, এমনকি সেই দল যদি গোটা মুসলিম বিশ্বের অর্ধেককেও গ্রাস করে ফেলে, তবুও তারা সঠিক পথের উপর নাই, এবং নবীর চেয়ে আগ বাড়িয়ে কাজ করছেন। আর নবীর চেয়ে আগ বাড়িয়ে কাজ করলে আমল ধ্বংস হয়ে যাবার ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন।
ইসলামের মৌলিক বিষয়ে (তাওহীদ–আখিরাত–রিসালাত ইত্যাদি) সঠিক পদ্ধতিতে জ্ঞান অর্জন ও প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে প্রতিটা স্তরের কমপ্লিট আন্ডারস্ট্যান্ডিং একারণে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ।
এই ফিলোসফিকাল আলোচনাগুলো কোথায় হবে? কাদের কাছে উপস্থাপন করা হবে? না ধর্মীয় দলগুলোর নীতিনির্ধারক ও নেতাগণ রিসার্চার যে, তাঁদের কাছে গিয়ে বিষয়গুলো উপস্থাপন করা হবে, আর না দেশে কমপ্লিট রিলিজিয়াস রিসার্চ সেন্টার আছে যে, সেখানে বিষয়গুলো পেশ করা হবে। না আলেমসমাজ ঐক্যবদ্ধ যে তাঁদের সকলের কাছে বিষয়টি পেশ করা হবে। কোনো ধর্মীয় দল বা ধর্মীয় নেতার ধারণা যদি এমন হয় যে, প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন হয়ে গিয়েছে, এখন শুধু কাজ করে যেতে হবে, তখন ঐ মুহুর্ত থেকেই জ্ঞানচর্চার দুয়ার বন্ধ হয়ে যায়। ধর্মীয় দলগুলোর এই অবস্থাই ঘটেছে। যখন কেউ নিজেদের প্রয়োজনে নিয়মিত জ্ঞানচর্চা করে না, তখন তাদের কাছে এসব মৌলিক ফিলোসফি উপস্থাপন করেও খুব একটা লাভ হয় না। অথচ ধর্মপ্রচারে দল পদ্ধতি ইসলামের ভয়াবহ ক্ষতি ডেকে আনছে, যদিও বাহ্যিকভাবে কখনো কখনো এর ভালো ফলাফল দেখা যায়। ধর্মপ্রচারে দল পদ্ধতির সমস্যার আলোচনা conceptual level এ আপাততঃ এটুকুই যথেষ্ট।
(চলবে)
পরবর্তী পর্বগুলোয় আলোচিত বিষয়সমূহ:
- বাংলাদেশের বৃহত্তম ইসলামী দল
- সেক্যুলার গণতান্ত্রিক পন্থায় ইসলাম কায়েম প্রসঙ্গে
- প্রতিবাদ করার কি কেউ নেই?
- পরিশিষ্ট – ১ : ধর্মতত্ত্বের কিছু মৌলিক আলোচ্য বিষয়
- পরিশিষ্ট – ২ : Levels of guidance




