লিখেছেনঃ মোহাম্মদ আবদুর রহিম
সহকারী অধ্যাপক, সরকারি হাজী এ.বি. কলেজ
একটি খবর জেনে আমি স্তম্ভিত ও বিস্মিত। কারণ যে অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে ছাত্রজীবনে কেউ করতে পারলো না, আজ এ বয়সে এবং এ পেশায় এসে এমন অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়া বিব্রতকর হলেও কিছুটা মজারও বটে। কারণ অতটুকু যোগ্যতা (?) থাকলে রাজনীতি ছেড়ে মাস্টারিকে বেছে নেয়ার প্রয়োজন হতো না। মজার ব্যাপার হলো, এখনো কবুতরের অসহায় নিরীহ বাচ্চাকে জবাই করতে পারিনা বলে গিন্নির খোঁচাও খেতে হয়।
অনেক চিন্তা করলাম, শুভাকাঙ্খীদের সাথে আলাপ করে বুঝলাম আসলে আমার অপরাধও কম নয়। বি.সি.এস করার পর কোন বেকুব কখনো সন্দ্বীপে পদায়িত হয়না, বরং শহরে গিয়ে সন্দ্বীপ পরিচয়টাও মুছে ফেলতে চেষ্টা করে। আমিতো সন্দ্বীপ আসলামই, আবার কলেজে কেন ক্লাস হয়না, ক্লাসটাইমে কেন ছাত্রছাত্রীরা বাইরে থেকে হৈচৈ করে তা নিয়ে আমার এতো মাথা ঘামানো কেন? শিক্ষক নেই বলে অতিথি শিক্ষক ম্যানেজ করা, নিজের উদ্যোগে ক্লাস রুটিন করে ক্লাস কনফার্ম করা, সহপাঠক্রমিক বিভিন্ন কাজের উদ্যোগ নেয়া, নিজের উদ্যোগেই লাইব্রেরি সাজানো এতাসব ফাজলামি করা আসলেই ঠিক হয়নি। এ.বি. কলেজে অনার্স কোর্স, শতভাগ পাস এবং সন্দ্বীপের শিক্ষা-সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে এ.বি. কলেজকে গড়ে তোলার আমি দেখেছি। বাস্তবে দেখার অধিকার কি সবার আছে? এটা আমার অনধিকার চর্চা মনে হয়।
নিজে পুরাতন সন্দ্বীপ টাউনে থেকে স্কুল জীবন পার করেছি। পাবলিক লাইব্রেরি গিয়ে বই পড়ার ‘কুঅভ্যাস’ তখন থেকেই সৃষ্টি। ছাত্রজীবনেও নাস্তা না করে বা শীতের কাপড় না কিনে বই কেনার অভ্যাস করেছি। ছাত্রজীবন শেষে সহস্রাধিক বইয়ের মালিক হয়েছি। সন্দ্বীপে আসার পর নিজের বই আর নিজের কম্পিউটার দিয়ে সবাইকে নিয়ে উত্তরণ গণপাঠাগারের সূচনা করি। ছাত্রনেতা অবস্থায় যেখানে বাড়ি-গাড়ির মালিক হওয়ার কথা, সেখানে কিছু বই নিয়ে খুশি হয়ে ঢাকা থেকে সন্দ্বীপ প্রত্যাবর্তনকে একাট অপরাধ(?) হিসেবেও বিবেচনা করা যায়। সন্দ্বীপের ছেলেমেয়েরা বই পড়েনা তো আমার কী হয়েছে? আমি কেন আবার পাঠাগার করতে গেলাম? পাঠাগারে “বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস”, “ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাস”,“ বাংলা কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ”, “কবি আবদুল হাকিম: জীবন ও কর্ম” এসব স্টাডি সার্কেল ও সেমিনার করতে গেলাম? কেন বেসরকারি উদ্যোগে বাংলাদেশের উপজেলাভিত্তিক প্রথম ওয়েবসাইট করতে গেলাম যা থেকে উইকিপিডিয়াও তথ্য নিয়েছে? কেন স্টিমারেও বই পড়ার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করলাম? কৃতি ব্যক্তিদের সংবর্ধিত করেছি, কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দিচ্ছি প্রতিবছর।
এসব প্রোগ্রামে সবাই দাওয়াত দেয় রাজনৈতিক নেতাদের, আমি দাওয়াত দিই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের। কারণ আমি ছাত্রছাত্রীদের কাছে ‘রোল মডেল’ করতে চেয়েছি কৃতি শিক্ষাবিদদের, রাজনৈতিক নেতাদের নয়। কারণ আমার দৃষ্টিতে রাজনীতিতে জায়গা কম, প্রতিযোগিতা বেশি এবং রিস্ক বেশি। শিক্ষায় ক্ষেত্রটা একটু বিসতৃত। আমি শিক্ষার্থীদের ¯^cœ দেখাই এম.আই.টি, ক্যালটেকএর, এমপি-মন্ত্রীর নয়। এ অপরাধতো আসলে ছোট নয়। আমার অপরাধ আসলে অমার্জনীয়। কারণ আমি উত্তরণের জন্য বই যোগাড় করেছি সদ্যপ্রয়াত ¯^vaxb বাংলা বেতার খ্যাত কবি বেলাল মোহাম্মদ থেকে, তাঁর বড়ভাই ইউসুফ সাহেব থেকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপিকা সেলিনা আপা থেকে, প্রখ্যাত লেখক জাফর ইকবাল স্যারের কাছ থেকে, আমাকে বই দিয়েছেন কর্নেল (অব.) দিদারুল আলম বীরপ্রতীক। ছোট্ট একটা ‘মাস্টার’ হয়ে এতো বাড় বাড়াটা মনে হয় ঠিক হয়নি। উত্তরণ থেকে কমপক্ষে তিনশত শিক্ষার্থী কম্পিউটার শিখেছে। এতগুলো ছেলেমেয়েকে কম্পিউটার শেখানোর অভিযোগ তো ছোট নয়!
কুঁড়েঘরে বসে চাঁদের দেশের দেখাও অপরাধ বটে। আমি সন্দ্বীপে জাতীয় মানের প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে টেক্কা দেয়ার নিয়তে সবাইকে নিয়েই সন্দ্বীপ আনন্দ পাঠশালার উদ্যোগ নিয়েছি। সন্দ্বীপে এতোগুলো স্কুল থাকতে আমি কেন আবার নতুন করে স্কুল করতে গেলাম? স্কুল করবো তো করবো এত সুন্দর ভবন কেন করলাম-এটাকেও ছোট অপরাধ বলা যায়না। স্কুল তো স্কুল আবার সাথে মিনি শিশুপার্ক-এতোসব করার কোন দরকার ছিলো? সন্দ্বীপে বিজ্ঞান শিক্ষা উঠে যাচ্ছে তো কার বাপের এমন কী ক্ষতি হয়েছে? আমি কেন আবার বিজ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, কলেজ শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার সবাইকে নিয়ে ভিডিও ক্লাসের আয়োজন করতে গেলাম? দেশের সেরা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও শিক্ষাগ্যালারি নেই। সেখানে ছোট্ট একটি স্কুলে এতোসব আয়োজন কি বাড়াবাড়ির পর্যায়ে পড়েনা?
সন্দ্বীপে মাতৃসদন সমস্যার সমাধানে সকল ডাক্তারদের সম্পৃক্ত করে প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সন্দ্বীপ মেডিক্যাল সেন্টার। সরেজমিনে থাকায় কাজগুলো অনেকটা আমার তত্ত্বাবধানেই হচ্ছে। সন্দ্বীপের মেয়েরা আগেও মারা যেতো, এখনো যাচ্ছে, ভবিষ্যতেও যাবে-এটাই| এর সমাধানের উদ্যোগ নিলে দেশের নেতারাই নেবেন, আমার মতো ছোট্ট মাস্টার কেন নিতে যাবে? চিন্তা করে দেখলাম, সত্যিই তো এটাও একটা অমার্জনীয় অপরাধ।
আসলে যত দোষ আমার মাথাটার। সবসময় নতুন কিছু কিলবিল করে। সন্দ্বীপের ক্রসড্যাম নিয়ে কতো আন্দোলন হলো, আরো হবে। জাপানের আদলে ক্রসড্যাম বাদ দিয়ে ‘ব্লক-চেইন’ দিয়ে সন্দ্বীপকে রক্ষার চিন্তা করা যায় কিনা তা নিয়ে টেকনিক্যাল লোকদের নিয়ে একটি কমিটি করার উদ্যোগ নিয়েছি। বাস্তবায়ন করবে রাজনীতিবিদরাই। শুধু টেকনিক্যাল সাপোর্টের অভাবে জলবায়ু ফান্ডের একটাকাও পায়নি সন্দ্বীপ। এরকম আরো অনেকগুলো চিন্তা ও রয়েছে আমার মাথায়।
শুভাকাঙক্ষীদের সাথে আলাপ করে জানলাম, আমার এসব চিন্তাই আমার অপরাধ। আমি নাকি সুদূরপ্রসারী চিন্তা নিয়েই এসব করছি। এটাই আমার দুর্ভাগ্য যে, দলমত নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে উদ্যোগ নিয়েও এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘সন্দ্বীপের’ করতে পারলাম না, ‘আমার’ই থেকে গেলো। নিঃসন্দেহে আমার চিন্তা অনেক সুদূরপ্রসারী, তবে তা বিশ-পঞ্চাশ বছরের নয়, অনন্ত অসীম জীবনের জন্য। আমি আমার যোগ্যতা ও সীমাবদ্ধতার ব্যাপারে খুবই সচেতন। রাজনীতি করার জন্য যা লাগে (অর্থ, অস্ত্র ও জনবল) তা আমার নেই এবং ভবিষ্যতেও এসবের মালিক হওয়ার ইচ্ছা আমার নেই।এ কারণে শিক্ষার পথে এসেছি। এম.ফিল ডিগ্রি অর্জন করেছি। পি.এইচ.ডি করার জন্য দেশের বাইরে থেকেও অফার পেয়েছি। বৃদ্ধা মা এবং এ প্রতিষ্ঠানগুলো এভাবে রেখে যেতে চাই না। একটু গুছিয়ে হয়তো পি.এইচডি করতে চলে যাবো। আমাকে আমার মতো চলতে দিলে কারো ক্ষতি হবে না, কিন্তু আমার ক্ষতি করতে চাইলেই কি ক্ষতি করা যাবে? যদি আমাকে মেরে ফেলেন সেটাও আমার মতো গুণাহগারের জন্য একটা বিশাল সুযোগ জান্নাতে যাওয়ার। আর আমি চাকুরির পূজা করিনা, পূজা করি রিজিকের মালিকের।
সুতরাং আমাকে ছোট করতে গিয়ে নিজেরা ছোট হবেন কেন? আপনারা আপনাদের কাজ করুন, আমাকে আমার মতো কাজ করতে দিন। ‘রাজনীতিবিদ’ আবদুর রহিমের চেয়ে ‘শিক্ষাবিদ’ আবদুর রহিম পরিচয় আমার কাছে অনেক অনেক বড়। অপরাধের জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী, তবে আমাকে এ অপরাধটুকু (?) নির্বিঘ্নে চালিয়ে যেতে দিন, সহযোগিতা করুন। ফলাফল আপনারাই তথা সন্দ্বীপবাসী ভোগ করবেন, আমি বা আমার পরিবার নয়। তবে একথা বলতে পারি, হয়তো আমি একদিন থাকবো না, তবে যে কোন পর্যটক সন্দ্বীপ আসলে তাদের দেখার স্থান হিসেবে উত্তরণ গণপাঠাগার, সন্দ্বীপ আনন্দ পাঠশালা এবং সন্দ্বীপ মেডিক্যাল সেন্টারকে রাখবে। এমন একটা সময় আসবে যখন সন্দ্বীপবাসী এ প্রতিষ্ঠান তিনটি নিয়ে গর্ব করবে।




