কানুনী সুলতান সুলায়মান  (প্রথম পর্ব)

কানুনী সুলতান সুলায়মান (প্রথম পর্ব)

ইয়াভুজ সুলতান সেলিমের মৃত্যুর পর, মানিসাতে অবস্থান কারী শাহজাদা সুলতান সুলেইমান ইস্তানবুলে এসে তার বাবার স্থলাভিষিক্ত হন।
ইস্তানবুলে ফিরে এসেই প্রথমে তিনি তার পিতার জানাযা নামাজ পড়েন এবং তাকে মির্জা সারায় নামক স্থানে দাফন করেন। পিতাকে দাফন করার ফর তার পিতার রেখে যাওয়া কাজ সমুহকে দ্রুততার সাথে সম্পন্ন করেন। এর মধ্যে প্রথম যে কাজটি করেন তা হল, সুলতান সেলিম মসজিদকে দ্রুততার সাথে নির্মাণ করেন।
ক্ষমতা অধিগ্রহনের কাজ শেষ করেই তিনি তার উজির করেন। এর পর তিনি একটি ‘ইহসান’ হিসাবে তাব্রিজ থেকে যাদেরকে বন্দী করে নিয়ে আসা হয়েছিল তাদেরকে করে দেন। তিনি তাঁদেরকে মুক্তি দিয়ে তাঁদেরকে এই স্বাধীনতা দেন যে, যার ইচ্ছা সে চলে যেতে পারবে আর যার ইচ্ছা সে ইস্তানবুলে থাকতে পারবে।
তার শাসনকালের শুরুতেই তার এই ন্যায়বিচার ও ন্যায়ের শাসনে মুগ্ধ হয়ে জনগণ তাকে ‘কানুনী’ উপাধিতে ভূষিত করেন। তিনি শুধুমাত্র ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করেই ক্ষান্ত হননি বরং তার পিতার শাসনামলে যে সকল উজিরগণ জুলুম ও অন্যায় করেছিল তাঁদেরকে তিনি শাস্তি দেন। মানুষকে জুলুম করার জন্য ‘হুনি’ ( রক্তপাতকারী) হিসাবে পরিচিত নৌ-সেনাপতি জাফর কে ফাঁসী দেন।

জানবারদির বিদ্রোহঃ
তিনি ক্ষমতা গ্রহন করার সাথে সাথেই যেহেতু সব কিছুকেই ঢেলে সাজাচ্ছিলেন, কোন কোন দল বা ব্যক্তি নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য এটাকে একটি সুযোগ হিসাবে বেছে নিতে চান। কানুনী সুলতান সুলাইমানের এই পরিবর্তনকে মোক্ষম সময় ভেবে অনেক গভর্নর বিদ্রোহ করে বসে। ইয়াভুজ সুলতান সেলিমের শামে নিযুক্ত গভর্নর জানবেরদি গাজালীও এই সময় বিদ্রোহ করে বসেন।মূলত,তার পিতা ইয়াভুজ সুলতান সেলিমের কিছু রাজনৈতিক ও কৌশলগত ভুলের কারণে এই বিদ্রোহ আগুন জ্বলে উঠে। পূর্বেও যেমন বর্ণিত হয়েছে, জানবেরদি স্লাবিক বংশদ্ভোত একজন গোলাম। তিনি ছিলেন মামলুকি রাষ্ট্রের একজন সেনাপতি। তাঁদের সেনাপতি হয়ে তিনি উসমানীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। এমনকি সিনান পাশা যেই যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করেন সেই যুদ্ধের সকল আয়োজন তিনি সম্পন্ন করেন এবং সেনাপতির দায়িত্ত্ব পালন করেন। এই যুদ্ধে উসমানীগণ বিজয় অর্জন করলে সে জানবেরদি সুলতান সেলিমের কাছে এসে পায়ে পড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করলে সুলতান ইয়াভুজ সেলিম তাকে মাফ করে দেন। শুধু তাই নয় তাকে শামের গভর্নর নিযুক্ত করেন। ইয়াভুজ সুলতান সেলিম মৃত্যুবরণ করার পর কানুনী দায়িত্ত্ব গ্রহন করার প্রাক্কালে সে এটাকে একটি সুযোগ হিসাবে বিবেচনা করে এবং বিদ্রোহ ঘোষণা করে। বিদ্রোহ করেই ক্ষান্ত হয়নি সে তার নামে খুতবা দিতে বলে এবং তার নামে মুদ্রা চালু করে।
এই খবর পাওয়ার সাথে সাথেই কানুনী সুলতান সুলেয়মান সেখানে সেনাবাহিনী প্রেরন করে বিদ্রোহ দমন করেন এবং বিদ্রোহকারী জানবেরদিকে হত্যা করান।

কানুনীর সালতানাত পাশ্চাত্যে জিহাদের সেনাবাহিনী প্রেরনের মাধ্যমে শুরু হয়েছিলঃ

একথা অনস্বীকার্য যে, ইয়াভুজ সুলতান সেলিম তার পুত্র কানুনীর জন্য একটি বিশাল রাষ্ট্র ও শক্তিশালী রাষ্ট্র রেখে যান। তিনি যখন মৃত্যুবরণ করেন তখন তার রাজ্যে কোন ধরনের সমস্যা ছিল না। কেননা ইয়াভুজ সুলতান সেলিম পূর্বে শাহ ইসমাইল ও দক্ষিনে মামলুকিদের পরাজিত করেন। তিনি উসমানী খিলাফাতকে মিসর ও ইরান পর্যন্ত বর্ধিত করেন। এক অর্থে বলতে গেলে রাষ্ট্র আর শিশু প্রায় একই ধরণের। যত বড় হতে সমস্যাও সে তুলনায় বড় হতে থাকে। এই জন্যই সুলতান সেলিমের মৃত্যুর পর অনেক গভর্নর বিদ্রোহ শুরু করে। নতুন সুলতান ক্ষমতা গ্রহন করতে না করতেই বিদ্রোহ দমনের জন্য মনযোগ দিতে বাধ্য হন।।
বিজয়াভিযান সমূহ
নতুন সুলতান কানুনী সুলতান সুলায়মান খিলাফাতের দায়িত্ত্বগ্রহন করার সাথে সাথে ইউরোপে ও পাশ্চাত্যের যে সকল দেশে জিহাদী অভিযান চলতেছিল সে গুলোকে পুনরায় অভিযান শুরু করার নির্দেশ দেন। তার প্রথম লক্ষ্য ছিল বেলগার্ড। এর আগেও বেলগার্ডকে বিজয় করার জন্য অনেক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল কিন্তু বিজয় করতে সক্ষম হননি। এই সৌভাগ্য কানুনীর ভাগ্যেই জুটেছিল।ফলে তিনি ৩০শে আগস্ট ১৫২১ সালে বেলগার্ডকে অবরোধ করেন।
এই সময়ে তার কাছে বিভিন্ন অভিনন্দন পত্র আসতেছিল। তিনি এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে যাদের সাথে চুক্তি করা প্রয়োজন তিনি তাঁদের সাথে চুক্তি করেন আর যাদের সাথে পুরাতন চুক্তি ছিল সেগুলোকে তিনি নবায়ণ করেন।
বেলগার্ড বিজয়ের পর কানুনী সুলতান সুলায়মান রডস (Rodos) দ্বীপকে বিজয়ের জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ করেন। কেননা কৌশলগত দিক থেকে এই দ্বীপ ছিল খুবই গুরত্ত্বপূর্ণ। ফাতিহ সুলতান মেহমেদ এই দ্বীপকে বিজয়ের জন্য অভিযান পরিচালনা করেন কিন্তু তিনি সফল হতে পারেননি।
অনেক কঠিন এবং দীর্ঘ সময় ধরে চেষ্টা করার পর এই দ্বীপকে বিজয় করতে সক্ষম হন। সুযোগ পেলেই এই দ্বীপ থেকে উসমানীদেরকে আক্রমন করা হত এবং এই দ্বীপ ইউরোপিয়ানদের হাতে থাকায় তারা এখান থেকে নানান ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করত। এই জন্য কানুনী আগে এই দ্বীপকে দখল করে নেন। তিনি শোভালিয়েদেরকে পরাজিত করে এই দ্বীপের দখল নেওার পর, শোভালিয়েদেরকে গিরিতে যাওয়ার অনুমতি দান করেন। রডস দ্বীপের সমস্যা সমাধান করে তিনি ১৫২৩ সালে ইস্তানবুলে ফিরে আসেন।

গভর্নর আহমেদ পাশার বিশ্বাসঘাতকতাঃ
কানুনী সুলতান সুলায়মান রডস থেকে ফিরে আসার পর আহমেদ পাশাকে মিশরের গভর্নর হিসাবে প্রেরন করেন। কিন্তু তিনি মিসরে গিয়েই যেন এই আয়াতের বাস্তব প্রতিফলন ঘটান।
﴿إِنَّ الْإِنسَانَ خُلِقَ هَلُوعًا﴾
মানুষকে ছোট মনের অধিকারী করে সৃষ্টি করা হয়েছে৷ (মা’রিজ-১৯)
মিসর ইস্তানবুল থেকে অনেক দূরে অবস্থিত হওয়ায় তিনি স্বাধীন সুলতান হওয়ার স্বপ্ন দেখেন এবং নিজের নামে মুদ্রা ছাপানোর পাশাপাশি তার নামে খুতবা দেওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু আহমেদ পাশার সাথে পাঠানো কাজী মেহমেদ তার এই আচরনের বিরোধিতা করেন এবং উসমানী রাষ্ট্রের প্রতি তার আস্থা ও বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ করেন। ফলে তার সাথে আহমেদ পাশার দ্বন্দ শুরু হয় এবং এক যুদ্ধে বিদ্রোহী আহমেদ পাশা নিহত হয়।
আহমেদ পাশাকে হত্যা করার পরেও মিশরে আভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও দ্বন্দ অব্যাহত থাকে। কানুনীর কাছে এই খবর পৌঁছালে তিনি তার পারগালার উজির ইব্রাহীম পাশাকে মিশরে পাঠিয়ে এই সেখানে শান্তি আনয়ন করেন। এটা করার সময় যে সকল আলেমকে তার পিতা জোরপূর্বক মিশর থেকে ইস্তানবুলে নিয়ে এসেছিলেন তাঁদের মধ্যে যারা মিশরে ফিরে যেতে চায় তাঁদেরকে মিশরে পৌঁছিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন এবং যে সকল মিশরীয় জেলে ছিল তাঁদেরকে মুক্তি দিয়ে মিশরে পাঠিয়ে দেন। কানুনীর এই পদক্ষেপকে মিশরীয়গণ খুব ভালো চোখে দেখেন এবং তার জন্য দোয়া করেন। পারগালি ইব্রাহীম পাশা ১ বছর পর্যন্ত মিশরে অবস্থান করার পর সুলতানের নির্দেশে পুনরায় ইস্তানবুলে ফিরে আসেন। এই সময়কালের মধ্যে শাহ ইসমাইল মৃত্যু বরণ করেন এবং তার ছেলে তাহমাস্প তার স্থলাভিষিক্ত হন।
ইরানের শাহ, তাহমাস্প ( Tahmasp) এর দায়িত্ত্ব গ্রহন কে আনুষ্ঠানিক ভাবে না জানানোর কারণে কানুনী তাঁদেরকে একটি চিঠি পাঠিয়ে তাঁদেরকে আক্রমণ করার হুমকি দেন।

মোহাচ ময়দানের যুদ্ধ এবং বুদি বিজয়ঃ
কানুনীর দায়িত্ত্ব গ্রহনের পরপরই ইউরোপে পরিচালিত অভিযান সমূহের ফলে ইউরোপে এক আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে হাঙ্গেরী এতে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। কেননা পাশ্চাত্যের রাষ্ট্র সমূহ মুসলিমদের বিরুদ্ধে সব সময় ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। বিশেষ করে বেলগার্ডের পতনের পর তারা উসমানী খিলাফাতের বিরুদ্ধে নতুন ষড়যন্ত্রে মেতে উঠে।
কিন্তু ইউরোপীয়ানদের মধ্যেও কোন ঐক্য ছিল না। বিশেষ করে অন্যান্য ইউরোপীয়ান দেশ সমূহের সাথে ফ্রান্সের রাজনৈতিক দন্দ ছিল চরমে। ফ্রান্সের রাজা প্রথম ফ্রাঞ্চচইসকে (I. François) শারলকেন (Şarlken) বন্ধী করে। এই অবস্থা উসমানী খিলাফাতকে অনেক সুযোগ তৈরি করে দেয় এবং তাঁদের রাজার মুক্তির জন্য ফ্রান্স, উসমানী সুলতান কানুনীর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে দূত পাঠায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে কানুনী সুলতান সুলায়মান ফ্রান্সকে সাহায্য করার লক্ষ্যে এবং ইউরোপে উসমানী খিলাফাতের অবস্থানকে মজবুত করার জন্য মিশর ফেরত ইব্রাহীম পাশাকে সরদার করে ২৩ শে এপ্রিল ১৫২৬ সালে ইস্তানবুল থেকে ১ লাখ সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন । সেনাবাহিনী পাঠানোর সময় কানুনী এই নির্দেশ প্রদান করেন যে, ফসলী জমির উপর দিয়ে যাওয়া যাবে না এবং সেখানে পশু চড়ানো যাবে না। স্থানীয়দের পশুতে হাত দেওয়া যাবে না এবং কোন ক্রমেই তাঁদের কোন কাজে হস্তক্ষেপ করা যাবে না। যারা এই কাজ করবে অথবা এই কাজ করতে উদ্যমী হবে তাঁদেরকে শূলে চড়িয়ে ফাঁসী দেওয়া হবে।
কানুনীর সর্বপ্রথম উদ্দেশ্য ছিল, হাঙ্গেরীর রাজধানী বুদিকে বিজয় করা। উসমানী সেনাবাহিনী যাত্রা করার ৩ মাস পর বেলগার্ডে গিয়ে পৌঁছেন। যাত্রা পথে তারা টুনার রাস্তা অনুসরণ করেন । কেননা বুদি শহরটি টুনার পাদদেশে নির্মিত হয়েছিল এবং নদীর তীর ধরে এই যাত্রা অধিকতর সহজ ছিল। কানুনীর নেতৃত্বে ১ লক্ষ উসমানী সেনাবাহিনী বুদি সম্মুখে যাওয়ার সময় কানুনী খবর পান যে, হাঙ্গেরী মোহাচ ময়দানে সৈন্য সমাবেশ ঘটিয়েছে। এই খবর পাওয়ার পর তিনি মোহাচ অভিমুখে যাত্রা করার নির্দেশ দেন।


হিলাল কৌশল (এটা উসমানীদের বিশেষ এক কৌশলের নাম)

২৯শে আগস্ট ১৯২৬ সালে উসমানী সেনাবাহিনী কানুনী সুলতান সুলায়মান ও অনন্য সেনাপতির নেতৃত্বে মোহাচ ময়দানে এসে হাজির হয়।
হাঙ্গেরীয়ান সৈন্যরা তাঁদের সম্মুখ বাহিনীকে ময়দানে ধরে রাখার জন্য এক অদ্ভুত পদ্ধতি অবলম্বন করে। এই লক্ষে তারা তাঁদের অশ্বারোহী বাহিনীকে একে অপরের সাথে শিকল দিয়ে বেধে দেয়। যাতে করে তারা যখন তাঁদের ঘোড়া নিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হবে তখন যেন তাঁদের সামনে যারা পড়বে সকলকে দলিত মথিত করে অগ্রসর হতে পারে।উসমানী গোয়েন্দারা এই কথা জানার পর তারা কানুনী সুলতান সুলায়মানকে অবহিত করে। তাঁদের এই পরিকল্পনা শোনার পর কানুনী তাঁদের বিরুদ্ধে উসমানীদের বিশেষ যুদ্ধ হিলালী কৌশল (Hilal Taktiği) অবলম্বনের সিধান্ত নেয়। এই পদ্ধতি অনুযায়ী সৈন্যরা হিলালের মত করে (নতুন বাঁকা চাঁদ) হাঙ্গেরীয়ান সৈন্যদেরকে ঘিরে ফেলে তাঁদেরকে একদম মাঝখানে নিয়ে আসবে। এর পর তাঁদের উপর অনবরত বল নিক্ষেপ করবে এবং তীর নিক্ষেপ করবে। এর পর তাঁদেরকে চতুর্দিক দিক থেকে আক্রমণ করে নাস্তানাবুদ করে দিবে।
ইস্তানবুল থেকে যাত্রা করে হাঙ্গেরীতে পৌঁছতে পোঁছতে উসমানী সেনাবাহিনীর সৈন্য সংখ্যা দাড়ায় ৩ লক্ষে। কেননা যাত্রা পথে অনেকেই উসমানী বাহিনীতে যোগ দেয়। আর হাঙ্গেরী সেনাবাহিনীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৫০ হাজার।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে কানুনী সুলতান সুলেয়মান আকাশের দিকে হাত তুলে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে এই দোয়া করেন।
ইলাহী, হে প্রভু! সকল শক্তি এবং ক্ষমতার মালিক তুমি। সকল সাহায্য এবং সুরক্ষা তোমার পক্ষ থেকে। হে আল্লাহ তুমি উম্মতে মুহাম্মদীকে সাহায্য কর
১৫২৬ সালে ২৯ শে আগস্ট আসরের পর বহুল প্রত্যাশিত সেই যুদ্ধ শুরু হয়। সেই সময়ে উসমানী বাহিনীর সেনাপতিত্ত্বে ছিলেন পারগালী ইব্রাহীম পাশা এই সময়ে হাঙ্গেরীয়ান বাহিনী প্রবল বেগে উসমানী বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল কেন্দ্র থেকে যুদ্ধ পরিচালনাকারী মূল সেনাপতি কানুনী সুলতান সুলেয়মানের উপরে আক্রমণ করা। হাঙ্গেরিয়ান শত্রুরা আক্রমণ করার সাথে সাথেই উসমানী সেনাবাহিনী তাঁদের যুদ্ধ কৌশলের অংশ হিসাবে পিছু হটেন এবং এটাকে সুযোগ মনে করে হাঙ্গেরীয়ান বাহিনী ভেতরে ঢুঁকে পড়ে। এর পর উসমানী বাহিনী প্রথমে পাশে থেকে পরে পেছন দিক থেকে ঘিরে ফেলে তাঁদের উপর আগুনের গোলা নিক্ষেপ করতে থাকে। হাঙ্গেরীয়ান বাহিনী কিছু বুঝে উঠার আগেই এক ভয়াবহ আক্রমণের মুখোমুখি হয়ে পালাতে শুরু করে। উসমানীদের আক্রমনে নাস্তানাবুদ হয়ে অনেকেই নিহত ও আহত হয়। হাঙ্গেরীয়ান রাজা দ্বিতীয় লাজস এক গর্তে মৃত অবস্থায় খুঁজে পাওয়া যায়। এই যুদ্ধ দুই ঘণ্টা স্থায়ী হয়। যে সকল হাঙ্গেরীয়ান সেনা কোনভাবে প্রানে বাঁচাতে সক্ষম হলেও তারা অন্ধকাঁরে দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে। এই ভাবে মহান আল্লাহ মুসলমানদেরকে এক বড় বিজয় দান করেন।
কানুনী সুলতান সুলায়মান এই যুদ্ধের পর তার সৈন্যদেরকে ৩ দিন বিশ্রাম গ্রহনের সুযোগদান করেন। এর পর তারা বুদিনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। খ্রিষ্টানরা তাঁদের সেনাবাহিনীর এই ভয়াবহ পরাজয় এবং তাঁদের রাজার মৃত্যুর কথা শুনে শহর ছেড়ে পালিয়ে যায়। শহরের দায়িত্ত্বে থাকা ইয়াহুদি নেতা সালামন ইয়াসেফ কোন প্রকার প্রতিরোধ না করে শহরের চাবি কানুনীর হাতে সমর্পণ করেন।
এই ভাবে কোন প্রকার রক্তপাত ছাড়াই বুদিনকে মুসলিমগণ বিজয় করতে সক্ষম হন। কানুনী এখানে ১৪ দিন অবস্থান করার পর, ইস্তানবুলে ফেরার পথে আরও অনেক কেল্লাকে বিজয় করে ইস্তানবুলে ফিরে যান। এর পর যে সকল হাঙ্গেরীয়ান তার কাছে আশ্রয় চান, তিনি তাঁদেরকে ওয়াদা দেন যে, তিনি তাঁদেরই মধ্য থেকে যাপলিয়া নামক একজনকে রাজা হিসাবে নিয়োগ দিবেন।

এনাতোলিয়ার বিদ্রোহঃ
কানুনী সুলতান সুলায়মান অভিযানে থাকার সময়, তার অনুপস্থিতিতে এনাতোলিয়ার কিছু গভর্নর বেশী কর আদায় করে। এটাকে পুঁজি করে ফুলিয়ে ফাপিয়ে অনেক অঞ্চলের জনগণ বিদ্রোহ করে বসে। এই বিদ্রোহীদের অধিকাংশই ছিল তুর্কমেন। তারা সুউন খোজা নামক এক ব্যক্তির নেতৃত্বে এই বিদ্রোহ ঘোষণা করে। সুলতান সুলেয়মান এই খবর পাওয়ার সাথে সাথেই তার কিছু বিশ্বস্ত পাশাকে পাঠান বিদ্রোহ দমন করার জন্য। তারা অতি অল্প সময়েই এই বিদ্রোহ দমন করতে সক্ষম হন।
১৫২৭ সালে আদানা এবং তারসুসে এই বিদ্রোহ শুরু হয়। এই বিদ্রোহ দমন করার পর আদানায় ‘ওলী খালিফা’ নামক আরেকটি বিদ্রোহ নতুন করে শুরু হয়। এই সকল বিদ্রোহ দমন করার পরেও এনাতোলিয়াতে শিয়া ও তুর্কমেনদের বিদ্রোহ চলতেছিল। পরবর্তীতে এই সকল বিদ্রোহকে দমন করার জন্য কানুনী সুলতান সুলেয়মান তার বড় সেনাপতি ইব্রাহীম পাশাকে পাঠান। ইব্রাহীম পাশা এই দায়িত্ত্ব পাওয়ার পর তিনি সেখানে এসে এই বিদ্রোহকে সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করেন। কিন্তু এর এক বছর পর পুনরায় আদানাতে আর একটি বিদ্রোহ শুরু হয়। এই বিদ্রো পরে পিরি বেয় নামক সেনাপতি নির্মূল করেন।

প্রথম ভিয়েনা অবরোধঃ
বুদিনকে দখল করার পর কানুনী সুলতান সুলেয়মান যাপলইয়াকে হাঙ্গেরীর রাজা হিসাবে ঘোষণা করেন। তার এই ঘোষণা উসমানী এবং হাঙ্গেরীয়ানদের মধ্যকার সম্পর্ককে শক্তিশালী করে। অপরদিকে হাঙ্গেরীয়ান রাজা ফারদিনান্দ তার নিজের ক্ষমতাকে স্থায়ী করার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। এই সমস্যা সমাধানের জন্য এবং বন্ধু রাষ্ট্র ফ্রাস্নকে জার্মানিদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য কানুনী পুনরায় যুদ্ধ যাত্রা করেন। কেননা ফ্রান্সিসরা বার বার উসমানীদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছিল।
কনুনী যুদ্ধ যাত্রা করার পূর্বে তার উজীরে আজম ইব্রাহীম পাশাকে অনেক বড় দায়িত্ত্ব দেন। তাকে তিনি এমন ক্ষমতা দেন যে, সে প্রায় খলিফার পদমর্যাদা সমপন্ন হয়ে যায়।
কানুনী সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করার পরে ১০ মে ১৫২৯ সালে, দুই লক্ষ সৈন্য নিয়ে ইস্তানবুল থেকে বুদিনের উপর দিয়ে যাত্রা করেন। উসমানী বাহিনী ১৯শে আগস্ট হাঙ্গেরীতে গিয়ে পৌঁছে। কানুনী তার বাহিনী নিয়ে হাঙ্গেরীতে পৌঁছার পর, যাপলিয়া তার কাছে এসে তার হাতে বাইয়াত গ্রহন করে তার নতুন দায়িত্ত্ব শুরু করে। সেখানে কানুনী তার বাহিনী সহ ছয়দিন পর্যন্ত অবস্থান করেন। বুদিনের রাজপ্রাসাদে যাপলিয়াকে হাঙ্গেরীর রাজা হিসাবে ঘোষণা দিয়ে ভিয়েনায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন। এখান থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, উসমানী বাহিনী যখন ইস্তানবুল থেকে যাত্রা করেছিল তখন জানত না যে, তারা ভিয়েনার উপর দিয়ে যাবে। অর্থাৎ ভিয়েনা অবরোধের সিধান্ত বুদিনে থাকা অবস্থায় নেওয়া হয়। ভিয়েনার উপর দিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল সেখানে আশ্রয় গ্রহন কারী ফারদিনান্দকে গ্রেফতার করা। কিন্তু ভিয়েনায় যাওয়ার পর জানতে পারেন যে, ফারদিনান্দ ভিয়েনা থেকে পালিয়ে অষ্ট্রিয়াতে আশ্রয় নিয়েছে।
২৭ শে জুলাই উসমানী বাহিনী ভিয়েনায় পৌঁছে সিম্মেরিং নামক অঞ্চলে তাবু স্থাপন করে। সেখান থেকে অবরোধ পরিচালিত করার সিধান্ত নেওয়া হয়। এইভাবে অবরোধ করে ভিয়েনার কেল্লাকে কয়েক দফা সর্বাত্মক আক্রমণ করার পরেও শক্তিশালী প্রতিরোধের কারণে কোন ফলাফল পাওয়া যায়নি। অক্টোবর মাস শুরু হতেও ভিয়েনার বিখ্যাত ঠাণ্ডা শুরু হয়ে যায়। একই সাথে বৃষ্টির সময়ও শুরু হয়ে যায়।পদাতিক সৈন্যরা এই বৃষ্টির নিচেই যুদ্ধ করতে থাকেন।
উসমানী সেনাবাহিনী ভিয়েনা অবরোধের পরিকল্পনা আগে না করার কারণে তারা ভারী বল নিয়ে আসেনি। কেননা এই অবরোধের সিধান্ত রাস্তায় থাকা অবস্থায় নেওয়া হয়েছিল। বৃষ্টি এবং অত্যধিক ঠাণ্ডার কারণে সৈন্যরা কাঁপতে থাকে এবং পশুদের জন্য কোন চারন ভুমিও পাওয়া যাচ্ছিল না। অক্টোবর মাসে ভিয়েনার আবহাওয়া অত্যধিক ঠাণ্ডা হত। এই ঠাণ্ডার উপযুক্ত তাবু নিয়ে যুদ্ধ করতে বের হওয়ার ফলে সৈন্যদের পক্ষে যুদ্ধ করা সম্ভব ছিল না। যার ফলে এই অবরোধ ২১ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয় কিন্তু কোন ফলাফল আনতে পারেনি।
কানুনী যখন বুঝতে পারেন যে, এই অবস্থায় এবং এই আবহাওয়ায় যুদ্ধ করে কোন ফলাফল বয়ে আনা সম্ভব নয়, তখন তিনি তার কমান্ডারদেরকে অবরোধ প্রত্যাহার করার নির্দেশ দেন এবং ইস্তানবুলে ফিরে যাওয়ার সিধান্ত নেন।
কানুনী ইস্তানবুলে ফিরে আসার পর পরবর্তী গ্রীষ্মকালে ইস্তানবুলে শিশুদের জন্য “সুন্নতে খৎনা” র আয়োজন করেন। দীর্ঘদিন ধরে চলে এই অনুষ্ঠানে উসমানী রাষ্ট্রের বিভিন্ন গভর্নরগণ ও অন্যান্য দেশের রাজাগণও দাওয়াত প্রাপ্ত হন। এই অনুষ্ঠানে এত বেশী পরিমানে হাদিয়া আসে যে, যা গননা করা অসম্ভব হয়ে দাড়ায়।

কানুনীর হাঙ্গেরী ও জার্মানী অভিমুখে যাত্রাঃ
কানুনী সুলতান সুলেয়মান ইস্তানবুলে ফেরার পরেই রাজা ফারদিনান্দ জার্মানদের সাহায্য নিয়ে পুনরায় বুদিনে আক্রমণ করে। এই আক্রমনে রাগান্বিত হয়ে কানুনী পুনরায় প্রস্তুতি নিয়ে হাঙ্গেরীয়ান ও জার্মানদেরকে শায়েস্তা করার জন্য তাঁদের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। কানুনী তার বাহিনী নিয়ে বেলগার্ডে পৌঁছলে, ফারদিনান্দ তার নিকটে দূত পাঠায়। তিনি দূত মারফত কানুনীকে বলেন যে, তাকে যদি হাঙ্গেরীর রাজা বানানো হয় তাহলে তিনি উসমানী খিলাফাতকে ট্যাক্স দিবেন এবং তাঁদের নেতৃত্বকে স্বীকার করে নিবেন। কিন্তু কানুনী তার এই প্রস্তাবকে প্রত্যাখান করেন এবং তার যাত্রা অব্যাহত রাখেন। কিন্তু জার্মান সাম্রাজ্য ভয়ে কোন প্রকার প্রতিরোধ গড়ে না তোলায় তিনি বিনা বাঁধায় অনেক নতুন দুর্গ ও শহর বিজয় করে ইস্তানবুলে ফিরে আসেন। পরবর্তীতে ইরানের রাজনৈতিক অবস্থা পরিবর্তন হওয়ায়, উসমানী খিলাফাত ফারদিনান্দের প্রস্তাবকে গ্রহন করে চুক্তি স্বাক্ষর করে।
এনাতোলিয়ার বিদ্রোহ এবং “ ফাতহ-ই-ইরাকাইন” অভিযান
কানুনী সুলতান সুলায়মান যখন ইউরোপ অভিযান নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন তখন তার অনুপস্থিতিকে সুযোগ ভেবে কিছু গ্রুপ বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এই বিদ্রোহীদের নেতৃত্বে ছিল ইরানের সাফাবি রাষ্ট্রের সাথে একাত্ত্বতা ঘোষণা কারী আলেবি গণ। এই বিদ্রোহসমূহ ছাড়াও আরও কিছু বিদ্রোহ দানা বেধে উঠেছিল। সে সময়ে কানুনী মোহাচ অভিযানে ছিলেন। কানুনী যখনই পাশ্চাত্য অভিমুখে কোন অভিযানে বের হতেন তখনই নতুন নতুন বিদ্রোহ দানা বেধে উঠত। ফলে তিনি ফিরে এসেই বিদ্রোহ দমনের জন্য সেনাবাহিনী পাঠাতে বাধ্য হতেন। খুবই আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, উসমানী খিলাফাত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে হয়তবা পাশ্চাত্যের হাঙ্গেরিয়ানদের সাথে অথবা প্রাচ্যের ইরানি শিয়াদের সাথে যুদ্ধরত ছিলেন। এক সমস্যা সমাধান করার আগেই আরেক এক নতুন সমস্যার জন্ম নিত।
এই সমস্যাকে সমাধান করার জন্য কানুনী সুলতান সুলায়মান হাঙ্গেরী অভিযান থেকে ফিরে আসতে না আসতেই উসমানী খিলাফাতের ইতিহাসে “ফাতহ-ই-ইরাকাইন” নামক প্রসিদ্ধ অভিযানে বেরিয়ে পড়েন। এই অভিযানে কানুনীর সাথে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও চিত্রশিল্পী মাত্রাকচি নাসুহও অংশগ্রহন করেন। যাত্রা পথে তিনি গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহের বর্ণনা দিতেন এবং এগুলোকে ছবি একে সবার সামনে তুলে ধরতেন।
কানুনী সুলতান সুলায়মান এনাতলিয়ার দায়িত্ত্ব তার পুত্র মুস্তাফার হাতে অর্পণ করে, কুতাহইয়া দিয়ে কনিয়ায় পৌঁছান। সেখানে তিনি যাত্রা বিরতি করে কয়েকদিন অবস্থান করেন এবং মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমির মাজার যিয়ারত করেন। এরপর তিনি যাত্রা করে যুদ্ধে অংশগ্রহন করেন। এর পর তিনি এরজিনযান ও এরজুরুম হয়ে নতুন বিজিত হওয়া এরচিশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। ২০শে সেপ্টেম্বর তিনি তাব্রিজে পৌঁছালে জনগণ তাকে এক বিশাল সমাবেশের মাধ্যমে বরণ করে নেয়। তাব্রিজে পৌঁছার পর প্রচণ্ড শীতকে উপেক্ষা করে তিনি তার যাত্রাকে অব্যাহত রাখেন এবং কাসর-ই শিরিনে পৌঁছান।
কানুনী সুলতান সুলায়মান তার উজিরে আজম ইব্রাহীম পাশাকে বাগদাদে পাঠান। এরপর তিনি নিজে শহরে প্রবেশ করেন। বিশাল বাহিনী নিয়ে প্রবেশকারী কানুনী সুলতান সুলায়মান প্রথমে ইমাম আজম আবু হানিফার মাজারে যান এবং তার কবর যিয়ারত করেন। কানুনী সুলতান সুলায়মান বাগদাদে তার অবস্থানকে শক্তিশালী করার পর, পত্র মারফত তার অবস্থানকে সকল জায়গায় জানিয়ে দেন।
এই শীতকালীন সময়ে কানুনী ৪ মাস পর্যন্ত বাগদাদে অবস্থান করেন এবং এই সময়ে বাগদাদ এবং তার আশেপাশের সকল এলাকার প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি প্রসাশনকে মজবুত করেন। এর পাশাপাশি ইমামে আজম আবু হানিফা এবং শায়খ আব্দুল কাদির জিলানীর কবরকে বাঁধায় করেন। বাগদাদে অবস্থাকালে কারবালা সহ অনেক গুরত্ত্বপূর্ণ স্থান যিয়ারত করেন।
বাগদাদের সকল কাজকে এইভাবে সমাধা করার পর ইস্তানবুলে ফেরার সময় তিনি তাব্রিজে যান। এই সময়ে তাহমাস্প এর ভাই সাম মির্জা তাব্রিজে এসে কানুনীর কাছে আশ্রয় গ্রহন করেন।
ফেরার পথে কানুনী মেরেন্দ-হয় থেকে এরচিশ হয়ে আদিলজেওয়াজে যান। সেখান থেকে আহলাত, দিয়ারবাকের এবং হালেপ হয়ে ইস্তানবুলে ফিরে আসেন। এখান থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, কানুনী কক্ষনোই তার সিংহাসনে বসে থাকতেন না। তিনি সব সময় অভিযানে বের হতেন। মূলত তাকে একজন মহান ও বড় সুলতান করার পেছনে মূল কারণও ছিল এটাই।

একটি ভুল-বুঝাবুঝি

শান্তি প্রক্রিয়ার সময়কে কাজে লাগিয়ে উজিরে আজম ইব্রাহীম পাশা ফ্রান্সের সাথে কিছু অর্থনৈতিক চুক্তি করেন। উদ্দেশ্য ছিল অর্থনীতিক দিক থেকে সাম্রাজ্যকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও বেশী শক্তিশালী করে তোলা এবং রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে বড় করা। ফলশ্রুতিতে ১৫৩৬ সালে (কারো কারো মতে ১৫৩৫ সালে) উসমানী খিলাফাতের রাষ্ট্রের সাথে ফ্রান্সের দ্বিপাক্ষিক স্বার্থের ভিত্তিতে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী উভয় দেশের নাগরিকরা উভয় দেশে ভ্রমনের, ব্যবসা করার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান স্থাপনের সুযোগ পাবে।
এই চুক্তির ফলে কানুনীর সমালোচনা করলেও, আমাদের মতে এই সমালোচনার মূল কারণ হল, চুক্তিটিকে ভালোভাবে না বুঝা। যদিও বলা হয়ে থাকে যে এই চুক্তির মাধ্যমে ফ্রান্সিসদেরকে বেশী সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। আসলে তা নয়, উভয় দেশই সমান সুযোগ সুবিধা পেয়েছিল। তবে ফ্রান্সিসরা তাঁদের এই সুযোগকে ভালোভাবে কাজে লাগতে পারলেও উসমানীগণ এটাকে কাজে লাগাতে পারেননি। এই ক্ষেত্রে সুলতানকে দোষারূপ না করে সেই সময়ে বণিকগোষ্ঠী ও যারা এই সকল কাজে নিয়োজিত ছিল তাঁদের ভুল হিসাবে দেখতে হবে।
শায়খুল ইসলাম হযরত যামবিল্লি আলী (রঃ) এর মৃত্যুঃ
উসমানী খিলাফাতের বিশেষ করে ইয়াভুজ সুলতান সেলিমের গুরুত্বপূর্ণ সিধান্তসমূহ নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি বড় ভুমিকা পালন কারী যামবিল্লি আলী (র:) ১৫৩৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন।ইয়াভুজ সুলতান সেলিমের মিশর ও ইরান অভিযানের ফতওয়াও এই শায়খুল ইসলামই দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয় তার সাহসী সিধান্ত ও ফতওয়ার ফলে তিনি পরওয়াহীন বলে পরিচিত ছিলেন। মুসলমানদের উপর অভিযান পরিচালনা যাবে কি যাবে না এই বিষয়ে তার যে ফতওয়া ছিল এই ব্যাপারে বহু বিতর্ক থাকলেও ইয়াভুজ সুলতান সেলিমের অনেক সিধান্তের ব্যাপারে তিনি হস্তক্ষেপ করতেন। তার এই সকল বিষয় দেখলেই বুঝা যায় তিনি তৎকালীন খলিফা দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন না।
যামবিল্লির মৃত্যুর পর তার স্থলাভিষিক্ত হন ইবনে কামাল। তিনিও তার পূর্ব সুরির মত জ্ঞানে ছিলেন পরিপূর্ণ একজন আলেম।
উজিরে আজম ইব্রাহীম পাশার সমাপ্তি
ইব্রাহীম পাশা দীর্ঘ ১৪ বছর কানুনী সুলতান সুলায়মানের উজিরে আজম হিসাবে দায়িত্ত্বপালন করেন। কিছু সামাজিক ও রাজনৈতিক দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগে সুলতান তাকে ফাঁসী দেওয়ার নির্দেশ দেন। ইব্রাহীম পাশার ফাঁসির পর আয়াস মুহাম্মেদ পাশাকে কানুনী তার উজিরে আজম হিসাবে নিয়োগ দেন।

উসমানীদের সাগরের উপর আধিপত্যঃ
কানুনী সুলতান সুলায়মান ছিলেন একজন দূরদৃষ্টি সম্পন্ন সুলতান। এই জন্য তিনি নৌ-শক্তির উপর ব্যাপক গুরুত্ত্বারোপ করেন। সেই সময়ের বিখ্যাত নাবিক বারবারসকে ইস্তানবুলে আমন্ত্রন করে তাকে ‘Beylerbeyi’ উপাধিতে ভূষিত করে, সে যে ভাবে চায় সেভাবে যেন জাহাজ নির্মাণ করতে পারে এই জন্য তাকে সকল ধরণের সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয়।
কানুনী ইরাকাইন অভিযান থেকে ফিরে এসে ‘খাইরুদ্দিন’ নামে ভূষিতকারী বারবারসকে কাপ্তান পাশালিক নাম দেন এবং তাকে ইতালির সমুদ্রতীরে প্রেরন করেন। আলজেরিয়ার অধিবাসী বারবারস খাইরুদ্দিন পাশাকে সমগ্র ইউরোপ খুব ভালোভাবেই জানত এবং তাকে ভয় করত। উসমানী খিলাফাতের নৌবাহিনী ভূমধ্য সাগরের অনেকগুলো যুদ্ধে বিজয় লাভ করে এবং কানুনীর আভলনিয়া (Avlonya) অভিযানের সময় এজিয়ান সাগরের অনেক গুলো দ্বীপকে বিজয় করে।
সাগরে এই সকল অভিযান যে সকল বড় ফলাফল বয়ে এনেছিল তার মধ্যে সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল প্রেভেযেতে অর্জিত বিজয়। ২৭ শে সেপ্টেম্বর ১৫৩৮ সালের এই সমুদ্র যুদ্ধে উসমানী খিলাফাতের সেনাপতি বারবারস খারুদ্দিন পাশা, অ্যান্ডেরা দরিয়া (Andera Doria) র শত্রু বাহিনীকে নাস্তানাবুদ করে দেয়।
পর্তুগিজরা লোহিত সাগরের তীরবর্তী মুসলমানদেরকে হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি মুসলমানদের পুণ্যভুমি হারামাইন শরীফকে (মক্কা ও মদিনা) ধ্বংস করে দিবে বলে হুমকি দেয়। তাঁদের এই হুমকির জবাবে কানুনী সুলতান সুলায়মান ১৫৩৮ সালে তার মিশরের গভর্নর হাদিম সুলায়মানকে পাঠান তাঁদের এই দুঃসাহসকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য। অতীতে ভারতীয় মুসলমানদেরকে হুমকি প্রদান কারী পর্তুগিজদেরকে উসমানী নৌবাহিনী যেভাবে সালমান রইসের নেতৃত্বে নাস্তানাবুদ করে দিয়েছিল, এবারও তারা হাদিম সুলায়মানের নেতৃত্বে লোহিত সাগরের তীরবর্তী মুসলমানদের এবং হারামাইন শরীফের নিরাপত্ত্বা নিশ্চিত করে ইস্তানবুলে ফিরে আসেন।

5 Responses

  1. cialis official site
    cialis official site at |

    […] cialis 5 […]

  2. cialis without a doctor prescription

    […] cialis 5mg […]

  3. where can i buy a viagra
    where can i buy a viagra at |

    […] where can i buy a viagra […]

  4. where can i buy cialis online
    where can i buy cialis online at |

    […] where can i buy cialis […]

  5. ed pills over the counter
    ed pills over the counter at |

    […] ed pills cvs […]

Leave a Reply