আহমদ ছফারে নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে একধরনের মোহাচ্ছন্নতা আছে। বুদ্ধি বা চিন্তাচর্চার অপরিসীম বন্ধ্যাত্বের মধ্যেও বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা বুদ্ধিচর্চার ভাব ধরেন, তাদের অনেকেরই পাঠ শুরু হয় আহমদ ছফার ‘যদ্যপি আমার গুরু’, ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ কিংবা ‘’বাঙালি মুসলমানের মন’ দিয়ে।
অসাধারন লেখনী-শক্তি আহমদ ছফাকে অনন্যতা দিয়েছে। ছফা খুব শক্তিশালীভাবে সমালোচনা করতে পারেন, এবং যেই সময়ে তিনি ছিলেন—– নিসঃন্দেহেই স্বপ্ন দেখতেন একটি সমাজতান্ত্রিক সমাজ গড়ার। সমাজতান্ত্রিক সমাজের স্বপ্ন তিনি দেখতেই পারেন,তাতে আমাদের সমস্যা থাকার কথা না; নেই-ও। তবে এই স্বপ্নের মোহাচ্ছন্নতা বাঙালি সমাজ ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যত অনুমানে আহমদ ছফাকে সঠিক পথ দেখায়নি।
২.
‘সাম্প্রতিক বিবেচনাঃ বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ আহমদ ছফার শুরুর দিকে লেখা বই। ১৯৭২সালে বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণে লেখক দাবি করেছেন—– “এই গ্রন্থে যে সকল মতামত প্রকাশিত হয়েছে সেগুলো বাহাত্তর সালে যতটা প্রাসঙ্গিক এবং সত্য ছিল, এই সাতানব্বই সালে তাদের তাৎপর্য ক্ষুন্ন না হয়ে বরং অনেকগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।“ ফলে বোঝাই যায়, এই বইটি তার গুরুত্বপূর্ণ কর্মের একটি। সবচেয়ে বড় কথা, বইটি এখনো অনেক তরুণকে আলোড়িত করে। ছফাকে কেন্দ্র করেই অনেক তরুণের স্বপ্ন আবর্তন করে। বাংলাদেশে একটি সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা, সংস্কৃতি, সমাজ নির্মানের স্বপ্নে তারেই পথিকৃৎ ভাবেন।
৩.
বাংলাদেশে এখন বুদ্ধিজীবি কারা? টেলিভিশনে যারা কথার খই ফোঁটান, পত্রিকার পাতায় যারা গালিবাজি আর স্বপ্নবাজি করে বেড়ান, তারা? যারা গালিবাজি করেন, তাদের কথা না হয় বাদই দিলাম। যারা স্বপ্নবাজি করেন, অতীত ইতিহাস রোমন্থন করে যারা নানান সূযোগ-সুবিধা আদায় করেন,তারা আর যা-ই হোক, বাঙালির ভবিষ্যত নির্মানে কোন অনুপ্রেরণা হবেননা, এটা চোখ বন্ধ করেই বলা যায়। আমাদের বুদ্ধিজীবিদের আড়ষ্টতা, সাংবাদিকদের অসততা; নিসঃন্দেহেই বাংলাদেশের ভবিষ্যত নির্মাণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই সময়ে বড় বাঁধা। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা একটু পদোন্নতি, বিদেশগমণের লক্ষ্যে অসাধু রাজনীতিবিদদের দ্বারে দ্বারে ঘোরেন। আমাদের ছাত্ররা বিসিএস, চাকরির পরীক্ষা নিয়ে ভাবনার কালে বাংলাদেশের ভবিষ্যত নির্মাণে তাদের যে দায় আছে, দায়িত্ব আছে, সেই বোধ হারিয়ে ফেলেন। আমাদের রাজনীতিবিদরা আমাদেরকে যে রাজনৈতিক সঙ্কটে ফেলেছেন, যে মাফিয়ামার্কা রাজনৈতিক সংস্কৃতি নির্মাণ করেছেন; তাত্থেকে উদ্ধারে আর কত প্রজন্মকে ভুগতে হবে, আল্লাহই ভালো জানেন!
বাঙালির বুদ্ধিজীবিতায় এই যে জড়ত্ব, এই যে বন্ধ্যাত্ব— এইটা আজকের না। আহমদ ছফা এই বিষয়টাই শুরুতে অসাধারণভাবে তুলে ধরেছেন। জাতির ভবিষ্যত অনুমান ও নির্মাণে তাদের প্রচেষ্টার বিপরীতে তারা ব্যস্ত থেকেছেন নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নে। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের আত্মঘাতী রাজনীতি দেশের ভবিষ্যত নির্মাণের বিপরীতে, মেহনতি মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের বিপরীতে রাজনীতিবিদদের ব্যক্তিগত, দলীয় স্বার্থার্জনে ব্যস্ত ছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্বে যেখানে কোটিপতির সংখ্যা ছিল ‘এক’, সেই সংখ্যাই এখন হাজার হাজার।
দেশের সাধারণ মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে সাংস্কৃতিক জগতে এলিট শ্রেণি তৈরি করে, কবি-সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক কর্মীদের চাটুকারিতার মধ্যে ফেলে দিয়ে; জাতীয় আশা-আকাঙ্ক্ষার স্বতঃ স্ফুর্ত অগ্রসরতাকে হত্যা করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে রেখে, রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে পশ্চাত্মখী করে রাখা হয়েছে। বিদেশি অনুকরণ দাসত্ব তৈরি করেছে। —এই সব কথাই সর্বাংশে সত্য এবং ছফা বেশ সুন্দরভাবে বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করেছেন।
৪.
কিন্তু একটা জায়গায় এসে আহমদ ছফা সেই একই ভুল করেছেন। ছফা বাঙালির ধর্মাচারণের মধ্যে শুধু পশ্চাৎপদতাই দেখেছেন। মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক যেমন তার্কি থেকে ধর্মীয় সবকিছুকে ঝেটিয়ে বিদায় করেছিলেন, ছফা বাংলাদেশেও সে রকম বলপ্রয়োগ চান। ধর্মকে আগাগোড়া কুসংস্কারাচ্ছন্নতা ও পশ্চাৎপদ আকারে ব্যাখ্যা করেন। আহমদ ছফারা এইখানে এসেই থেমে যান। বাঙালির সাহসকে প্রশংসা করেন, আবার সেই বাঙালির ধর্মাচারণেই চরম বেদনাবোধ করেন। বাঙালির চাওয়া-পাওয়ামত সংস্কৃতি নির্মাণ করতে চান আবার সেই সংস্কৃতি নির্মাণে ধর্মের ভুমিকা অস্বীকার করেন। সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করেন, আবার সাম্রাজ্যের অধিকারীদের দিয়েই উদাহণ দেন। মানবিক হতে চান, কিন্তু মানবিকতা অন্যের কাছ থেকে ধার করে বাঙালিকে গিলাতে চান।
ধর্মের মধ্যে যেই অসীম সম্ভাবনা আছে, সেটাকে তিনি দেখতে পাননা। বাঙলায় ধর্মের ইতিহাস যথাযথ পর্যালোচনা না করেই সব সমস্যার অন্যতম উৎস তিনি ঐ ধর্মেই দেখতে পান। ধর্মরে পশ্চিমা ধারনায় ব্যাখ্যা করেন। সমাজতন্ত্রের দাবিদারদের সত্যিকার সমাজতন্ত্রী না হতে পারায় ভর্তসনা করেন, কিন্তু স্যেক্যুলার রাজনীতিকদের দ্বারা অর্জিত মুসলিম রাষ্ট্র ‘পাকিস্তান’কে তিনি ‘ধর্মরাষ্ট্র’ বানান। আর বাঙালির মুক্তি আন্দোলনকে ধর্মের কব্জা থেকে মুক্তি আন্দোলন বলে আখ্যায়িত করেন, আবার একই সাথে এই দেশের ৮০ভাগ মোসলমানের মধ্যে ৬৯ভাগ কড়া মুসলিম বলে হা-হুতাশ করেন। তার নিজের বক্তব্যগুলোই কেমন যেন উল্টে-পাল্টে যায়। আহমদ ছফাকেও মনে হতে থাকে অতিমাত্রায় স্বপ্নবাজ। সমাজতন্ত্রের কবি, ভাবুক, চিত্রকর, মানবপ্রেমিক সংগ্রামী, জ্ঞানমিশ্রিত কর্মী বাহিনী ছাড়া শুধু সাংবিধানিক ঘোষনায় যে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হতে পারেনা; এই সত্য তিনি বোঝেন, পর্যালোচনা করেন। কিন্তু ইসলামের ক্ষেত্রে আসলে তিনিও আড়ষ্ট হয়ে যান, এ ক্ষেত্রে তিনি সরলীকৃত ইতিহাস বর্ণনাকারী হয়ে যান, পর্যালোচক, সমালোচক হতে পারেননা; সোজা নাকচ করে দেন।
৫.
আমাদের এখানে স্যেক্যুলারিজমের পর্যালোচনা হয়না, সমাজতন্ত্রের পর্যালোচনা হয়না, ইসলামের পর্যালোচনা হয়না, লিবারেলিজম-মডার্নিজমের পর্যালোচনা হয়না। আমরা অন্ধ। যেটা ধরি, সেটা ধরেই থাকি। এই অস্থির সময়ে আপনি কাকে নাকচ করবেন? কেন নাকচ করবেন? নৈতিকভাবে বিরোধিতা না করে জোর করে খেদিয়ে দেয়ার যে সংস্কৃতি; এটা বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক গভীরে শেকড় গড়েছে। আহমদ ছফাও যেখান থেকে বেরুতে পারেননি। সমাজতন্ত্র নিয়ে অতিমাত্রায় আবেগি হয়েছেন। সমাজতন্ত্র তো হয়-ই নি বরং শোষন বেড়েছে। চাটুকার বেড়েছে। সর্বক্ষেত্রে অসাধুতা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। আমরা ‘মুক্তি’র কথা বলি; সেই মুক্তিতো পশ্চিমা অর্থে মুক্তি। সে মুক্তি কেউ চাইতেই পারে। কিন্তু এই অঞ্চলে যে অন্যভাবে চিন্তা করার লোক থাকতে পারে, অন্য মতাদর্শে মুক্তি খোঁজার সম্ভাবনা খুঁজতে পারে। সেই সম্ভাবনা বন্ধ করার সাধ্য কার?
না। বাংলাদেশ সঠিক পথে আগায়নি। আমরা নিজেদের বিকাশ না করে অন্যের গলা চেপে ধরেছি। এই যে সংস্কৃতি আমরা তৈরি করেছি, তা থেকে মুক্তি দরকার। সবার জন্য সূযোগ চাই, সারাদেশে। বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তির চর্চা চাই। অতীতের নির্মোহ বিশ্লেষন চাই। ভবিষ্যত নির্মানের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা চাই। আমাদের বুদ্ধিবৃত্তি আর চিন্তার বিকাশ ঘটুক।





সমাজতন্ত্র কে পুজিবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থার সাথে মিলাইয়া আপনি বোক্সুদের পরিচয় দিলেন। প্রথমে ভাবছিলাম ভালো লিখতাছেন পরে দেখি!
ধর্ম, ইসলাম ধর্ম সাম্রাজ্যবাদী ধর্ম। বাঙালি সংস্কৃতি আর ইসলাম সাংঘর্ষিক এইটা মাথায় রাখতে হবে। পোষাক, আচার অনুষ্ঠান ইত্যাদি বাঙালির অনেক কিছুই ইসলামে নিষেধ।