
“সুতরাং এরা যা বলে সে বিষয়ে ধৈর্য ধারণ করুন এবং আপনার পালনকর্তার প্রশংসা পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করুন সূর্যোদয়ের পূর্বে, সূর্যাস্তের পূর্বে এবং পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করুন রাত্রির কিছু অংশ ও বাদিভাগে, সম্ভবত: তাতে আপনি সন্তুষ্ট হবেন।“ (সূরা ত্বহা, আয়াত-১৩০)
“অতএব দুর্ভোগ সেসব নামাযীর,যারা তাদের নামায সম্বন্ধে বে-খবর; যারা তালোক-দেখানোর জন্য করে” (সূরা মাউন, আয়াত-৩-৬)
ছোটবেলায় ধর্ম বইয়ে পড়েছিলাম,নামাযে দাঁড়িয়ে সিজদাহ-এর দিকে তাকায় থাকতে হয়।রুকুতে যেয়ে দুই পায়ের ফাকে।আবার বসে,সিজদাহের দিকে।মানে বুঝতাম না তখন।দৈনিক নামাযে দাঁড়িয়ে পায়ের কাছে রংবেরং এর মসজিদের মিনার দেখতাম,আর্কিটেকচার,ফুল-পাতা।গম্বুজ।আবার রুকুতে যেয়ে পায়ের দিকে তাকায় থাকতাম।আঙ্গুল নাচাইতাম।শেষ বৈঠকে বসে আড়চোখে আরেকজনের আঙ্গুল তোলা দেখতাম,আর ভাবতাম,দেখি,কে আগে তাশাহহুদ পড়ে!আর নামাযে দাঁড়িয়ে তো রাজ্যের যত চিন্তা,মাথায় আসতো।সমীকরণ মিলাতাম।
অনেকগুলা সুরা শিখেছিলাম।কেউ জিজ্ঞেস করলেই গড়গড় করে বলে দিতাম।অবাক হয়ে সে হয়তো বলতো,মাশাল্লাহ।খুব ভালো।
এখন কিছুটা বুঝি।ধর্ম বইয়ে পড়া সেই নামাযে দাড়ানোর নিয়মের কথা।ধরেন,আপনি আপনার বসের সামনে কিংবা স্যারের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।তাকে সবাই সম্মান করে।মানে খুবি শ্রদ্ধ্যেয় একজন মানুষ আর কি।বস আপনাকে কিছু বলছে।আপনার মধ্যে কমন কি কি সিমটম দেখা যাবে?আপনি নার্ভাস হয়ে যাবেন,আপনি অন্য দিকে তাকিয়ে থাকবেন।আর যদি আপনি অপরাধী হন,আপনার বস/বাবা/স্যার কিছু বলে,আপনি কোন দিকে তাকাবেন?নিচের দিকে।যতটা লজ্জ্বা,ভয় আপনার শরীরী ভাষায় ফুটিয়ে তোলা যায়,ততটাই দেখাবেন।সাহিত্যের ভাষায়,মাটির সাথে মিশে যেতে চাইবেন।নামাযে দাড়ালে আল্লাহ্ তাঁর বান্দার একদম কাছে চলে আসেন।একদম কাছে।আপনি সারাদিনের অনেক কষ্ট,অনেক অপরাধ,অনেক আর্জি নিয়ে তাঁর সামনে হাজির হন।চিন্তা করে দেখুন তো,একজন অপরাধী আপনি,কষ্টের পাথর বুকে নিয়ে দাঁড়ানো আপনি,নামাযে আছেন।আপনার সামনে আপনার মালিক উপস্থিত।আপনার এপ্রোচ তখন ঠিক কি রকম হবে?ঠিক সেইটাই হৃদয় দিয়ে উপলব্ধী করে নামায পড়লে ইনশাল্লাহ,নামায কবুল হয়ে যাবে।ধর্ম বইয়ে সবার জন্য সহজ করে লেখা হয়,কিন্তু কখনোই উপলব্ধীর বিষয়টা পরিষ্কার করা হয় না।
এবার আসি পরের অংশে।আমরা ছোটবেলায় সবাই কম-বেশী আরবী পড়া শিখেছি।ছোট ছোট সুরা শিখেছি।আমরা যদি একটু কষ্ট করে,দৈনিক বা দুই দিন এ একটি সুরার অর্থ মুখস্থ করে ফেলি,আর সেই সূরা দিয়েই সুন্নাত আর নফল নামাযটা পড়ে ফেলি,দেখবেন,নামাযে অনেক মনোযোগ আসবে।কোরান তিলাওয়াতটাও হহে যাবে।আর মসজিদে ইমাম যেই অংশ তিলাওয়াত করেন,সেটার অর্থ যদি নামাযের পরে তার কাছ থেকে জেনে নি,তাহলেই কিন্তু হয়ে যায়।শুধু ছোট ছোট সূরা শিখে বিশাল পুলসিরাত পার হবার দুঃসাহস না করাই ভালো।
নামাযে অনেক কথা মনে হয়।রাজ্যের চিন্তা,রাজ্যের হিসাব।স্বাভাবিক।আপনি নামাযে দাড়ালে শয়তান আপনাকে ছেড়ে দিবে না।শয়তান তখন আরো শক্ত করে জাকিয়ে বসবে।কারণ বান্দা নামায পড়ছে মানে শয়তানের সেনাবাহিনী থেকে একজন একজন করে কমে যাচ্ছে।শয়তান তা হতে দিবে কেন?আমাদের মানসিকভাবে দৃঢ় হবার চুড়ান্ত চ্যালেঞ্জ এখানে।আমাদের মনে সত্যি যদি এই উপলব্ধী আসে,আল্লাহ কে সামনে হাজির জেনে,তার কাছে ফরিয়াদ জানানোর জন্যই নামায পড়ছি,এটা বেহেশতে যাবার টিকিট না শুধু,তবেই দেখবেন,আপনি দৃঢ় হবেন।ব্যাক্তিজীবনেও এর প্রভাব অসীম।
পাঞ্জাবী পড়েই নামায পড়োবেন।এটা লোক দেখানো।পাঞ্জাবী কেন,যেকোন ভদ্র পোশাক ই আল্লাহর সামনে হাজির হবার জন্য যথেষ্ট।পাঞ্জাবীতে বাড়তি কোন সওয়াব নাই।বরং পাঞ্জাবীর জন্য সময় নষ্ট না করে,পরবর্তী ওয়াক্তের জন্য অপেক্ষা করা,ধীরে সুস্থে ওযু করে মসজিদের দিকে যাওয়া,মনকে পুরোপুরি শান্ত করে ফেলাটাই আসল।আপনি আপনার মালিকের কাছে যাচ্ছেন,যিনি আপনাকে নগ্ন করে সৃষ্টি করেছেন,নগ্ন করেই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন,যার সামনে আপনাকে একদিন নগ্ন হয়ে উঠে দাড়াতে হবে।তিনি আপনার মনের কথা শুনতে চান,আপনার পোশাকের রং তাকে আকৃষ্ট করে না।
নওমুসলিম হবার মধ্যে এক অন্যরকম সুখ আছে।আমি একজন নওমুসলিম।না,আমি অন্য ধর্ম থেকে আসিনি।আমার বাবা-মা সবাই প্র্যাক্টীক্যাল মুসলিম।কিন্তু আমি মুনাফিক ছিলাম।আমি দুনিয়ার বুকে স্বর্গ খুঁজেছি এতদিন।এখন আর খুঁজিনা।আল্লাহ আমাদের সব্বাইকে সুস্থ এবং সুস্থির ভাবে আমল করার সুযোগ করে দিন।বেশী বেশী কোরানের অর্থসহ তিলাওয়াত করার তৌফিক দিন।অলসতা থেকে মুক্তি দিন।পাঞ্জাবী-পায়জামা,দাড়ি,টুপি,হোব্বা-জোব্বা,মেসওয়াক,আতর-সুরমা ইত্যাদি সংস্কৃতির আড়ালে যাতে আল্লাহমুখিতায় খামতি না পড়ে সেইদিকে মনোযোগী করে দিন।আমিন।




