এটা কোন পূর্ণাঙ্গ আলোচনা নয়। বলা যেতে পারে, এটা আলোচনার ভূমিকা অথবা প্রস্তুতিমূলক খসড়া। আজকের আলোচ্য বিষয় হলো, নবীদের এবং বিশেষ করে শেষ নবীর দাওয়াত কি ছিল?
১. সকল নবীর দাওয়াত ছিল, আল্লাহর দাসত্ব কবুল করো এবং তাগুত থেকে বেঁচে থাকো। দাসত্বের সীমানা ও তাগুতের ব্যখ্যাও তারা দিয়েছেন। মক্কা এবং মদীনার জীবনে মহানবী (স) এ দাওয়াতই দিয়েছেন। দাওয়াতের মুল কথা ছিল তিনটি, তাওহিদ, রেসালত এবং আখেরাত। মহানবী (স)’র কাজ কি তা কুরআনে বার বার উল্লেখিত হয়েছে। আল্লাহ বা রাসুল (স) এটাকে অস্পষ্ট রাখেননি।
২. কুরআন থেকে আমরা জানি কোন কোন নবী ছিলেন বাদশাহ। যেমন, দাউদ (আ), সুলাইমান (আ), ইউসুফ (আ) প্রমুখ। সকল নবী-রাসুল সমাজ বিনির্মাণ করতে পারেননি। তারপরও তারা সফল নবী ছিলেন। নবীরা যে সমাজ নির্মাণ করেন সে সমাজের নেতৃত্ব নবীদের হাতে থাকে। যেমন, মুসা (আ) এবং শেষ নবী (স)।
৩. কুরআন-হাদীস খোদাভীতি ও ন্যায়-বিচারের ভিত্তিতে জনকল্যাণমূলক সমাজের কথা বলে। নবীর নেতৃত্বে তৈরি সমাজের পরিচালক পরবর্তীতে কে হবেন এবং কি ভাবে হবেন সে ব্যাপারে কুরআন-হাদীসে মৌলিক কিছু কথা বলা হলেও বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি। সে কারণেই চার খলিফার সবাই ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে নিয়োগ পান এবং পরে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবার পর এর বিরুদ্ধে সাহাবারা সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলেননি।
৪. খেলাফতে রাশেদার পর সাহাবারা, এবং তাবেয়িন ও তাবে-তাবিয়েনের যুগে উলামাদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ জ্ঞান-চর্চা, দ্বীনের প্রচার, জনকল্যাণ ও সমাজ-সংশোধনের কাজে জড়িত থাকলেও রাজনীতি থেকে দূরে থেকেছেন।
৫. সাহাবাদের যারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে গিয়েছেন তারা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করেছেন বলে আমরা জানি না। তারা তাওহিদ, রেসালত এবং আখেরাতের দাওয়াত দিয়েছেন। সততা, ন্যায়-বিচার এবং জনকল্যাণের বানীই প্রচার করেছেন। পরবর্তী সময়ে দেশে-দেশে মুসলমানদের অনেকে মুসলিম-অমুসলিম রাজা-বাদশাহদের জুলুম-নির্যাতন বা ইসলাম-বিরোধী কাজের বিরুদ্ধে অনেক সময় প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। তাদের এ সকল তৎপরতা ‘ফরিজা-ই-ইক্বামাতে দ্বীন’ ছিল, না কি জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের আন্দোলন ছিল সে বিষয়ে আমাদের গবেষণা করা দরকার।
৬. পরাধীনযুগে মুসলমানদের জাগরণের পথে উদ্বুদ্ধ করার জন্যে পরিচালিত আন্দোলনের সময় বিভিন্ন ব্যক্তি ও দলের পক্ষ থেকে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা খুব জোর দিয়ে বলা হয়েছে। এর পক্ষে বলতে গিয়ে তারা কুরআনে বর্ণিত ‘আন-আক্বিমুদ্বীন’ (৪২ শুরা:১৩), ‘লি-ইউজহিরাহু আলাদ্দীনি কুল্লিহি’ (৬১ সাফ: ৯), ‘লি-ইয়াকুনাদ্দিনু কুল্লুহু লিল্লাহ’ (২ বাকারাহ: ১৯৩), ‘ইনিল হুকমু ইল্লা লিল্লাহ’ (১২ ইউসুফ: ৪০), ‘ফামান-লাম ইয়াহ্কুম বিমা-আনজালাল্লাহু ফা-উলা-ইকা হুমুল কাফিরুন’ (৫ মায়েদা: ৪৪), ‘ফিল আরদি খালিফা’ (২ বাকারাহ: ৩০), ‘কালিমাতুল্লা হিল হিয়াল উলইয়াহ’ (৯ তাওবা: ৪০), ‘আল্লাজিনাহুম ইন-মাক্কান্নাহুম ফিল আরজ’ (২২ হাজ্ব: ৪১), ‘উলিল আমর’ (৪ নিসা: ৫৯) প্রভৃতি উক্তিকে বেশি বেশি ব্যবহার করেছেন। কেউ কেউ এ সকল পরিভাষার নতুন ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। তাদের দেয়া অনেক ব্যাখ্যা সম্পর্কে বিতর্কের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।
৭. রাসুল এবং সাহাবাদের যুগে রাষ্ট্রের প্রকৃতি, সীমানা, দায়িত্ব প্রভৃতি এক রকম ছিল। বর্তমান সময়ে রাষ্ট্র নাগরিক-জীবনের সকল ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করে এবং নাক গলায়। আবার গোলকায়নের ফলে যে কোন রাষ্ট্রকে বিশ্ব সমাজের ব্যাপারেও নিজের ভূমিকা নির্ণয় করতে হয়। সে দিক দিয়ে একজন মুসলমান শুধু একটি রাষ্ট্রের নাগরিক নয়, তিনি বিশ্বরাষ্ট্রের নাগরিকও বটে। তাই এখন বিশ্বনবীর উম্মাতদের বিশ্ব-রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে ভূমিকা পালনের প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি হয়েছে।
৮. পরিবর্তিত বিশ্বপরিস্থিতিতে মুসলমানদের কোন ধরণের কাজকে অগ্রাধিকার দিতে হবে তা নিয়ে আমাদের তর্ক ও পর্যালোচনা করতে হবে। পূর্ববর্তীদের তত্ত্ব ও কর্মকৌশলকে অন্ধভাবে অনুসরণ না করে যুগের প্রয়োজনকে সামনে রেখে আমাদের কর্তব্য নির্ণয় করা করা দরকার।




