আমাদের সংস্কৃতির গতিপথ

সংস্কৃতি বা কালচার : সংস্কৃতি বা কালচার শব্দটি আমাদের অতিপরিচিত। আমাদের ব্যবহারিক জীবনে সংস্কৃতি বা কালচারের  ব্যবহারও অহরহ। বাংলা সংস্কৃতি শব্দের উৎপত্তি সংস্কার থেকে। সংস্কার অর্থ বিশুদ্ধীকরণ। সংস্কৃতির ইংরেজি রূপ হল Culture। Culture’র প্রতিশব্দ রূপে আমরা সাধারণত কৃষ্টি, সংস্কৃতি এবং তাহযিব ব্যবহার করে থাকি। সংস্কৃতি বা কালচার সভ্যতার সাথে ব্যাপক ভাবে জড়িত। সংস্কৃতি বা কালচার হল Training of mental and moral powers। এ দিক থেকে বলা যায়- দেহ, মন, হৃদয় ও আত্মার উৎকর্ষ সাধনই  হলো সংস্কৃতি। অন্যভাবে, মানুষের সুরুচির মার্জিত প্রকাশই Culture বা সংস্কৃতি। মূলত সংস্কৃতি বা কালচারকে নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞায় আবদ্ধ করা জটিল বিষয়।

ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দ্বারাই একে বুঝার চেষ্টা করতে হবে। সামগ্রিকভাবে সংস্কৃতি একটি সামাজিক আমিত্ব। সমাজ ও সমষ্টির সাথেই এর সম্পর্ক। সংস্কৃতি বা কালচারের সৃষ্টি হয় শহরে এবং তা বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছুরিত হয় পল্লী জীবনে। শহরে সংস্কৃতি বা কালচার দ্রুত পরিবর্তনশীল। কারণ শহরে সামাজিক জীবনের অভাব। সুতরাং সংস্কৃতি বা কালচার প্রধানত পল্লী জীবনের সম্পদ। পাড়া-গাঁয়ের জীবনাচারই সংস্কৃতি বা কালচারের ধারক ও বাহক।

সংস্কৃতির উপাদান : সংস্কৃতির উপাদানগুলোকে বিভিন্ন ভাবে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করার সুযোগ রয়েছে। সাধারণত সংস্কৃতির উপাদান দুটি। যথা-

১। আদর্শিক । এটি ধর্মের সাথে সম্পর্কিত এবং মানুষের বিশ্বাসের উপর নির্ভরশীল।

২। স্থানিক বা লোকাল। এটি ভৌগোলিক পরিবেশ ও আবহাওয়ার উপর নির্ভরশীল এবং বিভিন্ন জাতি ও শ্রেণী ভেদে সংস্কৃতি ভিন্নতর হয়ে থাকে।

বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক-চিন্তাবিদ সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী (র.) তার “ইসলামী সংস্কৃতির মর্মকথা” গ্রন্থে সংস্কৃতির মৌলিক উপাদান পাঁচটি বলে উল্লেখ করেছেন। সেগুলো হলো-

১। জীবন সর্ম্পকে ধারণা।

২। জীবনের চরম লক্ষ্য।

৩। মৌলিক বিশ্বাস ও চিন্তাধারা।

৪। ব্যক্তি প্রশিক্ষণ।

৫। সমাজ ব্যবস্থা।

সংস্কৃতির এই পাঁচটি উপাদানকে গ্রন্থকার বিশদভাবে বিশ্লেষণ করে এগুলোর যথার্থতা প্রমাণ করেছেন।

আমাদের সংস্কৃতি : সংস্কৃতি চর্চা একটি জাতিকে তার জাতিসত্ত্বা ও স্বকীয়তা সম্পর্কে সচেতন করে তুলে। কোনো দেশের উন্নতি-অগ্রগতি তরান্বিত করতেও সংস্কৃতির ভূমিকা রয়েছে। ঠিক তেমনি সাংস্কৃতিক উদাসীনতা কিংবা সাংস্কৃতিক দেউলিয়াত্ব একটি জাতিকে গোলামীর আঁচলে আবদ্ধ করতে পারে। বর্তমানে আমাদের সমাজের  এক শ্রেণীর তরুণ প্রজম্ম নিজেদের প্রগতিশীল দাবি করে নিজস্ব সাংস্কৃতিক চিন্তা-চেতনা লালনে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। অবশ্য এর জন্য দায়ী কিছু বুদ্ধিজীবি টাইপের দুষ্ট লোকেরা। যারা এ দেশের আবহমান লালিত আদর্শ-বিশ্বাসকে অস্বীকার করে। যারা আধুনিকতা ও প্রগতিশীলতার আবরণে দেশের টিকে থাকার মূল ভিত্তিস্তম্ভে কুঠারাঘাত করছে অনবরত। ফলে দিকভ্রান্ত হচ্ছে উঠতি বয়সের কিছু তরুণ-তরূণী। সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস বলেছেন- “আমাদের সংস্কৃতিতে আমাদের জনগণের আবহমান লালিত আদর্শ, বিশ্বাস, ইতিহাস, ঐতিহ্য, জীবনাচার ও জীবনপদ্ধতি বিধৃত হবে এটাই স্বাভাবিক।”

বাংলাদেশের সংস্কৃতি বা কালচারের সাথে ইসলামের সর্ম্পক বহুকালের। এ সর্ম্পক একদিনে গড়ে ওঠেনি, অনেক সময় পর অনবরত চেষ্টারই ফল। বলতে গেলে এ দেশের সভ্যতা- সংস্কৃতি, সাহিত্য ফুলে-ফলে সুশোভিত হয় মুসলমানদের সাড়ে ছয়শত বছরের শাসনকালে।  প্রফেসর যতীন্দ্রনাথ সরকার বলেছেন-“ মুসলমানরা এ দেশে আসার আগে সংস্কৃতি এদেশে ছিল না।” পরবর্তীকালে ইংরেজদের শোষণকালে সমাজের গোড়ায় প্রোথিত এই চেতনায় ফাটল ধরাবার চেষ্টা হয়েছে সর্বোচ্চ। সে ধারাবাহিকতায় আজো একটি গোষ্ঠী এখানকার জনসাধারণের মাঝে বিভাজন সৃষ্টি করতে তৎপর রয়েছে। তাও আবার বিভিন্ন বেশে এই অপতৎপরতা। কখনও তা গণজাগরণ মঞ্চে (?), কখনো বা অসাম্প্রদায়িক চেতনার আবরণে। কোনো কোনো সময় এই দুষ্টচক্র সফল হতেও দেখা যায়। তবে তা ক্ষণিকের জন্য, স্থায়ী হয় না। সত্যপন্থীরা একটু সচেতনভাবে এগিয়ে এলেই তারা ঘুরে-ফিরে আপন ঘরে চলে যেতে বাধ্য হয়। এই ইতিহাস অনন্তকালের। সুতারাং এখানে সত্যপন্থীদের  দায়িত্ব-কর্তব্যই একটু বেশি।

ইসলামী সংস্কৃতি : ইসলামী সংস্কৃতির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে সবচেয়ে অর্থবহ বক্তব্য রেখেছেন সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী (র.)। তিনি বলেন-

“সংস্কৃতি হচ্ছে দ্বীন ও দুনিয়ার এক মহত্তর সমন্বয়।….. এ হচ্ছে একটি ব্যাপকতর জীবনব্যবস্থা বা মানুষের চিন্তা-কল্পনা, স্বভাব-চরিত্র, আচার-ব্যবহার, পারিবারিক কাজকর্ম, সামাজিক ক্রিয়াকাণ্ড, রাজনৈতিক কর্মধারা, সভ্যতা ও সামাজিকতা সবকিছুর ওপরই পরিব্যাপ্ত। আর এ সমস্ত বিষয়ে যে পদ্ধতি ও আইন বিধান খোদা নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, তারই সামষ্টিক নাম হচ্ছে ইসলামী সংস্কৃতি।”

মূলত ইসলামী সংস্কৃতি মানুষের সামগ্রিক জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। ইসলামী সংস্কৃতির প্রতিটি দিক মানুষের কল্যাণ ও উন্নতি- অগ্রগতি তরান্বিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে । এর রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। ইসলামী সংস্কৃতির ভিত্তি হচ্ছে তাওহীদ, রিসালাত ও আখিরাতের উপর বিশ্বাস।

সাংস্কৃতিক আগ্রাসন : মানব জীবনে সংস্কৃতির প্রভাব রাজনীতি ও অর্থনীতির চেয়েও সুদূর প্রসারী ও ব্যাপক। ফলে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের এ যুগে আধিপত্যবাদী শক্তির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। আর সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের হাতিয়ার হলো টেলিভিশন, কম্পিউটার, ইন্টারনেট, ডিশ এন্টেনা, সংবাদপত্র ইত্যাদি। ভৌগোলিক সীমা বা দেশ দখলের আগ্রাসন এবং বাজার দখলের আগ্রাসী কৌশলের চেয়েও ভয়ানক হচ্ছে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন । এটি সম্পূর্ণ নেতিবাচক এক কর্মসূচি। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের লক্ষ্যই হলো টার্গেটকৃত জাতিকে আত্মপরিচয় বিস্মৃত, শিকড় বিচ্ছন্ন একদল মানুষে পরিণত করা, যারা গোলামীকে হাঁটু পেতে মেনে নেবে। সাংস্কৃতিক পরিচয় বিলুপ্ত করে দেশ ও জাতিসমূহকে করায়ত্ত করার সুদূরপ্রসারী আগ্রাসনে গোটা বিশ্ব ব্যবস্থা আজ ধ্বংসের সম্মুখীন।

একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশও আজ অপসংস্কৃতির আগ্রাসনের মারাত্মক শিকারে পরিণত হয়েছে। ইসলামী চিন্তাবিদ অধ্যাপক মফিজুর রহমানের ভাষায়-“কুসংস্কৃতির লোনা প্লাবন আমাদের লালিত মূল্যবোধ, পূর্ণচেতনা, মঙ্গল ও কল্যাণকর সমস্ত কিছুকে ভাসিয়ে নিয়ে চলছে মহাসাগরের গর্ভে।”

আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি দুইটি দিক থেকে আগ্রাসনের শিকার। যথা-

১। পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আগ্রাসন : এটি বিশ্বব্যাপী আরোপিত পাশ্চাত্য সাংস্কৃতিক যুদ্ধ স্বরূপ। এর মূলে সক্রিয় রয়েছে ভোগবাদ ও পুঁজিবাদ মিশ্রিত দুনিয়াপূজারি চিন্তাধারা। এটি পরোক্ষভাবে আমাদেরকে প্রভাবিত করছে।

২। ভারতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসন : অশ্লীলতার দেশ ভারতের অপসংস্কৃতি গ্রাস করছে আমাদের গোটা সমাজ-সংস্কৃতিকে।

ভারতীয় সংস্কৃতি মূলত ধর্মীয় দিক থেকে শিরক মিশ্রিত এবং জৈবিক দিক থেকে নগ্নতায় ভরপুর ও বাস্তবতা বিবর্জিত।

ভারতীয় নগ্ন সংস্কৃতির করাল গ্রাসে আমাদের দেশীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং ধর্মীয় চিন্তা-চেতনা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনিত হয়েছে। চল্লিশটিরও অধিক ভারতীয় স্যাটেলাইট চ্যানেলের মাধ্যমে একদিকে যেমন সাংস্কৃতিক দেউলিয়াত্ব সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে বছরে প্রায় হাজারো কোটি টাকা সে দেশে চলে যাচ্ছে যা দেশের অর্থনীতিতেও নাজুক অবস্থার সৃষ্টি করছে। অথচ আমাদের কোনো চ্যানেল সে দেশে দেখানো হচ্ছে না, এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। ভারতীয় চ্যানেলগুলোর কার্টুন, সিনেমা-নাটক, সিরিয়াল এবং আইটেম গান নামক অশ্লীলতা কোনোটিই আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির সাথে সঙ্গতিশীল তো  নয়ই বরং সাংঘর্ষিক। অথচ এগুলো আমাদের নবপ্রজম্মকে প্রভাবিত করছে নেতিবাচক ভাবধারায়। তরুণ-তরুণীদের পোশাকে-আশাকে, আচার-আচরণে, কথা বলার ভঙ্গিমায় বিশেষ ধরনের অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমাদের বহু বছরের ঐতিহ্য পরিবার প্রথায় ভাঙ্গন ধরছে, সামাজিক অস্থিরতা মহামারি আকার ধারণ করছে, ইভটিজিং, মাদকাসক্তি, খুন, ধর্ষণ ইত্যাদি অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। এছাড়া মিডিয়ার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত পরকীয়া, লিভ টুগেদার, নর-নারীর অবাধ মেলামেশা, ভালোবাসা দিবস পালন, বর্ষবরণ, মঙ্গল প্রদীপের সংস্কৃতি ইত্যাদিকে উৎসাহিত করছে। যা সামাজিক বিপর্যয় সৃষ্টিতে সহায়তা করছে ব্যাপকভাবে। বিশিষ্ট শিল্পী ও কলামিস্ট ওবায়েদুল হক সরকারের মতে “আমাদের শিক্ষাঙ্গন আজ রণাঙ্গনে পরিণত হয়েছে, মাস্তান-চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্যে উন্নয়ন উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, মঙ্গল প্রদীপ মার্কা সংস্কৃতির ধাক্কায় আমরা প্রতি পদে শুধু পিছিয়ে পড়ছি।”

আমাদের করণীয় : আমাদের উপর আরোপিত সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মোকাবেলায় আমাদেরকে করণীয় সম্পর্কে সজাগ হতে হবে। একে প্রতিরোধ করার কৌশল রপ্ত করতে হবে। নচেৎ আমরাও ব্যর্থ জাতি হিসেবে ইতিহাসের গর্ভে হারিয়ে যাওয়ার ভয় আছে। সাংস্কৃতিক আগ্রাসন মোকাবেলায় সর্বাগ্রে প্রয়োজন ব্যাপকভাবে নিজস্ব সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলা। এই আন্দোলনের ভিত্তি হতে হবে সাংস্কৃতিক সচেতনতা। পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত এই আন্দোলনকে ছড়িয়ে দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, দল-মত-নির্বিশেষে সকলের সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমেই এই আন্দোলন পরিচালনা করতে হবে। তৃতীয়ত, রাষ্ট্রীয়ভাবে সাংস্কৃতিক নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, যার ভিত্তিতে সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য বহাল রাখা যায়। মিডিয়ার অপসংস্কৃতি প্রচার রোধ করতে কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে আইন প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়ন করতে হবে। স্যাটেলাইট চ্যানেল নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও এই আইনে রাখতে হবে।

– See more at: http://weeklysonarbangla.net/news_details.php?newsid=11454#sthash.YW4PwRPt.dpuf