সালটা ১৯৯১, আমার টগবগে তারুন্য। সদ্য এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে জয়ী হয়ে নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত শেষে বিএনপি ক্ষমতায় । আর বছর শেষে বিশ্ব রাজনীতিতে আসল বিশাল পরিবর্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙে যাওয়া, সমাজতন্ত্রের পতন। আমরা অবাক বিস্ময়ে দেখলাম কিভাবে ছাত্রইউনিয়নের পতন হল দ্রুত গতিতে। কিন্তু নিভৃতে ঘটে গেল এক বিরাট পরিবর্তন। সিপিবি ভেঙে গেল, একতা বন্ধ হল আর সুপরিচিত বামরা নিভৃতে চলে গেল। কিন্তু আদর্শ কি তারা সরিয়ে ফেলল? উত্তর কি পাচ্ছেন?
তখন থেকেই কিছু ঘটনা ঘটল যা আমার কাছে মনে হয়েছে সম্পূর্ন অপরিকল্পিত, প্রতিষ্ঠার আকাংক্ষা আর প্রফেশনাল হবার প্রচেষ্টা থেকে এক বিশাল বটবৃক্ষ তৈরী হয়ে যাওয়া। ১৯৪৯ সাল থেকে ১৯৮৬-৮৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ এবং মেধাবীদের সংগঠন ছিল ছাত্রইউনিয়ন। তাহলে এই লক্ষ লক্ষ নেতা-কর্মী এবং স্কলাররা গেল কোথায়? এই প্রশ্নের অনুসন্ধানের মধ্যেই রয়েছে রাজনৈতিক এবং সামাজিক আন্দোলনের বর্তমান অবস্থায় বাম চিন্তার একক আধিপত্যের রহস্য।
এখন দেখি কিভাবে বামরা এগিয়ে গেল?
# শেখ হাসিনা ব্যক্তিগতভাবে ছাত্র ইউনিয়ন দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। ছাত্র ইউনিয়ন নেতা বেবী মওদুদ তার ঘনিষ্ট বান্ধবী। তিনি সব সময় বলেন ছাত্র ইউনিয়নের পুলাপান পড়াশুনা করে আর ছাত্রলীগ করে মাড়ামাড়ি,। সিপিবি সব সময় প্রো ইন্ডিয়া এবং রাশিয়ান ব্যাকড দল। তাই মতিয়া চৌধুরী ১৯৮০ সালের দিকে জয়েন করে আলীগে। আর ১৯৯১ সালের পর ঝাকে ঝাকে নেতারা চলে যান আলীগে। তারা দলের প্রতি নিবেদিত থেকে যথাসম্ভব সৎ থেকে এবং ১/১১তে শেখ হাসিনার পক্ষে অবস্থান নেন। তার ফল দেখছেন।
# ম্যাডাম ব্যক্তিগতভাবেও বামদের পছন্দ করেন। শহীদ জিয়ার সময়ের ন্যাপ এবং পরে সালাম তালুকদার-মান্নান ভুঁইয়ার হাত ধরে শত শত চীন পন্থী কমিউনিস্ট এবং জাসদের নেতারা বিএনপিতে সুদৃঢ় অবস্থান করে ফেলেন। সেটাও জাসদের রাজনৈতিক পরাজয় আর চীনাদের ব্যক্তিগত খায়েশ।
# তৎকালীন একতা সম্পাদক এবং সিপিবির সহকারী সেক্রেটারী মতিউর রহমান আজকের কাগজ-ভোরের কাগজ হয়ে প্রথম আলো তৈরী করেন। আর মাহফুজ আনাম করেন ডেইলি স্টার। আবার কট্টর সেক্যুলারিস্ট সাগর সাহেব করেন চ্যানেল আই। যেখানে ছিল সংবাদ আর একতা সেখানে তারা দেশের সেরা মিডিয়া হাউজ তৈরী করে ফেলেন। এর পরে আসে দেশের মোড় ঘুড়ানো চ্যানেল একুশে টিভি ১৯৯৭ সালে। সম্পূর্ন বাম রিক্রুটের এই চ্যানেলের সব কর্মকর্তা, এডিটর, স্ক্রিপ্ট রাইটার, ক্যামেরাম্যান, ডিরেক্টররাই আজ পর্যন্ত সব চ্যানেল নেত্তৃত্ব দিচ্ছে। তারাই রিক্রুট করছে, সব কিছু প্রমোট করছে সেটা এনটিভিই হোক আর দিগন্ত টিভিই হোক।
# এর পরেই প্রতিষ্ঠা হয় সম্পূর্ন ধারনা ঘুরানো ইকোনোমিক বিশ্লেষন হাউজ সিপিডি আর তার হাত ধরেই টিআইবি, বেলা, সুজন, আসক এবং অধিকার। যারা দেশের সব চিন্তাশীলদের একত্রিত করে ফেলে। তবে সে ক্ষেত্রে অবশ্যই ইসলামপন্থীদের শুরু থেকেই সচেতনভাবে ইগনোর করা হয়, ফলত তারা হয়ে যায় একঘড়ে।
# এরশাদের সময় থেকে প্রথমে নারীর ক্ষমতায়নের চিন্তা এবং নিজেদের প্রতিষ্ঠার ধারনা থেকে ব্র্যাক, প্রশিকা, আশা, গনসাহায্য সংস্থা সহ শত শত এনজিও গড়ে উঠে। বর্তমান অবস্থা এমনই যে এই এনজিও গুলি দেশের বাজেটের সমান রেভেনিউ হ্যান্ডেল করে। দেশের এক বিশাল অংশ তাদের আওতায়।
# দেশ গার্মেন্টসের প্রতিষ্ঠাতা প্রাক্তন ছাত্র ইউনিয়ন নেতা নুরুল কাদেরের হাত ধরে গার্মেন্ট শিল্পের অগ্রগতি হয় সাথে সাথে তিনি অনেক বাম ছাত্র যেমন আনিসুল হক, একে আজাদের মত শত শত বাম উদ্যোক্তা তৈরী করেন যারা হয়ে যান হাজার কোটি টাকার উদ্যোক্তাদের এক বিশাল চেইন। এপেক্স, স্কয়ার, আড়ঙের মত বিশাল কনজিউমার রিলেটেড প্রতিষ্ঠান তৈরী হয়ে যায় আরেকদিকে।
# ডঃ সাঈদুর রহমান, সরদার জয়নুদ্দিন, আবুল কালাম শামসুদ্দিন, আক্তারুজ্জামান ইলিয়াস প্রমুখের ভাব শিষ্যরা ঠিক দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায় এক ভাগ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আনিসুজ্জামান, বিকে জাহাঙ্গীর, মুনতাসীর মামুনদের হাত ধরে আলীগ আরেক ভাগ প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমদ, মনিরুজ্জামান মিঞা, ইউসুফ হায়দার দের হাত ধরে বিএনপির বুদ্ধিজীবিতার চর্চ্চা করতে থাকে। মূলত দুই দলের বৃহৎ অংশই বাম নিয়ন্ত্রিত। এটা আসলে অসচেতন ভাবেই হয়েছে বলে মনে হয়েছে আমার কাছে।
# ডঃ হুমায়ূন আজাদ, শামসুর রাহমান, সেলিম আল দীন আর সৈয়দ শামসুল হকের হাত দিয়েই সাংস্কৃতিক মুভমেন্টের ক্ষেত্র তৈরী হয় সাথে থাকে মার্কিন, ইউরোপ এবং ভারতের প্রতিবছর এনজিও বাবদ বাঙালী সংস্কৃতি প্রমোটের হাজার কোটি টাকার বাজেট। ডেডিকেশন, অর্থ, রাস্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে যে অসম যুদ্ধ তৈরী করা হয়েছে তার শেষ পরিনতি আমি ভাবলেই শিউরে উঠি।
# আমেরিকা, ফ্র্যান্স, জার্মানী, বৃটেন এবং অস্ট্রেলিয়ায় যায় বেশ কিছু বাম নেতাকর্মী। তারা পড়াশুনা করে অর্থ ইনকাম করে ঢাকায় বিনিয়োগ করে।
# আবার ব্যাংক, ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রুপ ইত্যাদির মার্কেটিং, ব্র্যান্ড, কমিউনিকেশন ফিল্ডের ক্ষেত্রে বাম ব্যাকড ছেলেরা ব্যাপক ভালো করে তারা নিজ যোগ্যতা বলেই দখল করে নেয় দেশের শীর্ষ সব প্রতিষ্ঠানের পদ। আবার বাম ছাত্র নেতারা এশিয়াটিক, গ্রে, এডকম, মিডিয়াকম, বিটপী, মাত্রা, এক্সপ্রেশন্সের মত এড এজেন্সী তৈরী হয়ে যায় যারা সমগ্র এড মার্কেটের মূলত ৯০% দখল করে ফেলে। এক্ষেত্রে কর্পোরেট জগতে এক নীরব প্রতিষ্ঠা ঘটে অসচেতন ভাবেই।
# আলীগ-বিএনপি সবাই বিচারবিভাগ, পুলিশ, প্রশাসনে বামদের সমান ভাবেই পেট্রন করেছে, করছে এবং করতেই থাকবে।
—– এই হচ্ছে দেশের সামগ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান। এখন প্রশ্ন হল এই ঘটনা গুলি কি বামরা পরিকল্পিতভাবে করেছে?
উত্তর হিসাবে আমার কাছে মনে হয়েছে সোভিয়েতের পতনের ফলে হতাশ, দলছুট, টিকে থাকার বাসনায় উম্মত্ত যোগ্য, ট্যালেন্ট, আধুনিক বামরা তাদের নিজেদের প্রয়োজনেই এই সব করেছে। ২০০৫ সাল থেকে তারা সিপিডি, প্রথম আলো, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের মাধ্যমে ইন্টার কানেক্টেড হয়ে এক বিশাল অদৃশ্য সেক্যুলার মুভমেন্টের শক্ত এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী আনপ্যারালাল বটবৃক্ষময় প্লাটফর্ম।
ঠিক এই জায়গায় আমি বর্তমানে ইসলামিস্টদের সম্ভাবনার এক বিশাল দিগন্ত দেখছি।
দেশের বৃহত্তম ছাত্র সংগঠনের প্রায় ৭০% লাখো তরুণ ছাত্রত্ব শেষে আর রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকছেনা। তাহলে তারা যাচ্ছে কোথায়?
এই হারিয়ে যাওয়া তরুণদের মুনাফেকী নয় চিন্তায় সৎ, দেশপ্রেমিক, আধুনিক, ধার্মিক এবং সেরা প্রফেশনাল হওয়া, প্রতিষ্ঠান তৈরি করা এবং প্রমোট করার মাধ্যমেও গড়ে দিতে পারে বুদ্ধিবৃত্তিকতার ক্ষেত্রে ইসলামপন্থীদের উর্বরতার চারনভূমী।
আমরা কি এভাবেও ভাবতে পারি না?
আল্লাহ্ আমাদের সকল প্রচেষ্টা কবুল করুন।
(পরের লেখায় বামদের স্টাইল নিয়ে কিছু বলব)
(বিশেষ দ্রষ্টব্য: লেখাটা আমার নয়। লেখকের অনুমতিক্রমে সংকলিত। হুবহু। সেখানে আমার মন্তব্য ছিলো – “দেখা যাচ্ছে ‘পার্টি লাইনে’ কেউ কখনো ‘ভালো কিছু’ করতে পারেনি! সব কিছুতে ‘আমরা’ – এই ধারা ‘ব্র্যান্ডিং’ কনসেপ্টের সাথে সাংঘর্ষিক। branding ছাড়া creativity হয় না, হতে পারে না। আমি ইকবালের খুদী তত্ত্বের অনুসারী। অতএব, আমি শুধু ‘আমি’তে বিশ্বাসী। আমার কাছে ‘আমরা’ হচ্ছে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র ‘আমি’র ইসু্যভিত্তিক সাময়িক সমষ্টি বা ঐক্যমাত্র।”)





অসাধারন বিশ্লেষণ…..
মাছ পানি পেলেই যেমন সাঁতার কাটতে চায় তেমনি বামরাও!!
অনেক অজানা তথ্য জানলাম…………………
অনেক অনেক শুভকামনা।
মূল লেখকের নামটা জানতে চাই?