“ডিভাইড এন্ড রুল পলিসি”- মতপার্থক্যে সৃষ্টির মাধ্যমে বিভাজন করা এবং শাসন করার এক কৌশল। মূলত সপ্তদশ শতকে ভারতবর্ষে ইউরোপীয় দস্যুতুল্য ব্যবসায়ী পরিচয়ে ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীর আগমনের পর থেকেই উপমহাদেশে এই মূলনীতির প্রয়োগ ব্যাপক আকারে শুরু। প্রথম দিকে ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী (ডাচ, পর্তুগীজ, স্পেনীয়, ইংরেজ) একে অপরের বিরুদ্ধে এই মূলনীতি প্রয়োগ করে তারা তাদের স্ব স্ব ব্যবসায়িক লুটপাটে ব্যস্ত ছিল। পরবর্তী সময়ে তারা এই মূলনীতি প্রয়োগ করে মুসলিম-হিন্দু সম্প্রীতি-ঐক্য বিনষ্ট করার কাজে। এই একই মূলনীতি প্রয়োগ করে মুসলিম রাজা-বাদশাহ ও অমাত্যদের ভেতরে পারস্পরিক অনৈক্য ও বিভেদের বীজ তারা বপন করে।
এভাবেই এই সংখ্যালঘিষ্ঠ গুটিকতেক বিদেশী বেনিয়ার দল, প্রধানত ব্রিটিশ জাতি-গোষ্ঠীর, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম ও হিন্দু জাতিকে পদানত রাখে রাখে প্রায় দুইশ বছর। সাতচল্লিশ পরবর্তী সময়ে ভৌগলিক স্বাধীনতা মিললেও এখনও বাংলাসহ গোটা ভারতীয় উপমহাদেশ তাদের দাসত্ববৃত্তি করে যাচ্ছে। এখনও গোটা বাংলায় চালু রয়েছে তাদের এই “বিভাজন ও শাসন” মূলনীতি। শুধু পরিবর্তন হয়েছে নেতৃত্বদানকারী শাসক গোষ্ঠীর, হয়নি শাসিত বা বিজিত জাতির। ব্রিটিশ নেতৃত্বের স্থানে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব। পার্থক্য কেবল ‘আটলান্টিকের এপার -ওপার’।
বর্তমান বাংলাদেশে এদেশের ক্ষমতালিপ্সু রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীগুলো সাংস্কৃতিক বাঙালী জাতীয়তাবাদ (আওয়ামী লীগ), ভৌগলিক বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ (বিএনপি) এবং ধর্মীয় জাতীয়তা বা আন্তর্জাতিকতাবাদের (প্রধানত জামায়াতে ইসলামি) নামে নিজেদের ভেতর বিভাজন ও বিভেদ অক্ষুন্ন রেখেছে। আর এই বিভাজন ও বিভেদের মাধ্যমে তারা সাম্রাজ্যবাদী বিদেশী শক্তির নিকট এই দেশ ও জাতিকে শাসন ও শোষণের পথ উম্মুক্ত রেখেছে।
দেশের এসব দল ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো তাদের নিজস্ব দলীয় চিন্তা-চেতনা বিস্তারের নামে ক্ষমতার নেশায় উন্মাদ। রাষ্ট্রের ক্ষমতাশীর্ষে আরোহনের জন্য তারা বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী শাসক গোষ্ঠীর পদলেহন করে চলছে। তাদের মধ্যে চলছে ‘দেশ এবং দেশের সম্পদ’ কে কতটা ছাড়ে বিদেশীদের হাতে ইজারা দিতে পারে তার পাল্টাপাল্টি প্রতিযোগীতা। ফলে এদেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ভৌগলিক সীমানা আজ উম্মুক্ত। বিদেশী প্রভুরা যে যার মত আজ দখল ও স্বত্ব প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত।
রাজনৈতিক ময়দানে লড়াইরত দল ও গোষ্ঠীগুলোর তবুও হঁশ হয় না। তাদের দলীয় তথাকথিত চিন্তা-চেতনা বিকাশের লড়াই বন্ধ হয় না। যতদিন তথাকথিত দলীয় চিন্তা-চেতনা ফেরীর নামে রাজনৈতিক দলগুলোর এই আন্তঃবিভাজন, আন্তঃকলহ ও আন্তঃবিভেদ দূর না হবে, ততদিন বজায় থাকবে সাম্রাজ্যবাদী শাসন- শোষণ।
তাই নিজেদের ভেতরের দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও বিভাজন নিজেদেরকেই দূর করার পথ খুঁজতে হবে। তৈরি করতে হবে আন্তঃদলীয় সম্প্রীতি ও ঐক্য।
কেবল তখনই দেশে আসবে উন্নয়নের কাংখিত গতি। জীবন-মানের ঘটবে উন্নয়ন। মানুষ পাবে স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ। তাই সকল রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতর অনৈক্য ও বিভেদ নয়, প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য ও অভেদ্য মেলবন্ধন। প্রয়োজন সর্বাগ্রে উপনিবেশিকদের চাপিয়ে দেয়া “ডিভাইড এন্ড রুল” পলিসির বিনাশ।




