১) নবী করীম সাঃ এর জীবদ্দশায় যে দুইবার ভিন্ন কাউকে ইমামতির জন্য নির্ধারণ করেছেন, তার মধ্যে দুবারই আবু বকর সিদ্দিক রাঃ কে নির্ধারণ করেছেন। দ্বিতীয়বার, মৃত্যুর ঠিক আগে আয়েশা রাঃ বলছিলেন, আবু বকর তো নরম মনের মানুষ, আপনার স্থানে দাড়াতে পারবেননা।পরে হাফসা রাঃ কে দিয়েও বলালেন। নবীজি অনড়।আবু বকরই পড়াবে।সাহাবাদের মধ্যে বিশেষভাবে জ্ঞানচর্চাকারি আবু হুরায়রা ছিলেন, যোদ্ধা খালেদ বিন ওয়ালিদ ছিলেন, সুমধুর সুরের উবাই বিন কাব ছিলেন এবং নৈতিকতার পরম পুরুষ আবু জর রাঃও ছিলেন। তাহলে এর মধ্যে আবু বকরকে কেন বিশেষভাবে নির্বাচন করা হচ্ছে? উত্তরটা সহজ, দ্বীনের ফাহাম-তাফাক্কুহ ফিদ দীন, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও নেতৃত্ব ক্ষমতার কারণে। এবং এ বিষয়ে তেমন দ্বিমতও নেই। ফলে, দ্বীনের ফাহাম-তাফাক্কুহ ফিদ দীন, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও নেতৃত্ব ক্ষমতার আকালের যুগে আবু বকর রাঃ এর জীবন পাঠ জরুরি হয়ে পড়ে।
২) মক্কায় কাফেরদের প্রবল নির্যাতনের মুখে আবু বকর রাঃ হাবশায় হিজরতের জন্য চললেন। কাররা গোত্রের প্রধান ইবনে দাগিনার সাথে পথিমধ্যে দেখা হলে আবু বকরকে লক্ষ্য করে তিনি বললেন, আপনি এত ভালো লোক,বিপদে আপদে সাহায্য করেন, আত্মীয়তা রক্ষা করেন, গরীব-দুখির খোঁজ রাখেন। আপনাকে তো দেশ ও গোত্রছাড়া করা সম্ভব নয়। ইবনে দাগিনা আবু বকরের জন্য কুরাইশের কাছে নিরাপত্তা চাইলেন। কুরাইশের সর্দাররা বলল, সে যতখুশি ঘরে ইবাদত করুক, অপ্রকাশ্যে,নয়তো আমরা আশংকা করছি, আমাদের ছেলেপুলেরা তার মাধ্যমে বিভ্রান্ত হবে। নিরাপত্তা মিলল। আবু বকর নিজের বাড়ির আঙিনায় মসজিদ নির্মাণ করে ইবাদত-তেলাওয়াত শুরু করলেন। মানুষজন হুমড়ি খেয়ে পড়তে লাগলো। কাফেররা উদ্বিগ্ন হল। ইবনে দাগিনাকে তলব করে বলল, আবু বকর তো ফের বিভ্রান্ত করা শুরু করছে। ইবনে দাগিনা বলল, হয় একা একা পড় বা আমার নিরাপত্তা ফিরিয়ে দাও। আবু বকর রেগে বললেন, ধুরু, আপনি থাকুন আপনার নিরাপত্তা নিয়ে। আমি আল্লাহর নিরাপত্তায় সন্তুষ্ট।(বুখারি ২২৯৭)
এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হল,ইসলাম ব্যক্তিগত হলে মক্কার কাফেরদের ইসলামের সাথে মোকাবেলা হতনা। এবং ইসলাম কোন দেশীয় বা জাতীয় সাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাস করেনা।কোন ভূমি ও জাতি যদি জাহেলিয়াতের মাধ্যমে আক্রান্ত হয় তাহলে তাকে নাকচ করা জরুরি।আবু বকর ভালো মানুষ ছিলেন নিসন্দেহে, স্বীকৃতও ছিল। তবে, এই ভালো মানুষী দিয়ে মক্কায় কোন পরিবর্তন আসেনি এবং এই ভালো মানুষটা যখন ইসলামের দাওয়াত দিলেন, তখন জাহেলিয়াত সহ্য করতে পারেনি।তবুও, নিরাপত্তা হুমকি সত্ত্বেও কাফেরের অধীনে থাকতে রাজি হননি। আল্লাহর নিরাপত্তায় সন্তুষ্ট ছিলেন।জাহেলিয়াতের সাহায্যে ইসলাম কায়েম সম্ভব নয়।
২) কোরআনের একটা আয়াতে বলা হয়েছে, তোমরা নিজেদের বাঁচাও, তোমাদের আশেপাশের মানুষ গোমরাহ হলেও তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবেনা (৫- ১০৫)। এই আয়াত যদিও চূড়ান্ত অক্ষমতার প্রেক্ষাপটের, তবুও,কেউ কেউ এই আয়াতের মাধ্যমে অসক্রিয়তার কথা ব্যাখ্যা গ্রহণ করছিল। আবু বকর রাঃ বললেন,না! দেখো, নবীজি তো বলেছেন, যখন তোমার পাশে সামান্য অন্যায় হবে তবুও তুমি বাঁধা দেবেনা, তাহলে সবাইকে আল্লাহ শাস্তি দিবেন।
নবীজির মৃত্যুর পর যখন ইরতিদাদের হাওয়া চলা শুরু হল, জাকাত দিতে অস্বীকার। তাদের সাথে কি যুদ্ধ করা হবে, এ নিয়ে মতানৈক্য তৈরি হল। সবাই বলল, ঈমান আনলে ও সালাত আদায় করলে তো আর যুদ্ধ করা যাবেনা নবীজি বলেছেন। আবু বকর বললেন, যে ঈমান-সালাত-জাকাতের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করবে, তার সাথে আমি যুদ্ধ করবো।
লক্ষ্য করার বিষয়, আমি তো জাহেলিয়াত থেকে মুক্ত এই অজুহাতের কোন সুযোগ নেই। জাহেলিয়াত গালেব হবার শাস্তি সবার পেতে হবে। আধুনিক কালে যে ব্যাপক রিদ্দাত শুরু হয়েছে, তাতে ধর্ম-সমাজ-রাজনীতির মধ্যে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করার যে প্রবণতা আছে, তাকে মোকাবেলা করা জরুরি।নবীজি ও আবু বকর এখানে মোকাবেলা ও যুদ্ধের কথা বলেছেন, হত্যার কথা বলেননি, মুখের প্রতিবাদের কথা বলেননি।তারও হয়ত গুরুত্ত আছে। তবুও,আদতে সাধারণ প্রতিবাদ,মিছিল ও বিচ্ছিন্ন হত্যার মাধ্যমে এই রিদ্দাতের মীমাংসা করা সম্ভব নয়। সামাজিক ক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি।
৪) নবীজির মৃত্যুর পরে শক্ত হাতে হাল ধরেছিলেন আবু বকর।নবীকে যে পূজা ও মহাব্বতের পার্থক্য ধরিয়েছেন।আনসাররা নেতৃত্বের আশা করেছিল। তিনি তাদেরকে মসজিদে বসে তাদের অবস্থান, নবীজির বক্তব্য শোনালেন এবং রাজি করলেন।খলিফা থাকাকালীন একজন তার সাথে বেয়াদবি করলে এক সাহাবি বলল, আপনি অনুমতি দিলে তাকে হত্যা করে ফেলবো। তিনি কথা অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিলেন এবং মীমাংসা করলেন। পরে আবার সেই সাহাবি হত্যার অনুমতি চাইলে আবু বকর বললেন, ধুরু, ধুত্তুরিকা, কিসব বলছ!
একবার তার হাত থেকে লাঠি পড়ে গেল, তিনি সওয়ারি থেকে নেমে নিজেই লাঠি উঠালেন। সাহাবিরা বলল আমরা তো পারতাম, আবু বকর বললেন, নাহ! নবীজি বলেছেন, নিজেই নিজের কাজ করবে।
আলি রাঃ প্রথমে বাইয়াত দেননি। তবুও, আবু বকর ব্যক্তিগত সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন।নবীজি মারা যাওয়ার কিছুদিন পর একদিন বের হলেন, সাথে আলিও ছিল। পথে হাসান রাঃ কে দেখে চুমু দিলেন, কাঁধে তোলে নিলেন। এবং কবিতা আবৃতি করলেন, আমার বাবার সাথে নবীজির অনেক মিল, আলির সাথে তো কোন মিলও নেই।লক্ষণীয়,মতপার্থক্য নিয়েও তাদের মধ্যে কত মিল ছিল! আলি নিজের দ্বিমতের কারণে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেননি। দ্বিমত থাকা সত্ত্বেও আবু বকর তার উপর কোন চাপ সৃষ্টি করেননি। অনেক ঐক্যমতের চেয়ে এই দ্বিমতও ভালো।( মুসনাদে আহমদ ৩৪-৪৪ পৃষ্ঠা)




