অনেক সেক্যুলার মানুষকেই দেখি সুফিবাদকে বেশ পছন্দ করেন। আবার ধর্মতন্ত্রপন্থীরা সুফিবাদের কঠোর বিরোধিতা করেন। উভয় পক্ষের অবস্থান কিন্তু একই-সুফিবাদ সম্পর্কে দুর্দান্ত মুর্খতা।
সেক্যুলাররা সুফিবাদকে অরাজনৈতিক, সফট, অহিংস, সরল, দুনিয়া বিমুখ, গানাবাজনা তথা সাংস্কৃতিক বিষয় মনে করেন। তাদের কাছে সুফি ইসলাম নিরাপদ মনে হয়। এরে নিয়ে কোনও টেনশন করতে হয় না। বরং তারা যে ইসলামী রাজনীতির ভয় করেন তার বিপরীতে সুফি ইসলামকে একটা লড়াই করতে দেখেন।
এদিকে ধর্মতান্ত্রিকরা, বিশেষ করে সালাফিরা সুফিবাদী ইসলামকে দেখেন শেরেক-বেদাত হিসেবে। তারা সুফি কালাম, সংস্কৃতি, চর্চা, সম্পর্ক ও প্রতীক মাত্রই বেশরিয়তি ব্যাপার মনে করেন। সেই জায়গা থেকে সুফিবাদীকে কাইট্টা ফালানোই যেন একমাত্র সমাধান মনে করে এরা।
অথচ প্রত্যেক দরবেশ, পীর-আউলিয়ার জীবন মাত্রই রাজনৈতিক। সরাসরি যুদ্ধ, সংগ্রাম বা সমকালীন কায়েমী স্বার্থবাদের সঙ্গে তাদের লড়াই ছিল। তারা জনগণের মধ্যে নিজেদের বয়ান ও চর্চা ছড়িয়ে দিয়ে লড়াইকে অনন্য অভিমুখ দিয়েছেন। নিজেদের ক্ষমতার উত্তাপ থেকে সরিয়ে সহজ-সরল এক জীবন যাপনে শামিল করেছেন যা সাধারণের সমর্থনপুষ্ট হয়ে জীবনদর্শন, তরিকা ও সংগ্রামের নতুন সম্ভাবনা হিসেবে হাজির হয়েছে। সময়ের পরিক্রমায় সেই সব লড়াইয়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য জারি আছে। বয়ান ও লড়াই হারিয়ে গেছে। এখন সংস্কৃতিটাকে বিচার করেই সেক্যুলাররা সুফিবাদ সমর্থক বনে গেছেন আর ধর্মতান্ত্রিকরা বিরোধী হয়েছেন।
কিন্তু রাজনীতি, ক্ষমতা ও সমাজের যে স্তরে ইসলামের স্বাভাবিক বিকাশ সম্ভব হয়নি সেখানেই সুফিবাদের রূপ ধরে ইসলাম অগ্রসর হয়েছে। এ কারণে সুফি প্রকল্প আগ্রাসী, অদম্য ও সাহসী। বাস্তবতা-দুনিয়াদারি যেখানে এসে মানুষকে তৌহিদ-রিসালত থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার দুঃসাহস দেখায়, সেখানে সুফিবাদ মানুষের মুক্তির সম্ভাবনাকে অসম্ভবের ভেতরকেই নতুন করে জাগিয়ে তোলে।
সমগ্র পৃথিবী শয়তানের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে, ক্ষমতার সব টুকু নিয়ন্ত্রও কর্তৃত্ব অত্যাচারীদের হাতে চলে যেতে পারে, প্রিয় ভালোবাসার মানুষদের দখল করতে পারে ভোগবাদী ধনী-সামর্থবানেরা। কিন্তু সুফিবাদ মানুষকে পরাজিত ব্যক্তি জীবনের ভেতর থেকেই নবজাগরণে শামিল করার সমর্থ করে তোলে।
প্রিয় মানুষেরা, সচেতন ও বাস্তববাদী হিসেবে আমাদের মতো পরাজিত মানুষদের ছুড়ে ফেলতে পারো। আমাদের স্মৃতিকে ময়লা হিসেবে সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলতে পারো। স্পর্শ-গন্ধহীন দিন-রাত কেটে যায়। অথচ তোমাদের প্রিয় মুখটা মনে পড়ে। অনুভূতিগুলো আজও সজীব। কিন্তু এতো কাছে থেকেও জয়ী আর পরাজিতের মাঝে কত ব্যবধান। এমন করুণ বাস্তবতার মধ্যেও ব্যক্তি মানুষ তার রবের কাছে সমর্পিত হয়ে, স্রেফ আল্লাহকে ভালোবেসে, তার প্রেমে দিওয়ানা হয়ে- এই জগতকে অবজ্ঞা করে জীবনকে মহিমাময় করে তুলতে পারে।
সুফিবাদ জয়ী-সফল মানুষদের নিয়ে কোনও কারবার করে না। এটি অসফল, নিরাসক্ত, অক্ষম, গরিব, ভোদাই, পাপী-তাপীদের নিয়ে কারবার করে। যাদের জীবনে সঠিকতা নাই, যাদের জীবনে শুদ্ধতা নাই, ভদ্র সমাজে যাদের জায়গা হয় না, যারা নিজেদের প্রেম কোনো্ প্রেয়সীর কাছে সোপর্দ করতে পারে না, যারা সন্তান-সংসারের মাঝে নিজের ভবিষ্যত দেখার সুযোগ পায় না তাদের জন্য সুফিবাদ।
সুফিবাদ আপনাকে বেহেশতের সন্ধান দিতে পারবে না, হুরের নিশ্চয়তা দিতে পারবে না, দুনিয়ার মাঝেই এসি মসজিদে দামী জায়নামাজে কপালের স্পর্শ এবং দামী ফ্লাইটে ধর্মীয় ট্যুরিজমের ব্যবস্থা করতে পারবে না। স্ট্যান্ডার্ড-স্মার্ট-রিচ নারী-পুরুষদের যৌন সম্পর্কের ব্যবস্থাও করবে না সুফিবাদ।
বরং সুফিবাদ আপনাকে এই বার্তাটি দেবে যে, লা তাকনাতু মির রহমাতিল্লাহ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না, অতীতের ভুল থেকে ক্ষমা পাওয়ার ব্যাপারে হতাশ হইও না, তওবার দরজা সব সময় খোলা আছে- সব সঙ্কটে-সম্ভাবনা নিজের নাফরমানি-গোস্তাকি থেকে মুক্ত হয়ে মহান আল্লাহর রহমতের মাঝে তুমি বিলীন হয়ে যেতে পারবে।
সুফিবাদ আপনার সামনে এমন একটা সম্ভাবনা হাজির করে- যে মানুষ চুরি করেছে, যে মানুষ ডাকাতি করেছে, তারপক্ষেও তওবা করে ফানা হয়ে যাওয়া সম্ভব। ফলে আমরা যেসব মানুষ স্রেফ গরিব-কালো-খাটো-নিম্নপদস্থ-আনস্মার্ট বলে সহীহ-সৎ-পরহেযগার-ডিসেন্ট-ভদ্র মানুষদের প্রত্যাখ্যান আর জুলুমের শিকার, তাদের জন্যও আত্মনিবেদন করে প্রেম হাসিলের সুযোগ আছে। এই ব্যাপারটা অনেক বেশি পলিটিক্যাল ব্যাপার।
কাজেই যারা সুফিবাদকে বিদ্যমান মুর্খতার মধ্য দিয়ে ডিল করছেন-সেই সেক্যুলার ও শরীয়াপন্থীদের সঙ্গে তাল মেলানোর কিছু নাই। যে যেখানে পারেন তওবা করেন, জিকির করেন, তসবিহ পড়েন, মোারাকাবা করেন, তাহাজ্জুদ পড়েন, রোজা রাখেন, কুরআন তেলাওয়াত করেন। জমিন ও আসমানের মাঝে আশেকি-নিবেদন-বন্দেগী-ফানা ফিল্লাহর এক তরঙ্গ সৃষ্টি করেন যে সব কিছু গুড়িয়ে দেওয়া যায়।
কেন হতাশ হবেন, ভয় পাবেন- যখন জনে জনে জনতা তওবা-অশ্রুপাত-জিকিরের হল্লা দিয়ে অপ্রতিরোধ্য গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলে সব অস্ত্র-সব ক্ষমতা-সব নিপীড়নকে পরাজিত করতে পারে। আমীন।




