(উত্তরাধুনিক মুসলিম মন – এর দ্বিতীয় খন্ডে অন্তর্ভুক্ত হবে তারিক রামাদানের জীবনী। এই জন্য লিখা হয়েছে তার এই সংক্ষিপ্ত বায়োগ্রাফি। বাংলাদেশে তারিক রামাদানের যারা একনিষ্ঠ পাঠক তাদের পরামর্শ ও মতামতের জন্য এখানে লিখাটি ২ কিস্তিতে পোস্ট করা হলো।)
এক.
সমকালীন ইউরোপীয় ইসলামের বলিষ্ঠ স্বর, চিন্তাবিদ, দার্শনিক, শাস্ত্রজ্ঞ ও মিডিয়া তারকায় পরিণত তারিক রামাদান একই সাথে ভক্তজনের নিবিড় ভালোবাসা ও উষ্ণ বিতর্কের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখান থেকে তিনি ইসলাম সম্পর্কে মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের ধারণা ও মতামত সংস্কারের এক সংগ্রামী মিশন শুরু করেছেন। তারিক রামাদানের লেখা রসুল চরিতের নাম হচ্ছে In the footsteps of the Prophet : Lessons from the life of Muhammad. এখানে তিনি ভক্তি ও যুক্তির অপূর্ব সংমিশ্রণে যা বলতে চেয়েছেন তা হচ্ছে ইসলাম ও তার নবীর বাণী আজকের দিনের মুসলমানরা তাদের জীবনে কিভাবে সৃষ্টিশীল ও কার্যকরীভাবে প্রয়োগ করতে পারবে।
তিনি ইসলামী শাস্ত্রবিদদের দ্বারা এ যাবৎ ‘দারুল ইসলাম’ ও ‘দারুল হরব’ -এ পৃথিবীকে বিভাজনের ঐতিহ্যকেও সংস্কারের কথা বলেছেন। তার কথা হচ্ছে পশ্চিমে মুসলমানরা প্রান্তিক ও ক্ষতিগ্রস্থ সংখ্যালঘু হিসেবে শত্রু ভূমিতে বসবাসের ধরণা বদল করে পশ্চিমা সমাজের দায়িত্ববান অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সংস্কৃতির প্রশ্নগুলোকে তারিক রামাদান অত্যন্ত কৌশলের সাথে সবার সামনে নিজের মত করে উপস্থাপন করেন এবং শুরু থেকেই তিনি এ ব্যাপারে দক্ষতার নজীর রেখেছেন। ১৯৯৩ সালে মাত্র ৩২ বছর বয়সে তিনি জেনেভায় ভলটেয়ারের বিতর্কিত Muhammad or Fanaticism নাটকের মঞ্চায়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আওয়াজ তোলেন। ফলস্বরূপ নাটকটির মঞ্চায়ন বন্ধ হয় এবং এভাবে একটি তারকার জন্ম লাভ ঘটে। ১
অবশ্য তার সব কার্যক্রম একইভাবে এগোয় নি। সুইজারল্যান্ডের কলেজ ডি সোসুরেতে শিক্ষকতার সময় তিনি ডারউইনের প্রস্তাবিত জীববিজ্ঞানের পাশে ইসলামী ধারণার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ একটি জীববিজ্ঞানের উপর জোর দেন। এতে তার সহকর্মীরা বিব্রত হয়। তখন তিনি বলেন তিনি কখনো বর্তমানে প্রচলিত কারিকুলাম বাতিলের কথা বলেন নি। তিনি শুধু প্রচলিত ধারণার সাথে নতুন একটি ধারনা যোগ করেছেন। ২
জন্মসূত্রে সুইস নাগরিক তারিক রামাদানের ভক্তরা ইউরোপ ছাড়িয়ে পুরো পশ্চিমা বিশ্বে আজ ছড়িয়ে পড়েছে। তার যুক্তিশীল ও চিন্তামূলক বক্তৃতা শুনবার জন্য অসংখ্য তরুণ-বৃদ্ধ নির্বিশেষে অসংখ্য নর-নারী অপেক্ষা করে। তিনি বিভিন্ন সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে যোগ দেন। টিভিতে কথা বলেন এবং প্রাণবন্ত বিতর্কে অংশ নেন। শুধু তাই নয় ইউরোপের রাস্তায় রাস্তায় বিশ্বায়ন বিরোধী মিছিলে তিনি এক পরিচিত মুখ। ম্যাকডোনাল্ড বিরোধী সমাজতন্ত্রীরাও তার সাথে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তার কায়েমী স্বার্থবিরোধী অবস্থান কখনো কখনো সৌদি আরব, মিশর, লিবিয়া, তিউনেশিয়ার স্বৈরতন্ত্রী ও অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপকদের দারুণভাবে বিব্রত করেছে, যারা প্রতিনিয়ত মানবাধিকার লংঘনের সাথে জড়িত। ফলে এসব দেশে তিনি অবাঞ্ছিত হিসেবে ঘোষিত হয়েছেন। শুধু তাই নয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ত্রাসনীতিরও তিনি একজন সমালোচক।
ফলে সেখানেও তার প্রবেশাধিকারকে সংকুচিত করে দেয়া হয়েছে। তারিক রামাদান একান্তভাবেই ইউরোপের সন্তান ও ইউরোপের সৃষ্টি। ইউরোপের ভাষা ও সংস্কৃতি যেমন তার একান্ত নিজস্ব তেমনি তিনি তার ইসলামী আত্মপরিচয় নিয়েও গর্বিত। তিনি প্রথাগত আলেম বা বুদ্ধিজীবীদের মত নন। মুসলিম দুনিয়ায় বড় বড় আলেম আছেন যারা কোরআন-হাদীসে বিপুলভাবে পারদর্শী হলেও সমকালীন বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, রাজনীতি, অর্থনীতি, দর্শন ও কূটনীতিতে তেমনভাবে সফল নন। তাছাড়া আধুনিককালে মানুষের জীবন, তাদের আশা-আকাঙ্খা, মনস্তত্ব, কর্মকৌশল আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল ও কঠিন। মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি ও ধর্মচর্চা ক্রমাগতভাবে প্রভাবিত ও পরিবর্তিত হচ্ছে তাদের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক দ্বারা। বিশেষ করে পশ্চিমের দেশগুলোতে সংখ্যালঘু মুসলমানদের সমস্যার ধরণ ও বৈচিত্র ঠিক মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোর মত নয়। এ বাস্তবতায় সনাতনী পদ্ধতিতে জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে কাংখিত সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। তারিক রামাদানকে বুঝতে হলে এই প্রেক্ষাপটকে আমাদের মনে রাখতে হবে এবং এই প্রেক্ষিতেই তার উত্থান ঘটেছে নতুন কালের নিশান বরদার হিসেবে।
দুই.
তারিক রামাদানের জন্ম সুইজারল্যান্ডের জেনেভায়, ১৯৬২ সালের ২৬ আগস্ট। তারিকের পিতার নাম সাঈদ রামাদান ও মাতা ওয়াফা আল বান্না। তারিকের মাতামহ ছিলেন মিশরের বিখ্যাত মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতিষ্ঠাতা হাসান আল বান্না। তারিকের পিতা সাঈদ রামাদানও ছিলেন প্রথিতযশা ইসলামবিদ ও আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানে পারদর্শী। একই সাথে ব্রাদারহুডের রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট। এই কারণে মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গামাল আব্দুল নাসের তাকে সুইজারল্যান্ডে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেন।
সুইজারল্যান্ডেও সাঈদ রামাদান ব্যাপক কর্মযজ্ঞ গড়ে তোলেন। এখানে তিনি ১৯৬১ সালে জেনেভা ইসলামিক সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন যেটি একই সাথে মসজিদ, থিংক ট্যাংক ও কম্যুনিটি সেন্টার হিসেবে কাজ করে। তার আর একটি পরিচয় হলো তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত সামাজিক ও ইসলামিক অ্যাকটিভিস্ট ম্যালকম এক্সের একজন পরামর্শদাতা ও মুরব্বী ছিলেন। ১৯৬৫ সালে ম্যালকম এক্স হজ্ব পালন করে দেশে ফেরার পথে জেনেভায় কয়েকদিনের জন্য সাঈদ রামাদানের আতিথেয়তা গ্রহণ করেন। সেখানে দীর্ঘ আলাপচারিতার পর সাঈদের কাছেই ম্যালকম প্রথমবারের মতো ইসলামের শ্বাশ্বত বাণী আত্মস্থ করেন। এ সব কথা ম্যালকম তার শেষ জীবনে সাঈদের কাছে লেখা এক চিঠিতে অকপটে স্বীকার করেছেন।৩ জেনেভায় যেমন তারিকের বেড়ে ওঠা তেমনি এখানেই তার বিদ্যাচর্চার সূত্রপাত। তিনি জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্ডারগ্রাজুয়েট, মাস্টারস ও পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন। মাস্টারসে তিনি দর্শন ও ফরাসি সাহিত্য পড়েন। মাস্টারসে তার ডিসারটেশনের শিরোনাম ছিল The Notion of Suffering in Neitzsche’s Philosophy পিএইচডি ডিসারটেশনের সময় তিনি এটিকে সম্প্রসারিত করেন এবং নতুন শিরোনাম দেন Nietzsche as a Historian of Philosophy.4
জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবি ও ইসলামি শাস্ত্রেও তিনি পিএইচডি করেন। তার বিশেষজ্ঞতার বিষয় হলো ইসলাম ও ইসলামী ধর্মতত্ত্ব, দর্শন, রাজনীতি ও আন্ত:ধর্ম সংলাপ । ইসলাম, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতির উপর লেখাপড়া ও গবেষণার জন্য তিনি কায়রোর আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটিয়েছেন বেশ কয়েক বছর। আল আজহারে মেধাবী তারিক পাঁচ বছরের কোর্স মাত্র ২০ মাসে শেষ করেন এবং একই সাথে ৭টি ইজাজাহ (Certificate) লাভ করেন, যা তাকে ধ্রুপদী ইসলামী জ্ঞানের জগতে অনায়াস প্রবেশের অধিকার দেয়। সুইজারল্যান্ডের কলেজ ডি সোসুরেতে শিক্ষকতা দিয়ে তার পেশাগত জীবনের যাত্রা আরম্ভ। একই সাথে তিনি ফ্রাইব্রুগ বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ম ও দর্শনের প্রভাষক হিসেবে কাজ করেন। কিছুদিন জেনেভায় চাকরীর পর ২০০৫ সালে তিনি অক্সফোর্ডের সেন্ট অ্যান্টনি কলেজে ভিজিটিং ফেলো হিসেবে যোগ দেন। ২০০৭ সালে তিনি নেদারল্যান্ডের লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন ইসলামিক স্টাডিজের অধ্যাপক হয়ে। একই সাথে তিনি রটারড্যামের ইরামুস বিশ্ববিদ্যালয়ে Identity and Citizenship এর অতিথি অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেন। ২০০৯ সালে ইরামুস বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে অধ্যাপকের পদ থেকে অব্যাহতি দেয় এই কারণে ইরানী টিভিতে তিনি একটি অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। রামাদান এই ঘটনাকে Islamophobic I Politically Charged হিসেবে উল্লেখ করেন। ৫ একই বছর (২০০৯) তারিক রামাদান আবার ফিরে যান অক্সফোর্ডে। এবার তাকে অফার করা হয় ‘হামাদ বিন খলিফা আল সানি’ অ্যান্ডাউড চেয়ার। এ চেয়ার বিশেষ করে সৃষ্টি করা হয়েছিল সমসাময়িক ইসলামিক ও ওরিয়েন্টাল স্টাডিজের জন্য।
সুইজারল্যান্ডে থাকতে তরুণ বয়সে তারিক ‘মুভমেন্ট অফ সুইস মুসলিম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। এই সংগঠণের উদ্দেশ্য ছিল দেশের বিভিন্ন জায়গায় আন্তঃধর্মীয় সংলাপের মাধ্যমে সুইসদের মধ্যে ইসলাম সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেয়া। এসব সংলাপে তারিক সরাসরি অংশ নিতেন। ইসলামী চিন্তার জগতে এভাবেই শুরু হয় তারিকের অভিযাত্রা। শুধু তাই নয় তরুণ বয়সে তারিক বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমের সাথেও নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন এবং সুইসদের সাথে মিলিত ভাবে কাজ করেন। এসব সামাজিক কার্যক্রমের লক্ষ্য ছিল শিল্পোন্নত দেশগুলোতে সুবিধাবঞ্চিত ও অবহেলিত বৃদ্ধদের সম্পর্কে সচেতন করা। তার এ কার্যক্রম প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও অনেকখানি স্বীকৃতি পায়। তরুণ শিক্ষক হিসেবে এসব বিষয়ে তিনি ছাত্রদের সচেতন করবার জন্য লেখেন তিনটি বই: The Split Hour Glass, In Red, In the Margin & A Common Point, Difference.6
পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাকে নিয়োগ দেয় ধর্মবিষয়ক একজন উপদেষ্টা হিসেবে। এই সূত্রে তিনি ‘ইইউ কমিশন অন ইসলাম এ্যান্ড সেকুলারিজম’ এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাকে সময়ে সময়ে উপদেশ ও পরামর্শ দিয়ে থাকেন। ২০০৫ সালে ব্রিটিশ সরকার তাকে ধর্মীয় বিষয়ে একটি টাস্কফোর্সে যোগ দেয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। তিনি ব্রাসেলস ভিত্তিক ‘থিংক ট্যাংক ইউরো মুসলিম নেটওয়ার্ক’ এর সভাপতি। তিনি একই সাথে কাতার ভিত্তিক রিসার্চ ‘সেন্টার ফর ইসলামিক লেজিসলেশন এন্ড এথিকস’এর পরিচালক। তার দাওয়া সংক্রান্ত প্রায় ১০০ সিডি আছে যার দুনিয়া জোড়া খ্যাতি ও শ্রোতা রয়েছে। ২০০৮ সালে বৃটেনের প্রসপেক্ট ম্যাগাজিন একটি অনলাইন জরিপের মাধ্যমে তাকে দুনিয়ার প্রভাবশালী ১০০ জন চিন্তকের মধ্যে ৮ম স্থান দেয়।
তারিক তার এই বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রমের পাশাপাশি এক সময় মুসলিম বিশ্বের স্বৈরাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য রাখা শুরু করেন। যার ফলে ২০০৯ সালে তাকে মিশর, তিউনেশিয়া, লিবিয়া, সিরিয়া, সৌদি আরবে অবাঞ্ছিত (Persona non grata) ঘোষণা করা হয়। তারিকের মত স্বাধীনচেতা ব্যক্তির জন্য এটাই হয়তো স্বাভাবিক। শুধু তাই নয় তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানবাধিকারের একজন বড় প্রবক্তা। মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এমনকি স্বৈরাচারী মুসলিম রাষ্ট্র প্রধানদের প্রতি তিনি স্পষ্ট কথা বলতেও দ্বিধা করেন নি। যার কারণে এখানকার সরকার ও রাষ্ট্রব্যবস্থা তাকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করার চেষ্টা করেছে। ইসরাইলকে রক্ষা করতে মানবাধিকারে ছাড় দেয়ায় তিনি ফরাসি ইহুদি বুদ্ধিজীবীদের কঠোর সমালোচনা করেছেন এবং এদেরকে বলেছেন – Knee jerk defenders of Israel.7
২০০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত নটরডাম বিশ্ববিদ্যালয় তাকে লুস অ্যান্ডাউড চেয়ার প্রদান করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু মার্কিন ভিসা না পাওয়ায় তিনি এ চাকরিতে যোগ দিতে পারেন নি। ২০০৩ সালে আমেরিকার ইরাক আগ্রাসনের সমালোচনা করায় ২০০৪ সালে বুশ প্রশাসন তার উপর ভিসা এমবারগো দিয়ে রাখে। এ সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে তারিকের হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুশীল সমাজ ও মানবাধিকার কর্মীরা নিজ খরচে আইনী লড়াই শুরু করে। অবশেষে মার্কিন সরকারের বিরুদ্ধে তার জয় হয়। ২০১০ সালের ২০ জানুয়ারি মার্কিন সরকার তার উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়।
২০০৪ সালে তিনি ফ্রান্সের মুসলিম মেয়েদের হিজাব পরিধানের উপর নিষেধাজ্ঞা জারীর প্রেক্ষিতে আবার বিতর্কে জড়িয়ে যান। তিনি সেকুলারিজমের নামে স্কুলে ও পাবলিক প্লেসে ইসলামী অনুশাসনের উপর ক্রাক ডাউনের ঘোর বিরোধী। এ নিয়ে ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট সারকোজীর সাথে তার তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। তিনি হিজাব নিষেধাজ্ঞার তীব্র সমালোচনা করেন এবং ধ্রুপদী ইউরোপের উদার নৈতিক সংস্কৃতি রক্ষার আহ্বান জানানঃ
Rights are rights, and to demand them is a right … the right of Muslim girls to choose for themselves whether to cover up is a classic libertarians necessity.8
তিন.
তারিক রামাদান কৃত রসূল চরিত In the Footsteps of the Prophet মূলত পশ্চিমা পাঠকদের জন্য লেখা। ইংরেজি ভাষায় লেখা অন্যান্য রসূল চরিতের পাশে এর স্বাদ পাঠকের কাছে একটু অন্যরকম লাগতে পারে। শিল্পী ক্যাট স্টিভেনসের (বর্তমানে ইউসুফ ইসলাম) লেখা রসূল চরিতে দেখা যায় একজন দায়ীর (Preacher) অনুভব। কারেন আর্মস্ট্রং লিখেছেন বুদ্ধিবৃত্তির শক্ত চাদর মুড়ে । মার্টিং লিংসের ভাষার মধ্যে আছে সুফিবাদী অন্তর্লীনতা। তারিক লিখেছেন পশ্চিমের সকল শ্রেণির মানুষের জন্য যারা সহজে রসূলের বাণীকে হৃদয়ঙ্গম করতে পারে।
তারিকের কাছে রসূল হচ্ছেন একজন বিনয়ী, অনুভূতিসম্পন্ন ও মহানুভব ব্যক্তি। তিনি খোদাপ্রেমী অথচ ধর্মান্ধ নন। তিনি তার অনুসারীদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন কোন কিছুর বাড়াবাড়ি বা অতিরঞ্জন কাম্য নয়। মধ্য পন্থাই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ। রসূল তার অনুসারীদের হৃদয় দিয়ে জয় করার পক্ষপাতী ছিলেন। জোরপূর্বক ধর্মান্তরে তার আস্থা ছিল না। মদীনার স্থানীয় সংস্কৃতির অনেক কিছুই তিনি গ্রহণ করেছিলেন। রসূলের হিজরতকে তারিক রামাদান দেখেছেন সংস্কৃতির বৈচিত্র্যময় সংশ্লেষ হিসেবে । ইসলামের বৈশ্বিক নীতিকে অক্ষুন্ন রেখেও নতুন সংস্কৃতিকে গ্রহণ করা সম্ভব এর নজীর মদিনায় মক্কা থেকে আগত মুহাজিররা সম্ভব করে তুলেছিলেন। তারিকের কাছে রসূল (স.) প্রতিভাত হয়েছেন সমতার প্রতীকরূপে যিনি ছিলেন নীতির প্রশ্নে অটল অথচ অন্যের মর্যাদাকে স্বীকৃতি দিতে তার কুণ্ঠা ছিল না। রসূলের আশে পাশে অনেক নারী-পুরুষ ছিলেন যাদের অনেকে তার বিশ্বাসের সহযাত্রী ছিলেন না। কিন্তু তিনি তাদের নৈতিক ও মানবিক সামর্থ্যকে অস্বীকার করেন নি।
তারিক বর্ণনা দিচ্ছেন রসূল তার প্রথম স্ত্রী খাদিজাকে সব সময় যে কোন দাওয়াতের সময় সঙ্গে রাখতেন । এভাবে তিনি লিঙ্গ বৈষম্যের (Gender Segregation) বিরুদ্ধে সেই কালে তার অবস্থান পরিষ্কার করেন। হিজরতের পর রসূল (স.) যে মদিনা সনদের আওতায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন তারিক রামাদান সেটিকে দেখেছেন সংস্কৃতির বৈচিত্র্যের স্বীকৃতি হিসেবে।
রসূলের জীবন থেকে তারিক রামাদান তিনটি শিক্ষা নিয়েছেনঃ
-ধর্ম, বর্ণ ও লিঙ্গ নির্বিশেষে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা ও জুলুমের অবসান।
-ইনসাফ প্রতিষ্ঠার নীতি ইসলামের ভিতর ও বাহির উভয় স্থান থেকেই আসতে পারে।
-ইসলামী নীতি কোন বদ্ধ জলাশয় নয়। বরং এটি একটি বৈশ্বিক নীতির অনুসরণ করে যা কিনা অন্য ধর্ম ও বিশ্বাসের মৌল ভাবনার সাথে একাত্মতা পোষণ করতে পারে।৯
তারিক রামাদানের রসূল চরিত পশ্চিমা পাঠকদের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তারা এ বই থেকে যেমন তৌহিদের বিশ্ব ভাবনায় অনুপ্রাণিত হবে তেমনি সমকালীন সমাজের ভোগবাদ, অস্থিরতা ও প্রতিহিংসার রাজনীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে উদ্ধুদ্ধ হবে। সাংবাদিক আয়ান বরুমা লিখেছেন তারিকের বাণী এ কালে যেন Alternative to Violence – সন্ত্রাসের বিকল্প ।১০
চিন্তা ভাবনার জায়গা থেকে তারিক ঠিক জ্যা জ্যাক রুশোর সাথে একমত হননি, যিনি বলেছিলেন ধর্মীয় বিশ্বাস রাজনৈতিক আনুগত্যকে বিপদে ফেলে দেয়। তারিক বরং জন লকের সাথেই বেশি একাত্মতা বোধ করেন কারণ তিনি বলেছিলেন ধর্মীয় বিশ্বাস জাতীয় নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে বাধা হতে পারে না। তারিক সব সময় তার বক্তৃতাগুলোতে সামাজিক সমস্যার ইসলামীকরণের ধারণার বিরুদ্ধে মত দেন। কারণ তিনি মনে করেন মুসলমান হিসাবে নয়; বরং নাগরিক হিসাবে এ সমস্যাকে আমাদেরকে দেখতে হবে। তাহলেই মুসলমান তরুণরা গাড়ী পোড়ানোর চেয়ে ভোট বিপ্লবে এগিয়ে আসবে।
তারিক রামাদান আরো মনে করেন সুইসাইড বম্বিং ও ভায়েলেন্স কোনো যুদ্ধের অংশ হতে পারে না। সে যে যুদ্ধই হোক, যে অবস্থাতেই হোক। এটা পরিষ্কার ভাবে ইসলাম নিষিদ্ধ কাজ। মানুষ কেন সন্ত্রাসের আশ্রয় নেয় তার মোটিভেশন বোধগম্য হলেও তিনি কৌশল হিসেবে টেররিজম ও ভায়োলেন্সকে ন্যায়সঙ্গত ও যুক্তিপূর্ণ মনে করেন না। মুসলিম বিশ্বের স্বৈরশাসকদের জুলমবাজী ও পশ্চিমাদের পররাষ্ট্রনীতির মধ্যে যে গলদ আছে তার থেকেই সন্ত্রাসবাদের উপস্থিতি- এ ব্যাপারটা তার কাছে যথেষ্ট পরিষ্কার। কিন্তু এর থেকে উত্তরণের পথ কি তা তিনি হয়তো জানেন কিন্তু পশ্চিমের সংখ্যালঘু সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে বাস্তবতার প্রেক্ষাপটকে তিনি উপেক্ষা করতে পারেন না। পশ্চিমের সাংস্কৃতিক কাঠামোর মধ্যে থেকেই তিনি এর একটি ফয়সালা চান। সন্ত্রাসবাদকে তিনি মনে করেন নৈতিকভাবে এটি নিন্দনীয় কিন্তু রাজনীতির সাথে এর যোগসূত্র আছে।
তারিক রামাদান মনে করেন একটি যুক্তিশীল কিন্তু ঐতিহ্যবাদী ইসলামী ভাবাদর্শ ও মূল্যবোধ ইউরোপীয় আলোকদীপ্তির (Enlightenment) চিন্তাভাবনার চেয়ে কম বিশ্বজনীন নয়। সেদিক দিয়ে বিচার করলে তারিকের চিন্তা ভাবনা ঠিক সেক্যুলার নয় কিন্তু একই সাথে পশ্চিমা উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধেরও পরিপন্থী নয়। তার রাজনীতি সন্ত্রাসবাদের বাইরে একটি বিকল্প পথের সন্ধান দেয় যা কিনা পারস্পরিক সহাবস্থান ও বহুত্ববাদী মূল্যবোধের পক্ষে সহায়ক
। (চলবে…২য় পর্ব)





”ইউরোপীয় ইসলামের” কথাটা কেমন হলো? ইসলামের আবার ইউরোপীয় কিংবা এশীয় রূপ আছে নাকি। ইসলাম তো ইসলামই। এর রূপ একটাই। বড় জোর বলা যেতে পারে ইউরোপীয় মুসলিম কমিউনিটির বলিষ্ঠ স্বর, ইত্যাদি ইত্যাদি।
ধন্যবাদ চমৎকার লেখার জন্য।
লেখাটি পড়ে বেশ উপকৃত হলাম। তারিখ রামাদানের নাম শুনেছিলাম। কিন্তু তার সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। অসংখ্য ধন্যবাদ। এই পোস্টের লেখক সম্পর্কে তেমন কিছু জানিনা। তবে এক ফাহমিদ-উর-রহমানের “ইকবাল মননে অন্বেষণে” নামক একটা বই আমার ব্যক্তিগত পাঠাগারে আছে। একই লেখকের “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” নামক একটি বই আমি নিজে পড়েছি এবং বেশ কয়েকটা অন্যদেরকে দিয়েছি। চমৎকার বইটি।
আল্লাহ হাফিজ।
মোঃ ছাইফুল ইসলাম শামীম
সহকারী অধ্যাপক
সিএসই বিভাগ, রা.বি.