[সম্পাদকের নোট:মুল ইংরেজি শিরোনাম “Beyond Islamism”এর সঠিক বাংলা অনুবাদ করা মুশকিল।তা সত্ত্বেও একটা ভাবানুবাদ হিসেবে “ইসলামবাদ অতিক্রম করিয়া” ব্যবহার করা হয়েছে।পুরো প্রবন্ধের থিম খেয়াল করলে এটা পরিষ্কার হয় যে,লেখক প্রচলিত “ইসলামী আন্দোলন তত্ত্ব” থেকে পাঠকদেরকে অগ্রসর করার তাগিদ দিয়েছেন।সেই হিসেবে আমাদের শিরোনাম আশাকরি আমাদের পাঠকদেরকে আশাহত করবেনা।]
মূল : তারেক রামাদান ; অনুবাদ : আবু সুলাইমান
‘ইসলামিজম’ বা ‘পলিটিক্যাল ইসলাম’- কোনোটাই মৃত নয়। যারা এর মৃত্যু ঘোষণা করছে- অথবা ‘পলিটিক্যাল ইসলাম পরবর্তী’ যুগের আগমনী বাঁশি বাজাচ্ছে তারা ভুল করছে। আর আফ্রিকা, এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনা থেকে এটা স্পষ্টভাবে দৃষ্টিগ্রাহ্য হচ্ছে। ইসলামিজম হারিয়ে যাবার কিংবা মৌলিকভাবে পরিব্যক্ত বা রুপান্তরিত হবার কোনো বিষয় নয়। কিন্তু আমার গবেষণা- আমার আদর্শিক অবস্থান- আমার আশা, এই যে, আমাদেরকে অবশ্যই ‘পলিটিক্যাল ইসলাম’ বা ‘নির্বাচনবাদি ইসলামপন্থা’র বৃত্তের বাইরে যেতে হবে এবং ‘ইসলামিজম’ কনসেপ্ট এর সকল দিকের উপর প্রচুর ‘অনুসন্ধানি গবেষণা’ করতে হবে।
আমার এই অবস্থান ব্যাখ্যা দেয়ার পূর্বে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনা করা দরকার। এ সকল বিষয়ে কনফিউশন এতই গভীর যে, সবার আগে এই বিষয়গুলোর ধারণা সুস্পষ্ট করা দরকার।
প্রথমতঃ মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুড কিংবা তিউনিশিয়ার এন্নাহদা তাদের নিজ নিজ দেশের নির্বাচনে বিজয় লাভ করে। সকল গণতন্ত্রবাদীদের অবশ্যই ব্যালট বাক্সের এই বিজয় কে শ্রদ্ধা করতে হবে। ইসলামপন্থীদের ক্ষমতায়ন কিংবা সিদ্ধান্তের সাথে যে কেউ ভিন্নমত পোষন করতে পারে; কিন্তু কোনকিছুই মিশরের এই সামরিক অভ্যূত্থানকে ‘ন্যায্য’ প্রতিপাদন করতে পারেনা। অর্থাৎ সামরিক জেনারেলদের ষড়যন্ত্র প্রত্যাখ্যান করে অসহিংস আন্দোলনকারীদের যে দাবী তা সঠিক। এখানে মূল ইস্যু এই নয় যে, ইসলামপন্থীরা গণতান্ত্রিক আচরণ শিখতে পারেনি। বরং গণতন্ত্র স্বৈরশাসকের নিয়ন্ত্রণে আরো বেশি অনিরাপদ, যেমনটি দেখা গেছে বিগত ষাট বছরে। অন্যদিকে, তিউনিশিয়ায় নির্বাচিত সরকারের বিপক্ষে চরমপন্থী সালাফী কিংবা সেকিউলারিষ্ট কারো ষড়যন্ত্রমূলক কার্যক্রম মেনে নেওয়া যায় না। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সাথে আদর্শগত মতপার্থক্যের কারণে কোনো অন্যায় কে ন্যয় প্রতিপাদন করা যাবেনা।
দ্বিতীয়তঃ পরিভাষাগত সমস্যা। এ বিষয়ে বিভ্রান্তি চরম; কেউই স্পষ্টভাবে জানেনা, ইসলামিজম কি? পরিভাষাটি এখন চরম মর্যাদাহানিকর অর্থে ব্যবহৃত হয় এবং আল-কায়েদা থেকে শুরু করে এন্নাহদা, মুসলিম ব্রাদারহুড, তুরস্ক ও মরক্কোর জাস্টিস এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি, এমনকি ইরানের বর্তমান শাসনকালকেও এই পরিভাষাটি দিয়ে বুঝানো যায়। এটা অবিশ্বাস্য যে, পরিভাষাগত এই যে বিভ্রান্তি সেটি সুচিন্তিতভাবে জিইয়ে রাখা হচ্ছে অথচ পরিভাষাটির সঠিক কোনো ইতিহাস নেয়। উপসাগরীয় অঞ্চলের রাজা শাসিত দেশগুলোর শাসকগোষ্ঠী- যারা পশ্চিমা স্বার্থের সহযোগী মিত্র, যারা বলে ‘গণতন্ত্র হারাম’, যারা ইসলাম কে তাদের নিজস্ব স্বার্থে আক্ষরিক অর্থে ও দমন-নিপীড়ন এর ক্ষেত্রে ব্যবহার করে, নারীদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গন হতে বাইরে রাখে- যদিও তারা মূলনীতি ও কার্যগত দিক থেকে ‘পলিটিক্যাল ইসলাম’ এর অনেক এজেন্ডারই বাস্তবায়নকারী তবুও তাদের কে কখনোই ‘ইসলামিষ্ট’ হিসাবে চিত্রিত করা হয়না।
তাছাড়া, বিভিন্ন ইসলামপন্থী পার্টি বা সংগঠনগুলোকেও সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা দরকার; ইসলামপন্থী দলের মধ্যে কিছু আছে শান্তিপূর্ণ, সংস্কারবাদী ও আইনানুসা্রী; অন্যরা আক্ষরিক ও গোঁড়া, বাকিরা সহিংস ও চরমপন্থী। এরূপে সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িতকরণ ব্যতীত কোন গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক কিংবা রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সম্ভব নয়। এই আর্টিকেলের মূল লক্ষ্য সংস্কারবাদী ও আইনানুসারী ইসলামপন্থী আন্দোলনগুলো (Reformist and Legalist movements); তবে কতিপয় বিষয়ে সকল ইসলামপন্থী আন্দোলনগুলোর প্রসঙ্গ আসতে পারে (এই আলোচনার ভিত্তি হচ্ছে, ‘পলিটিক্যাল ইসলামবাদ’ এর সমর্থকরা (যে কোনোভাবে) রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হতে চায়)।
তৃতীয়তঃ এটা পরিষ্কার যে, ‘ইসলামিজম’ বিষয়ে লিখিত আমার এই সমালোচনামূলক নিবন্ধ কোনভাবেই ‘ইসলামিজম’ এর বিরোধী পক্ষ যা বলে ও যে রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করে তার সত্যায়ন নয়। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে স্ব-আরোপিত ‘লিবারেল’, ‘প্রগ্রেসিভ’, ‘সেকিউলার’, এমনকি ‘বামপন্থীরা’ও (প্রতিটি পরিভাষা ইতিবাচকভাবে গৃহীত) চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে আপন আপন দেশকে সংকট থেকে রক্ষা করার কোন বিকল্প প্রস্তাব উপস্থাপন করতে। ‘পশ্চাৎমুখী ইসলামিস্টদের’ (Retrograde Islamists) বিরোধীতা করাই কারো আদর্শিক বা বাস্তবিক গ্রহণযোগ্যতার জন্য যথেষ্ট নয়। কার্যত, কিছু কিছু ‘লিবারেল’ অংশ অতীতে স্বৈরশাসকদের সহযোগীর ভূমিকা পালন করেছে, পশ্চিমাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছে এবং ব্যর্থ হয়েছে তাদের নিজ নাগরিকদের বুঝতে। তারা প্রায়শ ক্ষেত্রে, ‘ইসলামিস্টদের’ বিরুদ্ধে এক হবার আহবান জানিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যেকার বিভাজন এবং রাজনৈতিক দীনতাকে আড়াল করেছে। এই উদারতাবাদীদের কোনো গণভিত্তি নেই এবং এ বিষয়ে তাদের দলনেতারা যথেষ্ট সচেতন। কাজেই ইসলামপন্থীদের (পূর্ববর্তী) সমালোচনা করার অর্থ এই নয় যে ইসলাম্পন্থীদের ব্যাপারে উদারতাবাদীদের (পরবর্তী) যে মতামত তা সঠিক । আমাদের উদ্দেশ্য, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে রাজনৈতিক সচেতনতার যে চরম সংকট তা তুলে ধরা।
বর্তমানে আমাদের ‘ইসলামিজম’-চিন্তার বাইরে আসার সময় হয়েছে। বিংশ শতকের শুরুতে যখন মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও এশিয়ায় ‘ইসলামিজম’ চিন্তার উন্মেষ ঘটে তখন ইসলামপন্থীদের তিনটি মৌলিক উদ্দেশ্য ছিলোঃ (ক) উপনিবেশ হতে মুসলিম সমাজকে স্বাধীন করা, (খ) পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন মোকাবিলা করে ইসলামকে সামনে আনা এবং (গ) ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে দরিদ্র ও নির্যাতীতদের প্রাধিকার দিয়ে সামাজিক সুবিচার কে অবলম্বন করে যে মুক্তি আন্দোলন গড়ে উঠেছিলো তার থিসিস ও মৌলনীতিকে ব্যাখ্যা করা। ইসলামপন্থী্রা ছিলো ধর্মীয়ভাবে রক্ষণশীল, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে জনগণের কাছাকাছি এবং তারা বিশ্বাস করতো যে, উপনিবেশবাদের যে ‘বহুমুখি শোষণ ব্যবস্থা’ (multifaceted yoke of colonialism) তা থেকে বাঁচার এক মাত্র উপায় হচ্ছে ‘জাতি-রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠা। তাদের এই আন্দোলনের সাথে কেউ একমত পোষণ করুক বা না করুক, এটা দিয়ে কমপক্ষে তাদের আদর্শিক ও রাজনৈতিক পরিচিতি বুঝা যেত।
বিশ্বব্যবস্থা পাল্টেছে। কিন্তু মুসলিম ব্রাদারহুডসহ অন্যান্য ইসলামপন্থি দলগুলোর কার্যক্রম বিশ্বব্যবস্থার সাথে সমানুপাতিক হারে পাল্টেনি। বিশ্ব-ইতিহাসের উন্নয়নের যে গতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিবর্তনের যে হার এবং গ্লোবালাইজেশনের যে নতুন ধারা, তার সাথে ইসলামপন্থি দলগুলো সমান পদক্ষেপে সঙ্গতি রক্ষা করতে পারেনি।তাছাড়াও, বর্তমানে জাতি-রাষ্ট্রের ‘ক্ষমতার ধারণা’র পরিবর্তন ঘটেছে। যখন জাতি-রাষ্ট্রের ধারণার উৎপত্তি ঘটে, তখন রাষ্ট্র-ক্ষমতাকে মনে করা হতো সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের একমাত্র নিয়ামক। আজ জাতি-রাষ্ট্রের এই চরম ক্ষমতার সমাপ্তি ঘটেছে। ফলতঃ বিশ্বব্যাপি অনেক ইসলামপন্থী আন্দোলনগুলোর মৌলিক উদ্দেশ্য ও কর্ম-কৌশলের মাঝেও অনেক ভূল পরিবর্তন বাধ্যগতভাবে এসেছে। এ সকল ফ্যক্টরের কারনে কাল পরিক্রমায় ইসলামপন্থী আন্দোলনগুলোর মাঝে এক ধরনের অসংলগ্নতা তৈরী হয়েছে এবং তারা ব্যর্থ হয়েছে নতুন যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে। ইসলামপন্থী আন্দোলনগুলো জাতীয়তাবাদী হওয়ায়, জাতি-রাষ্ট্রের ধারণা তাদেরকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। ফলে তারা যেমন একদিকে অবহেলা করেছে অর্থনৈতিক ইস্যু, সাংস্কৃতিক ইস্যু তেমনি ব্যর্থ হয়েছে স্বাধীনতা, নাগরিকত্ব, ব্যক্তিক বিকাশের মত মৌলিক প্রশ্নগুলোর সমাধান দিতে। বিরোধী দল হওয়ায়, তারা নিজেদেরকে ব্যস্ত রেখেছে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণকে পশ্চিমাদের দৃষ্টিতে বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহনযোগ্য করে তোলার কাজে। ফলে ইসলামপন্থীরা পরিণত হয়েছে ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ গোষ্ঠীতে এবং ‘প্রয়োগবাদ’ এর নামে একের পর এক ইস্যুতে ‘আপোষমূলক’ অবস্থান গ্রহণ করেছে। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক মুক্তি অর্জনের ক্ষেত্রে তাদের যে অমিত সম্ভাবনা ছিল সেটা নিষ্ফল করে তারা তাদের ‘রিলিজিয়াস রেফারেন্স’ অক্ষুন্ন রেখেছে।
ধর্মীয় গ্রন্থের নতুন ব্যাখ্যা হতে আমরা আর কত দূরে অথবা জনগণের মুক্তির ‘ধর্মতত্ব’ হতে কত দূরে যেখানে থাকবে দরিদ্র ও নির্যাতিতদের অগ্রাধিকার এবং যা সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক কে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিভাষা দ্বারা ব্যাখ্যা করবে। চলমান বিশ্বব্যবস্থায় উপহার দেয়ার মত কোন ‘বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থা’ ইসলামপন্থীদের নিকট নেই। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাবার চেষ্টায় বুঁদ হয়ে থাকায় ‘প্রকট পুঁজিবাদি অর্থনীতি’র সামনে তারা মাথা নত করে রেখেছে। ধর্মের অনুস্মরনের ক্ষেত্রে তারা পশ্চিমা বিশ্ব ও পশ্চিমাদের ‘চরম স্বাধীনতা’র বিপরীতে হয়েছে অতিমাত্রায় ‘প্রতিক্রিয়াশীল ও গোঁড়া’।
ফলশ্রুতিতে খুইয়েছে শিক্ষা, সামাজিক সুবিচার, পরিবেশ, কালচার ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে কোন নৈতিক সমাধান প্রস্তাব করার যোগ্যতা । দেখা গেছে আবেগাশ্রয়ী, পরিচিতি সংশ্লিষ্ট অথবা নির্বাচন পদ্ধতির ক্ষেত্রে ধর্মকে ব্যবহারের ‘সস্তা জনপ্রিয় উদ্দ্যোগ’(Populist attempts) গ্রহণ করতে ।
তুরস্কের অর্থনৈতিক অগ্রগতি প্রশংসনীয় । তুরস্কের নেতাদের দক্ষতা ও প্রায়োগিক যোগ্যতা উল্লেখ করার মত (পাশাপাশি জনগণের মৌলিক কিছু স্বাধীনতা হরণ ও ক্ষমতা কুক্ষিগত করার যে মানসিকতা তা অবশ্যই সমালোচনাযোগ্য)।
এটি ভাল যে, মিশর ও তিউনিশিয়ায় ইসলামিষ্টদের চিন্তার কিছু্টা উন্নয়ন ঘটছে অথবা ধর্মীয় সীমার মধ্যে ধর্ম-ভিত্তিক “ইসলামিক স্টেট” এর পরিবর্তে “সিভিল স্টেট” এর উদ্ভবের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে । কিন্তু তাদের আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকছে কেবলমাত্র স্লোগান ও ক্ষমতা গ্রহনের মাঝে এবং সেখানে সুস্পষ্ট, মৌলিক ও উদ্ভাবনী রাজনৈতিক প্রকল্পের ঘাটতি রয়েছে। আইনানুসারি ও রক্ষণশীল ইসলামিস্টদের (Legalist and Conservative Islamists) কার্যক্রমে উল্লেখ করার মত কিছু নেই। বৈপ্লবিক কোনো পরিবর্তন আনার মত সামর্থ্য তাদের নেই। বরং বিরোধী পক্ষ যতটুকু ভাল বা মন্দ মত করার সামর্থ রাখে তারাও তেমনি।
এখন আমাদের উচিৎ অগ্রাধিকার তালিকা পুনঃনিরীক্ষণ করা, গতিপথ (প্যারাডাইম) পুনঃনির্ধারণ করা। এখন উচিৎ ‘নির্বাচনবাদি ইসলামপন্থা’র অতিমাত্রিক রাজনীতিকীকরণ বন্ধ করা। শতাব্দীব্যাপি রাষ্ট্র শক্তির বিরোধীতা করে এবং বিগত কয়েক দশক ক্ষমতা চর্চা করে ‘ইসলামিজম’ বর্তমানে একটি মধ্যপন্থা ও ব্যবস্থাপনার ‘আদর্শ’-তে পরিণত হয়েছে। প্রতিক্রিয়াশীলভাবে পশ্চিমা আগ্রাসনের বিরোধীতা কিংবা নিজেদের মাঝে শত্রু তৈরী করা ছাড়া বৃহত্তর পরিসরে উপহার দেয়ার মত এখানে আর কিছু নেই। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো যতদিন এরুপ নিয়ন্ত্রণপ্রবণ ও প্রতিক্রিয়াশীল ভিশন এর মাঝে সীমাবদ্ধ থাকবে ততদিন তারা নিজেদের ‘স্বাধীন’ করতে পারবে না।
বিশ্বাস, ধর্ম আর আইনের ‘বায়বীয় ধারণার’ পুরোপুরি বাইরে এসে জনগণের প্রকৃত মুক্তির, আত্মমর্যাদার এবং আধ্ম্যাতিকতার প্রয়োজনের কথা শুনতে হবে। আমাদের সামনে মূল কাজ হচ্ছে মানুষের কর্মের প্রকৃত লক্ষ্য নিয়ে নতুন ভাবে চিন্তা করা এবং বর্তমানের অবিচার ও অমানবিক বিশ্বব্যবস্থার একমাত্র প্রকৃত বিকল্প হিসেবে ব্যক্তিক ও সামাজিক নৈতিকতার একটি মানদন্ড নির্ধারণ করা।
স্বাধীনতা, সুবিচার, আত্মমর্যাদা এবং মানব-মুক্তির প্রয়োজন কখনোই এখানে বৃহত্তর হয়ে উঠেনি; আজকের মুসলমানদের সকল বিষয়ে প্রয়োজন সার্বিক ও সমন্বিত দর্শন। ‘নির্বাচনবাদদী ইসলামপন্থা’ মুসলমানদেরকে যে আজ সব বিষয়েই বিশৃংখল ব্যবস্থাপনার মধ্যে হাজির করেছে সেখান থেকে তাদের মুক্তি আবশ্যক। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো আজ তার বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের জন্য হাহাকার করছে; এ বিপ্লব হবে অন্তর্গত দিক থেকে মৌলিক এবং লক্ষ্যমাত্রার দিক থেকে নজিরবিহীন ।
ক্ষমতা চর্চাকারী এবং ক্ষুদ্র রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের নিকট হতে দূরে থেকে আমাদেরকে ইসলামী সভ্যতার যে প্রকৃত ঐতিহ্য ও সম্পদ যা মানব-মর্যাদা, স্বাধীনতা, সুবিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তার আইন তৈরী করে তার সাথে সামঞ্জস্যবিধান করতে হবে। আজকের মুসলিম জনগণের নিজেদের পুনর্মূল্যায়ন জরুরী। আর এই প্রক্রিয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আধ্যাত্মিকতা এবং মিস্টিসিজম বা সুফিবাদ । সুফিবাদের সে নির্দিষ্ট ফর্ম এর কথা বলছিনা যা ”রাজনীতিতে অংশ নিতে” চাইনা এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা চর্চার (এবং ক্ষমতা চর্চাকারীদের) খেলায় নিঃশেষ হয়ে যায়, বরং এমন খাঁটি সুফিবাদ যা মানুষের মানবিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক (সুবিবেচক ও ন্যায় বিচারক সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে) কার্যক্রম থেকে অবিচ্ছিন্ন।
স্বাধীনতা কে শরীয়াহর মাধ্যমে নিশ্চিত করাই যথেষ্ঠ নই; বরং আধুনিক যুগের দৃষ্টিকোণ থেকে ‘স্বাধীনতা’র পূর্ণ অনুধাবন প্রয়োজন । শরীয়াহর উচ্চতর উদ্দেশ্যকে (মাকাশিদ) অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে ‘ঈশ্বরের অধরা আইন হিসাবে পরিচিত যে হ্রাসপ্রাপ্ত প্রবিধান’ তার উপর। আর এ বিষয়টি ঈমাম আস-সাতিবি ‘শরীয়াহর উদ্দেশ্য’ শীর্ষক লেখায় তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, মূলত ‘শরীয়াহর উদ্দেশ্য’ই হচ্ছে ‘আইনের দর্শন’ এবং এই বিষয়টি অবশ্যই ‘স্বাধীনতার ধারণা’র জন্য চিন্তা করতে হবে। আমাদের এমন একটি “স্বাধীনতা দর্শন” প্রয়োজন যা হবেনা সংকুচিত, প্রতিক্রিয়াশীল কিংবা গোঁড়া বরং তা হবে নারী এবং পুরুষ উভয়ের জন্য সমভাবে বিস্তৃত, হোলিস্টিক এবং মুক্তিদায়ী।
পুরুষ ও নারী উভয় গ্রুপ হতে তরুণ আলেম বা পণ্ডিত এবং বুদ্ধিজীবী প্রয়োজন যারা কিঞ্চিৎ হলেও সাহস প্রদর্শন করবে । তরুণ বুদ্ধিজীবীদের ইসলামের মৌলিক বার্তা আর নিয়মের প্রতি সশ্রদ্ধ থাকতে হবে। পাশাপাশি পুরনো ইসলামী ঐতিহ্য কে যারা শক্তি যুগিয়েছে তাদের সাথে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অবশ্যই পুনর্মিলনের পথ খুঁজতে হবে। যে সকল প্রতিষ্ঠান তরুণদের তৈরী করেছে, যেগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রনে এবং চিন্তাগতভাবে দূর্বল (যেমন- আল-আজহার বা উম্মুল- কুর-আ) সে সবের নিয়ন্ত্রণ হতে তাদের মুক্ত হতে হবে। শুধুমাত্র নিষ্ক্রিয় দর্শক না হয়ে তাদের সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে এবং সিভিল সোসাইটির ডাইনামিক্সে নতুন অর্থ যুক্ত করার মাধ্যমে তাদের উপস্থিতি প্রমাণ করতে হবে। তরুণ বুদ্ধিজীবীদের নতুন নতুন ক্ষেত্র বের করতে হবে, নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে এবং নতুন ভাবে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। নিজেদের আত্মবিশ্বাসী রেখে প্রতিষ্ঠিত সমাজ ব্যবস্থাকে তাদের প্রশ্নবিদ্ধ করতে হবে।
যদিও চ্যালেঞ্জ বিশাল, তবুও রাজনীতির আবেশ থেকে নিজেকে মুক্ত রেখে, একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের উচিত “প্রভাবশালী অর্থনীতির বিকল্প ‘পাল্টা-শক্তি’ কিভাবে শিক্ষা ও সামাজিক আন্দোলনের ভিত্তিতে সাংস্কৃতিক ও শৈল্পিক সৃজনশীলতার মাধ্যমে মানব মুক্তির পথ উম্মুক্ত করে তা সুস্পষ্ট করা”। স্বশাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে একটি সাধারণ চূড়ান্ত লক্ষ্য প্রস্তাবের (Propounding general ultimate goals) এবং বৈশ্বিক ভিশন প্রণয়ন (Developing a global vision) করার ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণভাবে যে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতা তা আমি এখানে উল্লেখ করেছি। শিয়া-সুন্নি এবং সঙ্ঘাতমুখী বিভিন্ন মাজহাবের মাঝে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া দরকার। যে সকল ঘটনা এই বিভাজন এর ক্ষেত্রে ইন্ধন যোগায় সেগুলো গুরুতর কিন্তু স্পষ্টত হাস্যকর। বর্তমানের স্কলার, মুক্ত বুদ্ধিজীবী এবং আন্দোলনের কর্মীদের আবশ্যিকভাবে এই ফাঁদ থেকে দূরে থাকতে হবে (অথচ ইসলামিষ্টরা এই ক্ষেত্রে নিজের নাঁক কেটে হলেও অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করে)।
মুসলমানরা তাদের প্রতিরোধে একা নয় । শুধুমাত্র উত্তর ও দক্ষিণ এর মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করায় নয় বরং ‘ইসলাম বনাম পশ্চিম’ এর মাঝে যে বিরোধপূর্ণ সম্বন্ধ গড়ে তোলা হয়েছে তার অপসারণও জরুরী । ল্যাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা, এশিয়ার সাথে শিক্ষা, বৈজ্ঞানিক এবং সাংস্কৃতিক অংশীদারিত্বের যে সম্ভাবনা তার অন্বেষণ অত্যাবশ্যক। মুসলিমদের যে পূর্বতন ধারণা – “সকল জ্ঞান তার নিজের তৈরী হতে হবে- উৎস যাই হোকনা কেন”- তা আজ পরিত্যক্ত হয়েছে । মুসলমানরা নিজেরাই অন্তর্গত দিক থেকে বদলেছে। অন্যান্য সভ্যতা, সংস্কৃতি ও সামাজিক কাঠামোকে অধ্যায়ন করতে, এর সঙ্গে আদান-প্রদান উৎসাহিত করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে মুসলমানরা সেখান থেকে কোন লাভ পায়নি। বরং মুসলমানরা দিনে দিনে আরো দূর্বল হয়েছে। ইসলামিষ্টরাও এর ব্যতিক্রম নয়। উত্তরের দিকে আবিষ্ট থেকে তারা বিভ্রান্ত হয়েছে এবং দক্ষিণকেও হারিয়েছে (কেন্দ্রস্থ কিবলা হতে পরিধিস্থ সকল বিদুর দুরত্ব এবং মান কি একই নয়?)।
আজকের ইসলামিষ্টরা রক্ষণশীল ভূমিকা গ্রহণ করছে যা কেবলমাত্র ‘অভিযোজিত’ হতে চাই। সমসাময়িক মুসলিম মনন কে অবশ্যই এই ‘রক্ষণশীল অবস্থানগ্রহণ’ হতে মুক্ত হতে হবে এবং তাদেরকে ইসলামের ঐতিহ্যের মাঝে মানবিকতা ও আধ্যাত্মিকতার জন্য যে সংস্কারবাদী ও প্রাক-বৈপ্লবিক শক্তি (near revolutionary power) নিহিত রয়েছে তার প্রতি তাদের অঙ্গীকার পূনর্মূল্যায়ন করতে হবে। আর এই ঐতিহ্য একই সাথে ভেতর ও বাহির উভয়ের সাথে সমভাবে পূনর্মিলনের আহবান জানায়। এক চক্র শেষ হয়; নতুন চক্র উঁকি দেয়। নিজস্ব ঐতিহ্যের সাথে উপযুক্তভাবে পরিচিত হবার মাধ্যমে, অগ্রাধিকার তালিকা সুনির্দিষ্ট করার মাধ্যমে এবং আমাদের নিকট যে নতুন সরঞ্জাম রয়েছে তার সদ্ব্যব্যবহারের মাধ্যমে আমরা আমাদের যে লক্ষ্য – স্বাধীনতা, আত্মমর্যাদা ও মুক্তি- তা অর্জন করতে সক্ষম হবো । “আজকের আত্মবিশ্বাসহীন মুসলমানরা হচ্ছে ওয়ার্ডেন (দ্বার-রক্ষক) যে তাদের কম্পিত হাতে ধারণ করে তাদের ‘নিজের কারাগার’-এর চাবি” প্যারাডক্সটি আজকের মুসলমানদের জন্য সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে ।




