“”** কাজী ফৌজিয়া **””
ধর্মের নামে সামজিক একটি নির্দিষ্ট বৈষম্যের বিষয়ে প্রশ্নটি অনেক দিন থেকেই মনের মধ্যে একটা পাথরের মত চেপে ছিল। কিন্তু বলতে সাহস পাইনি। আজ বেশ সাহস নিয়ে লিখতে বসে গেলাম; যা হবে দেখা যাবে কিন্তু নিজেকে আর বেঁধে রাখতে পারলাম না। বিভিন্ন ধর্মের উপাসনালয়ে কাজের অংশ হিসেবে যেতে যেতেই কৈশোর থেকে গেঁথে থাকা প্রশ্নটি পোক্ত হয়েছে। আজ সেই প্রশ্নটি রাখছি সবার সামনে আঘাতের জন্য, সমাধানের প্রত্যাশায়।
এই বছর আমার অর্গানাইজেশন আমাকে দায়িত্বদিয়েছে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গুলির সাথে সম্পর্ক বানাতে ও মেম্বার বানাতে। এই কাজের ধারাবাহিকতায় সেদিন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের স্বরস্বতী পূজা উপলক্ষে মন্দিরে গেলাম আউট-রিচ করতে। আমি হিজাবি মহিলা মনের মধ্যে সংকোচ ছিল মন্দিরের পূজারী আর ভক্তরা কিভাবে নিবে আমাকে। যখন গিয়ে কথা বলা শুরু করলাম তারা খুবই বিনয় এর সাথে আমার আগমনের হেতু শুনলো। পূজারী আর পূজা কমিটির লোকের সহযোগিতার অভাব ছিল না ।পুজাস্থানে তাদের নিজেদের মধ্যে খন্ডন বা খন্ডিত হওয়ার চিত্র ওখানেও ছিল। বাঙালীরা দোতালায় আর ইন্ডিয়ানরা নীচতলায় পূজা পালন করছিল। বিদ্যা-দেবীও আলাদা ছিল।
আমার মত মুসলিম হিজাবী মহিলা দুই পূজাতেই অভ্যর্থনা পেল। যখন চলে আসতে চাইলাম কেউ আমাকে না খেয়ে আসতে দিবে না তাদের একটাই কথা ভগবান এর প্রসাদ না খেয়ে যাওয়া যাবে না।আমি ভাবলাম রুটি-রুজি আল্লাহর তরফ থেকে আসে তাই একে আমি উপেক্ষা করতে পারিনা। মন্দির থেকে বের হয়ে সারা পথ একটাই প্রশ্ন শাখা সিঁদুর পরা কোন মহিলা কি মসজিদে ঢুকতে পারে। এমন কি আমি মসজিদের কেন্দ্রীয় নামাজের ঘরে যেতে পারি?
মনে পরে ৩ বছর পূর্বে এক পান্জাবী শিখ দাদা আমাকে গুরু দুয়ারা নিয়ে গিয়েছিল; খাওয়ার সময় তাদের আপ্যায়ন দেখে মনে হল স্বয়ং গুরু নানক বুঝি তাদের সামনে খাবার খেতে এসেছে। পুরো দুনিয়ায় শিখ ধর্মের লোকেরা তাদের গুরু দুয়ারায় তিনবেলা যে কোন ধর্মের মানুষকে খাবার পরিবেশন করে। মানুষের বিনয় আমাকে গিল্টি ফীল করতে বাধ্য করে। ভাবছিলাম কোথায় হারিয়ে গেল মুসলমানদের ভেতরে ইসলাম ধর্মের মহত্বের নিদর্শনগুলো? কেন আমরা আজ আমাদের সেই পরশ-মনির আলো থেকে দুরে? ‘আমরা সেরা’ এই চিন্তা আমাদের চিন্তায়, কিন্তু কাজে কর্মে চর্চায় কোথায় আমাদের অবস্হান? ভাবনাগুলো আজকাল পিছু ছাড়ে না।সেই পরশমনির আলো যা আইয়ামে জাহেলিয়াতকে হার মানিয়ে মেয়েদের দিয়েছিল সম্মান; যা আসলে মানুষকেই দিয়েছিল সম্মান। জাতপাত এর উর্ধ্বে এক সমাজ উঁচু-নিচুর ব্যবধান ঘুঁচিয়ে মানুষকে বলেছিল সেরা। সেই সৌন্দর্য খুঁজে বেড়াই আমি প্রতিদিন।
আমার কাজের কারনে প্রেসবেটেরিয়ান, ক্যাথোলিক, মেথোডিস চার্চে যাই, প্রতিবার প্রবেশ মুখে চিন্তা করি আমি হিজাবী মুসলিম মহিলা, কেউ অপছন্দ করবে না তো ? এই সব চার্চে বড় বড় পদে যে সব পাদ্রিরা থাকেন তাদের সাথেও কথা বলি। ব্যবস্হাপনায় যারা থাকেন তারাও কথা বলেন। আজ পর্যন্ত কোন খারাপ আভিজ্ঞতা হয়নি আমার। আমাদের ওয়ার্কার রাইটস, ইমিগ্র্র্রেশন রাইটস, মুসলীম প্রফাইলিং বন্ধ করন সবকিছুতেই সমর্থন সহযোগিতা পাই এদের কাছ থেকে। বরং নিজের ধর্মের লোকের কাছে হয়েছি অপমানিত।
কখনো কোন কাজে মসজিদে গেলে, পড়িমরি করে ছুটে আসে কেউ- হ্যালো এখানে না !! মহিলাদের নামাজের জায়গা পিছনের রুমে বা বেইসমেন্টে। আমি যদি বলি আমি ইমাম বা সেক্রেটারির সাথে দেখা করব কাজ আছে, তাহলে অফিস বা গেটের বাইরে বা রাস্তায় অপেক্ষা করতে বলবে। একবার তো মাইনাস ৫ আবহাওয়ায় ৩০ মিনিট রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলাম সেক্রেটারির সাথে কথা বলতে। কবে কখন মসজিদে আইন হল মহিলারা মুল নামাজের রুমে থাকতে পারবে না, তাদের আলাদা রুমে পিছনে বা বেইসমেন্ট পাঠানো হবে আমি জানি-না।তবে জানি হজ্বে পুরুষ মহিলার এক সাথে সব ইবাদত করে, নবীজির সাথে উনার বিবিরা যুদ্ধে যেতেন। সব রকম ইতিহাসই তো বলে ইসলামই মেয়েদের প্রাপ্য সম্মান ও সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করেছে। তবে কে বানাল এতসব বৈষম্য-মূলক আচরণ?
আমার বাবা ছেলে মেয়ে কে সমান সম্পত্তি দিয়ে গেছেন। তিনি বলতেন আমি সন্তানদেরকে দুই নজরে দেখব না,সবাই আমার কাছে সমান। বাবা একটা মসজিদ প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। তিনি মারা যাওয়ার পর আমার ভাই মতোয়াল্লি। আমার মা বা বোনেরা কখনো মতোয়াল্লি হব না এটাই আইন। এই সামাজিক আইনকে বাবা ভাঙ্গতে পারেননি। আমি মনে করি চাইলেও পারতেন না।
আমাকে অনেকেই দাওয়াত দেয় মুসলিম সেন্টারে নামাজে যেতে আমি যাই না। আমি বলি পিছনের রুমে বা বেইসমেন্টে স্পিকারে শুনে নামাজ পড়ার চেয়ে আমার ঘরই উত্তম। ওখানে আমি আমার পছন্দের জায়গায় দাড়াতে পারি। আর আমাকে বন্দি করার পেছনে পুরুষদের লজিক হল তাদের মনে শয়তান ঢুকে পরবে, ইমান নষ্ট হবে, লোভ লালসা তৈরি হবে। এই সবতো পুরুষদের সমস্যা তারা ইমান মজবুত করুক শয়তান বিতাড়িত করুক আর যদি না পারে চোখ বেধে নামাজ পরুক ।আমাকে আমার আল্লাহর ঘরে অপমানজনক আচরণ আমি মানতে পারি না। তাই নামাজেও যাই না। ঘরই আমার জন্য উত্তম ইবাদত এর স্হান। একদা ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রাহ্মনদের অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে কাতারে কাতারে নিম্ন বর্ণের হিন্দু ধর্মের মানুষ বৈষম্যহীন ইসলামের ছায়ায় এসেছিল। সেই অত্যাচার একটুও না কমলেও, অত্যাচারিতের সেই স্রোত ইসলামের আশ্রয়ে আসা কি কমে যায়নি? এজন্য কে দায়ী? ইসলামের সেই মহত্ব আর সৌন্দর্য কাদের জন্য আজ প্রশ্নবিদ্ধ?
কয়দিন পূর্বে নিউ ইয়র্কে মেয়েরা পালন করল হিজাব ডে রেলী ।আমাকে দাওয়াত দিয়েছে আমি যাইনি; কেন যাব? হিজাব আমার উপরে আমি পড়তে চাইলে পরব। না পরতে চাইলেও কেউ বাধ্য করতে পারবে না। যদি কাজের জায়গায় কেউ বাধা দেয় ধর্মীয় চর্চা ও পোশাকের কারণে, তবে রিলিজিয়াস ডিসক্রিমিনেশন কেস হবে। তাই এই ডে নিয়ে আমার মাথা ব্যথা নেই। আমি সেদিন যাব যেদিন মেয়েরা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান যাকে আল্লাহর ঘর বলা হয় সেই ঘরে তার বান্দার প্রতি অসম ও বৈষম্যমূলক আচরণের প্রতিবাদে তারা রাস্তায় নামবে। আমি জানি এই লিখা দেখে অনেকে গালি দিবে, দেয় দিক মনের মাঝে অপমানিতের আগুন আজকের নয়, ৩৫ বছরের। আমার বয়স ৪৫ বছর আমি ৩৫ এজন্য বললাম ১৯৭৭ বাবা যখন মসজিদ বানান, আমি দলবল নিয়ে ফ্লোরের মাটি পিটিয়ে ঠিক করি, মাটি গুলিয়ে ফ্লোর নিখুত করে লেপে দেই। সপ্তাহের একদিন মসজিদ পরিস্কার করতাম।
একদিন ইমাম সাহেব ঘোষণা দিলেন, আমি বড় হয়ে গেছি তাই আমি আর মসজিদে ঢুকতে পারব না। তারপর থেকে কোন কাজ থাকলে ভিখারির মত দরজায় দাঁড়াই। কি আজব যিনি আমায় সৃষ্টি করে আশরাফুল মখলুকাত ঘোষণা করেছেন, তাঁর বান্দার কাছে আমি অপমানিত হই, তাঁরই ঘরে।তাই এই লেখা কাউকে আঘাত করার জন্য নয়, সমাজের একটি বৈষম্যমুলক ব্যবস্হার উপর আঘাত দিতে।
কেউ যদি এর পক্ষে ব্যাখ্যা দিয়ে আমার এ ক্ষোভের নিরসন করতে পারেন, আমন্ত্রন রইল তার কাছে সবার জন্য লিখে জানানোর।





এই লিখায় লেখকের মন্তব্যের পক্ষে বা বিপক্ষে মতামত চাই।
আপনি কোন মসজিদে এমন বেইজমেন্টে মহিলাদের নামাজের ব্যবস্থা দেখেছেন- তা উল্লেখ করেন নি।
তাছাড়া অনেক মসজিদ মহিলাদের আলাদা ব্যবস্থা আছে, তবে হ্যা, এটা খুব খারাপ নিয়ম আমাদের দেশে যে, ঈমাম সাহেবের সাথে দেখা করতে হলে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা লাগবে, আর দেখা করার ব্যপারটাও সহজ না।
এদিকে বলেছেন- //আমি বলি পিছনের রুমে বা বেইসমেন্টে স্পিকারে শুনে নামাজ পড়ার চেয়ে আমার ঘরই উত্তম। ওখানে আমি আমার পছন্দের জায়গায় দাড়াতে পারি। আর আমাকে বন্দি করার পেছনে পুরুষদের লজিক হল তাদের মনে শয়তান ঢুকে পরবে, ইমান নষ্ট হবে, লোভ লালসা তৈরি হবে। এই সবতো পুরুষদের সমস্যা তারা ইমান মজবুত করুক শয়তান বিতাড়িত করুক আর যদি না পারে চোখ বেধে নামাজ পরুক// । আপনি কি পুরুষের সাথে এক রুমে নামাজ পরার পক্ষে?
রেলিবেন্ট হবে একটা পোস্ট, এই ভিডিওতে মসজিদে মেয়েদের নামাজ নিয়ে কিছু কথা বলেছেন শায়খ আকরাম নদভী।
http://imbdblog.com/?p=2315
আমার কাছে মনে, মেয়েদের প্রতি ইসলামিস্টদের অসংখ্য বৈষম্যের কারণেই এ প্রশ্নটা উঠেছে। এটা দীর্ঘদিন ধরে জমতে থাকা ক্ষোভের পাহাড়ের একটা আইসবার্গ মাত্র।
এটা কাঠমোল্লাদের নিজের বানানো আইন-নবী সাঃ ঈদের মাঠেও মেয়েদের নিয়ে নামাজ পড়েছেন–আর এরা এটাকে নিষিদ্ধ করে বিদাতের জন্ম দিয়েছেন।
আমার মেয়েদের আমি নামাজে নিয়ে যাই-কিশোর বয়স পরযন্ত নিতাম, পরে মেয়েরাই আর যেতে চায়না বড় হয়েছে এবং কেউ কিছু বলবে এই ভয়ে?
আল্লাহ-নবীর আইন যারা চেঞ্জ করে তারা কি মুসলিম হতে পারে??
মসজিদে নারি পুরুষ উভয়ের যাওয়ার অধিকার রয়েছে ।