সমস্যাটা আসলে কাদের? একটি শিশু যে এখনো ঠিকমতো হাঁটতে শেখেনি। কথা বলতে পারে না। এমনকি ভাল-মন্দের কোন পার্থক্যই যার জানা নেই। তার দিকে তাক করা অস্ত্রের নল দেখলে কি মনে হয়? ওই শিশুটার পরিচয় ছাপিয়ে আরও অনেকগুলো বিষয় কি সামনে আসে না! তার কোন ধর্ম নেই। তার কোন মতবাদ নেই। সে কাউকে গালি দেয় না। কেবল ক্ষিদে পেলে কাঁদে। তাহলে তার দিকে যে অস্ত্রের নল তাক করা হলো, গুলি করা হলো, হাত-পা ছিঁড়ে শকুনের খাবার করা হলো; এসবের যৌক্তিকতা কোথায়?
কিছুদিন আগে একজন তরুণ গবেষকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। ইরাকে যে সুন্নীরা লড়াইয়ে নেমেছে ওটা হচ্ছে দীর্ঘ অন্যায়ের একটা কঠোর প্রতিবাদ। অনেকেই বিশেষ করে আমেরিকানরা এতে শিয়া-সুন্নীর দ্বন্দ্ব খুঁজে বের করেছে। সত্যিটা তারা সামনে আসতে দিবে না। মার্কিন মিডিয়ার মতো মুসলিম দেশগুলোর মিডিয়ায়ও দেদারছে বলে বেড়াচ্ছে ওটা হলো শিয়া-সুন্নী তীব্র সমস্যার একটা বহিঃপ্রকাশ। সত্যিটা হলো, মালিকির দুঃশাসন আর আমেরিকানদের অত্যাচার মিলিয়ে সাধারণ জনগন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। এখানে মজলুম আর জালিম শ্রেণী মুখোমুখি হয়েছে। শিয়া-সুন্নী দ্বন্দ্ব খোঁজা এখানে নিতান্তই কষ্টকল্পনা। এটা অবশ্য সম্ভব হয়েছে এ কারণে, অত্যাচারিতদের বেশিরভাগই সুন্নী। কুর্দীদের বিষয়টাও সামনে আসছে। একটা কুর্দিস্থান হলে যে আমেরিকারই সবচেয়ে বেশি লাভ হয়। মধ্য প্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থ রক্ষার একটা শক্ত ঘাঁটি হতে পারে ওটা। ওই তরুণ গবেষকের কথায় যুক্তি আছে বটে। বিদেশি মিডিয়াগুলোতে যেভাবে ইসলামকে দুই ভাগে ভাগ করার চেষ্টা হচ্ছে তা সত্যিই ভয়াবহ।
আমরা না আবার এই বিষয়টাতেও মিডিয়া সন্ত্রাসের শিকার হয়ে বসি।
এবার আসি ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে। গাজা উপত্যকায় কি নির্বিচার হত্যাকান্ড চালানো হচ্ছে, তা বিশ্ববাসী জানে। এর অনেকটাই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের কল্যাণে। মিডিয়াগুলো কি বলছে? বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিকগুলোতে খবর বেরুলো, গাজা থেকে নিক্ষিপ্ত হামাসের রকেট হামলায় এক ফিলিং স্টেশনে আগুন লেগেছে। এতে সাত/আট জন ইসরায়েলী আহত হয়েছে। শিরোণাম হওয়ার মতো খবর বটে। যে শিশুদের লাশ দাফন করার কেউ নেই। যে শিশুদের দেহগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে আছে। যে শিশুর আহাজারি শুনে পশুরাও কাঁদছে। তাদের নিয়ে লিখবার কেউ নেই। এটাই হলো মার্কিন মানবতাবাদের মুসলমানি প্রকাশ!
আমরা মুসলামন বটে। নমাজ তো আদায় করি। রমজানের রোজা রাখি। টাকা থাকলে হজ্ব করি। যাকাতও তো দিই। তাহলে মুসলমান তো বটেই। কিন্তু এই মুসলমানিত্বের মাঝে ইসলাম আছে কতটুকু? আল্লাহ যে ঈমানদারদেরকে আবারও ঈমান আনার হুকুম দিয়েছেন, এর মানেটা কি?
ইসরায়েলের বন্দুকগুলো যখন পৃথিবীর ভবিষ্যত শিশুদের দিকে তাক করা থাকে, মার্কিন মডেলের মানবতা তখন কাঁদে না। কাঁদবেই বা কেন? যে শিশুরা বড় হয়ই ইসরায়েলের অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রের বিপক্ষে ইট-পাটকেল নিক্ষেপের জন্য ওরা আবার পৃথিবীর ভবিষ্যত হলো!
ওরা কিন্তু ঠিকই আছে। যে মেধা আমার জন্য কাজে লাগবে না তাকে ধ্বংস করে দাও। এই নীতিটা ওরা ভালমতোই রপ্ত করেছে। আমরাই কেবল বুঝি না ঠিক কি করা উচিত। বুঝবো কি করে? ওরা যখন বলে ইরাকে শিয়া-সুন্নী দ্বন্দ্ব হচ্ছে। আমরা চোখ বুঝে বিশ্বাস করি। ওরা যখন বলে তোমরা ভাল নেই। আমরা বিশ্বাস করি। ওরা যখন বলে, তোমরা এবার হাস। আমরা হাসি। ওরা বললে আমরা কাঁদিও। সবকিছু যেহেতু ওরাই বলে দেয় তবে আর আমাদের বাঁচবার প্রয়োজনটাই বা কি?
আজ খুব করে মনে পড়ছে একজন মহাবীরের কথা। তিনি মুসলিম স্পেনের শেষ সিপাহসালার মুসা। গ্রানাডার সুলতান আবদুল্লাহ যখন ফার্ডিন্যান্ডের কাছে আত্নসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেন তখন মুসা একাই লড়াইয়ের ময়দানে উপস্তিত হন। ফার্ডিন্যান্ডের বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। যুদ্ধের ময়দানেই তিনি শহীদ হন। ধন্য তার জীবন। আমরা সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর অপেক্ষায় আছি। যতদিন তার মতো কাউকে না পাই আমাদের তো মুসার মতোই হওয়া উচিত।
আমরা শত যুক্তি দিয়েও ওদের বুঝাতে পারবো না এমনটা কেন হচ্ছে! এর প্রতিকার কর। ওরা কখনো এটা করবে না। একজন ইসরাঈলীর গায়ে থুতু ছিটালে ওরা এটাকে মানবতার চরম অবমাননা মনে করে। এর শত শত ফিলিস্তিনি শিশু মারা গেলে, আনন্দ-উল্লাস করে। তখন মানবতার গায়ে কোন আঁচড় কাটে না। এর কারণ? আমরা নিজেরাই। শিয়া-সুন্নী দ্বন্দ্ব ছাড়াও আমরা অসংখ্য ভাগে বিভক্ত। কেউ কাউকে মুসলমান বলে মেনে নিতেই চাই না। এই সুযোগটাই নিচ্ছে ওরা। আর আল্লাহ তায়ালা অপেক্ষায় আছেন আমরা কবে সত্যিকারের মুসলমান হব। না হলেও ক্ষতি নেই। আমরা হয়ত একদিন ধ্বংস হয়ে যাব। আর আল্লাহ অপর কোন জাতিকে বেছে নিবেন দিনের প্রহরী হিসেবে।





ওরা যখন মদের পেয়ালায় ঠোকাঠুকি করে
আমরা তখন রক্তের নদীতে সাঁতার কাটি
ওরা অট্টহাসিতে রঙিন করে নিজেদের বেডরুম
আর আমরা মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে নিস্ব পথিক
অথচ
একদিন আমাদেরও প্রাসাদ ছিল
–খেজুর পাতা আর পাথরের
সেখানে জ্ঞান ও জ্ঞানীর কদর হতো
সেখানে মজলুমের ফরিয়াদ শোনা হতো
অন্যায়ের বিচার হতো