ড. মুহাম্মদ নূরুল আমিন
বিশেষ্য পদ ‘ক্ষমতা’শব্দের ক্রিয়ারূপ হচ্ছে ‘ক্ষমতায়ন’। ক্ষমতাকে ইংরেজীতে আমরা Power এবং ক্ষমতায়নকে Empowerment বলে থাকি। তবে ক্ষমতা নিয়ে কথা আছে। ক্ষমতা হচ্ছে Product of Personality in a Specific Situation. ক্ষমতা কাউকে দেয়া যায় না, এটা অবিভাজ্য। আমাদের বিশ্বাস অনুযায়ী সকল ক্ষমতার মালিক আল্লাহ এবং এ প্রেক্ষিতে কাউকে ক্ষমতা দানের সাথে আল্লাহর ক্ষমতা ভাগাভাগি বা অংশীদারিত্বের প্রশ্নটি জড়িয়ে পড়ে।
সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে ক্ষমতা বলতে সাধারণত Authority কে বুঝানো হয়ে থাকে। এখানে Authority হচ্ছে কর্তৃত্ব। বিখ্যাত ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ H Fayol একে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বলেছেন, Authority is the right to give orders and the power to exact obedience. আরেকজন বিশেষজ্ঞ H.A. Simon এর দৃষ্টিতে এটা হচ্ছে, The Power to make decisions which guide the actions of another, Sir Fredrick Hopper তার Management Survey পুস্তকে বলেছেন, ÒAuthority can be delegated, power cannot….. One may invest a person with authority and with responsiblity but one can no more invest him with power. than one can provide him with imagination and understanding.
আবার Authority ও Responsibility পাশাপাশি চলে। Responsibility বা দায়িত্ব হচ্ছে নির্দিষ্ট কোনো কাজ করার বা করানোর বাধ্যবাধকতা। কর্তৃত্ব যাদের আছে তাদের দায়িত্ব পালন করতে হয়। আবার শুধু দায়িত্ব থাকলে চলে না এই দায়িত্ব পালন করার জন্য কর্তৃত্বও থাকতে হয়। কর্তৃত্বের প্রকারভেদ আছে। আনুষ্ঠানিক কর্তৃত্ব যা রাষ্ট্র, সমাজ বা বৈধ প্রতিষ্ঠান কোন ব্যক্তিকে তার দায়িত্ব পালনের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদান করে। যেমন প্রশাসনিক কোন কর্মকর্তা। তাকে তার দায়িত্ব পালনের জন্য আর্থিক ও প্রশাসনিক কর্তৃত্ব বা Authority delegate করে দেয়া হয়। বিশেষ জ্ঞানের বা দক্ষতার ভিত্তিতে ব্যবহারিক কর্তৃত্ব গড়ে ওঠে। সমাজে বা পরিবারে অবস্থান, জ্যেষ্ঠতা অথবা নেতৃত্বের ভিত্তিতে ব্যক্তিগত কর্তৃত্বের সৃষ্টি হয়। এটা অনেকটা ঐতিহ্য বা কনভেনশনের ভিত্তিতে আসে। কর্তৃত্ব বা Authority এর আরো শ্রেণী বিভাগ আছে। যেমন Line Authority, Staff Authority এবং Functional Authority ইত্যাদি।
মহিলাদের ক্ষমতায়নের প্রসঙ্গটি নিয়ে অনেক দ্বিধা দ্বন্দ রয়েছে। এটা আসলে ক্ষমতায়ন না কর্তৃত্ব প্রদান এ নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। আমি এই নিবন্ধে ক্ষমতায়নকে কর্তৃত্ব অর্থেই ব্যবহার করবো এবং ধরে নেবো যে ক্ষমতায়ন বলতে সিদ্ধান্ত নেয়া, হুকুম দেয়া, আনুগত্য আদায় করাসহ নারীদের সব রকমের কর্তৃত্ব ও স্বাধীন বিবরণকেই বুঝায়। ক্ষমতায়ন অথবা কর্তৃত্ব প্রদান সেটা কি হিসেবে তা নিয়েও অনেক প্রশ্ন আছে। একজন মহিলা সভ্যতার প্রধান ভিত্তি পরিবারের একজন সদস্যা। তিনি একজন স্ত্রী, মা, কন্যা, পুত্র বধু অথবা দাদী হিসেবে বহুমুখী ভূমিকার অধিকারিনী। স্ত্রী হিসেবে তিনি স্বামীর সংসারের তথা ছেলে মেয়ে ও আত্মীয় স্বজনের দেখাশোনা ও লালন পালন এবং সম্পত্তির হিফাযতের জন্য দায়িত্বশীলা। এই দায়িত্ব পালনের জন্য যে কর্তৃত্বের প্রয়োজন তার সব কিছুই তার আছে। মা শাসন করতে পারেন। তিনি সংশোধনের অযোগ্য অপরাধী ছেলেকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন তার অনেক নজির আছে। এটা ক্ষমা বা কর্তৃত্ব প্রয়োগের একটি উদাহরণ, শাশুড়ি বা মায়ের উপস্থিতিতে পুত্র বধু অথবা কন্যারা স্বাভাবিকভাবেই Low Profile এ থাকেন। বায়োজ্যেষ্ঠ হিসেবে দাদীকে সবাই সম্মান করেন। কিন্তু তথাপিও পরিবারভিত্তিক সকল সমাজে গৃহ স্বামীই হচ্ছেন সকল কর্তৃত্বের প্রধান নায়ক। মাতৃতান্ত্রিক সমাজে মহিলাদের সর্বেসর্বা গণ্য করা হলেও নিরাপত্তার জন্য তারা পুরুষদের মুখাপেক্ষি। পুরুষ এখানে অভিভাবাবক।
দুনিয়ার অনেক পরিবর্তন হলেও আমরা এখনো পরিবার ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা এবং মূল্যবোধ সংরক্ষণ করে আসছি। ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং অনুশাসনের ভিত্তিতেই আমাদের পরিবার ব্যবস্থা গড়েৎে উঠেছে। এখানে নারীর সম্ভ্রম অত্যন্ত মূল্যবান। যিনা, ব্যভিচার ও অশ্লীলতা পরিত্যাজ্য। নারীর স্ব স্ব অবস্থানে থেকে ভূমিকা পালনে আইন ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কোন বাধা নেই। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর আইনও বিদ্যমান রয়েছে। আমাদের দেশে নারী এবং পুরুষ উভয়েই সমানাধিকার ভোগ করেন।
আমাদের দেশের মত পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে অমুসলমান সমাজে মা বাপ ভাই বোন বা আত্মীয় স্বজনদের নিয়ে গঠিত পরিবার ব্যবস্থা নেই। বুড়ো হয়ে গেলে মা বাপ বা দাদা দাদী বৃদ্ধাশ্রমে চলে যান। আঠার বছর পার হয়ে গেলেই ছেলে মেয়েরা তাদের ইচ্ছা মতো যে কোন জায়গায় থাকতে পারে। ছেলেরা গার্ল ফ্রেন্ড এবং মেয়েরা বয় ফ্রেন্ড নিয়ে একত্র বাস করলে সমাজ ও আইনের দৃষ্ঠিকোণ থেকে অপরাধী বিবেচিত হয় না। বিবাহিত দম্পতি অথবা অবিবাহিত যুগল বন্ধু-বান্ধবী যাই হোক না কেন তারা একে অপরকে ছেড়ে যে কোন সময় নতুন পার্টনার খুজে নিতে পারে। প্রকাশ্যে জনসমক্ষে রাস্তাঘাটে, রেলস্টেশনে, পার্কে পরস্পর পরস্পরকে আদর, চুম্বন করতে পারে। সোমত্ত মেয়েরা লেংগুট ও ব্রা পরে রাস্তাঘাটে চলাফেরা করতে পারে। সুইমিং পুলে উলংগ হয়ে সাঁতার কাটতে পারে। তারা ব্যবসা বাণিজ্য বা চাকরী-বাকরী করতে পারে। অবাধ যৌনাচারের কথা এখানেই নাই বা বললাম।
যে খৃস্টান জগত এক সময় নারীদের আত্মা আছে কি না তা খুঁজে বেড়াত সেই খৃস্টান জগত এখন সমাজের প্রত্যেকটি স্তরে নারীদের অবাধ বিচরণের পথ উন্মুক্ত করেই ক্ষান্ত হয়নি, তাদের ভোগের সহজপ্রাপ্য উপাদানেও পরিণত করেছে। সমাজে নারীদের এই অবাধ বিচরণকে তারা নারীর ক্ষমতায়ন নাম দিয়ে আমাদের দেশেও পাচার করেছে। আমাদের দেশের কিছু বুদ্ধিজীবী, এনজিও নেতা কর্মী এবং ক্ষমতার সাথে সংশ্লিষ্ট আমলা রাজনীতিবিদ ও মহিলা নেত্রী পাশ্চাত্যের এই ব্যবস্থাকে প্রবর্তনের জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই যে, তারা ক্ষমতায়ন বা ক্ষমতা প্রদানের এই আন্দোলনে ‘ক্ষমতা’ বা কর্তৃত্ব যাদের হাতে তাদের মটিভেট না করে নারীদের মটিভেট করার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। নারীরা পুরুষদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠেছেন। পাশ্চাত্যকে তারা রোল মডেল হিসেবে গ্রহণ করে স্বাধীন হবার আন্দোলনে নেমেছেন। যারা প্রত্যক্ষদর্শী তারা জানেন যে সেখানে নারী স্বাধীনতা এবং নারীর মর্যাদা বলতে যৌন স্বাধীনতা, যখন তখন বিবস্ত্র হওয়া, বারএ, পাবএ পুরুষের সেবাদাসী কিংবা কণ্ঠ লগ্ন হওয়া অথবা বহুগামিতা এবং ঘর সংসার ছেড়ে নিজের ইচ্ছানুযায়ী পেশা বেছে নেয়ার স্বাধীনতা ও অধিকারকে বুঝায়। অবশ্য এই স্বাধীনতা তারা যে স্বেচ্ছায় ভোগ করছেন তা বলা যাবে না, বাধ্য হয়েই করছেন।
এই অবস্থার স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে পাশ্চাত্য দেশগুলোতে পরিবার প্রথা ভেঙ্গে পড়েছে। পিতা মাতা ও সন্তানের স্বাভাবিক সম্পর্ক নষ্ট হয়ে গেছে এবং সমাজের ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। পাশ্চাত্য যখন ধ্বংসের দিকে অগ্রসর হচ্ছে তখন আড়াই তিন দশক আগে উন্নত দেশগুলো জেন্ডার ডেভেলাপমেন্টের নামে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কিছু চটকদার প্রোগ্রাম থ্রো করে এবং এ জন্য বেশ কিছু পয়সাকড়িও তারা দিতে থাকে। জাতিসংঘের উদ্যোগে নেদারল্যান্ড, ডেনমার্কের কোপেনহেগেন এবং বেইজিং এ জাকজমকপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মেলন করে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর প্রতিপালন ও বাস্তবায়নের জন্য বেশ কিছু ঘোষণাপত্র তৈরী করা হয়। নারীরা আলোচনার শীর্ষে উঠে আসে। বিভিন্ন পেশায় নারী-পুরুষ বৈষম্য দূরীকরণ এবং যৌনকর্মীদের স্বীকৃতি প্রদানসহ নারীর প্রতি সুবিচার নিশ্চিত করার কথা ওঠে এবং এজন্য একশান প্ল্যানও তৈরী হয়। সকল দেশের মন্ত্রণালয় ও এজেন্সিগুলোতে Gender Focal Point স্থাপন, অগ্রগতি পরিধারণ ও মূল্যায়নের জন্য Task Force ভিত্তিক কাজ কর্ম শুরু হয়। সরকারী বিভাগ ও এজেন্সিসমূহের কর্মকর্তা, কর্মচারী এনজিওসমূহের প্রতিনিধি এবং কর্মকর্তাদের জন্য স্থানীয়ভাবে এবং বিদেশে শিক্ষা প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। ইংল্যান্ড, আমেরিকা, নেদারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াসহ দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে জেন্ডারের ওপর উচ্চতর ডিগ্রি তথা মাস্টার্স, এমফিল, পিএইচডি করার জন্য অঢেল বৃত্তি প্রদান করা হয়। আমাদের দেশের বহু পুরুষ ও মহিলা এই সুযোগ গ্রহণ করেছেন। পারিবারিক শান্তি এতে কতটুকু এসেছে তা ভেবে দেখার সময় এসেছে।
বৃটিশ কাউন্সিলের স্কলার হিসেবে বিদেশে বিশেষ করে বৃটেনে আমার লেখাপড়া করার সুযোগ হয়েছে। তাদের নিয়মানুযায়ী বৃটিশ পরিবারের সাথে আমি ছিলাম। ভাঙ্গা পরিবারে স্বাধীনতার স্বাদ তারা কিভাবে ভোগ করছে তাদের বুকফাটা আর্তনাদের মধ্যে আমি তা প্রত্যক্ষ করেছি। স্বামীও আছে বয় ফ্রেন্ডও আছে, দ্বিপক্ষীয় ত্রিপক্ষীয় মারামারিও আছে। ইউনিসেফ দুর্দশাগ্রস্ত ছেলেমেয়েদের ওপর পরিচালিত এক সমীক্ষায় বলেছে যে, ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলোতে স্ত্রীকে পিটানোর হার আমাদের মত দেশগুলোর তুলনায় ৮৮ শতাংশ বেশী। আমার এক সহকর্মী রাশেদুল হাসান (আওয়ামী লীগ আমলে সংস্থাপন সচিব ছিলেন) একটি পরিবারে থাকতেন যে পরিবারের কর্ত্রী স্বামীর পিটুনি খেয়ে ঘর সংসারের সাথে পাট চুকিয়ে কুকুর নিয়ে বসবাস করতেন। কুকরটিই ছিল তার রক্ষক ও সাথী। এই সেদিনও একটি সমীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫৪ভাগ মহিলা তাদের স্বামীদের তুলনায় কুকুরকে বেশী ভালবাসেন। আমাদের দেশের মহিলারা যখন পাশ্চাত্য কালচার আমদানী করতে চান তখন এ বিষয়গুলো ভেবে দেখলে কি ভাল হয় না?
সুখ কোথায়, ঘরে না বাইরে? এর জবাব কিছু দিন আগে লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্স দিয়েছে। এলএসইর এক অভিজ্ঞ শিক্ষক ও গবেষক তার সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখিয়েছেন যে ইউরোপ ও আমেরিকার তুলনায় বাংলাদেশের মানুষই সবচেয়ে বেশী সুখী। কারণ তাদের পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় আছে। সিনহুয়ার সমসাময়িক এক জরিপেও দেখা গেছে যে এশিয়ান দেশগুলো ইউরোপ, আমেরিকা ও আস্ট্রেলিয়ার দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশী সুখী। কারণ একটাই; পারিবারিক বন্ধন। পাশ্চাত্য এখন পরিবার প্রথা ও পারিবারিক মূল্যবোধে ফিরে আসার জন্য কান্নাকাটি করছে। আর আমরা তাদের ফেলে দেয়া বর্জ্য অথবা ধ্বংসের উপকরণ সংগ্রহে যদি ব্যস্ত হয়ে পড়ি তাহলে তাতে প্রজ্ঞা এবং দূরদর্শিতা কোনটারই পরিচয় পাওয়া যায় না। তারা জেন্ডার ইক্যুইটির নামে সমাজকে পরিবারকে ধ্বংস করেছে, আমরাও এ বড়ি গেলার আগে ভালভাবে ভেবেচিন্তে অগ্রসর হওয়া দরকার। কথাটা বেইজিং সম্মেলনেও উঠেছিল। সব সিদ্ধান্ত ও কর্মসূচী সকল দেশের জন্য প্রযোজ্য নয়। কেননা সকল দেশের ধর্মীয় ঐতিহ্য ও কালচার এক নয়, ভিন্ন ভিন্ন। নেদারল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়ে জেন্ডার পড়ে বাংলাদেশের সমাজে তা বাস্তবায়ন করা যায় না। কেননা নেদারল্যান্ডে বিয়ে ও পরিবার নেই, বাংলাদেশে আছে। সেখানে সমলিঙ্গে বিয়ে বৈধ কিন্তু বাংলাদেশে অবৈধ, এই তফাৎটা না বুঝলে আমাদের সংকটের সমাধান হবে না।
নৈতিক অবক্ষয় কিভাবে পাশ্চাত্যবাসীদের আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে এখন সে সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করার চেস্টা করবো।
এক সময় আমি নোয়াখালীতে ডানিডা প্রকল্পের উপদেষ্টামন্ডলীতে স্থানীয় কাউন্টারপার্ট হিসেবে কাজ করতাম। সেখানে আমার একজন সুইডিশ সহকর্মী ছিলেন, নাম ওক ইডেন। তার সাথে আমার ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা পারিবারিক ঘনিষ্ঠতা পর্যন্ত পৌছে গিয়েছিল এবং তিনি আমার কাছে সুখ দুঃখের ঘটনা বলতে স্বাচ্ছ্যন্দবোধ করতেন। তিনি তার কর্মজীবনের প্রায় ৩০ বছর আফ্রিকাতে কাটিয়েছেন। দুই ছেলে এক মেয়ে। তারাও বিভিন্ন দেশে কাজ করেন। তার স্ত্রীর মৃত্যুর পর দাফন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসে তারা ৩১ বছর পর মৃত মা এবং জীবিত পিতাকে সশরীরে দেখেছিলেন। অবশ্য মাঝে মধ্যে টেলিফোনে তাদের সাথে কথা যে বলেননি তা নয়। ইডেন সাহেব আমাদের সমাজ ব্যবস্থাকে বেশ পছন্দ করতেন, বিশেষ করে বৃদ্ধ পিতা-মাতার প্রতি সন্তানদের দায়িত্ব কর্তৃব্য তাকে মুগ্ধ করতো। তিনি আমাকে প্রায়ই বলতেন, তোমরা তোমাদের এই পারিবারিক বন্ধন পাশ্চাত্যে কেন রফতানী করো না? তার দেশের পারিবারিক ভাঙ্গন এবং মূল্যবোধের অবক্ষয়কে তিনি ভয়াবহ বলে আখ্যায়িত করতেন। প্রায় ৭৫ বছয় বয়সী এই ভদ্রলোক শেষ বয়সে যে জীবনসঙ্গিনীকে নিয়ে মাইজদীকোটে থাকতেন তার ইতিপূর্বে আটটি বিয়ে হয়েছিল, ইডেন সাহেবের হয়েছিল পাঁচটি। ভদ্র, ন¤্র, মিতভাষী, দয়াদ্রৃ স্বাভাবের এই লোকটিকে আমি শ্রদ্ধা করতাম। কিন্তু তার যাবার পূর্বের একটি ঘটনায় এই শ্রদ্ধা নিয়ে আমি বিব্রত হয়ে পড়েছিলাম।
তিনি একটি বিড়াল পুষতেন, আমার ধারণা ছিল যাবার পূর্বে তিনি বিড়ালটি অন্য কাউকে দিয়ে যাবেন। কিন্তু তিনি তা করলেন না, ফেনীর একাডেমি রোডে আমাকে সাথে নিয়ে বিড়ালটিসহ পশু হাসপাতালে গেলেন। পশু ডাক্তারকে দিয়ে বিড়ালকে একটা ইনজেকশন পুশ করালেন এবং মিনিট দশকের মধ্যে লাফাতে লাফাতে বিড়ালটি মারা গেলো। এটি ছিল একটি মর্মান্তিক ঘটনা! ইডেন সাহেবকে আমি কড়া ভাষায় কিছু কথা বলেছিলাম। তার জবাব ছিল, বিড়ালটির সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার জন্য তিনি তা করেছেন। বিড়ালটির রক্ষণাবেক্ষণ, খোরপোষ প্রভৃতির পেছনে সেই ৭০ এর দশকে তিনি মাসে তিন সহ¯্রাধিক টাকা খরচ করতেন এবং তার ঝঃধঃঁং এতই উপরে তুলে ফেলে ছিলেন যে তার আশংকা যাবার সময় তাকে যদি অন্য কারুর কাছে দিয়ে যান তাহলে তার অমর্যাদা হবে এবং বিড়ালটি রান্না ঘরে চুরি চামারির স্বাভাবিক পেশায় ফিরে যাবে। কাজেই তাকে মেরে তিনি মর্যাদা রক্ষা করেছেন। যুক্তিটা ছিল অদ্ভুত। এই অদ্ভুত যুক্তির আরেকটি প্রতিফলন সম্প্রতি বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছে নিউ অলিংন্সে হ্যারিকেন ক্যাটরিনার আহত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া হতভাগ্য কিছু মানুষের জীবনে। তারা চিকিৎসার আশায় দিন গুণছিলেন। কর্তৃব্যরত চিকিৎসকরা তাদের আহাজারীতে এতই অস্থির হয়ে পড়েছিলেন যে চিকিৎসা দেবার পরিবর্তে ইনজেকশন দিয়ে তারা ৮৯জন হতভাগ্য রোগীকে মেরেই ফেললেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানবিক মূল্যবোধ খুনী চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে কোনপ্রকার পদক্ষেপ গ্রহণে প্রশাসনকে উদ্বুদ্ধ করেছে-এ ধরনের কোনও খবর পত্র-পত্রিকায় আমার নজরে পড়েনি। এই খবরের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের একটি অঙ্গরাজ্যে সংঘটিত আরেকটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এই ঘটনাটি অভাবিত এবং অভূতপূর্ব। এক মহিলা, গর্ভবতী আরেক মহিলাকে চুরি করে জঙ্গলে নিয়ে যায় এবং অচেতন করে তার পেশ কেটে বাচ্চা চুরি করার সময় ধরা পড়ে যায়। এর আগে এধরনের আরেকটি ঘটনাও নাকি সেখানে ধরা পড়েছিল।
অপরাধের ঘটনা আমরা শুনেছি। কিন্তু মানুষের ইতিহাসে মায়ের পেট কেটে বাচ্চা চুরির ঘটনা সম্ভবত এই প্রথম; তাও আধুনিক বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি ও সভ্যতার প্রধান মোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। ঘটনাটি যতই মর্মান্তিক হোক না কেন এর মধ্যে আমি বঞ্চিত মাতৃত্বের ক্রন্দন ধ্বনি শুনতে পাই। ভোগবাদ পাশ্চাত্যের নারী সমাজকে তাদের স্বাভাবিক চরিত্রের বিকাশ থেকে বঞ্চিত করেছে। নারী স্বাধীনতার নামে পুরুষের সমক্ষক হতে গিয়ে নারীরা হয়েছে পুরুষের দাসী, বিলাস সামগ্রী। তারা ঘর সংসার ও মাতৃত্ব হারিয়েছে। পুরুষের অত্যাচার তাদের বিয়ে বিমুখই শুধু করেনি, পাশ্চাত্যের এক বিরাট সংখ্যক মহিলা সঙ্গী হিসেবে কুকুরকেই বেশী প্রাধান্য দিচ্ছে। বিবাহ প্রথা লোপ সংখ্যা পাচ্ছে, তার স্থান দখল করছে লিভ টুগেদার ও হোমোসেক্সুয়েল সংস্কৃতি। কিন্তু এতেও তারা শান্তি খুঁজে পাচ্ছে না।
মহিলাদের একটা অংশ পুনরায় বিয়ে সংস্কৃতিতে ফিরে আসতে চাচ্ছে। শেষোক্ত গ্রুপের ক্ষীণ প্রয়াস বিলুপ্ত প্রায় পরিবার প্রথাকে কতটুকু পুনরদ্ধার করতে পারবে সময়ই একমাত্র তা বলে দিতে পারে। পাশ্চাত্য মহিলাদের সএকটি বিরাট অংশ এখন সন্তান নিতে চান না- অন্যের সন্তানকে মায়ের আদর দিয়ে বড় করতে চান। এই প্রবণতার বিপরীতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সেখানে অরেক শ্রেণীর মহিলাদের একটি বিরাট অংশ এখন সন্তান নিতে চান না- অন্যের সন্তানকে মায়ের আদর দিয়ে বড় করতে চান। এই প্রবণতার বিপরীতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সেখানে আরেক শ্রেণীর মহিলাদের আবির্ভাব ঘটেছে যারা গর্ভ ভাড়া দিয়ে পয়সা রোজগার করেন। এদের Surrogated Mother বলা হয়। কাজেই এখানে প্রকৃত মাতৃত্ব কোথায়? আর যেখানে প্রকৃত মাতৃত্ব নেই সেখানে মানব সন্তান তো পশুর বৈশিস্ট্য নিয়েই বড় হয়। এ অবস্থায় সভ্যতা টিকে থাকতে পারে না।
১৯৮৪ সালে হাইকোর্টের একটি রায় বিলেতে বিরাট আলোড়নের সৃষ্টি করেছিল। এর আগে এক ভদ্র মহিলা নিম্ন আদালতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেছিলেন। মামলায় তিনি এই মর্মে Declaratory judgement প্রার্থনা করেছিলেন যে আঠারো বছরের কম বয়সী মেয়েদের জন্ম নিয়ন্ত্রণ সামগ্রী দেয়ার আগে স্বাস্থ্য বিভাগকে তার মায়ের অনুমোদন নিতে হবে। নিম্ন আদালত তার আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। তিনি হাইকোর্টে আপীল করেন এবং আমার যতদূর মনে পড়ে ১১ বছর আইনী লড়াই এর পর হাইকোর্ট তার পক্ষে রায় প্রদান করে। অর্থাৎ ডাক্তারদের ওপর এই মর্মে নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয় যে মায়ের অনুমতি ছাড়া তারা ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের Contraceptive দিতে পারবেন না। এই রায়ে সারা বৃটেনে হৈ চৈ পড়ে যায়। গার্ডিয়ানের মতো ঐতিহ্যবাহী পত্রিকায় এর ওপর সম্পাদকীয় মন্তব্য েিলখ বলা হয় যে এর ফলে সে দেশের বহু সম্মানিত ব্যক্তি তাদের ইজ্জত হারাবেন। সারা বৃটেনে ভাই বোন পিতা কন্যাসহ নিকট ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে যৌন সম্পর্ক ও অনাচার এত বেশী যে তাদের আশংকা এর ফলে সমাজে প্রতিষ্ঠিত অনেক ভদ্র লোকের মুখোশ খুলে যাবে। আসলে এটা শুধু বৃটেনের সমস্যা তা নয় বরং নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়। সম্ভোগ লালসা, চারিত্রিক উচ্ছৃঙ্খলতা, ধর্মীয় চেতনার বিলুপ্তি ও সৃষ্টার প্রতি জবাবদিহিতার অভাব মানব সভ্যতাকে ধ্বংসের মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছে।
এই ধ্বংস থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য তারা যে কোন চেষ্টা করছেন না তা নয়। কিন্তু সে চেষ্টা যথার্থও নয়, ফলপ্রসূও নয়। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের একটি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে কালিফোর্নিয়া অঙ্গ রাজ্যে গর্ভপাত নিয়ে এখন রাজনীতি চলছে। এই রাজ্যের গভর্ণর আর্নল্ড সোয়ের্জনেগার Proposition73 নামক একটি শাসনতান্ত্রিক প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। এটি গৃহীত হলে ১৮ বছরের কম বয়সী গর্ভপাতে ইচ্ছুক মেয়েদের গর্ভপাত ঘটানোর ৪৮ঘন্টা পূর্বে ডাক্তারদেরকে তাদের পিতা মাতাকে বিষয়টি অবহিত করতে হবে।
The Economist পত্রিকার তথ্যানুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কালিফোর্নিয়া অঙ্গ রাজ্যটি হচ্ছে ঐ দেশের যৌনতার দিক থেকে সবচেয়ে স্বাধীন রাজ্যগুলোর অন্যতম। তের থেকে ১৯ বছর বয়সী অবিবাহিতা মেয়েদের গর্ভপাতের দৃষ্টিকোণ থেকে এই রাজ্যটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পঞ্চম এবং গর্ভধারণের দৃষ্টিকোণ থেকে সপ্তম স্থান অধিকার করে রয়েছে। ইকনমিস্টের তথ্যানুযায়ী ২০০০ সালে এই বয়স সীমার ১১৬০০০ অবিবাহিতা মেয়ে কালিফোর্নিয়াতে গর্ভবতী হয়েছ্ েএর মধ্যে ১৫ বছরের কম বয়সী ১৬২০ জন সহ ৪৪০০ কুমারী গর্ভপাতের আশ্রয় নিয়েছে।
শাসনতন্ত্র সংশোধন প্রস্তাবের সমর্থকের মতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৭ বছর বয়সী একটি মেয়েকে পিতা মাতার অনুমতি ছাড়া স্কুল নার্স মাথা ব্যথার একটি ট্যাবলেট পর্যন্ত যেখানে দেয় না, ফ্লু হলে সে এককভাবে ডাক্তারের পরামর্শ পায় না কিংবা পিতা মাতার অগোচরে দুধের দাঁত তোলাও তার পক্ষে যেখানে সম্ভবপর নয় সেখানে তের বছর বয়সী একটি মেয়ে তাদের সম্পূর্ণ অগোচরে অপারেশনের মাধ্যমে অথবা ওষুধ খেয়ে গর্ভপাত করাতে পারে। এতে কোনও বাধা নেই। আবার যেহেতু অবৈধ পিতাদের অধিকাংশেরই বয়স ২১ বছরের বেশী সেহেতু প্রচলিত আইন অনুযায়ী টীন এজারদের গর্ভবতী করার জন্য তাদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ উপেক্ষা করা হয়। এ অবস্থায় কিছু কিছু অভিভাবক তাদের অগোচরে মেয়েদের গর্ভপাতের বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারছেন না এবং আইন করে বিষয়টিকে পিতা মাতার গোচরীভূত করতে চান।
কালিফোর্নিয়ার গভর্ণর এ ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। তার ভাষায় I wouldn’t want to have some one take my daughter to a hospital for an abortion of something and not tell me. I would kill him if they do that.Ó অর্থাৎ আমাকে না বলে গর্ভপাত বা অন্যকোন কারণে আমার মেয়েকে কেউ হাসপাতালে নিয়ে যাক আমি তা চাই ন্ াকেউ যদি তা করে তাহলে আমি তাদের খুন করবো। আর্নল্ড সোয়ের্জনেগার এক সময় যৌন স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ভোগ সুখবাদী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি এখন দায়িত্বশীল পিতার ভূমিকা পালন করেন। তার দু’জন টীন এজার কন্যা এবং তের বছরের কম বয়সী দু’জন পুত্র সন্তান রয়েছে।
কালিফোর্নিয়ার শাসনতন্ত্র সংশোধনী প্রস্তাবটি পাশ হবে কি না মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দারা এ ব্যাপারে নিশ্চিত নন। সাম্প্রতিক এক জনমত জরীপে দেখা গেছে যে, ৪৫ শতাংশ উত্তরদাতা এর পক্ষে, ৪৫ শতাংশ এর বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন। অবশিস্ট ১০ শতাংশ কোনও পক্ষাবলম্বন করতে পারেননি। সংশোধনী প্রস্তাবের পক্ষাবলম্বীরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে যুক্তি দেখাচ্ছেন যে পিতা মাতাকে অবহিকরণের অর্থ গর্ভপাতের বিরোধীতা নয়। গর্ভপাত সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হোক এটা তাদের কাম্য নয়। প্রস্তাবটি পাশ হলেও একজন অপ্রাপ্ত বয়স্কা মেয়ে পিতা মাতাকে অবহিত না করে গর্ভপাতের অনুমতি দেয়ার জন্য আদালতের শরণাপন্ন হতে পারবে।
পক্ষান্তরে কালিফোনিয়ার নার্স ও পরিকল্পিত মাতৃত্ব সমিতি এর বিরোধিতা করছে। লস এঞ্জেলস টাইমস সাম্প্রতিক এক সম্পদকীয় মন্তব্যে বলেছে যে, সকল মেয়ে তাদের পিতা মাতার সাথে যৌন কর্ম, জন্ম নিয়ন্ত্রণ ও গর্ভপাত নিয়ে আলোচনা করবে এটা চিন্তা করতে খুব ভালই লাগে, কিন্তু আদতে তা হাস্যকর। একইভাবে একটি ভাঙ্গা বা ঝগড়াটে পরিবারের একটি টীন এজার মেয়ে গর্ভবতী হয়ে গোপনে গর্ভ নষ্ট না করে আদালতের অনুমতি নিতে যাবে একল্পনা আরো উদ্ভট, তাদের সন্দেহ হচ্ছে শাসনতন্ত্র সংশোধনের এ প্রস্তাবটি প্রকৃতপক্ষে গর্ভপাতকে বেআইনী করার প্রাথমিক পদক্ষেপ মাত্র। কেননা এতে গর্ভপাতের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে তাকে ভ্রুণ না বলে অজাত শিশুর মৃত্যু বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
গর্ভপাতের বিষয়ে পিতা-মাতাকে অবহিত করা হলে কিশোরী বয়সে গর্ভধারণ হারের ওপর কোনও প্রভাব পড়বে কি না যুক্তরাষ্ট্রে এটি একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। এটি এখন শুধু একটি রাজ্যের সমস্যা নয় বরং ৩৪টি রাজ্যেরই সমস্যা। এই রাজ্যগুলোর পিতামাতারা তাদের অপ্রাপ্ত বয়স্কা মেয়েদের গর্ভ মোচনের সিদ্ধান্তে সম্পৃক্ত হতে চান। কালিফোনিয়ার ১৪ বছর বয়সী মেয়েদের প্রায় এক চতুর্থাংশ এবং সতের বছর বয়সী মেয়েদের তিন পঞ্চমাংশ বিবাহ পূর্ব সংসর্গে লিপ্ত হয়। নিঃসন্দেহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি একটি ভয়াবহ সমস্যা। সমগ্র ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং এশিয়া আফ্রিকার কয়েকটি দেশও এই রোগে ভুগছে। বহু শতাব্দি ধরে মুসলিম বিশ্ব নিজেদের এ থেকে বাঁচিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু আকাশ সংস্কৃতির এই যুগে অধিকতর শক্তিশালী প্রচার মাধ্যম ও প্রযুক্তি নিয়ে যদি তারা আগ্রাসন প্রতিরোধে নিজেদের সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে ব্যর্থ হয় তাহলে গড্ডালিকা প্রবাহে তারাও ভেসে যাবার আশংকা রয়েছে। ব্যভিচার পাশ্চাত্য সমাজ ব্যবস্থার মর্মমূলে যেভাবে আসন গেড়ে বসেছে আগামী দু’দশকের মধ্যে তাদের জন সংখ্যার ৮০ ভাগ জারজ সন্তানরা দখল করে বসবে এবং এ অবস্থা হবে পাশ্চাত্য সভ্যতার আত্মহত্যার শামিল। এ অবস্থা থেকে বাঁচার পক্ষে পিতা মাতার অনুমতি নিয়ে গর্ভপাত করার আইন কোনও ভূমিকা রাখতে পারে বলে আমি মনে করি না। নৈতিক মূল্যবোধের পুনরুদ্ধার এবং পরিবার ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠাই এর একমাত্র সমাধান। পাশ্চাত্যবাসীদের বুঝতে হবে যে পরিবার না থাকলে সমাজ সভ্যতা টিকে থাকতে পারে না। খৃস্ট-ইহুদীবাদ তাদের ধোকা দিয়েছে। ঠান্ডা মাথায় ইসলামকে অধ্যয়ন করে তারা এ জীবন ব্যবস্থা থেকে যত শীঘ্র শিক্ষা গ্রহণ করেন ততই মঙ্গল।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাথলিক গীর্জাসমূহের ফেডারেশনের তরফ থেকে Family নামে একটি সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন বের করা হয়। মাঝে মধ্যে আমি এর কপি পাই। ৫৭ পৃষ্টার এই ম্যাগাজিনের প্রতিটি পৃষ্ঠার বিজ্ঞাপন, প্রবন্ধ, গল্প ও কবিতার একটি মাত্র সুর এবং তা হচ্ছে পরিবার ও মূল্যবোধ আমাদের ফিরিয়ে দাও, আমরা প্রাচুর্য চাই না, মা বাপ, ভাই বোন, আত্মীয় স্বজন নিয়ে সুখে থাকতে চাই। আমাদের মা’দের ঘরে ফিরিয়ে আনো। পাশ্চাত্য জগত মেয়েদের ঘর থেকে বাইরে এনে এখন বিপদে পড়েছে।
১৯৯৯ সালের ডিসেম্বর মাসে সুইডেনের এগ্রিকালচারল কোঅপারেটিভ ফেডারেশনের আমন্ত্রণে তিন সপ্তাহ মেয়াদী একটি শিক্ষা সফরে আমার সুইডেন যাবার সুযোগ হয়েছিল। সুইডেনের কৃষকদের যে সমৃদ্ধি আমি দেখেচি, ইউরোপের অন্য কোন দেশ বিশেষ করে ডেনমার্ক, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, বেলজিয়াম বা ইতালীতে তা আমার নজরে পড়েনি। কিন্তু সমৃদ্ধি সত্ত্বেও সে দেশের ক্ষুদ্র বৃহৎ সকল কৃষক তাদের পারিবারিক অশান্তি ও অসহায়ত্বের যন্ত্রণায় যে কত কাতর ঘনিষ্ঠভাবে তাদের সাথে মেলামেশা না করলে তা বুঝা যায় না। ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক অনেক নেতাই বলেছেন যে তারা খুবই একা। স্বামী-স্ত্রী দুজনই ভিন্ন ভিন্ন কর্মক্ষেত্রে কাজ করেন, সুখ দুঃখ শেয়ার করার জন্য তারা সাথী পান না।
এসব দেশের শুধু পুরুষরাই যে একা তা নয়, মহিলারাও একাকিত্বের যন্ত্রণা ভোগ করেন। পরিবারের এই দুই পার্টনারের দুরবস্থার প্রভাব পড়ছে তাদের সন্তানদের ওপর। শুধু ইউরোপ কেন, সারা পশ্চিমা জগতে এবং প্রাচ্যেরও কোন কোন দেশে ঘর ভাঙ্গার বিরূপ প্রতিক্রিয়া শিশুদের ওপর এসে পড়েছে। সমাজ তত্ত্ববিদরা উদ্বিগ্ন, মনস্তত্ত্ববিদ এবং শিশু বিশেষজ্ঞরা সমস্যা সমাধানের কূলকিনারা করতে পারছেন না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হার্ভার্ড বিম্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ চিকিৎসক ও খ্যাতিমান শিশু বিশেষজ্ঞ ড. টি বেরী ব্রাজেলটন সম্প্রতি লস এঞ্জেলস টাইমস এর সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, My own feeling is that we have pushed women too far. We have split them it two and we have not given them back anything to support themselves on either end. I just think our country is in deep deep trouble. অর্থাৎ আমার নিজের ধারণা হচ্ছে আমরা মেয়েদের অনেক দূরে ঠেলে দিয়েছি। দু’কূল রক্ষার জন্য আমরা তাদের কিছুই দেইনি। আমি মনে করি যে আমাদের দেশ গভীর গভীর সংকটে নিপতিত হয়েছে। ডা. ব্রাজেলটন ৮০ বছর বয়সী একজন প্রবীণ শিশু চিকিৎসক। তিনি দেখেছেন মায়ের অবহেলা কিভাবে শিশুদের জীবনী শক্তিকে তিলে তিলে ধ্বংস করে দিচ্ছে। তিনি আরো দেখেছেন কিভাবে মার্কিন মহিলারা জীবিকার জন্য শ্রম বাজারের দিকে দৌড়াচ্ছে এবং পরিবারের ভাঙ্গন মার্কিন শিশুদের কি ক্ষতি করেছে। নারী ও শিশু অধিকারের প্রবক্তা বলে কথিত সাবেক মার্কিন ফার্স্ট লেডি হিলারী ক্লিনটন জানেন নারী স্বাধীনতা ও স্বামীর পরকিয়া কিভাবে তার ঘর ভাঙ্গার যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিল।
১৯৯৬ সালে তিনি তার রচিত, ÒChildren’s potential lost to split-crushing poverty, children’s helath lost to unaffordablee care, children’s heart lost to divorce any custody fights, children’s future lost in an overburdened foster care system, children’s lives lost to abuse and violance, our society lost to itself as we fail our children.Óঅর্থাৎ দারিদ্র্যের কষাঘাতে শিশুরা তাদের সম্ভাবনা ও প্রতিভা হারাচ্ছে। পরিচর্যার অভাবে তাদের স্বাস্থ্যহানি হচ্ছে, তালাক এবং হেফাজতের লড়াই তাদের হৃদয় ভেঙ্গে দিচ্ছে, অতি ব্যস্ত সৎ পিতা-মাতার ঘরে বেড়ে ওঠা শিশুদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। অত্যাচার গালাগালি আর মারামারি মাঝখানে পড়ে শিশুদের জীবন নষ্ট হচ্ছে এবং এভাবে তাদের প্রতি দায়িত্ব পালনে আমাদের ব্যর্থনা আমাদের সমাজকে ধ্বংস করে দিয়েছে। হিলারী ক্লিনটন মার্কিন সমাজের আরো কিছু চিত্র তুলে ধরেছেন। তার ভাষায়, Homicide and suicide kill almost seven thousand children every year; One in four of all children are born to unmarried mothers, many of whom are children themselves and 135,000 children bring guns to school each day. Children in every social stratum suffer from abuse, neglect and preventable emotional problems.অর্থাৎ বছরে প্রায় ৭০০০ শিশু খুন ও আত্মহত্যার শিকার হয়। প্রতি চারটি শিশুর মধ্যে একটি শিশু অবিবাহিতা মায়ের ঘরে জন্ম নেয় যে মা’দের বেশীর ভাগ স্বয়ং অপ্রাপ্ত বয়স্কা। প্রতিদিন ১৩৫০০০ শিশু অস্ত্র নিয়ে স্কুলে আসে। সমাজের প্রত্যেক স্তরের শিশুরাই অত্যাচার অবহেলা এবং প্রতিরোধ্য আবেগজনিত সমস্যায় ভোগে।
হিলারী তার পুস্তকে নারী স্বাধীনতার অন্ধকার দিকটি তুলে ধরেছেন। পাশ্চাত্যের অন্যান্য দেশসহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মেয়েরা এখন স্বাধীন। তারা পরিবারের বন্ধনমুক্ত, স্বামীর ওপর তাদের নির্ভর করে চলতে হয় না। তারা নিজেরা উপার্জন করে নিজেরা চলতে পারে। ছেলে মেয়েরা এই সুযোগে পরিবার তথা পিতা মাতার ¯েœহ মমতা থেকে মুক্ত হয়ে গেছে। এই মুক্ত অবস্থায় যেখানে তাদের থাকতে অসুবিধা হচ্ছে সেখানে সমাজ ‘মুরগীর খামার’ খুলে পরীক্ষা নিরীক্ষা করছে এবং ভদ্র ভাষায় এর নাম দিয়েছে ‘ডে কেয়ার সেন্টার’। মার্কিন সমাজে পরিবার পদ্ধতির এত চরম অবনতি ঘটেছে যে এখন কেউই আর বিশ্বাস করতে পারছেন না যে তাদের সমাজ এ ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে সংশোধন ও পুনরুদ্ধার করতে পারবে। হিলারীও এ ব্যাপারে নিশ্চিত নন। তার ভাষায়, ÒMy personal wish that every child has an intact dependable family will likely remain a wish.Ó কাজেই তিনি সারা গ্রামের সহযোগিতায় তুলনামূলকভাবে ভাল আরেকটি ‘মুরগীর খামার’ করতে চান ( যেমন এক থেকে সাত দিন বয়সী বাচ্চা পুষে ৪ে৫ দিন পর আমরা বিক্রি করি), কিন্তু মার্কিন শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. ব্রাজেলটন মনে করেন যে বাড়িতে শিশুদের একজন মা দরকার। তার ভাষায়, ÒI think you are giving a gift to the child when you stay home with him as long as you can.Ó
শুধু একটা শিশুকে পেটে ধরে তার মা হওয়ার মধ্যে সাফল্য বা কৃতিত্ব বলে কিছু নেই যদি তাকে সময় দেয়া না যায়। ডাক্তার সাহেব মার্কিন মা’দের ঘরে না তাকার মনস্তাত্বিক যন্ত্রণা কি তা বোঝেন, তাই যতটুকু সম্ভব ততটুকু সময় ঘরে থেকে সন্তানদের দেখার জন্য অনুরোধ করেছেন, মার্কিন মায়েরা এই অনুরোধ কি রাখতে পারবেন?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অথবা পাশ্চাত্যের দেশসমূহে পরিকল্পিতভাবে পরিবার পদ্ধতিতে ভাঙ্গন আসেনি। স্বার্থপরতা, বস্তুবাদ, নাস্তিক্যবাদী মূল্যবোধ ও চিন্তা চেতনার অপরিহার্য পরিণতি হিসেবেই সেখানে পরিবার ভেঙ্গেছে। এখন তো অনেক দেশে আবার বিয়ে ব্যবস্থাও উঠে যাচ্ছে। লিভ টুগেদার, সমলিঙ্গের একত্রবাস অথবা পশু নিয়ে রাত্রি যাপন পারিবারিক জীবনের স্থান দখল করছে। এসব দেখে চিন্তাশীল সমাজবিদরা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে উঠেছেন। তারা ঐতিহ্যে ফিরে আসতে চাচ্ছেন কিন্তু পারছেন না। হিলারীর পুস্তকে এই আকুতিই ধরা পড়ে। বলাবাহুল্য তাদের এই সংস্কৃতি যেখানেই গেছে সেখানেই পরিবার ভেঙ্গেছে, ভবিষ্যৎ বংশধররা অনিশ্চয়তার মুখে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। চিলির নোবেল পুরস্কার বিজয়ী কবি জেব্রিয়েলা মিস্ট্রালের কণ্ঠে আমরা এরই প্রতিধ্বনি শুনতে পাই। তিনি বলেছেন, ÒWe are guilty of many errors and many faults but our worst crime is abandoning the children, neglecting the fountain of life. Many of the things we need can wait, the child cannot, Right now is the time his bones are being formed, his blood is being made and his senses are being developed. To him we cannot answer tommorrow. His name is today.Óআমরা জেব্রিয়ালার ন্যায় আফসোস করতে চাই না।
মানব সভ্যতাকে রক্ষা করার জন্য জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। কিন্তু এই সভ্যতার সূতিকাগার পরিবারকে রক্ষা করার জন্য জাতিসংঘ অদ্যাবধি কোন উদ্যোগ নিতে পারেনি। বরং যা নিয়েছে তা সম্পূর্ণ উল্টো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্যের পারিবারিক ধ্বংসলীলাকে এই প্রতিষ্ঠান সারা দুনিয়া বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে দিচ্ছে। সার্বিক অর্থনৈতিক মুক্তির নামে তারা মেয়েদের মায়ের দায়িত্ব থেকেও মুক্তি দিতে চায়, যেমন মুক্তি মার্কিন মহিলারা পেয়েছেন এবং তাদের সন্তানরা আস্তাকুঁড়ের কীটে পরিণত হচ্ছে।
উন্নয়নের মূলধারায় মহিলাদের অংশগ্রহণ নিয়ে আমাদের দেশে দীর্ঘ দিন ধরে বিতর্ক চলছে। তারা জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক এবং এক তৃতীয়াশ শিশুদের যদি তাদের প্রত্যক্ষ দেখাশোনার আওতায় ধরা হয় তাহলে আমাদের সমাজের পঁচাত্তর ভাগই নারী নির্ভর। এই অবস্থায় তাদের অবহেলা করার প্রশ্নই ওঠে না এবং তাদের বাদ দিয়ে সামাজিক উন্নয়নের কল্পনাও করা যায় না। তবুও তাত্বিক আলোচনায় Value Judgement এর বিষয় এসে যায় এবং আবেগ ও মূল্য বিচারের ওপর ভিত্তি করে আমাদের অনেক প্রশ্নেরই জবাব তালাশ করতে হয়।
েেকাপেনহেগেন বা বেইজিং সম্মেলন অথবা জাতিসংঘ কিংবা আন্তর্জাতিক কোনও সংস্থা কর্তৃক আয়োজিত সম্মেলন অনুষ্ঠান অথবা কোনও চুক্তি সম্পাদনের পূর্বে আমাদের মেয়েরা কি কখনো উন্নয়ন কাজ করেনি? উন্নয়নে মহিলাদের ভূমিকা সংক্রান্ত বিষয়টি এদেশে অবশ্যই নতুন কোনও বিষয় নয়। আমাদের ইতিহাসে মহিয়সী নারী অনেক ছিলেন, আমরা বর্তমানে যা চাই তাদের ধারা বজায় রেখেই চাওয়া উচিত। কোনও আন্তর্জাতিক সংস্থার ডিক্টেশনে নয়। কোনও সমস্যার যদি সুষ্ঠু সমাধান করতে হয় তাহলে বিষয়টি আভ্যন্তরীণ ক্রিয়াকলাপ থেকেই উৎসারিত হতে হবে, বাইরে থেকে হলে internalize করতে হবে। আমাদের মূল্যবোধ এবং আদর্শকে বাদ দিয়ে আমরা কিছু করতে পারি না। যে পরিণতি আমরা পাশ্চাত্যে দেখছি সেই পরিণতিতে পৌছার জন্য নয় বরং তা থেকে বাঁচার জন্য আমাদের প্রস্তুতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। আমাদের দেশে উন্নয়নে মহিলাদের অংশগ্রহণের বিষয়টিকে যে আঙ্গিকে গত তিন দশক ধরে উত্থাপন করা হচ্ছে তা শতকরা ১০০ ভাগ আমদানিকৃত, তাকে আত্মস্থ করার কোনও প্রক্রিয়া কখনো গ্রহণ করা হয়নি। আলোচনা, সেমিনার, কর্মশালা ইত্যাদির প্রাধান্য অথবা একচেটিয়াত্বের কারণে বিষয়টিকে আমরা internalize করতে পারছি না।
আমেরিকা ও পাশ্চাত্য জগৎ লেজ কেটেছে, তারা এখন আমাদেরও লেজ কাটতে চায় এ সহজ বিষয়টি আমরা উপলব্ধি করতে পারি না। যে কোনও নতুন সামাজিক মূল্যবোধের সহজ বিষয়টি আমরা উপলব্ধি করতে পারি না। যে কোনও নতুন সামাজিক মূল্যবোধের ক্ষেত্রে Social compatibility হচ্ছে প্রারম্ভিক বিষয়, যে সমাজে এ মূল্যবোধের প্রচলনের জন্য চেষ্টা করছি তা পুরাতন মূল্যবোধ ও আদর্শের আলোকে কতটুকু উন্নত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ কিংবা সহনশীল তা অবশ্যই ভেবে দেখতে হবে। প্রত্যেক সমাজের একটা নিজস্ব মূল্যবোধ আছে। কেউ তার নিজস্ব মূল্য বিচারে আমাদের অসভ্য বলে অভিহিত করে সভ্য বানাতে যাওয়া উচিত নয়। অন্যের মূল্যবোধকে আহত করা মানবতা স্বীকৃত পন্থাও নয়। এ জন্য মূর্তি পূজার ঘোর বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও ইসলাম মূর্তিকে গালি দিতে নিষেধ করেছে।
পাশ্চাত্য সভ্যতা কোকাকোলা, বিয়ার, হুইস্কি ও সেম্পেইনের সভ্যতা, নারী এখানে ভোগের উপকরণ, উন্নয়নের চালিকাশক্তি কিংবা উপাদান নয়। এই সভ্যতা আমাদের সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কেননা আমাদের মূল্যবোধ ও তাদের মূল্যবোধ সম্পূর্ণ আলাদা। আবার সার্বিক সামাজিক কাঠামো থেকে কাউকে আলাদা করারও উপায় নেই, কেননা তা সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না। এ ব্যাপারে বিচার বিবেচনা করে দু’শ বছর পরে কি হবে তার প্রতি লক্ষ্য রেখে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে আগানো প্রয়োজন। তা না হলে ভাল করতে গিয়ে খারাপ করে ফেলার আশংকাই বেশী। নদী বিশেষজ্ঞদের হুশিয়ারী হচ্ছে, নদী নিয়ে খেলবেন না, আপনি জানেন না এক দিকে বাঁধ দিয়ে এক হাজার একর উদ্ধার করলে অনস্থানে সে পাঁচ হাজার একর নিয়ে যেতে পারে। নদী থেকে শত সহ¯্র গুণ জটিল সমাজ এবং সামাজিক প্রক্রিয়া। সমাজ নিয়ে খেলার বিপদ অনেক বেশী। পাশ্চাত্য এখন এই বিপদের মধ্যেই আছে।
আমরা যে আদর্শে বিশ্বাস করি, সে আদর্শ তথা ইসলামে অর্থনৈতিক কর্মকা-ে মহিলাদের অংশগ্রহণ কিংবা সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে ঘরের বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ নয়। ঘরের বাইরে যেতে হবে বলেই পর্দা প্রথার প্রচলন হয়েছে। বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ হলে পর্দার প্রয়োজন ছিল না। আমরা বিশ্বাস করি The hand that rolls the cradle rules the world. যে হাত দোলনা দোলায় সে হাত দুনিয়া শাসন করে এবং এ প্রেক্ষিতে মায়ের ভূমিকাকে অক্ষুন্ন রেখে মহিলাদের পেশা নির্বাচন বাঞ্ছনীয়। পাশ্চাত্যের মতো সমাজ ও পরিবার বিচ্ছিন্নভাবে আমরা মহিলাদের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণের বিষয়টি চিন্তা করতে পারি না। পরিবার সমাজের ভিত্তি। পুরুষ এবং মহিলা নিয়ে পরিবার। তারা একে অপরের পরিপূরক, প্রতিদ্বন্দী নয়। বিবাহের মাধ্যমে পরিবার শুরু হয়। কর্মক্ষেত্র এবং সামাজিক অঙ্গনে অবাধ মেলামেশা এবং ব্যাপক যিনা ব্যভিচারের ফলে পাশ্চাত্যে বিয়ে ব্যবস্থা যেমন হুমকির সম্মুখীন, পরিবারও তেমনি ভাঙ্গনের শিকার। পরিবারকে বাদ দিয়ে পশ্চিমা সমাজ বর্তমানে কান্নাকাটি করছে। এমনও বলছে পরিবারকে রাখতে হলে দু’জনে চাকরী করলে চলবে না। সন্তান আসলে একজনকে দূর্গ পাহারা দিতে হবে; চাকুরী Sacrifice করতে হবে। তারা যেখানে ফিরে আসতে চাচ্ছে আমরা তো সেখানে যুগ যুগ ধরে আছি। আমার শাল্লার অভিজ্ঞতা আছে, খুশী কবিরের বিপ্লব আমি দেখেছি, উন্নয়নের নামে এনজিওগুলো মহিলাদের ঘরের বাইরে নিয়ে এসেছিল। এখন অনেক স্থানে এনজিও নেই, বিপ্লবও নেই। মহিলারা ক্রস ফায়ারিং এ পড়ে গেছেন। তারা বাইরেও থাকতে পারছেন না, ঘরেও ফিরে আসতে পারছেন না। স্ট্যান্ডার্ড বজায় রাখার জন্য অনেকে প্রস্টিটিউশনকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে। এ পেশাকে এখন স্বীকৃতি দেয়ার জন্য লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে কেউ কেউ আন্দোলনে নেমেছেন। এর থেকে দুর্ভাগ্যজনক আর কি হতে পারে?
আমাদের মা-বোনেরা সুবহে সাদিক থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করেন, এই কাজ কি অর্থনৈতিক কাজ নয়? নতুন করে চিন্তা করার আগে বর্তমানকে যদি আমরা ভাষা দেই তাহলে জিডিপি এ পর্যায়ে থাকে না। মুসলিম সমাজে মায়েদের দায়িত্ব অপরিসীম। অতি কষ্টে তারা মানব জাতিকে ধারণ করেন। তাদের এই পরিশ্রমও কষ্টের বিনিময় অর্থ হতে পারে না। সভ্যতার দূর্গ তাদের হাতে, পাশ্চাত্যের ব্যভিচার অনুকরণ করে আমরা এ দূর্গ ভাঙ্গতে পারি না।
সহীহ মুসলিম ও সহীহ আল বুখারী শরীফের একটি হাদীস অনুযায়ী প্রত্যেক স্ত্রীলোক তার স্বামীর পরিবারের লোকদের এবং তার সন্তানদের দায়িত্বশীলা এবং তাদের সম্পর্কে তাকে জবাবদিহি করতে হবে। আরেকটি হাদিস অনুযায়ী সন্তান সম্ভাবা ও স্তন্যদায়ী মুমিন নারীর মর্যাদা হচ্ছে সক্রিয় প্রহরারত সৈনিকের মতো। এই অবস্থায় যদি তিনি মৃত্যুবরণ করেন তবে শহীদের জন্য নির্ধারিত মর্যাদা পাবেন। আরেকটি হাদীসে বলা হয়েছে সন্তান ও পরিবারের পরিচর্যা নারীদের জন্য জিহাদের সমতুল্য। আদর্শ ও ঐতিহ্য থেকে নারীদের বিচ্ছিন্ন করে পাশ্চাত্য ভোগ ও সমৃদ্ধি দেখেছে, কিন্তু সুখের মুখ দেখেনি। আমরা তাদের অনুসরণ করতে পারি না। কেননা সেটা আমাদের জন্য অনিবার্যভাবে ধ্বংস ডেকে আনবে।




