লেখক: মাওলানা কালীম সিদ্দিকী
সামনে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর মাঝে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, দ্বীনের বিভিন্ন শাখার কর্মীদের মাঝে পরস্পর সু-সম্পর্ক ও সহযোগিতার মানসিকতা বিলীন হয়ে গেছে। এমনকি পরিস্থিতি এই দাঁড়িয়েছে যে, কোনো এক শাখার একই ব্যবস্থাপনাধীন লোকদের মাঝেও পরস্পর বড় ধরনের বিরোধ দেখা দেয়। জীবনের বেশিরভাগ সময় ব্যয় হয় অন্যকে খাটো করে নিজের অবস্থান উর্ধ্বে তুলে ধরার মধ্যে। ঈমান ও কুফর, হক ও বাতিলের দ্বন্দ্বের পরিবর্তে শুরু হয় অন্য এক লড়াই। প্রত্যেকের ধারণা, আমি যা কিছু করছি বা আমার দ্বারা যে কাজ হচ্ছে, সেটিই কাজ, আর সেটিই হক ও সত্য। অন্যরা যা কিছু করছে তা কোনো কাজই না। এভাবে নিজের কাজের প্রতি গুরুত্ব দিতে গিয়ে অন্যের কাজকে তুচ্ছ মনে করার মানসিকতাটাই মুখ্য হয়ে ওঠেছে।
আমেরিকায় অনেক ব্যক্তি ও সংগঠন ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার চেষ্টা করছেন। আমার পরম শ্রদ্ধেয় মুরব্বী হযরত মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভী রাহ.কে তাঁর আমেরিকা সফরে ওখানকার হিতাকাঙ্খীগণ সে দেশের দ্বীনের কর্মীদের মাঝে পরস্পর সম্পর্ক ও সহযোগিতার অভাবের কথা জানিয়ে চিকিৎসার আবেদন জানালে হযরত মাওলানা রাহ.যে আলোচনা করেছিলেন তার সারমর্ম তুলে ধরছি-
“দুটি বস্ত্তকে একত্রিত করার জন্য একটি মাধ্যমের প্রয়োজন হয়। দুটি কাগজকে একসাথে মিলানোর জন্য আঠা ব্যবহার করতে হয়। একটি কাঠকে একটি কাঠের সাথে যুক্ত করার জন্য বিশেষ ধরনের আঠা ব্যবহার করা হয়। তদ্রূপ অন্তরের সাথে অন্তর জোড়া লাগানোর জন্যও একপ্রকার আঠা আছে। আর তা হল ইখলাস এবং আল্লাহর সাথে নিবিড় সম্পর্ক। ইখলাস ও আল্লাহর সাথে সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করেই ঘটতে পারে পরস্পরের মিলন।”
ইখলাসের নিদর্শন ও তা চেনার উপায় সম্পর্কে হযরত সাইয়েদ আহমদ শহীদ রাহ.-এর একটি বাণী আমাদের জন্য আলোকবর্তিকা হতে পারে। তিনি বলেন- “দ্বীনের একটি মৌলিক স্বীকৃত নীতি হল ইখলাস ছাড়া কোনো আমল গ্রহণযোগ্য হয় না। ইখলাসের মাপকাঠি হল, দ্বীনের প্রতিটি কর্মীর প্রতি তার দ্বারা অনুগৃহীত হওয়ার (দ্বীনের প্রতিটি কর্মী আমার উপর অনুগ্রহ করছে- এমন) অনুভূতি নিজের অন্তরে সৃষ্টি হওয়া। যদি কারো অন্তরে অন্যের দ্বারা অনুগৃহীত হওয়ার অনুভূতি সৃষ্টি হয়, তাহলে বোঝা যাবে তার অন্তরে ইখলাস আছে।”
ইখলাস হল, প্রত্যেকেই দ্বীনের প্রতিটি কাজকে নিজের কাজ মনে করে করা। মনে করুন, আপনার একটি বিল্ডিং তৈরী হচ্ছে। কেউ এসে সেখানে শ্রম দিতে লাগল, বালির সাথে সিমেন্ট মিলাতে শুরু করল, ইট এগিয়ে দিল, আপনি কি এটাকে তার অনুগ্রহ বলে মনে করবেন না? আপনি তো মনে করবেন এ কাজগুলো আমারই ছিল, ঐ ব্যক্তি আমার হয়ে আমার কাজটা করে দিচ্ছে।
আল্লামা শাওকানী রাহ.ও এই মূলনীতিটির উল্লেখ করে বলেছেন, যদি কোনো ব্যক্তি কোথাও দ্বীনের কোনো শাখায় কাজ করতে থাকে আর সেখানে তার চেয়েও ভালো কোনো কর্মী চলে আসে, তাহলে ইখলাসের পরিচয় হল আগত ব্যক্তিকে অনুগ্রহকারী মনে করে কাজের সুযোগ দেবে এবং নিজে অন্যস্থানে কাজ শুরু করবে। আগত কর্মীকে পূর্ণ সহযোগিতা করবে। মোটকথা, দ্বীনী প্রতিষ্ঠান ও তার কর্মকর্তাদের মাঝে পরস্পর সম্পর্ক ও সহযোগিতার মূল ভিত্তি হতে পারে ইখলাস ও আল্লাহর সাথে মজবুত সম্পর্ক।
ইখলাস অন্তরের এমন এক অবস্থার নাম, যা প্রতিটি মানুষের থাকা উচিত। অন্তরে ইখলাস সৃষ্টি করা এবং তা বজায় রাখার হুকুমও শরীয়ত দিয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, ইখলাস সৃষ্টি করা এবং তার ওপর দৃঢ় থাকা মানুষের ইখতিয়ার ও সামর্থ্যের ভিতরের বিষয়। কখনো কখনো মানুষ কাজের শুরুতে খুবই মুখলিস থাকে। কিন্তু পরে ইখলাস কমতে কমতে শেষ হয়ে যায়। আবার কখনো এর বিপরীতও ঘটে। কাজের শুরুতে ইখলাস থাকে না, পরে ধীরে ধীরে ইখলাস নসিব হয়ে যায়। অন্তরে ইখলাস সৃষ্টি করা এবং তা বজায় রাখার জন্য অভিজ্ঞতার আলোকে একটি পদ্ধতির কথা বলছি।
অন্যের সাথে মিলে কাজ করবে এবং অন্যের পেছনে পেছনে থাকার মেজাজ তৈরী করবে। মানুষকে নিজের সাথে জুড়ানোর চেষ্টা করবে না। আজকাল দ্বীনের খাদেম এবং ধর্মীয় সংগঠনের কর্মীরা চেষ্টা করেন, সকলেই যেন আমার দলে চলে আসে এবং আমার পেছনে থেকে কাজ করে।
হযরত আশরাফ আলী থানভী রাহ.-এর ভাষ্যমতে- “প্রত্যেকেই অনুসরণীয় হতে চায়, তাহলে অনুসারী আসবে কোত্থেকে।” এজন্য নিজেকে মুক্তাদী (অনুসরণকারী) বানান। অনুসরণীয় সাজা থেকে বিরত থাকুন। অনুসারী হয়ে অন্যের সাথে মিলে কাজ করার মধ্যে শুরুতে ইখলাস থাকে এবং ধীরে ধীরে তা বাড়তেই থাকে। শুরু থেকে যদি ইখলাস না-ও থাকে, একপর্যায়ে ইখলাস সৃষ্টি হয়ে যায়। তাই দ্বীনের প্রতিটি সেবককে অন্যের সাথে মিলে ও পেছনে থেকে কাজ করার পরামর্শ দেওয়া উচিত। এতে যদিও অন্তরে খুব কষ্ট লাগে কিন্তু এর মধ্যেই রয়েছে বরকত ও নিরাপত্তা। যে অন্যের সাথে মিলে কাজ করতে পারে সে দ্বীনের যে কোনো খাদেমের সহযোগী হয়ে থাকে, প্রতিপক্ষ হয় না।”
হযরত আশরাফ আলী থানভী রাহ.-এর একটি বাণী আমাদের জন্য আলোকবর্তিকা- “দ্বীনের প্রতিটি কর্মীর সহযোগী হও, প্রতিবন্ধক নয়।”
আফসোস! মানুষ যখন নিজের ব্যক্তিগত নিমগ্নতা ও জীবিকার কাজে লেগে থাকে তখন অন্তরঙ্গতা ও ভালবাসার সাথে একে অপরের কাজে সহযোগী হয়। সেই লোকগুলোই যখন দ্বীনের কাজে যোগ দেয় তখন তৈরি হয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার মানসিকতা। অথচ দ্বীন তাদের মাঝে মিলন সৃষ্টির জন্যই এসেছে। এ ব্যাপারে কুরআনে পাক ঘোষণা দিয়েছে- “আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখ এবং পরস্পরে বিভেদ করো না। আল্লাহ তোমাদের প্রতি যে অনুগ্রহ করেছেন তা স্মরণ রাখ, এক সময় তোমরা একে অন্যের শত্রু ছিলে। অতপর আল্লাহ তোমাদের অন্তরসমূহকে জুড়ে দিয়েছেন। ফলে তাঁর অনুগ্রহে তোমরা ভাই-ভাই হয়ে গেলে। তোমরা অগ্নিকুন্ডের প্রান্তে ছিলে। আল্লাহ তোমাদেরকে সেখান থেকে মুক্তি দিয়েছেন। এভাবেই আল্লাহ তোমাদের জন্য স্বীয় নিদর্শনসমূহ সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা সৎ পথ পেতে পার।”-সূরা আলে ইমরান (৩):১০৩
কখনো কখনো কোনো মুখলিস ব্যক্তিও শিকার হয়ে যান এক ভ্রান্তির। দ্বীনের কোনো বিশেষ শাখায়, নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে, কোনো সংগঠন বা সংস্থার সাথে মিলে, অথবা কোনো বড় মুরব্বীর সম্মান ও ভালোবাসায় তার অধীনে কোনো একজন কাজ করছে। এখন এ কর্মীর মনে আগ্রহ জাগল, অন্য লোকেরাও যেন দ্বীনের ওই শাখায়, ওই সংগঠনের আওতায় কিংবা ওই শাইখের অধীনে কাজ করতে চলে আসে। একদিক থেকে এটা মানুষের স্বভাবজাত অনুভূতি। তবে এ আগ্রহের সঙ্গে সঙ্গে যদি এ মনোভাবও সৃষ্টি হয় যে, অন্য মানুষ তার নিজস্ব দ্বীনী কাজ ছেড়ে দিক, অথবা সেই কাজ বাধাপ্রাপ্ত হোক, তাহলে সেটি সঠিক নয়। আর এটা সম্ভবও নয়।
মুমিনরাই সর্বশেষ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীর বাস্তব নমুনা হতে পারবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “এক মুমিন অরেক মুমিনের জন্য দেয়ালের ইটের মতো, একে অন্যের শক্তি যোগাবে।” (রিয়াদুস সালিহীন – বুখারী ও মুসলিম)




