‘জামাতের শীর্ষ নেতাদের ফাসির মধ্য দিয়ে জামাত একটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন দল হিসেবে আবির্ভূত হবে। এখন আর জামাতকে স্বাধীনতা বিরোধী তকমা বহন করতে হবেনা। ‘ – এই ধরনের বক্তব্য দেয়া মানুষগুলোকে কেন যেন আমার গর্দভ টাইপের মনে হয়। গ্লোবাল পলিটিক্স না জেনেই তারা এইসব কথাবার্তা বলে থাকেন। তাদেরকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে, মিশরের ইখওয়ানুল মুসলিমীনের নেতারা কি স্বাধীনতা বিরোধী ছিলেন? তাহলে কেনো একটি বৈধ সরকারকে নামিয়ে দেয়া হল? এই ফ্যাক্টগুলো না বুঝলে আলোচনা করে লাভ নেই।
এই দেশে আওয়ামীলীগ বা বিএনপি কে সরকারে আছে তা ফ্যাক্টর না। কে সাম্রাজ্যবাদী, আধিপত্যবাদী শক্তির কতটুকু সার্ভিস দিচ্ছে, প্রক্সি দিচ্ছে তার উপর নির্ভর করছে সরকারে থাকা না থাকা। আমাদের দুর্ভাগ্য, ইসলামী নেতারা ইসলামী ঐক্যকে গুরুত্ব না দিয়ে, সঠিক কর্মপন্থা তৈরিতে গুরুত্ব না দিয়ে পশ্চিমাদের কাছে নিজেদেরকে অধিক আজ্ঞাবহ এবং কথিত মডারেট মুসলিম হিসেবে তুলে ধরার জন্য কি প্রাণান্তকর চেষ্টাই না করে থাকেন।
প্রখ্যাত সাংবাদিক মাসুদ মজুমদার ভাই একদিন উনার বাসায় এক আলাপচারিতায় দেশের ইসলামী দলগুলোকে বিএনপি আওয়ামী লীগের ‘কোলবালিশ‘ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। খুব অবাক হয়েছিলাম এই অদ্ভুত উপমা শুনে। সাম্প্রতিক সময়ে কোন কোন ইসলামী দল বিশ দলীয় জোট ছাড়ছেন এমন সংবাদ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। দু একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালেও খবরটি এসেছে। কারন হিসেবে পৌর নির্বাচনে আসন না দেওয়া এমনকি পর্যবেক্ষণ কমিটিতেও না রাখার অভিযোগ এসেছে। এ প্রসংগে ক্ষোভ জানাতে গিয়ে এক নেতা বলেছেন, এই জোটে গিয়ে লাভের চাইতে ক্ষতি হয়েছে বেশী।মাসুদ ভাইয়ের কোলবালিশ তত্ত্বটা মনে পড়ে গেল।
খোলনলচে পালটে দিয়ে ওখানে যাওয়াটা এবং আসাটা দুইটাই তো রং ডিসিশন। যতদিন নিজেরা নিজেদেরকে মানতে পারবেননা,ঐক্যবদ্ধ হতে পারবেননা, অপরকে সহ্য করতে পারবেননা ততদিন কোলবালিশ হিসেবে একজনের কোল থেকে আরেকজনের কোলে ঘুরবেন-এটাইতো নিয়ম। আপনারা নিজেরা এক হলে কতবড় শক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারেন তা তো হেফাজতে ইসলাম দেখিয়ে দিয়েছে। তারপরও বুঝেননা… কেনো?
শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ. এবং মুফতি ফজলুল হক রহ. এর জেল জুলুম, বি বাড়িয়ায় ছ’জন আলেমের শাহাদাতের ঘটনা সে সময় ছিল বিএনপি জোটের ক্ষমতায় যাওয়ার অন্যতম কারন। ক্ষমতায় যাওয়ার পর একটা মন্ত্রীত্বের জন্য ইসলামী ঐক্যজোট নেতারা কম দৌড়াদৌড়ি করেননি। কিন্তু পাননি। মাওলানা মহি উদ্দিন খান বিভিন্ন প্রোগ্রামে বিএনপির এই প্রতারণার কথা সরাসরি বলতেন। আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা সবসময়ই মিথ্যা আশ্বাস, প্রতারণা এবং অলীক ক্ষমতার পেছনে ছুটাছুটি করি। ড্রাইভিং সিটে যারা থাকেন তাদের চোখ তো সবসময়ই সামনের দিকে থাকতে হয়। ওয়ার্ল্ডের ইসলামিক লিডার আর আমাদের ইসলামিক লিডারদের মধ্যে চিন্তা, দুরদর্শিতা ও প্রজ্ঞার পার্থক্য কি অনেক বেশী? হয়ত।
১৯৯৯ সালে ইসলামী ঐক্যজোট জোট ছিল দল হয়নি। তখন চার দলীয় জোট গঠন হল। বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি এবং ইসলামী ঐক্যজোট মিলে হয়েছিল এই জোট। আমি তখন ইসলামী ছাত্র মজলিসের কেন্দ্রে কাজ করি। সে সময় ছাত্র মজলিসের পক্ষ থেকে আমরা একটি লিফলেট প্রকাশ করি। সেখানে বলা হয়েছিল যে, আমরা ইসলামপন্থীরা আওয়ামীলীগ বিএনপির নেতৃত্বে এক হতে পারি কিন্তু নিজেরা নিজেদের নেতৃত্বে এক হতে পারিনা। এই লিফলেটের প্রতিক্রিয়াস্বরূপ তৎকালীন খেলাফত মজলিসের মহাসচিব এ,আর,এম আবদুল মতীন সাহেব বললেন, ছাত্র মজলিস নেতৃত্ব বিদ্রোহী হয়ে গেছে। খেলাফত মজলিসের সাথে বিদ্রোহ করেছে। সত্য কথা হল মতিন ভাই নিজেই পরবর্তিতে বিদ্রোহ করে জামাতে চলে গেলেন। ছাত্র মজলিস তার আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল।
নব্বুইয়ের দশকে খেলাফত মজলিসের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে বক্তৃতার অন্যতম প্রতিপাদ্য বিষয় থাকত, খেলাফত আন্দোলন ও যুব শিবিরের একীভূত হয়ে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস নামে আত্মপ্রকাশের বিষয়টি। ২০০৪ সালের পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠান গুলোর বক্তৃতায় বড় একটি বিষয় হয়ে পড়ে ভাংগনের গুরুত্ব তাৎপর্য ও ফজিলত সম্পর্কে। ভাংগনের কারনে আমরা কেউ কেউ হয়েছি স্বঘোষিত একমাত্র আহলে হক, কেউ একমাত্র আহলে সংবিধান, কেউ একমাত্র আহলে শৃংখলা। অথচ কে না জানে ২০১৫ সালে এই ‘একমাত্র‘ শব্দের লালন ও পালন যারা করেছেন তারা কতটুকু হাস্যকর হয়ে উঠেছেন। এই শব্দটি নিজেই এখন ঠাই করে নিচ্ছে ক্রমশ ভাগাড়ে এবং যাদুঘরে।
আহমদ আবদুল কাদের ভাই বলতেন, ‘যে সমুদ্রে ঢেউ নেই তার চাইতে যে পুকুরে ঢেউ আছে তা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।‘ সেই কিশোর বেলায়, তারুণ্যে পা দেয়ার ট্রানজিট মুহুর্তে কোন এক কর্মশালায় শোনা কথাটা গেথে গিয়েছিল মনের গভীরে, বুকের গভীরে। তারপর কত দু:সাহসী তরুণকে দেখলাম, ঢেউ তুলতে গিয়ে কী মর্মান্তিক ভাবেই না ডুবে গেছেন সমুদ্রের গভীরে।
নিবেদিত যোদ্ধারা কখন পরাজিত হয়? যখন মঞ্চের চারপাশে তেলবাজ, চাটুকার ও মোসাহেবদের সংখ্যা শনৈ শনৈ বাড়তে থাকে। হাইব্রিড নেতাদের আনাগোনা বাড়তে থাকে। গলাবাজ লোকগুলোর গলার আওয়াজে দিনরাত উপোষ থেকে কাজ করা কর্মীটির নরম সুর চাপা পড়ে যায়। তেলবাজদের ঢেলে দেয়া তেলে মঞ্চ পুরোহিতের শরীরটা তৈলাক্ত হয়ে উঠে। কর্মীর কাছে এই নেতাকে কেমন যেন আজানা অচেনা মনে হয়। অভিমানে, অপমানে কান্নায় সে একসময় নিরব নিথর হয়ে যায়। এই চিত্র কোথায় নেই? কোন সংগঠনে নেই? কোন দলে নেই? এই ভাইরাসমুক্ত স্থান খুজে পাওয়া কঠিন।
সত্যিই তো, যে সাগরে ঢেউ নেই, তরংগ নেই তা তো মৃত, ডেডসী। ডেডসী তে কোন মাছ বা জলজ প্রাণী বাচতে পারেনা। কেবল কিছু ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক জাতীয় অনুজীবের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। আমাদের লেক গুলোতে, নদী গুলোতে এখন প্রচুর ঢেউয়ের প্রয়োজন, তরংগের প্রয়োজন। প্রয়োজন মৃদু মৃদু বাতাসের, পর্বতসম উর্মিমালার। খু উ উ উ উ ব প্রয়োজন।
আসুন আমরা একটি গল্প শুনি, গল্পটি একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে; সিলেট অঞ্চলে যাদের বাড়ি তারা কানাইঘাট থানার গাছবাড়ি নামক একটা এলাকার কথা জানেন। ওখানে একটা নামকরা আলিয়া মাদ্রাসা এবং নামকরা একটা বড়সড় কওমি মাদ্রাসা রয়েছে। দুই মাদ্রাসার বার্ষিক মাহফিলে লক্ষাধিক লোক জমায়েত হয়। কিন্তু দুই মাদ্রাসার বার্ষিক মাহফিলে এক মাদ্রাসার আলেমরা অপর মাদ্রাসার আলেমদের বিরুদ্ধে, শিক্ষা ব্যাবস্থার বিরুদ্ধে বিষোধগার করতেন। একবার এই বিষয়টা চরম আকার ধারণ করল। ডাইরেক্ট ফতোয়া দিয়ে একপক্ষ আরেক পক্ষকে ইসলাম থেকে একেবারে খারিজ করে দিলেন।
যাই হোক শীতকাল শেষ হল। মাহফিলের মৌসুমও শেষ। একদিন গাছবাড়ি বাজারের মসজিদে মাগরিবের নামাজের সময় দুই মাদ্রাসার গুরুত্বপূর্ণ দুইজন মাওলানা সাহেব উপস্থিত। সৌজন্যতার কারনে দুই মাদ্রাসার দুইজন মাওলানা একজন অপরজনকে নামাজে ইমামতী করার জন্য অনুরোধ জানালেন। কিন্তু জবাবে দুইজনই না না করছিলেন। ঠিক এসময় কাতারের পেছন থেকে একজনের কন্ঠস্বর শোনা গেল। লোকটি বলছিল; আপনারা দুই মাদ্রাসার মাওলানারা দুই গ্রুপকেই অমুসলিম বলে ফতোয়া দিয়েছেন। আমরা আম মানুষ তো এসব কিছুই বুঝিনা। আপনারা যে কোন একজন কাফের ইমামতি করুন আমরা নামাজ পড়ব।
লেবাসধারী গালিবাজদের উদ্দেশ্যে
ইসলামী মিডিয়ার খুব দরকার তাইনা? মিডিয়া একটা তো মার্ক জুকারবার্গ ফ্রী তে আমাদেরকে দিল। এটা নিয়ে কি করছেন আপনারা? আমরা ওখানে ঢুকে ক্রমাগত সবাই সবাইকে গুতাচ্ছি, চুলকাচ্ছি, আর ভাবছি এই বুঝি ইসলামী হুকুমত কায়েম হয়ে যাচ্ছে। এটাকে গালাগালি আর অশ্লীল বাক্য বর্ষণের ভাগাড়ে রূপান্তরিত করেছেন। অশ্লীলতা শুধু সানি লিওন আর ভারতীয় নায়িকারা ছড়াননা, ইসলামী লেবাসধারীরাও কখনো কখনো ছড়িয়ে থাকেন। ইসলামী মিডিয়ার জন্য ইসলামী লোক লাগবে। কবি বলেছেন, বন্যেরা বনে সুন্দর শিশু মাতৃকোড়ে। কিছু কিছু মানুষকে মিডিয়া ছাড়াই সুন্দর লাগে। মিডিয়া নাগালে পেলে কেউ কেউ ইতর হয়ে উঠে। আলেমদের ভাষা আর বস্তির ভাষার মধ্যে কি কোনোই পার্থক্য থাকবেনা? একেকজনের প্রোফাইলের নুরানী চেহারা আর কমেন্টের ভাষার মধ্যে কোন মিল খুজে পাওয়া যাচ্ছেনা। দেখছিলাম আর আশ্চর্য হচ্ছিলাম।
অভিমানী ভাইদের বলছি-
আমি জানি এতদিনের পরিচিত মানুষগুলোর সমালোচনা কাউকে ব্যাথিত করছে, রক্তাক্ত করছে, হৃদয়টাকে ছিন্নভিন্ন করছে। নিজের সাজানো গোছানো ঘরটাকে কেমন যেনো অচেনা লাগছে। এটাই স্বাভাবিক এবং নিদারুণ বাস্তবতা। কিন্তু এটাও তো সত্য যে অশ্লীল ভাষায় গালাগালি করা লোকগুলো নির্বোধ এবং মুর্খ। কুরআন ও হাদীস অনুযায়ী লিখুন। উম্মাহর জন্য লিখুন। ফ্রী ল্যান্সার হয়ে উঠুন। বলয়টাকে ভেংগে বেরিয়ে আসুন। মুক্ত পৃথিবীরর তাজা অক্সিজেনে শ্বাস নিন। কোটি জনতার কাছে দ্বীনের দাওয়াত পৌছানোর চেষ্টা করুন। একমাত্র আহলে হক, একমাত্র আহলে সংবিধান, একমাত্র শক্তিশালী সংগঠন শব্দগুলো কতটা হাস্যকর হয়ে উঠেছে তার সবচেয়ে ভাল নজীর হচ্ছে বাংলাদেশের ইসলামী দলগুলো।




