ইংরেজি Career শব্দটির বাংলায় এককথায় অর্থ হচ্ছে জীবনোপায়। অর্থ্যাৎ জীবিকা উপার্জনের পথ ও পন্থা। Career Development মানে হচ্ছে জীবিকা উপার্জনের পথ ও পন্থার ক্রমান্বয়ে উন্নতি সাধন এবং জীবনে সমৃদ্ধি অর্জন। অক্সফোর্ড ডিক্শনারিতে ক্যারিয়ারকে এইভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, A person’s course or progress through life. অর্থ্যাৎ একজন মানুষের জীবনে ধারাবাহিক উন্নয়ন সাধিত হওয়া। পেশা বা বৃত্তিমূলক কর্মকাণ্ডে সফলতাই হচ্ছে ক্যারিয়ারের সফলতা। অন্যভাবে বললে, জীবনের একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এমন পেশা নির্ধারণ করা যেখানে ব্যক্তির জীবন-জীবিকার উন্নয়ন সাধিত হয়ে থাকে।ক্যারিয়ার গঠন ও উন্নয়ন সাধনের জন্য প্রয়োজন বিশেষ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা।বর্তমান শিক্ষিত তরুণ সমাজ ও তাদের অভিভাবকগণ ক্যারিয়ার নিয়ে এখন বেশ উদ্বিগ্ন।পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে কিভাবে সম্মানজনক উপায়ে জীবিকা উপার্জন করা যায় এ নিয়ে থাকেন তটস্থ।
ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য যারা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করছেন, সমাজ বিপ্লবের কাজ করছেন ক্যারিয়ার উন্নয়নে তারা অত্যন্ত মনোযোগী থাকেন।তাঁদের ক্যারিয়ার ভাবনার মূল লক্ষ্য থাকে পরকালিন সফলতা।মৃত্যু পরবর্তি জীবনে সাফল্য লাভ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ব্যক্তিজীবনে যে পরিমাণ জাগতিক উন্নয়ন সাধিত হওয়া দরকার তাঁরা ততটুকুই করেন।পুঁজিবাদ, সেক্যুলার অর্থ্যাৎ বস্তুপূজারিদের মত বল্গাহীন ও দুনিয়াকেন্দ্রীক একচেটিয়া ক্যারিয়ার উন্নয়নে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা বিশ্বাসী নন।বিশেষ করে যারা ছাত্র ইসলামী আন্দোলনের সাথে জড়িত ক্যারিয়ার গঠনের ব্যাপারে তারাই সবচেয়ে বেশি মনোযোগি থাকেন। দ্বীনি আন্দোলনের কঠিন দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ভালো পড়াশোনা করা ও উন্নত ক্যারিয়ার গঠন অনেকের দ্বারা দু:সাধ্য মনে হতে পারে।কিন্তু একটি সুসংঘবদ্ধ ও সুশৃঙ্খল কাঠামোর মধ্যে থাকলে অনেক কঠিন কাজও সহজসাধ্য হয়ে যায়।
ছাত্র ইসলামী আন্দোলন হচ্ছে সে কাঠামোগুলোর মধ্যে একটি।এখানে কর্মী- দায়িত্বশীলগণ যেহেতু সবাই ছাত্র থাকেন, সেহেতু নিয়মতান্ত্রিক পড়াশোনা ও সাংগঠনিক দায়িত্বের ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষায় একে অপরের প্রতি সহযোগি হতে পারেন। ছাত্র ইসলামী আন্দোলনে আনুগত্য-শৃঙ্খলা এবং নিষ্ঠার সাথে যিনি দায়িত্ব পালন করেন, কর্মজীবনেও কাঙ্ক্ষিত ক্যারিয়ার উন্নয়নে তিনি অনেক অনেক বেশি সফল হতে পারেন।তবে কিছু কর্মী রয়েছেন যারা ক্যারিয়ার Build up (গড়ার) করার পূর্বেই Sacrifice (বিসর্জন) করে ফেলেন! অথচ একাডেমিক ভালো ফলাফল অর্জনের মাধ্যমে আগে ক্যারিয়ার গড়তে হয়, তারপর বিসর্জন দেয়া না দেয়ার প্রশ্ন আসে।প্রকৃত ক্যারিয়ার সেক্রিফাইস তখনই হবে যখন ক্যারিয়ার গঠনের পর অর্থ্যাৎ উপার্জনের সম্ভাব্য সুযোগ-সুবিধাবলী অর্জনের পর আপাত: সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের কারণে তা পরিত্যাগ করেন অথবা দায়িত্বশীলের সিদ্ধান্ত মাথা পেতে নেন।এ ধরণের ত্যাগ-কুরবানিই জনশক্তিদের জন্য প্রেরণার উৎস এবং পরকালীন সাফল্য লাভের পাথেয় হতে পারে।
একথা সত্য সেক্যুলার আন্দোলন যারা করেন বা জাগতিক ধ্যান ধারণা যারা লালন করেন তাদের সাথে পড়াশোনা কিংবা উন্নত ক্যারিয়ার গঠনের প্রতিযোগিতায় নিজেদের টিকিয়ে রাখা ইসলামপন্থীদের জন্য অনেক কঠিন কাজ।এক্ষেত্রে মেধাবী এবং অধ্যাবসায়ী কর্মীরাই পারেন সেক্যুলারদের সমকক্ষতা অর্জন করতে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় সেক্যুলারদের পিছনেও ফেলে দেন।অনেক কম মেধাসম্পন্ন কর্মীও কিন্তু ইসলামী আন্দোলনের শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে থেকে সফল হচ্ছেন। এসব জনশক্তি শুধু মেধায় দক্ষ নন নৈতিকতার মানদণ্ডেও সর্বোচ্চে অবস্থান করছেন।এর প্রধান কারণ হচ্ছে এক মহান মিশনারি চিন্তা-চেতনা নিয়ে তাঁরা গড়ে উঠেন।যা হচ্ছে ইসলামকে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চে তুলে ধরার মিশন, পরকালীন নাজাতের মিশন, জান্নাত লাভের মিশন। মিশর, তুরস্ক, তিউনিশিয়াসহ অনেকগুলো মুসলিম দেশে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীগণ ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার উন্নয়নে সেক্যুলারদের চেয়ে অনেক শীর্ষে অবস্থান করছেন। সেখানে দেখা যায় যে নেতৃবৃন্দ রাজনীতি বা দলীয় কর্মকান্ডকে-কে পেশা হিসেবে গ্রহণ না করে স্বীয় একাডেমিক অথবা অন্যকোন যোগ্যতার সর্বোচ্চ প্রদর্শণ করে কর্মজীবনে সফল হচ্ছেন।
যেমন কোন দায়িত্বশীল একদিকে একটি ইসলামী দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বপালন করছেন অন্যদিকে দেশ সেরা প্রকৌশলী, ডাক্তার, স্কলার অথবা অধ্যাপক হিসেবে সমধিক পরিচিত আছেন। সাধারণ মানুষের কাছে তাদের রাজনৈতিক বা দলীয় পরিচয়ের চেয়ে সামাজিক পরিচয়টাই মুখ্য থাকে।এ কারণে সেসব অঞ্চলে ইসলামী আন্দোলনগুলোর গণভিত্তিও তত মজবুতি লাভ করেছে এবং কর্মীবহুল দলের চেয়ে ব্যাপক জনসমর্থিত দলে পরিণত হয়েছে।তাই আপাত ভোটের রাজনীতিতেও তারা সফল হচ্ছেন।জনবহুল কিন্তু সীমিত কর্মক্ষেত্রের দেশ বাংলাদেশ।
শিক্ষিত বেকার (unemployed) এবং আংশিক-বেকারের (underemployed) সংখ্যার দিক থেকে পৃথিবীর উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে প্রথম দিকে অবস্থান করছে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি।তাছাড়া প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতি থাকায় প্রবাসেও রপ্তানি করা যাচ্ছে না এখানকার অল্পশিক্ষিত বিশাল শ্রমশক্তি।ঘুষ-দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে বৈধভাবে সরকারি চাকুরি গ্রহণ এবং টিকে থাকা এখানে বড় দায়।বি.সি.এস.সহ অন্যান্য নিয়োগ পরীক্ষায় অতিরিক্ত কোটাপ্রথা মেধাবীদেরকে সরকারি চাকুরির প্রতি হতাশ করছে।একমাত্র প্রাইভেট কর্পোরেট কিংবা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীগুলোই এখন মেধাবী তরুণদের প্রধান আকর্ষণ। কিন্তু এখানেও ভালো ক্যারিয়ার গড়তে গেলে এমন কিছু প্রফেশনাল ডিগ্রী থাকতে হয় যেগুলো অর্জন ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ, যেমন বিবিএ, এমবিএ, আইটি প্রভৃতি।এতসব প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে ইসলামী সমাজ বিপ্লবের কর্মীদের উপরোক্ত ক্ষেত্রে ক্যারিয়ার গড়ে তোলা সত্যিই চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার। তবে গতানুগতিকতার বাইরে এমন কিছু ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে ইসলামপন্থীরা অনায়াসাইে ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট করতে পারেন। যেখানে রয়েছে সম্মান এবং উন্নত জীবনের নিশ্চয়তা।
সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে দ্বীনি আন্দোলনের মিশনারি কাজের অংশ হিসেবেও এসব ক্ষেত্রকে তারা ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নিতে পারেন। বর্তমান বিশ্ব ও দেশীয় প্রেক্ষাপটে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদেরকে নিম্নোক্ত ক্ষেত্রসমূহে ক্যারিয়ার গড়তে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করা উচিত: গণমাধ্যমকর্মী/সাংবাদিকতা: ইলেক্ট্রনিক্স ও প্রিন্টেড মিডিয়ায় ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্টের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। যে কোন একাডেমিক বেকগ্রাউন্ড থেকে এসে এখানে ক্যারিয়ার গড়া যায়। সাংবাদিকতায় সম্মানের সাথে টিকে থাকার সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হচ্ছে সৎ সাহস। তবে সরকারি রোষানল, কর্পোরেট মাফিয়া চক্র ও দুর্নীতিবাজদের মোকাবেলা করে খুব কম সংখ্যক মিডিয়া এবং সংবাদকর্মীই এখানে টিকে থাকতে পারে। সমাজ ও সভ্যতা বিনির্মাণে আধুনিক গণমাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মানুষকে মোটিভেটেড করা, আন্দোলিত করা কিংবা শিহরিত করার মত যাদুকরি ক্ষমতা থাকে মিডিয়া কর্মীদের। ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদেরকে এখানে ভূমিকা পালন করার জন্য ব্যাপকভাবে এগিয়ে আসা উচিত। কারণ এখানে হলুদ সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, জাতিকে সঠিক তথ্য দেয়া এবং সাম্রাজ্যবাদের মুখোশ উন্মোচন করতে খোদাভীরু মিডিয়াকর্মীর বড়ই অভাব। তবে মুসলিম উম্মাহর প্রতি উৎসর্গিত ও শক্তিশালী মিশনারি লক্ষ্য না থাকলে এসব মিডিয়া এবং সাংবাদিকদের এখানে টিকে থাকা কষ্টসাধ্য।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অঙ্গন
যে দেশ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে যত শীর্ষে সে দেশ এখন তত সমৃদ্ধশালী ও উন্নত। ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার উৎকর্ষতা সাধনই তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উৎকর্ষতা। কত কম সময়ের মধ্যে বেশি পরিমাণ তথ্য বা ডিজিটাল ডাটা সংগ্রহ, ব্যবস্থাপনা এবং নির্ভুলভাবে প্রেরণ করা যায় তাই নিয়ে গবেষণা করাই হচ্ছে তথ্য প্রযুক্তিবিদ্যা। বর্তমানে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবস্থার উৎকর্ষতাই তথ্যপ্রযুক্তির বিদ্যার সবচেয়ে বড় সফলতা। উন্মুক্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ব্লগ, অনলাইন নিউজপোর্টাল, ভিডিও শেয়ারিং প্রভৃতি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নিজস্ব মতাদর্শ প্রচার, প্রসার এবং বিরোধী পক্ষের অপপ্রচারের জবাব দেয়া এখন অত্যন্ত সহজ কাজ। ইসলামী আন্দোলনের কর্মী এবং নিপীড়িত ও মজলুম জনগোষ্ঠীর কাছে তাই অনলাইন মিডিয়াগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়। বর্তমান জীবন-জীবিকার এমন কোন ক্ষেত্র অবশিষ্ট নেই যেখানে তথ্যপ্রযুক্তি সেবা পৌঁছেনি।
বাংলাদেশের সরকারি সেবা, ব্যবসায়-বাণিজ্য, লেনদেন, ব্যাংকিং, মার্কেটিং, শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি, আবাসন সবক্ষেত্রেই তথ্যপ্রযুক্তি পৌঁছে গেছে।তাই এই ক্ষেত্রে ব্যাপক কর্মক্ষেত্রও সৃষ্টি হয়েছে।কম্পিউটারের উপর ৬ মাস থেকে ১ বছরের যেকোন ডিপ্লোমা কোর্স করে দক্ষতার সাথে এ ক্ষেত্রে ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট করা যায়। তাছাড়া ঘরে বসে অনলাইন ফ্রিলেন্সিং বা আউটসোর্সিংয়ের কাজ করেও সম্মানজনক জীবিকা উপার্জনের ব্যবস্থা রয়েছে।ফ্রিলেন্সাররা মূলত বিভিন্ন অনলাইন মার্কেটপ্লেসে (যেমন: freelancer.com, fiverr.com, upwork.com প্রভৃতি কয়েক হাজার অনলাইন বাজারে) তাদের পণ্য বা সেবা বিক্রয় করেন অথবা নির্দিষ্ট সময় ও নির্দিষ্ট কাজের জন্য গ্রাহক কর্তৃক ভাড়ায় খাটেন এবং উপার্জিত অর্থ ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে নির্ঝঞ্জাটে বাংলাদেশে নিয়ে আসতে পারেন।
শিক্ষকতা:
একমাত্র মাদ্রাসা ছাড়া অন্য কোন শিক্ষা ব্যবস্থায় ইসলামী তাহজীব-তামাদ্দুন শিক্ষার সুযোগ নেই। অথচ সিংহভাগ জনগোষ্ঠী প্রচলিত সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থায় পড়াশোনা করে আসছে।রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় বৈপ্লবিক পরিবর্তন ছাড়া জাতীয় শিক্ষানীতি পরিপূর্ণ ইসলামী আদর্শের আলোকে ঢেলে সাজানো সম্ভব নয়। ততদিন পর্যন্ত ইসলামী নীতিমালা ও মূল্যবোধ শিক্ষা থেকে সিংহভাগ মানুষ বঞ্চিত থাকবে, ইসলামী আদর্শ বিবর্জিত জীবন ব্যবস্থা প্রাধান্য পেতে থাকবে তা হয় না। তাছাড়া সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থার এ ধারা অব্যাহত থাকলে ইসলামী সমাজ বিনির্মাণের আন্দোলনও দিন দিন আরো বাধাগ্রস্থ হবে।ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের স্কুল-কলেজগুলোতে শিক্ষকতা তথা মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
শিক্ষা কারিকুলামে যাই থাক না কেন একজন আল্লাহভীরু শিক্ষকের সংস্পর্শে থাকলে ছাত্ররা আদর্শ মানুষ হওয়ার প্রেরণা পায়, খোদাভীতি চর্চার কিছু প্রশিক্ষণ পায়। এ ধরণের ছাত্রদের মধ্যে যাদের সরাসরি ইসলামী আন্দোলনে শরিক হওয়ার সৌভাগ্য হয় না, তারা স্বেচ্ছায় অন্তত আন্দোলনের বিরোধীতা করবে না কিংবা ইসলামের মর্যাদাহানি করবে না। যাদের একাডেমিক পড়াশোনা ভালো, ইসলামী আন্দোলনের সে সকল কর্মীদেরকে শিক্ষকতার মহান পেশায় আত্মনিয়োগ করা উচিত। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি, ব্যাংক-বীমা, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে বেশি বেতনে চাকুরি করার চেয়ে শিক্ষকতার মাধ্যমে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার এ আন্দোলনে শরিক থাকতে পারাটা অনেক বেশি মর্যাদাকর, অনেক বেশি সওয়াবের কাজ হবে।ইসলামপন্থী শিল্প ও ব্যবসায়িক উদ্যোক্তাগণ যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার প্রতি আরো মনোনিবেশ করেন তাহলে জাতির অন্ধকারাচ্ছন্নতা থেকে মুক্তির উপায় দ্রুততর হতে পারে।
সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবি অঙ্গন:
সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে যেকোন ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসা যায়, কোন বিশেষ একাডেমিক সার্টিফিকেটের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন সৃজনশীলতা ও মননশীলতার পরিচর্চা। হুট-হাট করে কেউ সাহিত্যিক অথবা বুদ্ধিজীবি হয়ে যেতে পারেন না। সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবি হতে হলে মোটামুটি এমন বৈশিষ্ট্যাবলী থাকা প্রয়োজন, যেমন: যারা নিয়মিত ডায়েরি সংরক্ষণ করে থাকেন, পত্রিকার কলাম-সাহিত্য পাতা নিয়মিত পড়েন, সংরক্ষণে রাখেন, সুন্দর উপস্থাপনায় স্মৃতি রোমন্থন করতে পারেন, নামকরা কবি-সাহিত্যিকের লেখা মনোযোগ দিয়ে পড়েন ও নিজ থেকে লেখার চেষ্টা করেন, ইতিহাসের ভালো জ্ঞান রাখেন, সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহের উপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখেন, যেকোন জিনিস নিখুঁতভাবে ভাবতে পারেন, খুঁটিনাটি বিষয়েও যাদের চোখ এড়ায় না, নিজের মধ্যে আলাদা স্বকীয়তা অনুভব করেন প্রভৃতি। জাতির দিকনির্দেশক, গবেষক ও বুদ্ধিজীবি মহল এখান থেকেই বের হয়ে আসেন। বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাহিত্য চর্চায় ইসলামপন্থীরা এখনো পিছনে পড়ে আছেন, এই সেক্টরে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার সময় এসেছে। সাম্রাজ্যবাদিদের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে পিষ্ট ও প্রভাবিত বুদ্ধিজীবি পরিমণ্ডলকে এখান থেকে দ্রুত মুক্ত করে নিয়ে আসতে হবে।
শিশু সংগঠক :
কোমলমতি শিশুদের সুস্থ সাংস্কৃতিক বিকাশ ও ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন রয়েছে শিশু সংগঠনের বর্তমানে প্রচলিত অধিকাংশ শিশু সংগঠন বিজাতীয় সংস্কৃতির পরিচর্চা কেন্দ্রমাত্র।শিশুতোষ গান, ছড়া, কবিতা, সাহিত্য, পত্রিকা, নাটক, গল্প প্রভৃতি চর্চাকেন্দ্র হচ্ছে শিশু সংগঠনগুলো।শিশু-কিশোরদের সাথে মিশতে পারা, মন-মানসিকতা বোঝা এবং প্রাণবন্ততা প্রভৃতি গুণাবলী শিশু সংগঠকদের থাকতে হয়।শিশু সংগঠন গড়ে তোলার জন্য দরকার উপযুক্ত আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা।কারণ শিশুদের বিনোদন উপকরণাদি অত্যন্ত আকর্ষণীয় হতে হয় যা ব্যয়বহুল।তবে জাতীয় সংগঠনের উদ্যোগ থাকলে এ ধরণের সংগঠন গড়ে তোলা এবং এখানে ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট করা খুব সহজ হয়।
নাট্যগোষ্ঠী :
নাটক সাহিত্যের একটি বিশেষ ধরণ যা পা-ুলিপি অনুসরণ করে অভিনয় করা হয়। সমাজ বাস্তবতার অনেকাংশই নাটক দিয়ে সহজে উপস্থাপন করা যায়। শুধু বিনোদনের জন্য নয়, নাটকের মাধ্যমে সমাজ সচেতনতা, দায়িত্ববোধ ও ধর্মীয় অনুভূতিও জাগ্রত করা সম্ভব।কিন্তু বর্তমানে নাট্যগোষ্ঠী ও নাট্যাঙ্গনগুলো অশ্লীলতা ও অপসাংস্কৃতিক সয়লাবে অন্যতম মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।ইসলামী আন্দোলনের সাংস্কৃতিক কর্মীদেরকে শিক্ষামূলক নাটক লেখা ও মঞ্চস্থ করার দিকে এগিয়ে আসা উচিত।ইসলামী সাংস্কৃতিক আন্দোলন করতে গেলে বর্তমান যুগে নাটক-সিনেমা বাদ দিয়ে সম্ভব নয়।তবে তা অবশ্যই হতে হবে প্রচলিত নীতিমালা অথবা চর্চার মধ্যে যতটুকু শরিয়া সমর্থন করে না তা বাদ দিয়ে।বর্তমান সমাজ ও রাষ্ট্রীয় বাস্তবতাকে সামনে রেখে সাংস্কৃতিক আগ্রাসণ প্রতিরোধ এবং ইসলামী সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় শরিয়া বিশেষজ্ঞগণ এক্ষেত্রে যুক্তিসঙ্গত অভিমত ব্যক্ত করবেন এটাই উম্মাহর প্রত্যাশা।
সঙ্গীত শিল্পী: কণ্ঠস্বর ও ধ্বনীর সমন্বয়ে সঙ্গীতের সৃষ্টি।ধ্বনী হতে পারে মানুষের কণ্ঠ নি:সৃত অথবা যন্ত্র উৎপাদিত শব্দ।ধ্বনীর প্রধান মাধ্যম হচ্ছে সুর। ধ্বনী, সুর ও তালের সমন্বয়ে সৃষ্টি হয় সঙ্গীত বা গান।এক্ষেত্রে যন্ত্র উৎপাদিত ধ্বনী ছাড়া বাকি সবগুলোই শরিয়া সমর্থন করে।বিধায় দেশে ইসলামী সঙ্গীত শিল্পী ও শিল্পীগোষ্ঠীর তৎপরতা আশাব্যাঞ্জক।তবে সঙ্গীত শিল্পে প্রধান অবস্থান সৃষ্টি করতে ইসলামী সঙ্গীতশিল্পী ও কলা-কুশলীদেরকে আরো বহু পথ পাড়ি দিতে হবে।ক্যারিয়ার হিসেবে সঙ্গীত ও ক্বেরাত শিল্পে তাদেরই এগিয়ে আসা উচিত যারা কণ্ঠঅনুশীলনে ভালো এবং শুধুমাত্র দ্বীনি মিশনারি কাজ হিসেবে একে গ্রহণ করতে পারবেন।
মাদ্রাসার শিক্ষক ও ইমাম-খতিব:
মসজিদ-মাদ্রাসাসমূহ দ্বীনের শ্রেষ্ঠ মারকাজ বা আবাদস্থল। সমাজের গুরুত্বপূর্ণ এবং নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবেও বর্তমানে মসজিদ-মাদ্রাসার ভূমিকা অনস্বীকার্য। এ সমস্ত দ্বীনি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি সাধারণ মানুষের আন্তরিক ভালোবাসা এবং যথেষ্ট সম্মানবোধ রয়েছে।কারণ তারা এগুলোকেই নি:স্বার্থ ও একমাত্র আখেরাতের কাজ বলে মনে করে।ইসলামী আন্দোলনকে পছন্দ করে না কিন্তু মসজিদ-মাদ্রাসার প্রতি, এসবের তত্ত্বাবধায়কগণের প্রতি অধিকাংশ মানুষের রয়েছে অগাধ বিশ্বাস ও ভক্তি-শ্রদ্ধাবোধ।
যারা সরাসরি মাদ্রাসা বেকগ্রাউন্ড থেকে এসে ইসলামী সমাজ বিপ্লবের আন্দোলন করছেন, তাদের ক্যারিয়ার শুরু করা উচিত মসজিদ-মাদ্রাসাগুলোতে দ্বীনি খেদমতের মাধ্যমে। মাদ্রাসা পরিচালনা অথবা প্রতিষ্ঠা, ছাত্র পড়ানো, ইমাম হিসেবে খুতবা প্রদান, মসজিদ ভিত্তিক দ্বীনি তালিম-তরবিয়ত, ওয়াজ মাহফিল, ইসলামী আলোচনা সভা প্রভৃতি কার্যক্রম নি:সন্দেহে দ্বীন প্রতিষ্ঠার শ্রেষ্ঠ কাজগুলোর অন্যতম। ব্যবসায়-বাণিজ্য অথবা জাগতিক কোন প্রতিষ্ঠানে চাকুরি দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করার চেয়ে মসজিদ-মাদ্রাসাসমূহে ক্যারিয়ার গড়ে তোলা, শত শত যোগ্য আলেম তৈরি করা, সাধারণ মানুষের দ্বীনি তালিম-তরবিয়তের ব্যবস্থা করার মর্যাদা যে কত বেশি, কত সওয়াবের কাজ তার স্পষ্ট সুসংবাদ আমরা হাদীসে রাসুল স. থেকে পাই।
মাদ্রাসা পড়ুয়া ইসলামী আন্দোলনের কর্মীবৃন্দ যারা সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় উচ্চতর ডিগ্রী নিচ্ছেন, তাদের ক্যারিয়ারের শুরুটাও মসজিদ-মাদ্রাসা থেকেই শুরু করা উচিত।যদিও আর্থিকভাবে যথেষ্ট স্বচ্ছলতা আনয়ন এখানে থেকে সম্ভব নয় তারপরও শুরুর কয়েক বছর এখানে থাকা উচিত।পরবর্তিতে একটা পর্যায়ে জাগতিক অন্যান্য ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়া যেতে পারে।তবে যেখানেই যাওয়া হোক না কেন দ্বীনি পরিচয় অর্থাৎ তাঁর আলেম হিসেবে পরিচয়টা প্রাধান্য পাওয়া উচিত।কওমি মাদ্রাসা ও আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার সমন্বয়ে এমন কিছু মাদ্রাসা অথবা স্কুল প্রতিষ্ঠায় নিজে উদ্যোক্তা হওয়া কিংবা অন্যকে উৎসাহিত করার কাজ তাঁরা করতে পারেন।এভাবে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে, ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তালেবে এলেমগণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন ।
আইনপেশা:
ন্যায় বিচার প্রাপ্তি মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে একটি। মানবরচিত মতবাদ বা জীবন ব্যবস্থার আলোকে রচিত আইন বা বিধানাবলী যথেষ্ট ত্রুটিপূর্ণ। এ সমস্ত আইনের অধিকাংশই মূলত প্রথাগত ও পরীক্ষামূলক হয়ে থাকে যা মানুষের শুধু দুর্ভোগ-ভোগান্তিই বাড়িয়ে থাকে।ঠিক তেমনই যেমন রোগের মূল কারণ চিহ্নিত না, ডায়াগনসিস না করে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখে ওষুধ দিয়ে দেয়া। ফলে রোগী সাময়িক সুস্থতাবোধ করলেও কিন্তু রোগ থেকেই যায় এবং তা আরো জটিল আকার ধারণ করে। তাই সকল জুলুম ও অবিচারের উৎস হচ্ছে মানুষের মনগড়া আইন-কানুন। রাব্বুল আলামীন আল্লাহর বিধানই শতভাগ ত্রুটিমুক্ত এবং ন্যায়বিচারের উৎস-এটাই মুসলিমদের দৃঢ় বিশ্বাস। কারণ সুমহান সৃষ্টিকর্তা হিসেবে তিনিই সবকিছু জানেন কোথায় মানুষের আসল সমস্যা এবং কি তার সমাধান-এই বিশ্বাস হচ্ছে প্রাকৃতিক এবং বিজ্ঞানভিত্তিক।
রাষ্ট্রীয় কাঠামোয়ে সেই বিধান প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত প্রচলিত বিধানে থেকে যতটুকু সম্ভব মানুষকে ন্যায় বিচার পাইয়ে দেয়া এবং দুর্ভোগ লাঘব করে দেয়া নি:সন্দেহে অনেক সওয়াবের কাজ। তাছাড়া সততার সাথে আইন পেশায় যথেষ্ট স্বাধীনতা, সম্মান এবং আর্থিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা রয়েছে। যারা অনার্স-মাস্টার্স অথবা ডিগ্রী-মাস্টার্স করেছেন তারাই এডভোকেটশিপ পরীক্ষায় উত্তীর্ণের মাধ্যমে জজকোর্টে আইন পেশা শুরু করতে পারেন। পরবর্তিতে আরো পরীক্ষা দিয়ে সুপ্রীম কোর্টেও প্র্যাক্টিস করতে পারেন। তাছাড়া বিসিএস এবং সুপ্রীম কোর্টের নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিচারক হিসেবেও নিয়োগ পেতে পারেন। তবে বর্তমান কাঠামোয়ে সৎভাবে বিচারক হিসাবে দায়িত্বপালন করা কিংবা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ এবং পরকাল ধ্বংসের কারণও হতে পারে। ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের আইন পেশাকে স্বোচ্ছাসেবা হিসেবে গ্রহণ করা কিংবা নামমাত্র মূল্যে সেবা দেয়া এবং এই পেশায় সৎ-দক্ষ জনবল বৃদ্ধিতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করা উচিত।
এনজিও, স্বেচ্ছাসেবি ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানে ক্যারিয়ার:
নন গভার্নমেন্ট অরগানাইজেশন বা NGO যার বাংলা অর্থ হচ্ছে বেসরকারি সেবা সংস্থা।এগুলো হচ্ছে অলাভজনক সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠান যার কোনটা নামমাত্র মূল্যে, কোনটা বিনামূল্যে মানুষকে বিভিন্ন সেবা দিয়ে থাকে।যেমন: আইন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্ষুদ্র ঋণ, পরিবেশ, শৃঙ্খলা, উদ্ধার, পুনর্বাসন, আবাসন, খাদ্য, মাতৃত্ব সেবা প্রভৃতি।এসবের কোনটার আংশিক অর্থায়নে রয়েছে সরকার, কোনটার পূর্ণাঙ্গ অর্থায়নে কোন বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা আন্তর্জাতিক কোন সংগঠন বা সংস্থা।এনজিওগুলোর মধ্যে কোনটার জনবল স্বেচ্ছাসেবী, কোনটার জনবল বেতনভুক্ত হয়ে থাকে।এগুলো মূলত বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধিনস্ত অধিদপ্তরের রেজিস্ট্রেশনভুক্ত যেমন, বাংলাদেশ এনজিও ব্যুরো, সমাজসেবা অধিদপ্তর ও জয়েন্ট স্টক কোম্পানি এন্ড ফার্ম প্রভৃতি। ২০১৫ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে রেজিস্ট্রিভুক্ত এনজিও ও স্বেচ্ছাসেবি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা হচ্ছে ২৩৩৩ টি।
মানবতার কল্যাণে যেকোন দাতব্য, অলাভজনক ও স্বেচ্ছাসেবাকে হাদীসের ভাষায় তিনটি সদকায়ে জারিয়া বা অবিরত পুন্য কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হিসেবে মর্যাদা দেয়া হয়েছে।এমন এক পুণ্য যা ব্যক্তি বা উদ্যোক্তার মৃত্যুর পরও ততদিন অব্যাহত থাকবে যতদিন মানুষ সে সেবা বা উপকার পেতে থাকে। ইসলামী সমাজ বিপ্লবের ক্ষেত্রেও এনজিও, স্বেচ্ছাসেবি ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অগ্রগণ্য। মানুষ যখন ইসলামপন্থীদের নিকট থেকে তার মৌলিক কিংবা অতিপ্রয়োজনীয় সেবাগুলো বিনামূল্যে কিংবা কমমূল্যে পেতে থাকবে তখন তার ঈমানও রক্ষা পাবে। কারণ দারিদ্র্যতা মানুষকে কুফুরির দিকে ধাবিত করে। অর্থ্যাৎ ইসলামপন্থীরা এগিয়ে না আসলে ইসলাম বিরোধী মহল সেবার বিনিময়ে তাদের উপর নিজস্ব মত-পন্থা চাপিয়ে দিবে কিংবা প্রলুব্ধ করবে।যেমন পার্বত্যাঞ্চল, উত্তরাঞ্চলসহ দেশের দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চলগুলোতে খৃস্টান মিশনারি, আহমদিয়া (কাদিয়ানী) এবং নাস্তিক সম্প্রদায় দরিদ্র মুসলমানকে ঈমানহারা করে যাচ্ছে। তাই নিজেই উদ্যোক্তা হওয়া অথবা কোন সামর্থবান ও সম্পদশালী মুসলিমকে উদ্যোগি করে এসব সেবামূলক কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিত।
গ্রামে গ্রামে মসজিদ ও মাদ্রাসাভিত্তিক কম্প্লেক্স প্রতিষ্ঠা এবং এসবের মাধ্যমে নিম্নোক্ত সেবাসমূহ সামর্থ অনুযায়ী প্রদান করা যেতে পারে, যেমন: বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্র, অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা, কুরআন হিফ্জ, বিশুদ্ধ কুরআন তেলাওয়াত শিক্ষা, নিয়মিত কুরআন-হাদীসের দারস, পাঁচ ওয়াক্ত নামাযে উৎসাহ, রমযান মাসে রোজার পরিবেশ রক্ষা, মাসআলা-মাসায়েল শিক্ষা, সাপ্তাহিক ফ্রি রোগ নির্ণয় (ডায়াগনসিস), প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রাণ তৎপরতা, আপদকালীন স্বেচ্ছাসেবা, হোমিও ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা সেবা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সচেতনতা এবং উন্নয়ন, কৃষি ও খামার বিষয়ক পরামর্শ, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা, আইনী পরামর্শ ও সেবা, মাদক ও অসামাজিক এবং জঙ্গী ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম বিরোধী সচেতনতা, মহিলাদের প্রয়োজনীয় দ্বীনি জ্ঞান ও মাসআলা শিক্ষা, বেকার যুবক ও মহিলাদের দিয়ে কুটিরশিল্প প্রতিষ্ঠা ও ক্ষুদ্র ঋণ কর্মসূচি, নির্মল আনন্দ ও বিনোদনের ব্যবস্থা প্রভৃতি।সারাদেশের বর্তমান মসজিদ-মাদ্রাসাগুলোকে এক একটি মার্কাজ হিসেবে গ্রহণ করে উপরোক্ত দ্বীনি ও সমাজসেবা কার্যক্রম চালিয়ে নেয়া যেতে পারে।
সেবাসমূহ কোনটা বিনামূল্যে, কোনটা নামমাত্র মূল্যে প্রদান করা হবে।এখানে বিধিমোতাবেক বেতনভুক্ত জনবল থাকবে এবং তা নিয়মিত আয় অথবা যাকাত বা অন্যান্য অনুদান থেকে প্রদান করা হবে।তবে এধরণের সেবাক্ষেত্রগুলো প্রতিষ্ঠালাভ করলে একপর্যায়ে সাম্রাজ্যবাদী ও ইসলাম বিরোধী শক্তিগুলোর চক্ষুশূলে পরিণত হয় এবং সরকারি অনেক বিধিনিষেধের বেড়াজালে পড়তে হয়।তবে দ্বীনি মিশনারি লক্ষ্য না থাকলে, আল্লাহর দ্বীনকে সর্বস্তরে বিজয়ী করার দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ না থাকলে মুসলিমদের পক্ষে এসব প্রতিষ্ঠান গড়া ও পরিচালনা অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার।খৃস্টান মিশনারি সংগঠনগুলো সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে মুসলিম দেশে এভাবেই কাজ করে যাচ্ছে এবং ধর্মান্তরিতের কাজে সফল হচ্ছে।ইসলামী সমাজ বিপ্লবের কর্মীরা ফুল টাইম (নির্ধারিত বেতনে) অথবা পার্ট টাইম (স্বেচ্ছাসেবা) কাজ হিসেবেও স্ব-স্ব এলাকায় এসব সেবামূলক কর্মকাণ্ডে মগ্ন হতে পারেন।একক অথবা গুচ্ছগ্রাম ভিত্তিক উপরোক্ত সেবাসমূহ সামর্থানুযায়ী প্রদানের মধ্য দিয়ে দেশে এক একটি আদর্শ ও স্বনির্ভর গ্রাম প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
আধুনিক যুগের প্রভাবশালী ইসলামী স্কলার এবং মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামী আন্দোলনগুলোর আধ্যাত্মিক রাহবার ড. ইউসুফ আল কারযাভির সাম্প্রতিক একটি প্রবন্ধের কিছু অংশ আলোচনার প্রাসঙ্গিক বলে এখানে উল্লেখ করছি। তিনি বলছেন, ‘কিছু কিছু ইসলামী আন্দোলন এখন রাজনীতি নিয়েই ব্যস্ত।তাদের সমস্ত সংগ্রাম, সাধনা রাজনীতিতেই লোক সমাগম করা। তাদের চিন্তা, অনুভূতি ও সাংগঠনিক কার্যক্রম সবই অনৈসলামিক সরকারের বিরুদ্ধে নিয়োজিত।তাদের শক্তি-সামর্থ সরকার যন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে ক্ষয় করতে হচ্ছে। কিংবা এমন যুদ্ধে তাদের জড়িয়ে পড়তে হয় যেখান থেকে না ইসলামের কোন উপকার হয়, না দেশের।এই অনাকাক্সিক্ষত যুদ্ধ যুগের পর যুগ চলতে থাকার কারণে একদিকে যেমন শক্তির অপচয় হয়, অন্যদিকে ইসলামের শত্রুরা অত্যন্ত আনন্দ পায়। অথচ এরা অনেক ধরণের ভালো, উপকারি, জরুরি এবং সম্ভাবনাময় কাজ থেকে বেশ দূরে থাকে।তারা বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে সময় দেয় না।ওরা শিক্ষা-প্রশিক্ষণেও সময় বেশি লাগায় না।সামাজিক কর্মকাণ্ডে এদের সময় একদম নেই।অথচ এই কাজগুলো কিন্তু রাজনৈতিক কর্মকা- থেকে আলাদা নয় বরং রাজনৈতিক সফলতার জন্য এগুলোকে অবশ্যই করণীয় কাজ হিসেবে মানুষ গ্রহণ করে নিয়েছে।রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সফলতা লাভ করতে হলে আমাদের উচিত এমন এক জেনারেশন তৈরি করা যারা দ্বীনকে বুঝবে পরিপূর্ণভাবে।যারা দুনিয়ার জ্ঞানেও পিছিয়ে থাকবে না।আকিদা-বিশ্বাস হবে একদম নির্ভেজাল।যারা ইবাদত করবে সহিহ্ সঠিক পন্থায়।’
ইসলামপন্থীদের এই মুহূর্তে দল, মত বা পন্থী পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে উপরোক্ত ক্ষেত্রগুলোতে ক্যারিয়ার উন্নয়নে ব্যাপকভাবে মনোনিবেশ করা উচিত।এসব সেক্টরে ক্যারিয়ার প্রতিষ্ঠা, দ্বীনি ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ড এবং এর সাথে সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই দল, পন্থা অথবা গোষ্ঠী ট্যাগমুক্ত রেখে সার্বজনিন হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত।সেবার বিনিময়ে সংকীর্ণ গোষ্ঠীগত স্বার্থ হাসিল, নোংরা রাজনৈতিক ফায়দা লাভ, পরবর্তিতে খোঁটা দেয়ার মানসিকতা, সেবা প্রাপ্তিতে নিজ পন্থীয় ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দান প্রভৃতি দলীয় বা গোষ্ঠীগত সংকীর্ণতা অবশ্যই পরিত্যাজ্য।
ক্যারিয়ার হিসেবে গ্রহণ করার মতো উপরোক্ত বর্ণনার বাইরেও ইসলামপন্থীদের জন্য আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র রয়েছে।মূলত জীবিকার ক্ষেত্রগুলো বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না।ইসলামকে বিজয়ী আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রাম প্রত্যেক মুসলমানের উপর সামর্থানুযায়ী ফরজ।সে হিসেবে সকল ধরণের হালাল ক্যারিয়ারে থেকেই দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অংশ নেয়া যায়।তবে আমার মতে বর্ণিত ক্ষেত্রগুলোতে ইসলামপন্থীদের এই মুহূর্তে বেশি মনোযোগী হওয়া দরকার।আল্লাহ আমাদের সকল প্রচেষ্টাকে তাঁর দ্বীনের অভিমুখি করুন এবং তাঁর সন্তুষ্টি দান করুন।





thinking is good but i differ on some point that we have to focus on sector which will be needed for temporary power politics & socio-cultural-civilization reform.
business, military, burocracy-judiciary, media, popularity-leadership-organization should be first priority for power politics.
business, education, media, cultural motivation, popularity-leadership-organization should be first priority for socio-cultural-civilization reform.