একাত্তরের সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হচ্ছে ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। সেখানে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডেরও বিচার হয়েছে। বিচারে ছাত্রসংঘের চার জন নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই চারজন হলেন মাওলানা মতিউ রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, চৌধুরী মঈন উদ্দিন ও আশরাফুজ্জামান খান। এর মধ্যে প্রথম দুজন নিজামী ও মুজাহিদ সরাসরি কোনো বুদ্ধিজীবী হত্যা করেছন বলে প্রমাণিত হয়নি। তবে হত্যাকাণ্ডের সুপ্রিম কমান্ড রেস্পন্সিবিলিটির দায়ে গত ২২ নভেম্বর মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। আগামী ৬ জানুয়ারি নিজামীর মামলার আপিলের রায় ঘোষণার কথা।
বাকি দুজন মঈন ও আশরাফ সরাসরি হত্যায় অংশ নিয়েছেন বলে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা প্রমাণিত হয়েছে বলে ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়েছে। আদালত যেমন বুদ্ধিজীবী হত্যার জন্য চারজনকে ফাঁসি দিয়েছে, তেমনি বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড নিয়ে একটি আইনী ভাষ্যও দিয়েছে। যার মধ্য দিয়ে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের ঐতিহাসিক বিবরণও রচিত হলো। তবে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড নিয়ে আদালত বাংলাদেশের জনপ্রিয় ভাষ্যটাই পুনরাবৃত্তি করে গেছে, যাতে এই ঘটনার মূলে থাকা আসল শক্তি পাকিস্তান ও তাদের পৃষ্ঠপোষক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দায় চেপে যাওয়া হয়েছে।
শুধু তাই নয়, একাত্তরের সকল ঘটনার আসল হোতা পাকিস্তানি সেনাদের দায়মুক্তি দিয়ে দেশটির বিভিন্ন লোক যেসকল বিবরণ লিখেছে তা উদ্ধৃত্ত করে হানাদার বাহিনীর সহযোগী আলবদরের উপরই বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের দায় চাপানো হয়েছে। আদালতে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের বিচারের ক্ষেত্রে মূলতঃ মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকের ঘটনাকেই আমলে নেওয়া হয়েছে। শুরুতে যেসকল হত্যাকাণ্ড হয়েছে তার কোনো বিচার হয়নি। বিশেষ করে ২৫ মার্চ রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের ঘটনা রয়ে গেছে বিচারের বাইরে।
পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের নামে আছে, শাস্তি নাই
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও আপিল বিভাগের রায়ে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে আলবদরের জড়িত থাকার কথা বলতে গিয়ে এই বাহিনী গঠনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি আলবদর গঠনে জড়িত পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের নাম ও পদবির কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু রায়ে শুধু ছাত্রসংঘের নেতাদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। পাকিস্তানি গবেষক ও লেখক সেলিম মনসুর খালেদ তার আলবদর বইয়ে একাত্তরে আলবদর গঠনের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। ওই বই উদ্ধৃত করে মুজাহিদের আপিলের রায়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বলেন, “একাত্তরে মেজর জেনারেল আবদুর রহীমের সঙ্গে ঢাকার ছাত্র সংঘের নেতারা দেখা করে আলবদরের বিষয়ে কথা বলেন। জেনারেল রাও ফরমান আলীর সঙ্গে কথা বলে আবদুর রহীম আলবদরের বিষয়টি চূড়ান্ত করেন, একই সঙ্গে লে. কর্নেল আহসানুল্লাহকে আলবদর গঠনের ব্যাপারে প্রাথমিক নির্দেশনা দেন। ঢাকায় আলবদরের দায়িত্ব দেওয়া হয় ব্রিগেডিয়ার বশীরকে। ১৯৭২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় লেখা হয়, জেনারেল রাও ফরমান আলীর ডেস্কে পাওয়া নথিগুলোর মধ্যে আলবদর-সম্পর্কিত একাধিক গুপ্ত নথি পাওয়া গেছে।”
মুজাহিদের রায়ে আপিল বিভাগ আরো বলেন, “৩১ বেলুচ রেজিমেন্টের মেজর রিয়াদ হোসেন মালিক একাত্তরে শেরপুর এলাকায় দায়িত্বে ছিলেন। একাত্তরের ১৬ মে তিনি ছাত্র সংঘের ৪৭ জন সদস্যকে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেন। ২১ মে তিনি ছাত্র সংঘের ওই সদস্যদের ‘আলবদর’ নামকরণ করেন। একাত্তরের শেষ দিকে ছাত্র সংঘের সদস্যদের ৭ থেকে ১২ দিনের সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে সারা বাংলাদেশে আলবদর বাহিনী ছড়িয়ে দেওয়া হয়।” আপিল বিভাগের রায়ের বিবরণ থেকে স্পষ্ট আলবদর গঠনে পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তাদের অনুমোদন, সংগঠিত করণ ও প্রশিক্ষণে জড়িত ছিল পাকিস্তানী সেনা বাহিনী। তবে আপিল বিভাগ আলবদরের নেপথ্যে জেনারেল রাও ফরমান আলী, মেজর জেনারেল আবদুর রহীম, লে. কর্নেল আহসানুল্লাহ, ব্রিগেডিয়ার বশীর ও মেজর রিয়াদ হোসেন মালিকের কথা উল্লেখ করলেও আলবদরের বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডসহ যেসকল অপরাধের অভিযোগ রয়েছে তার জন্য এই পাঁচজনের একজনকেও দোষী সাব্যস্ত করেনি।
বুদ্ধিজীবীর হত্যার পরিকল্পনাকারী
চৌধুরী মঈনউদ্দিন ও আশরাফুজ্জামান খানের মামলার রায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সরাসরি বলেছে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করেছিল জামায়াত। আলবদরকে দিয়ে তারা এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছিল। ২০১৩ সালের ৩ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল চৌধুরী মঈনউদ্দিন ও আশরাফুজ্জামান খানের মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে তাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদেশ দেয়া হয়। রায়ে বলা হয়, “এটা প্রমাণিত যে বাঙালি জাতিকে পঙ্গু করে দেয়ার যে ‘মাস্টার প্লান’ ছিল ফ্যাসিস্ট জামায়াতের। সেই পরিকল্পনারই অংশ হিসেবে আলবদর বাহিনীকে নিয়োগ দেয়া হয়। তাদের কাজ ছিল এ দেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা। আলবদর বাহিনী জামায়াতের নীলনকশা সম্পন্ন করতে ‘কিলিং স্কোয়াড’ হিসেবে কাজ করেছিল।”
মুজাহিদের রায়ে জেনারেল রাও ফরমান আলীর ডেস্কে পাওয়া নথিগুলোর মধ্যে আলবদর-সম্পর্কিত একাধিক গুপ্ত নথি পাওয়ার কথা বলেছেন আপিল বিভাগ। ফরমান আলীর ডেস্ক থেকে উদ্ধার হওয়া নথির মধ্যে একটি ডায়েরি ছিল বলে মুক্তিযুদ্ধের পরপর গণমাধ্যমে প্রতিবেদন বেরিয়ে ছিল। ওই ডায়েরিতে উল্লেখ পাওয়া যায় যে, দুজন আমেরিকান নাগরিক ঢাকা সফর করে। তারা হল হেইট (Haight) ও ডুসপিক (Dwespic), এদের নামের পাশে ছোট ছোট অক্ষরে ইউএসএ (USA) ও ডিজিআইএস (DGIS) অর্থাৎ ডিরেক্টর জেনারেল অব ইন্টারন্যাশনাল সার্ভিস লেখা ছিল। আরো লেখা আছে– ‘রাজনৈতিক, ৬০-৬২, ৭০’। অপর এক জায়গায় লেখা আছে– ‘এ দুজন আমেরিকান পিআই-এর একটি বিশেষ বিমানে ব্যাংককের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন’।
হেইট ও ডুসপিকের পরিচিতির ব্যাপারে তৎকালীন দৈনিক বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “হেইট ১৯২৮ সালে জন্মগ্রহণ করেছে। সে ১৯৪৬ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত সৈন্যবাহিনীতে চাকরি করত। ১৯৫৩ সাল থেকে সে সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ১৯৫৪ সাল থেকে সে আমেরিকান দূতাবাসের রাজনৈতিক কূটনীতিবিদ হিসেবে বহুদেশ ভ্রমণ করেছে। সে কোলকাতা এবং কায়রোতেও ছিল। সিআইএ এজেন্ট ডুসপিকের সঙ্গে গত বছর সে ঢাকা ফিরে আসে এবং রাও ফরমান আলীর সঙ্গে তিন হাজার বুদ্ধিজীবীর একটি তালিকা তৈরি করে। জেনারেলের শোবার ঘরে এই তালিকা পাওয়া গেছে।” মুক্তিযুদ্ধের ওপর ভারতীয় লেখক ক্যাপ্টেন এস কে গার্গের লেখা ‘স্পটলাইট: ফ্রিডম ফাইটার অব বাংলাদেশ’ বইয়ে বলা হয়েছে, “আত্মসমর্পণের ঠিক আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০ জন শিক্ষকসহ ৩ হাজার বুদ্ধিজীবীর একটি তালিকা তৈরি করে সিআইএ যাদের জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সদস্যদের নিয়ে গঠিত আলবদর দিয়ে দ্রুত নির্মূলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।”
ভিয়েতনাম-ব্রাজিলের পর ঢাকায় আসেন রবার্ট জ্যাকসন
বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবী হত্যার ঘটনায় মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকের ঘটনাগুলোর উপর জোর দিয়ে আলবদরের নামে জামায়াতের সম্পৃক্ততার কথা আলোচনা করা হয়। একারণে এই হত্যায্জ্ঞের প্রকৃতি নিরূপণে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট দূরে থাক, আলবদর গঠিত হওয়ার আগেই ২৫ মার্চের ঘটনার নেপথ্যে কী ছিল তাও আমলে নেওয়া হয় না। ফলে স্নায়ুযুদ্ধের চরম মুহূর্তে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মদদে বেছে বেছে হত্যার ঘটনাগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞের যোগসূত্রগুলোও খতিয়ে দেখা হয় না। বরং এ সংক্রান্ত তথ্যগুলো মুক্তিযুদ্ধের পর থেকেই সযতনে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। সর্বশেষ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারেও একই কাজ করা হয়েছে। অথচ একাত্তরের কাছাকাছি সময়ে, আমেরিকার মদদে ইন্দোনেশিয়ায় ১০ লাখেরও বেশি মাওবাদী কমিউনিস্টকে হত্যা করা হয়। নিকারাগুয়া, ব্রাজিল, উরুগুয়েতে সিআইএ তৈরি করে গোপন ঘাতক দল। ভিয়েতনামে ‘ফিনিক্স প্রোগ্রাম’ প্রোগ্রামের মাধ্যমে ১৫ হাজার মার্কিন বিরোধীকে বেছে বেছে হত্যা করা হয়েছে।
চমকে দেওয়ার মত খবর হলো এই সব ঘটনার সঙ্গে জড়িত একজন আমেরিকানের ভূমিকা নিয়ে একাত্তরের ডিসেম্বরের আগেই বাংলাদেশ, ভারত ও রাশিয়ার সংবাদপত্রে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এসব প্রতিবেদনে ভিয়েতনামের মতো বাংলাদেশেও হত্যাযজ্ঞের আশঙ্কা ব্যক্ত করা হয়েছিল, যা মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে সংঘটিতও হয়েছিল। একাত্তরের ২৮ অক্টোবরের স্টেটসম্যান পত্রিকার এক প্রতিবেদনের বরাতে ক্যাপ্টেন এস কে গার্গ লিখেছেন, “‘স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরুতেই সিআইএ পাকিস্তানের পক্ষে তাদের গোয়েন্দা সহযোগিতার কার্যক্রম শুরু করে। প্রথমদিকে গেরিলাবিরোধী তৎপরতায় পাকিস্তান সরকারকে সহযোগিতাতেই সীমাবদ্ধ ছিল তাদের কর্মকাণ্ড। বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের ২৫ মার্চের রাতেই নিকেশ করে দেওয়া হয়েছিল। আর এই নীলনকশাটি ছিল ঢাকার সাবেক ইউএস এইড কর্মকর্তা ‘কসাই’ জ্যাকসনের তৈরি। কাদের মারা হবে তার তালিকাটি তৈরি করেন কর্ণেল তাজ আর তা বাস্তবায়ন করেন ব্রিগেডিয়ার বশীর, কাদের ও হিজাজী। এরা বন্দিদের জেরাও করতেন।”
এর আগে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র সাপ্তাহিক ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এর একাত্তরের ১ আগস্ট সংখ্যায় ‘বাংলাদেশকে ভিয়েতনামে রূপান্তরের ষড়যন্ত্রের’ কথা বলা হয়। ‘ইয়াহিয়াচক্রকে মদত দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক দল ও মার্কিন বিশেষজ্ঞ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, “মার্কিন ষড়যন্ত্রকারীরা কি বাংলাদেশকে ভিয়েতনামে রূপান্তরিত করার ষড়যন্ত্র আঁটিয়াছে? এই অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক প্রশ্নটি আজ সকলের মনকে আলোড়িত করিতেছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গিয়াছে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা ‘জননিরাপত্তামূলক’ কর্মসূচির নামে ঢাকায় পুলিশ ‘বিশেষজ্ঞ’ পাঠাইবার সিদ্ধান্ত নিয়াছে। জননিরাপত্তার নামে এই বিশেষজ্ঞ ও তাহার শিকারি কুকুরের দলের কাজ হইবে, মুক্তিযুদ্ধ দমনের কাজে ইয়াহিয়ার জল্লাদ বাহিনীকে মদত দেওয়া। এই দায়িত্ব দিয়া যে কূটনীতিককে ঢাকায় পাঠানো হইতেছে, এই ধরনের কাজে তাহার নাকি বিশেষ পারদর্শিতা ও পূর্ব অভিজ্ঞতা রহিয়াছে। খবরে প্রকাশ, ইতোপূর্বে এই ব্যক্তি ভিয়েতনামে নিযুক্ত ছিল এবং সেখানেই বিশেষজ্ঞ হিসেবে হাত পাকায়। পাকিস্তানে নিযুক্ত বর্তমান মার্কিন রাষ্ট্রদূত ফারল্যান্ড একজন কুখ্যাত সিআইএ এজেন্ট। একসময় তিনিও কূটনৈতিক কার্য উপলক্ষে ভিয়েতনামে ছিলেন। কাজেই পুলিশ বিশেষজ্ঞ হিসেবে রবার্ট জ্যাকসন রাষ্ট্রদূত ফারল্যান্ডের পুরাতন খেলারই পুনরাবৃত্তি হইতে চলিয়াছে মাত্র।”
মজার ব্যাপার হলো মু্ক্তিযুদ্ধ শেষে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি ‘বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পাটি’ (সিপিবি) হিসেবে সক্রিয় হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধকালীন হত্যাযজ্ঞের জন্য শুধু রাজাকার ও আলবদরদের কথাই বলছে। তারা পাকিস্তান ও আমেরিকার ভূমিকার ব্যাপারে উচ্চকণ্ঠ নয়। এদিকে আওয়ামী লীগের মুখপত্র সাপ্তাহিক ‘জয়বাংলা’র একাত্তরের ১৩ আগস্ট সংখ্যায় বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকেই মার্কিনীদের তৎপরতার ব্যাপারে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, “১৯৬০ সাল থেকেই ঢাকাস্থ মার্কিন কনসাল জেনারেলের সম্প্রসারিত অফিসের নামে শাহবাগ হোটেলের একটি স্যুটে একটি গোপন অফিস ছিল। উক্ত গুপ্ত অফিসের উচ্চপদস্থ অফিসার ফরিদউদ্দিন আহমেদ ১৯৬৪ সালের দিকে আকস্মিকভাবে চাকরি ছেড়ে দেন। তিনিই প্রথম প্রকাশ করেন যে, কতিপয় মার্কিন অফিসার সমস্ত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছেন। বাংলাদেশের প্রত্যেকটি নেতা, গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মী, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও অন্যান্য ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের আলোকচিত্র, জীবনী ও কর্মতৎপরতা সম্পর্কে রিপোর্ট সংগ্রহ করে গোপন কক্ষে রাখা হয়।” “শাহবাগ হোটেলে গুপ্তচরবৃত্তির কাহিনি বিভিন্ন মহলে ছড়িয়ে পড়ার পর মতিঝিলস্থ আদমজী কোর্টে অবস্থিত কনস্যুলেট অফিসে গুপ্ত অফিসটি সরিয়ে নেওয়া হয়।”
জয়বাংলার প্রতিবেদনটিতে দাবি করা হয়েছিল, ওই কনস্যুলেট অফিসের মাধ্যমে চক্রান্তমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন রবার্ট জ্যাকসন। তাকে ইউএসএইড-এর পুলিশনীতি বিশেষজ্ঞ হিসেবে ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল। তিনি আইয়ুব খানের পুলিশের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করতেন। আওয়ামী লীগের মুখপত্রে জ্যাকসনকে, ‘বাংলাদেশে গণহত্যার সঙ্গে বিশেষভাবে জড়িত এবং বাছাই করা ব্যক্তিদের হত্যার পরিকল্পনাকারী’ আখ্যা দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, “বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশে নানা সাহায্য সংস্থা ও সেবা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এভাবে বিশেষজ্ঞদের আচ্ছাদনে গুপ্তচর ও হত্যার পরিকল্পনাকারীরা প্রবেশ করে। রবার্ট জ্যাকসন সে ধরনের একজন ক্রীড়ানক। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সাধারণ মানুষের রক্তে যার হস্ত রঞ্জিত, সেই জ্যাকসনই বাংলাদেশে নির্বাচিত হত্যার তালিকা প্রস্তুত করে সেনাপতিদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন।”
প্রতিবেদনে বলা হয়, “একটি বিদেশি পত্রিকা গণহত্যা বিশেষজ্ঞ জ্যাকসনের ঢাকা অবস্থানকালে যে বিভীষিকাময় কার্যক্রমের সঙ্গে লিপ্ত ছিলেন তা উদঘাটন করেছে। পত্রিকাটিতে বলা হয়েছে: ‘পরিস্থিতি আয়ত্তের বাইরে চলে গেলে যাদের হত্যা করা হবে তার একটি দীর্ঘ তালিকা তিনি প্রস্তুত করেন। জ্যাকসন আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কর্মতৎপরতা সম্পর্কে ইসলামাবাদকে উপদেশ দিতেন। এই ব্যক্তির পরিকল্পনা উত্তমরূপে কার্যকর হয়। ২৫ মার্চ গণহত্যা আরম্ভ করার সময় পশ্চিম পাকিস্তানি বাহিনী তারই তালিকা বেছে বেছে বিশেষ বিশেষ শ্রেণির ব্যক্তিদের হত্যায় লিপ্ত হয়।”
তিনজন সহকারী নিয়ে ঢাকায় কর্মরত জ্যাকসন সম্পর্কে পত্রিকাটি বলা হয়, “এই জল্লাদ জ্যাকই দক্ষিণ ভিয়েতনাম ও ব্রাজিল সরকারকে হত্যা ও ধ্বংসের পরিকল্পনা করে দেন। উক্ত দুটি দেশে জ্যাকসন পরিকল্পিত সংস্থা নরহত্যা ও ধ্বংস দীর্ঘদিন অব্যাহত রাখে।” জয়বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়, “হত্যার সহায়ক ও গণহত্যায় পরিকল্পনাকারী এই কুখ্যাত ব্যক্তিটি দক্ষিণ ভিয়েতনামে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড অব্যহত রাখার উদ্দেশ্যে ‘অপারেশন ফিনিক্স’ নামক একটি মানবতাবিরোধী প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেন।” “সমস্ত বিপ্লবী ঘাঁটি ধ্বংস এবং মুক্তিফ্রন্টের সঙ্গে সম্পর্কিত সকল ব্যক্তিকে হত্যাই ছিল জ্যাকসনের ‘ফিনিক্স অপারেশনের’ মূল লক্ষ্য। একসময় মার্কিন সিনেট সাব-কমিটির জনৈক সদস্য ভিয়েতনাম সফর করে এসে বলেছিলেন যে, উক্ত অপারেশন ফিনিক্স কার্যকরী করে পনের হাজার সায়গন সরকারবিরোধী রাজনৈতিক নেতাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং অনেককে নিক্ষেপ করা হয়েছে ‘কনসেনট্রেশন’ ক্যাম্পে।”
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, “জ্যাকসন– ব্রাজিলে পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর লোক নিয়ে একটি আধাসামরিক সংস্থা গঠন করেন। উক্ত দেশে পরিকল্পিত হত্যানুষ্ঠানের জন্য দায়ী এই সংস্থাটির নাম ‘ডোপস’। জ্যাকসন প্রতিষ্ঠিত ডোপস, রাতের অন্ধকারে রাজনৈতিক বিরোধীদের নৃশংসভাবে হত্যার অভিযান চালাত। ভাড়াটিয়া হত্যাকারী জ্যাক ব্রাজিলের কর্তৃপক্ষকেও হত্যার জন্য একটি দীর্ঘ তালিকা প্রস্তুত করে দিয়েছিলেন।” ২৫ মার্চের গণহত্যার পর রবার্ট জ্যাকসন ঢাকা ছাড়েন। পরে আগস্টে তিনি আবার ফিরে আসেন বলে একাত্তরের ৭ আগস্ট লন্ডনের ‘অবজারভার’ পত্রিকা তাদের মস্কো প্রতিনিধির বরাতে জানায়। ঢাকায় জ্যাকসনের উপস্থিতি নিয়ে ‘সোভিয়েত রাশিয়া উদ্বিগ্ন’ জানিয়ে প্রতিবেদনটিতে জ্যাকসনকে ‘বিদ্রোহ দমন বিশেষজ্ঞ’ বলে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, জ্যাকসনকে ঢাকায় পাঠানোর মাধ্যমে পূর্ব বাংলার দ্বন্দ্বকে ওয়াশিংটন ‘ভিয়েতনামিকরণ’ করছে বলে মনে করছে মস্কো।
বুদ্ধিজীবীর হত্যাকাণ্ড নিয়ে জহির রায়হানের ভাষ্য
বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড নিয়ে সরকারিভাবে কোনো তদন্ত হয়নি। ১৯৭১ সালের ৩১ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ একটি তদন্ত কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু তার সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি। তবে সরকারিভাবে না হলেও বেসরকারি পর্যায়ে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড তদন্তে একটি কমিটি গঠিত হয়েছিল। জহির রায়হানের উদ্যোগে গঠিত কমিটির নাম ছিল ‘বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড তথ্যানুসন্ধান কমিটি’। জহির রায়হান নিজেই ছিলেন এই কমিটির আহবায়ক। কমিটিতে আরও ছিলেন সৈয়দ হাসান ইমাম, এহতেশাম হায়দার চৌধুরী, ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলাম, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, এনায়েতুল্লাহ খান, ডঃ সিরাজুল ইসলাম, বাশরাত আলী, ড. আলাউদ্দিন আল আজাদ প্রমুখ। অবশ্য পরবর্তীতে ড. আজাদ কমিটি থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নেন। ২২ ডিসেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবে একটি অস্থায়ী অফিসে কমিটির কাজ শুরু হয়। সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে এ বিষয়ে তথ্যাবলী চেয়ে গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেয়া হলে প্রচুর সাড়া পাওয়া যায়। বুদ্ধিজীবীদের কাছে ঘাতকদের সবুজ কালিতে স্বাক্ষরিত চিঠির কপি, বদর বাহিনীর কমান্ডারের ডায়েরি, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য এ ধরনের প্রচুর তথ্য জমা হতে থাকে।
১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নিয়ে ভারতের সাপ্তাহিক ‘দ্য নিউ এইজ’ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে জহির রায়হানের বক্তব্য তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, “গণহত্যা তদন্ত কমিটির সভাপতি চলচ্চিত্র প্রযোজক জনাব জহির রায়হান আমাদের জানিয়েছেন, আল বদরদের কার্যকলাপ অনুসন্ধান করতে যেয়ে আমরা এক সাথেই অপরাধীদের প্রকৃত উদ্দেশ্য বুঝবার জন্য নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজছি। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে যখন নিহত বাবা ও ভাইয়ের দেহের অবশেষ ঢাকার বধ্যভূমিতে খুঁজে ফিরছি তখন আমাদের ধারণা ছিল যে দখলদার পাকিস্তানী শাসকদের নিশ্চিত পরাজয় উপলব্ধি করে পশুরা ক্রোধান্ধ হয়ে কাপুরুষিত হত্যাকান্ডের মাধ্যমে প্রতিহিংসাবৃত্তি চরিতার্থ করেছে। কিন্তু পরে বুঝেছি ঘটনা তা ছিল না। কেননা এই হত্যাকান্ডের শিকার যারা হয়েছেন তারা বাঙ্গালী বুদ্ধিজীবীদের প্রতিনিধি। স্থানীয় এবং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মনোভাবের জন্য সুপরিচিত ছিলেন। আল বদর বাহিনীর লোকদের কাছে সব লেখক ও অধ্যাপকই এক রকম ছিলেন। জহির রায়হান বলেছিলেন এরা নির্ভূলভাবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রমনা বুদ্ধিজীবীদের বাছাই করে আঘাত হেনেছে।”
এদিকে ওই জানুয়ারি মাসেই জহির রায়হান নিখোঁজ হয়ে যান। ৩০ জানুয়ারি তিনি মিরপুর ক্যান্টনমেন্টে উদ্দেশ্যে রওনা করার পর থেকে নিখোঁজ হয়ে যান। ওই দিন জহিরের কাছে খবর এসেছিল তার ভাই শহীদুল্লাহ কায়সার মারা যাননি, তিনি মিরপুর ক্যান্টনমেন্টে আছেন। শহীদুল্লাহর খবর জেনে তাকে উদ্ধার করতে গিয়েই জহির নিখোঁজ হয়ে যান। প্রসঙ্গতঃ ১৬ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাক বাহিনী আত্মসমপর্ণ করার পর থেকে ঢাকার সকল পাকিস্তানি সেনা, সামরিক স্থাপনা ও বিহারী জনগোষ্ঠী ভারতীয় সেনাবাহিনীর হেফাজতে ছিল।
বুদ্ধিজীবীদের খুনি ১০ পাক সেনাকে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়
একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করার পরপরই বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ১০জনকে ভারত নিয়ে যাওয়া হয়। এই ১০জনের মধ্যে ক্যাপ্টেন থেকে শুরু করে জেনারেল পদ মর্যাদার পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তারা ছিলেন। তাদের ঢাকা থেকে বিমান যোগে কোলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তীতে ত্রিদেশীয় চুক্তির মাধ্যমে তাদের পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। ব্রিটেনের সাবেক মন্ত্রী জন স্টোন হাউজ ১৯৭১ সালের ২১ ডিসেম্বর আকাশবাণীর কোলকাতা কেন্দ্রে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বুদ্ধিজীবী হত্যায় জড়িত ১০ পাক সেনার কথা বলেন। সাক্ষাৎকারে জন স্টোন হাউজ বলেন, “বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের ব্যাপারে পাকিস্তানী সৈন্যরাই যে জড়িত এ ব্যাপারে আমার কাছে প্রমাণ আছে।” তিনি জানান, “ভারত কর্তৃপক্ষ বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত ক্যাপ্টেন থেকে শুরু করে জেনারেল পদ মর্যাদার দশ জন পাকিস্তানী অফিসারকে বিমানযোগে কোলকাতায় নিয়ে গিয়েছিল।”
মার্কিন গোপন দলিলে বুদ্ধিজীবী হত্যা
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের অবমুক্ত করা গোপন দলিলপত্রে একাত্তরের ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী হত্যা সম্পর্কে জানানো হয়েছে ভারতীয়দের কাছে পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের শর্ত যাতে ‘ন্যায্য’ হয়, সেটা নিশ্চিত করতে প্রায় ৩০০ বুদ্ধিজীবীকে জিম্মি করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ঢাকার তৎকালীন মার্কিন কনসাল হার্বাট ডি স্পিভাক ১৯৭১ সালের ১৮ ডিসেম্বর ঢাকা ৫৬৯৬ ক্রমিকের অপর এক তারবার্তায় লিখেছেন, “আত্মসমর্পণের শর্ত যাতে ন্যায্য হয়, সেটা নিশ্চিত করতে পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর স্থানীয় সমর্থক ও রাজাকাররা প্রায় ৩০০ বুদ্ধিজীবীকে ‘জিম্মি’ করেছিল। আত্মসমর্পণের দুই দিন আগে অনেককে হত্যা করা হয়। স্থানীয় লোকজন বলছেন, ইটখোলা এলাকায় অনেককে ধরে এনে হত্যা করা হয়। কথিতমতে, রাজাকাররা এখনো ইটখোলা দখলে রেখেছেন।”
এদিকে ১৯৭২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি আরেক তারবার্তায় স্পিভাক লিখেছেন, “যুদ্ধ শেষ হওয়ার দিকে ২০০ থেকে ৩০০ বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়। অন্যান্য শহর থেকেও এ রকম খবর পাওয়া যাচ্ছে, তবে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। এ তালিকার সবাই বাঙালি। কিন্তু সাধারণভাবে তারা রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় ছিলেন। তাদের মৃত্যুর প্রেক্ষাপট সম্পর্কে আমরা বিস্তারিত জানাতে অপরাগ। তবে তাদের অধিকাংশকে ১১ থেকে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যবর্তী সময়ে তাদের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।”
১৮ ডিসেম্বরের বার্তায় বুদ্ধিজীবীদের জিম্মি করার ঘটনায় ‘পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর স্থানীয় সমর্থক ও রাজাকার’দের কথা বলা হলেও ২ ফেব্রুয়ারির বার্তায় স্পিভাক জানান বুদ্ধিজীবীদের কারা গ্রেপ্তার করেছিল। স্পিভাক বলেন, “সশস্ত্র ব্যক্তিরা। এদের সঙ্গে উর্দিধারী সশস্ত্র সৈনিকেরা ছিলেন।” স্পিভাকের এই বার্তা থেকে স্পষ্ট যে, বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় পাকিস্তানী সেনা বাহিনীও জড়িত ছিল। তবে তারবার্তায় স্পিভাক নির্দিষ্টভাবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরকে জানান, “জামায়াতের দুর্বৃত্তরাই’ বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে।” এ-সংক্রান্ত বাক্যে স্পিভাক ‘জামায়াত থাগস’ বা ‘জামায়াতের দুর্বৃত্ত’ শব্দ ব্যবহার করেন।
বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় ‘উর্দিধারী সশস্ত্র সৈনিক’ উপস্থিত ছিল বলার পরেও শুধু ‘জামায়াতি দুর্বৃত্তদের’ কথা বলেন স্পিভাক। এদিকে স্পিভাক তারবার্তা থেকে জানা যায় ধরে নিয়ে যাওয়া কিছু বুদ্ধিজীবী ১১-১৬ ডিসেম্বরে নিহত হননি। তাদের আটক রাখা হয়েছিল। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানী বাহিনীর আত্মসমর্পণের প্রায় দেড় মাস পর তাদের হত্যা করা হয়েছিল। স্পিভাক লেখেন, “মার্কিন তথ্যকেন্দ্র ইউসিস-এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রিপোর্ট করেছেন যে, বেশ কিছু নিখোঁজ বুদ্ধিজীবীকে মোহাম্মদপুর-বিহারি শিবিরে আটকে রাখা হয়েছিল। ২৮ জানুয়ারির (১৯৭২) সাম্প্রতিক সংঘর্ষকালে তাদের হত্যা করা হয়।”
তারবার্তায় দেখা যায়, বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধকালীন হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের বিষয়ে সংবাদপত্রে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল, যার ব্যাপারে স্পিভাক উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। স্পিভাক বলেন, “ঢাকার প্রেস অব্যাহতভাবে নতুন নৃশংসতার খবর ছাপছে। ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি কুমিল্লা সেনানিবাসে গণকবর পাওয়া গেছে। তবে এটা খুবই বিরক্তিকর যে, কিছু সংবাদপত্র হত্যাকাণ্ডের নায়কদের প্রতি মার্কিন সমর্থনের অভিযোগ করেই চলেছে।” আমেরিকার সম্পৃক্ততা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে অভিযোগের বিষয়ে স্পিভাক ঢাকা ৩২৮ ক্রমিকে আরেকটি তারবার্তা পাঠিয়েছিলেন। তবে ওই বার্তাটি পাওয়া যায়নি।
সোর্সঃ অনলাইন বাংলা প্রতিবেদন, পাকিস্তান-আমেরিকার দায়মুক্তি প্রকাশিত: ১৪ ডিসেম্বর ২০১৫





