Nure Alam Masud

ইসলাম প্রশ্নে সমকালীন সমস্যার উপর আলোকপাত-২

(প্রথম পর্ব)

ধর্মীয় রিসার্চ সেন্টারের গুরুত্ব

 

পূর্ণাঙ্গ ধর্মীয় রিসার্চ সেন্টার না থাকার ফলে একদিকে যেমন ধর্মীয় দল / মতগুলোর সংশোধনউন্নয়ন ঘটছে না, অপরদিকে তেমনি বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত মুসলমানেরা ঐক্যবদ্ধও হতে পারছে না। মুসলিম সমাজ হলো জ্ঞানভিত্তিক সমাজ। এখানে গোত্র প্রথা নেই যে বিভিন্ন গ্রুপ আলাদা আলাদা গোত্র হিসেবে নিজেদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে। আদর্শ মুসলিম উম্মাহ গোটা বিশ্বব্যাপী একই মূলনীতিতে চলবে, এবং তাদের মধ্যে পরস্পরবিরোধিতা থাকবে না। এটা নিশ্চিত করতে হলে ধর্মীয় রিসার্চ সেন্টারের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। পূর্ণাঙ্গ ধর্মীয় রিসার্চ সেন্টার থাকলে সেখানে নিয়মিত জ্ঞান চর্চার মাধ্যমে প্রতিটি গ্রুপই যেমন নিজেদের ভুলত্রুটির সংশোধন করতে পারবে, অপরদিকে তেমনি সকল গ্রুপের সর্বোচ্চ জ্ঞানী ব্যক্তিরা রিসার্চ সেন্টারে একত্রিত হয়ে পরস্পর জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে ঐক্যের দিকে পৌঁছাতে পারবে। অতঃপর এই রিসার্চ সেন্টার থেকে যেসকল দিকনির্দেশনা আসবে, মুসলিম জনগণ সেটা মেনে চলবে। রাসূলের (সা.) অনুপস্থিতিতে আলেম সমাজের কর্মকাণ্ড এভাবেই পরিচালনা করা প্রয়োজন। কিন্তু তা না করে যদি প্রতিটি গ্রুপ তাদের নিজস্ব মতবাদ/মতামত নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে, পরস্পরের সাথে জ্ঞানবিনিময় না করে, এবং নিজেদের চিন্তাধারাকে শতভাগ সঠিক বলে ধরে নিয়ে প্রচারপ্রসার করতে থাকেতাহলে যা ঘটবে তা হলো, সময়ের সাথে সাথে গ্রুপগুলো আকারেই কেবল বাড়বে, কিন্তু তাদের ভুলভ্রান্তিগুলো রয়েই যাবে, এবং বিভিন্ন গ্রুপের মাঝে দ্বন্দ্বসংঘাতেরও কখনো নিরসন হবে না।
মুসলিম মিল্লাত কিভাবে ঐক্যবদ্ধ হবে, যখন তাদের নেতারা (আলেম সমাজ) ঐক্যবদ্ধ নন? আর আলেম সমাজের এই ঐক্য হতে হবে জ্ঞানগত ঐক্য। সেজন্যে একটি মুসলিম ভুখণ্ডের সকল আলেমকে এক প্ল্যাটফর্মে আসতে হবে। একই প্ল্যাটফর্মে এসে পরস্পর জ্ঞানবিনিময় করতে হবে। অতঃপর নিজেদের ভুলগুলো সংস্কার করতে হবে, সংশোধনউন্নয়ন করতে হবে। আর এটাকেই আমি বলছি কমপ্লিট রিলিজিয়াস রিসার্চ সেন্টার। এধরণের রিলিজিয়াস রিসার্চ সেন্টারই হবে সকল ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের উৎস। ধর্মীয় নেতৃত্বও এখান থেকেই আসতে হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের মুসলিম সমাজে জ্ঞান অর্জনের চেয়ে ধর্মীয় কর্মকাণ্ড করার উপরই জোর দেয়া হয় বেশি। অথচ ইলম (knowledge) বিহীন আমল (practice) কোনোই গুরুত্ব বহন করে না। আর ইলম ছাড়া যারা আমল করতে যায়, স্বাভাবিকভাবেই তারা ভুল আমল করবে। যদি এমন হতো যে, প্রতিটা ইসলামী দল / মতেরই নেতৃত্ব একটি রিসার্চ সেন্টারে নিয়মিত একত্রিত হন, তাহলে আমরা কারো মাঝে ভুল দেখলে সেটা ঐখানে গিয়ে পেশ করতে পারতাম। কিন্তু ইসলামের নামে তৈরী হওয়া বিভিন্ন দল / গ্রুপগুলোর নেতারা নিজেদের অনুসারীদের কাছ থেকেই এজাতীয় কথা গ্রহণ করে না, আর অন্য গ্রুপের কাছ থেকে নিজের ভুল শোনার তো প্রশ্নই আসে না। অতএব, সংশোধন ও ঐক্য আসবে কিভাবে? প্রতিটা গ্রুপই নিজেদের কলেবর বৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত, অথচ ঐক্যের দিকে কারোরই নজর নেই। মুসলিম সমাজের এই জ্ঞানগত ঐক্যের জন্য জ্ঞানকেন্দ্র, অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গ ধর্মীয় রিসার্চ সেন্টার অপরিহার্য।
এখন, ইসলাম নিয়ে জ্ঞান অর্জনের পূর্বশর্ত যে জ্ঞানতত্ত্বের (Epistemology) পড়াশুনা, তা আলেমসমাজকে কিভাবে বুঝানো সম্ভব? “আলেমসমাজ” বলেইতো আসলে কিছু নেই। কোনো ইস্যুতে আলেমসমাজের কাছে গিয়েছিলামকথাটাই বলা সম্ভব নয়, বরং বলা যেতে পারে যে, ওমুক হুজুর আর ঐ হুজুরের শত্রুর কাছে গিয়েছিলাম ইস্যুটা নিয়ে। আমাদের বাস্তবতাটা এতই করুণ! মুসলিম সমাজে যদি কোনো পাপ কাজের প্রচলন দেখি, তবে সমাধানের জন্য কার কাছে যাবো? আলেমসমাজ বলে তো কোনো ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্মই নেই! অতএব, যারা ইসলাম নিয়ে স্বাধীন জ্ঞানচর্চা করছে ও বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করছে, তারা অসহায়ের মত আশেপাশের দুয়েকজন মানুষকে বিচ্ছিন্নভাবে সতর্কসংশোধনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, গোড়ায় গিয়ে যে সমাধান করবেসেই গোড়ায় (আলেমসমাজের কাছে) যেতে পারছে না। আর বিভিন্ন নেতৃত্বের কাছে গেলেও, রিসার্চারের ন্যায় মনোভাব না থাকায় তারা নিজেদের ভুল স্বীকার করতে কিংবা অন্য কোনো চিন্তা সম্পর্কে স্টাডি করতেও রাজী হন না।
ইসলামের নামে সমাজে নানান ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড চলছে। এগুলো নেতাবিহীন নয়; অবশ্যই ইসলামের নামে এসব কর্মকাণ্ড বিভিন্ন নেতৃত্বের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। ইসলামবিরোধী এসব কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হলে ও সঠিক ইসলামের প্রচার করতে হলে সেইসব ধর্মীয় নেতৃত্বের সংশোধন প্রয়োজন। সেই নেতাদের সংশোধনের জন্য, সকল ধর্মীয় নেতৃত্বকে একই প্ল্যাটফর্মে আনার জন্য, ঐক্য সৃষ্টির জন্য ও সংস্কারউন্নয়নের জন্য কমপ্লিট রিলিজিয়াস রিসার্চ সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন, যেখানে সকল ধর্মীয় নেতৃত্বের মতবিনিময়, জ্ঞানবিনিময় ও সাহায্যসহযোগীতা, সংস্কারউন্নয়ন ইত্যাদি ঘটবে। অতঃপর বিভিন্ন দেশের রিসার্চ সেন্টারগুলোর মাঝে বড় পরিসরে জ্ঞানবিনিময় হলে বৃহত্তর মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে, এবং এইরূপ জ্ঞানগত ঐক্যের মাধ্যমেই গোটা দুনিয়ার মুসলিম উম্মাহর একই পতাকাতলে আসা সম্ভব হবে।
রিলিজিয়াস রিসার্চ সেন্টার না থাকার ফলে দেখা যায় যে, কোনো ব্যক্তি আজীবন ইসলামের সংকীর্ণ একটি গণ্ডিতেই জ্ঞানচর্চা চালিয়ে গিয়েছে। অথচ হয়তো সে যে ধারায় পড়াশুনা করেছে, তার ভিত্তিই ভুল ছিলো! কিংবা সে সঠিক পদ্ধতিে জ্ঞান অর্জন করে নাই। শুধু ইসলামের বিভিন্ন ধারা নয়, অন্যান্য ধর্মতুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব, দর্শন, যুক্তিশাস্ত্র ইত্যাদি সকল প্রাসঙ্গিক স্টাডি টপিকের সম্পর্কে মানুষ জানতে পারবে রিসার্চ সেন্টারের কাছে এসেই। শুধু একটি ধারায় জ্ঞানচর্চার যে সমস্যা, তা রিসার্চ সেন্টার ব্যতিরেকে দূর করা সম্ভব নয়। আমাদের দেশে বিভিন্ন গ্রুপ নিজেদের ধারার বইপত্রই পড়ে থাকে, এমনকি বিরোধিতা করার উদ্দেশ্যেও অন্য ধারার বইপত্র পড়ে না। ফলস্বরূপ সীমাবদ্ধ গণ্ডিতে থাকার কারণে ভুলভ্রান্তির সংশোধন ঘটে না, অন্যান্য ধারা থেকে সঠিক জিনিসটাও গ্রহণ করা হয়ে ওঠে না। সকল ধরণের জ্ঞানগত বাধা (barrier) অতিক্রমকারী পূর্ণাঙ্গ ধর্মতত্ত্বকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা তাই খুবই জরুরি।

দ্বীনি নেতৃত্বের ন্যুনতম যোগ্যতা

দ্বীনি নেতৃত্বের জন্য ন্যুনতম যোগ্যতার শর্ত রয়েছে। সেই শর্ত যদি পূরণ না হয়, তাহলে কোটি কোটি মুসলমানের মাঝে যতজনই নেতা সেজে বসুক না কেনো, তারা কেউই প্রকৃত ইসলামী নেতৃত্ব নয়, এবং তাদের কারো আনুগত্য করাই বাধ্যতামূলক নয়, বরং ক্ষেত্রবিশেষে তাদের বিরোধিতা করা ফরজ হয়ে পড়ে।
এখন, ইসলামের নামে পরস্পরবিরোধী প্রতিটা দল / মতেরই ধর্মীয় নেতৃত্ব আছে। একজন সাধারণ মানুষ কিভাবে সত্যিকার দ্বীনি নেতৃত্বকে শনাক্ত করবেযখন প্রতিটা গ্রুপই নিজেদেরকে সঠিক বলে দাবী করছে, তখন তাদের যেকারো আনুগত্য করার আগে যাচাই বাছাই করতে হবে। এই যাচাইবাছাইয়ের মানদণ্ড কী? এইযে ইসলামের নামে বিভিন্ন দল / মতের অসংখ্য অনুসারী রয়েছে, এবং দিনদিন তারা কলেবরে বেড়েই চলেছে, নিশ্চয়ই তারা কোনো না কোনো মানদণ্ডের ভিত্তিতে তা করছে, ঐ নেতৃত্বকে মেনে নিচ্ছে। নিশ্চয়ই তাদের মানদণ্ড এক নয়। যদি প্রতিটা মানুষই, তা সে ইসলামের যে স্তরেই থাকুক না কেনো, প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে ঐ স্তর পর্যন্ত সকল স্তরের কমপ্লিট আন্ডারস্ট্যান্ডিং নিয়ে অগ্রসর হতো, তাহলে তাদের সকলের মানদণ্ড একই হতো, এবং তারা পরস্পরবিরোধী ধর্মীয় নেতৃত্বের অনুগামী না হয়ে একই ধর্মীয় নেতার আনুগত্য করতো। কিন্তু ইসলামের partial understanding নিয়ে অগ্রসর হওয়া মানুষেরা বিভিন্ন মানদণ্ডের ভিত্তিতে নেতৃত্ব পছন্দ করে নিচ্ছে, যদিও তারা জানে না যে, সেটাই প্রকৃত মানদণ্ড কিনা। যেমন, কারো কাছে হলো সেই গ্রুপই সঠিক, যারা সমাজে ইসলাম কায়েমের কথা বলে, রাষ্ট্রে ইসলাম কায়েমের কথা বলে। তখন সে এই মানদণ্ডের ভিত্তিতে কোনো দলে গিয়ে ভিড়ছে। আবার, কারো কাছে হয়তো তারাই সঠিক, যারা ব্যক্তিজীবনে ইসলাম কায়েমের কথা বলে। তখন সে ঐ গ্রুপের সাথে চলছে। কেউবা আবার মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে জিহাদ কিংবা কিতালকে, অর্থাৎ যেই গ্রুপ কাফিরদের বিরুদ্ধে জিহাদ ও কিতালের কথা বলবে, তাদেরকেই সে অনুসরণ করবে। এইভাবে ইসলামের partial understanding নিয়ে অগ্রসর হওয়া মানুষেরা বিভিন্ন অনুপযুক্ত/অসম্পূর্ণ মানদণ্ডের ভিত্তিতে নেতৃত্ব পছন্দ করে নিচ্ছে।
ইসলামের প্রকৃত দ্বীনি নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য কী? ইলম (জ্ঞান), আদালত (ভারসাম্য) ও দূরদৃষ্টি। এই তিনটিই কি শর্ত, নাকি আরো বেশি, নাকি আরো কম? এ নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন, রিসার্চ প্রয়োজন। উন্মুক্ত মানসিকতা নিয়ে অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন। পরস্পর জ্ঞানবিনিময়ের মাধ্যমে আলেমগণের ঐকমত্যে আসা প্রয়োজন। অতঃপর তারা নিজেরাই সে মানদণ্ড অনুযায়ী দ্বীনি নেতৃত্ব নির্বাচন করবেন, এবং সকলেই সেটা মেনে নেবে।
একজন ধর্মীয় নেতা যদি এমনসব ভুল কাজ করেন, যা সাধারণ মুসলমানের দৃষ্টিতেই অন্যায়, তখন কি তিনি আর নেতৃত্বের যোগ্য থাকেন? দ্বীনি নেতৃত্বকে যদি মানুষ দেখে কথা ও কাজের মিল নেই, তিনি দুনিয়াবী লাভের পিছনে ছুটছেন, তখন তার উপর আস্থা কি আর থাকবে? আল্লাহর রাসূলের (সা.)অনুপস্থিতিতে কে বা কারা তাঁর স্থলাভিষিক্ত হবেন? ইত্যাদি বহু বিষয় রয়েছে, যা আলাদা আলোচনার টপিক।
পরবর্তী পর্বগুলোয় আলোচিত বিষয়সমূহ:
  • কুরআনের সংকীর্ণ ব্যাখ্যা, ইসলামের সংকীর্ণ / পার্শিয়াল রেপ্রিজেন্টেশান
  • বিদ্বেষ/ বিরোধিতাপ্রসূত জ্ঞান অর্জনের সমস্যা : anti-ism
  • ধর্মপ্রচারে দল পদ্ধতির সমস্যা : introduction of new concept
  • বাংলাদেশের বৃহত্তম ইসলামী দল
  • সেক্যুলার গণতান্ত্রিক পন্থায় ইসলাম কায়েম প্রসঙ্গে
  • প্রতিবাদ করার কি কেউ নেই?
  • পরিশিষ্ট – ১ : ধর্মতত্ত্বের কিছু মৌলিক আলোচ্য বিষয়
  • পরিশিষ্ট – ২ : Levels of guidance

2 Responses

  1. ABUSAIF
    ABUSAIF at |

    আসসালাম.. বারাকাতুহ
    পড়তে আছি, চলতে থাকুক

    জাযাকাল্লাহ

    Reply
  2. Nure Alam Masud
    Nure Alam Masud at |

    সালাম।
    ধন্যবাদ…। বাকি পর্বগুলো শীঘ্রই দেব আশা করি।

    Reply

Leave a Reply