সেক্যুলার গণতান্ত্রিক পন্থায় ইসলাম কায়েম প্রসঙ্গে
সেক্যুলার ডেমোক্রেসির ইতিহাস খুবই নতুন, মাত্র চারশো বছরের। ওয়েস্টফালিয়া ট্রিটির মাধ্যমে ধর্ম ও রাষ্ট্রকে পৃথক করার কাজ শুরু হয়েছিলো, এবং এরপর যখন পশ্চিমারা ও ইউরোপিয়ানরা বিশ্বে আধিপত্যশীল হয়ে গেলো, তখন ইসলামপন্থীরা তাদের কাউন্টার করার জন্য তাদেরই পন্থা গ্রহণ করলো। তারাও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল গঠন করলো, যার মাধ্যমে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে সংসদের যাবার চেষ্টা করা হলো। অথচ দ্বীন হিসেবে ইসলামের পরিপূর্ণতার উপর যারা আস্থাশীল, তারা না দ্বীনের প্রচারের জন্য দল কনসেপ্টকে গ্রহণ করবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা.) তা করেননি, আর না তারা রাষ্ট্রে ইসলাম কায়েমের জন্য দলের মাধ্যমে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা.) তা করেননি। এমনকি যদি এসব কাজে সাময়িক ভালো ফলাফল দেখা যায়ও, তবুও দ্বীন ইসলামের পরিপূর্ণতার উপর আস্থাশীল ব্যক্তি এই যুক্তিতে এসব কাজকে পরিহার করবে যে, নবী কর্তৃক বাস্তবায়িত ইসলামের কর্মপন্থা সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত, আর আল্লাহর জ্ঞানকে অতিক্রম করে নতুন কোনো কনসেপ্ট ব্যবহার করে তাঁরই ধর্ম ইসলামের কাজ করাটা বড় ধরণের ধৃষ্টতা ও বোকামি।
আর সেই কাজ করতে গিয়ে প্রতিটা ইসলামী দলের ইতিহাসেই অনেক সুস্পষ্ট ভুল হয়েছে, এখনও হচ্ছে, এবং নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, ভবিষ্যতেও হবে। বেশ ক’মাস আগে দেখলাম রনি এমপি জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে একটা আর্টিকেল লিখেছে (২রা জানুয়ারি, সম্ভবতঃ বাংলাদেশ প্রতিদিনে)। প্রথম থেকেই রনি এমপি জামাতের নেতাদের সাথে জেলে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে আবেগী লেখা লিখে জামায়াত-শিবিরের মাঝে নিজের গ্রহণযোগ্যতা তৈরীর অপচেষ্টা চালিয়ে আসছিলো। এরপর যখন জামায়াত-শিবিরের ছেলেরা নিজেরাই তাকে নিজেদের মাঝে একটা প্ল্যাটফর্মে তুলে দিলো, তখন সে final blow দিলো। রাজনীতির স্বার্থেই রনি এমপির বিরোধিতা তারা করেনি, যখন সে পক্ষে লিখেছে। অথচ জামায়াত নেতাদের প্রশংসা করে লেখা রনি এমপির প্রথম আর্টিকেল পাবলিশ হবার পরে একজন প্রকৃত ধর্মীয় নেতৃত্ব হলে জনগণকে সচেতন করে দিতেন যে, দেখো, এই লোক ধুরন্ধর, সে তোমাদর মাঝে গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে, সে কিন্তু আসলে আমাদের পক্ষের লোক নয়।
কিন্তু রাজনীতির কারণেই সেই কাজ করতে পারেনি। শফিক রেহমানের কথাই বলি। এই লোকটি ইসলামের বড় ধরণের শত্রু, বাংলাদেশে বহু আগে থেকেই সে পশ্চিমা নোংরা সংস্কৃতির importer। কিন্তু সে বিএনপি-জামায়াত জোটের রাজনৈতিক বিবেচনায় বন্ধু। এখন জামায়াত-শিবির “ইসলামী” দল হলেও শফিক রেহমানের মত লোকের গ্রহণযোগ্যতা তাদের মাঝে তৈরী হয়ে গেলো; ধর্মীয় কারণে নয়, রাজনৈতিক কারণে। একারণেই জামায়াত শিবিরের কোনো নেতাই কখনো শফিক রেহমানের ব্যাপারে জনগণকে সচেতন করেনি যে, এই লোকটি নোংরা অপসংস্কৃতির importer, এর ব্যাপারে সাবধান থাকুন। অথচ শফিক রেহমানের import করা এসব অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে তখন তারা কিছু করতেও পারবে না, যখন ২০ দলীয় জোট ক্ষমতায় যাবে, আর শফিক রেহমান থাকবেন খালেদা জিয়ার অন্যতম উপদেষ্টা।
সেক্যুলার ডেমোক্রেসিতে রাজনীতির স্বার্থে অনেক কিছুই করতে হয়। ইসলামে ধর্ম ও রাজনীতি পৃথক নয়, জামায়াত-শিবিরই সেটা বলে থাকে, কিন্তু (সেক্যুলার) “রাজনীতির স্বার্থে” ইসলাম বিসর্জন দেয়াটাও ইসলামে নেই।
একবার দেখলাম হরতালে, সেটা সম্ভবত কোনো যুদ্ধাপরাধ মামলার রায়ের প্রতিক্রিয়ার হরতাল, সেই হরতালে অ্যামেরিকান এম্ব্যাসির গাড়ি ভাংচুর হলো। সাথে সাথে জামায়াতের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করে বিবৃতি দেয়া হলো। সেক্যুলার রাজনীতির ময়দানে নামলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রভু মানতেই হবে, তাদের গাড়ি ভাঙলে দুঃখ প্রকাশ করতেই হবে। অথচ যদিও সেটার কোনো প্রমাণ ছিলো না! আর এখন জনগণের অসংখ্য গাড়ি ভাংচুর, জ্বালাও পোড়াও করলেও দুঃখ প্রকাশ করা হয় না (জনগণের কাছে)! এগুলি তো ইসলাম নয়!
কট্টর ইসলামবিদ্বেষী হিন্দু নেতা নরেন্দ্র মোদী নির্বাচিত হবার পর জামায়াতের পক্ষ থেকে সবার আগে অভিনন্দন জানানো হলো। অথচ জামায়াত তখন এমনকি বিরোধী দলও নয়, সংসদে তাদের কোনো আসনও নেই যে, diplomatic obligation হিসেবে কাজটি করতে হবে। কিন্তু “ভবিষ্যত রাজনীতির স্বার্থে” কট্টর ইসলামবিদ্বেষী মুসলিম হত্যাকারী হিন্দু নেতাকেও অভিনন্দন জানানো জায়েজ। কারণ এটা “দলের স্বার্থে”, আর দল ইসলামের স্বার্থে।
প্রথমতঃ, সেক্যুলার ডেমোক্রেসির যে মানদণ্ড পশ্চিমা বিশ্ব সেট করেছে, তা ইসলামের মানদণ্ড নয়। দ্বিতীয়তঃ, দল পদ্ধতি হলো ইসলাম প্রচার-প্রসারের যে মূল কনসেপ্ট, তা থেকে এক প্রকার বিচ্যুতি। এরপর এই দলীয় স্বার্থে ও নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতির স্বার্থে এত বেশি বিষয়ে ছাড় দিতে হয় ও হয়েছে যে, তা সুস্পষ্ট ইসলামের লঙ্ঘন। শুরুতে ১ ডিগ্রি বাঁকা একটি পথকে প্রথমে সিরাতুল মুস্তাকিমের থেকে আলাদা বলে মনে হয় না, কিন্তু সেই পথ যখন অনেক দূর এগিয়ে যায়, এক ডিগ্রি হেলানো ভিত্তির উপর যখন ১০০ তলা বাড়ি তৈরী করা হয়, তখন সেই হেলে পড়া বাড়ি স্পষ্ট দেখা যায়, সেই পথ যে সিরাতুল মুস্তাকিম থেকে কতটা দূরে, তা সুস্পষ্ট হয়ে যায়।
প্রতিবাদ করার কি কেউ নেই?
এতসব সমস্যা দেখা ও বোঝা সত্ত্বেও অনেকে প্রতিবাদ করছেন না। যেহেতু এটা ইসলামের ব্যাপার, সেহেতু ইসলামের পতাকা বহনের সেই জ্ঞানগত যোগ্যতা ও আল্লাহ কর্তৃক আধ্যাত্মিকভাবে আদিষ্ট না হওয়া পর্যন্ত কারোরই উচিত না ইসলামের পতাকা বহন করা। তবে ভুল-ত্রুটি থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য সঠিক পদ্ধতিতে ইসলামের জ্ঞান অর্জন করা ফরজ। এতে নিজেকেও রক্ষা করা যায়, নিজের পরিবারকেও রক্ষা করা যায়।
তবে আশার কথা হলো, ইন্টারনেটের যুগে বাস করছি আমরা। এখানে মানুষের প্রাইভেসি বলে আর কিছু থাকছে না। তেমনি দলীয় প্রাইভেসি বলেও আর কিছু থাকছে না। অতি সম্প্রতি দেখছি শিবিরের বেশ অনেকের হাত দিয়ে ফেইসবুকে “inner dirty secrets” বের হয়ে আসছে। মানুষের অ্যাক্সেস টু ইনফরমেশান যত বাড়বে, ততই এটা ব্যাপকহারে ঘটতে থাকবে। তখন বিশুদ্ধ হওয়া ও নিজেদের সংস্কার করা ছাড়া উপায় থাকবে না। ইন্টারনেট হলো পরবর্তী বিপ্লবের হাতিয়ার। এর সম্ভাবনা ও আশঙ্কা, উভয়ই অনেক। যেমন :
১. ইন্টারনেটের মাধ্যমে মানুষ বিভিন্ন দল / মতের ভুল-ভ্রান্তিগুলো জানতে পারবে।
২. ইন্টারনেটের মাধ্যমেই আবার বিভিন্ন ভ্রান্ত ধারণার দল / মতের প্রচার-প্রসার ঘটবে।
৩. ইন্টারনেটের মাধ্যমেই মানুষ সঠিক পদ্ধতিতে জ্ঞানচর্চা সম্পর্কে জানতে পারবে, এবং প্রকৃত ইসলামের সাথে পরিচিত হতে পারবে। কারণ এতদিনের চুপ করে থাকা মানুষেরা, যারা পত্র-পত্রিকা ম্যাগাজিন ইত্যাদি কোনো প্ল্যাটফর্মেই জানা সত্ত্বেও প্রকৃত সত্য তুলে ধরতে পারছিলেন না, তারা এই information highway তে সঠিক information গুলো put করবেন। এবং ইসলামের সেই সঠিক বিষয়গুলো ইন্টারনেটে ভেসে বেড়াবে অনন্তকাল, আর কখন কোনো এক সম্ভাবনাময় বিপ্লবী ব্যক্তি সেই জ্ঞানের সংস্পর্শে এসে সত্যিকারের সংস্কার সাধন করবেন, তা কে জানে? অতএব, এটা খুবই আশার কথা। ইন্টারনেটের জগতে আর চাইলেই মানুষকে সংকীর্ণ সিলেবাসের মধ্যে কিংবা কুরআন-হাদীসের সংকীর্ণ বা বিকৃত ব্যাখ্যার মধ্যে ধরে রাখা সম্ভব হবে না। ইন্টারনেটের জগতে সকল ধরণের মতের সংস্পর্শে মানুষ আসবেই, এবং আসছেও। অর্থাৎ, একটি রিসার্চ যে প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয় আরকি। ইন্টারনেটের কারণে এখন মানুষ পড়ছে, শুনছে, জানছে এবং নিজের বিচারবুদ্ধি দিয়ে যাচাই করছে। ফলস্বরূপ, in the long run তারাই টিকে থাকবে, তাদেরই গণভিত্তি তৈরী হবে ও দৃঢ় হবে, যারা প্রকৃত সত্যের সাথে আছে। এতদিন ধরে ধর্মীয় রিসার্চ সেন্টার প্রতিষ্ঠা না করলেও, জ্ঞানগত বিপ্লব থেকে দূরে থাকলেও ইন্টারনেটের জগতে জ্ঞানের মুখোমুখি হয়ে পড়ছে বিভিন্ন দল-মতের লোকেরা। আর সত্যিকারের জ্ঞানগত ভিত্তি না থাকলে তখন তারা টিকে থাকতে পারবে না। অর্থাৎ, একটি জ্ঞানগত বিপ্লব imminent (অত্যাসন্ন)। এবং সেটা এই ইন্টারনেটের মাধ্যমেই হবে। ইন্টারনেট একটি নতুন প্রযুক্তি। আর খুব দ্রুতই তা সব মানুষের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। Data collection, data aggregation ইত্যাদি করে যাচ্ছে গুগল ফেইসবুকসহ বিভিন্ন সংস্থা। ডাটা মাইনিং, বিগ ডাটা, ইত্যাদি নিয়ে যেসব কাজ হচ্ছে, কে বলতে পারে যে সেটা ইসলামের সাহায্যে কাজে আসবে না? প্রতিনিয়ত ইসলামের বিষয়ে অসংখ্য সার্চ হয় গুগলে। কে বলতে পারে যে এই সার্চের মাধ্যমে সঠিক তথ্য কারো হাতে পৌঁছাবে না? কারণ ইসলামের শত্রুরা যেমন কাজ করে যাচ্ছে ইন্টারনেটে, তেমনি ইসলামের সম্পর্কে কমপ্লিট আন্ডারস্ট্যান্ডিং এর মানুষেরাও কাজ করে যাচ্ছেন ইন্টারনেটে, তেমনি কাজ করে যাচ্ছেন জামায়াত-শিবিরের মত দলগুলো। না চাইতেও সবাই যেনো এক জ্ঞানগত যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। এবং এই জ্ঞানগত যুদ্ধ দিনদিন প্রকট আকার ধারণ করবে। তখন সত্যের বিজয় হবেই। আমি এ ব্যাপারে খুবই আশাবাদী।
পরিশিষ্ট – ১ : ধর্মতত্ত্বের কিছু মৌলিক আলোচ্য বিষয়
৬. ঐশী গ্রন্থের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য (2nd authority : কুরআন)
১০. ধর্মীয় বিষয়ের authority-র পর্যায়ক্রম : (আক্বল, কুরআন, সুন্নাহ (মুতাওয়াতির হাদীস), ইজমা–এ উম্মাহ)।
১১. সতর্কতার কর্মনীতি (rule of precaution)
মৌলিক / সর্বজনীন স্তরের গাইডেন্স : এই গাইডেন্স সকল মানুষের মাঝে সহজাত। যে কেউ এই গাইডেন্সকে অনুসরণ করবে ও সৎকর্ম করবে, পরকালে সে মুক্তি পাবে, তার কোনো ভয় থাকবে না (২:৬২)। আর সর্বজনীন এই গাইডেন্স হলো তাওহীদ ও আখিরাতের অনুভুতি, এবং বিবেক ও বিচারবুদ্ধি। কোনো মানুষ ইসলামের সাথে পরিচিত না হলেও সে যদি শুধু এই চারটি অনুভুতিকে যথাযথভাবে অনুসরণ করে পথ চলে, তবে সেটাই তাকে পরকালে উৎরে দেবে। এটা আল্লাহরই ওয়াদা। তাওহীদ ও আখিরাতের অনুভূতি এবং বিবেক ও বিচারবুদ্ধি – এই চারটি বিষয় যে সকল মানুষের মাঝে সর্বজনীন,সহজাত – কুরআনে সেকথার প্রমাণও বিদ্যমান। [বিবেক [৭৫:২ (নফসে লাওয়ামা), ৯১:৮ (তাক্বওয়া)], বিচারবুদ্ধি (আক্বল ৮:২২), স্রষ্টার ব্যাপারে স্পিরিচুয়াল ইনস্পিরেশান (৪১:৫৩)]
কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাঁর অসীম দয়ার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে মানুষের এই যাত্রাকে সহজ করতে আরো তিনটি স্তরের গাইডেন্স দান করেছেন। পরবর্তী এই তিনটি স্তরের মাঝে যে ব্যক্তি যত বেশি স্তরে পৌঁছতে পারবে, তার সিরাতুল মুস্তাকিমে চলা ততই সহজ হবে। আর এই তিনটি স্তর হলো :
১. ঐশী কিতাব (আমাদের জন্য কুরআন মজীদ)
২. রিসালাত (আমাদের জন্য মুহাম্মদ (সা.))
৩. ইমামত (ইমাম আলী (আ.) হতে ইমাম মাহদী (আ.) পর্যন্ত ১২ ইমাম)
কোনো ধর্মেরই অনুসারী নয়, এমন ব্যক্তি গাইডেন্স এর মৌলিক স্তরে রয়েছে।
ইসলাম, খ্রিষ্ট ধর্ম ও ইহুদী ধর্মের অনুসারীরা পরবর্তী তিনটি স্তরের মাঝে দুটি স্তরের গাইডেন্স পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছে :
ঐশী কিতাব (ইহুদিদের তওরাত, খ্রিষ্টানদের ইঞ্জিল, মুসলমানদের কুরআন)
ও রিসালাত (ইহুদিদের মূসা (আ.), খ্রিষ্টানদের ঈসা (আ.), মুসলমানদের মুহাম্মদ (সা.))।
আর সর্বশেষ স্তরের গাইডেন্স, ইমামত পর্যন্ত যারা পৌঁছাতে পেরেছে, মুসলমানদের মাঝে তারা শিয়া বা আহলে বাইতের অনুসারী বলে পরিচিত।




