পবিত্র কোরআনের নিম্নক্ত আয়াতটি খেয়াল করি-
“আর সমস্ত মুমিনের অভিযানে বের হওয়া সঙ্গত নয়। তাই তাদের প্রত্যেক দলের একটি অংশ কেন বের হলো না, যাতে দ্বীনের জ্ঞান লাভ করে এবং সংবাদ দান করে স্বজাতিকে, যখন তারা তাদের কাছে প্রত্যাবর্তন করবে, যেন তারা বাঁচতে পারে” (তাওবা-১২২)
এই আয়াতে একটি বিষয় খুব সুস্পষ্ট যে, মুসলমানদের মধ্যে এমন একটি ইন্টেলেকচুয়াল গ্রুপ
অবশ্যই থাকা চাই যারা মুসলিম উম্মাহকে নলেজ দ্বারা বিশেষভাবে গাইড করবেন অর্থাৎ তাদের প্রধান কাজ হবে নলেজ দ্বারা লড়াই করা, ময়দানে প্রকাশ্য লড়াই নয়।
এবার খেয়াল করুন শুধু ইসলাম নয়, পৃথিবীতে যত বিপ্লব সাধিত হয়েছে প্রত্যেক বিপ্লবেই কোন না কোন ইন্টেলেকচুয়ালদের অসামান্য অবদান ছিল, অর্থাৎ সকল বিপ্লবকেই এই খোদাই নীতি মেনে চলতে হয়েছে।
ফরাসি বিপ্লবকে বিপ্লবে রূপান্তরিত করতে কাজ করেছিলেন রুশো, ভল্টেয়ার ও মন্টেস্কোর মতো দার্শনিকগন।
রুশ বিপ্লবের জন্য দরকার হয়েছিল মার্কস,লেলিন, টটেস্কির মত নামজাদা অর্থনীতিবিদ ও দার্শনিকদের।
জার্মনির সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ভিত তৈরি করেছিলেন গ্যেট, হেগেল,নিটশের মত দার্শিনক ও তাত্বিকরা।
তাহলে ইসলাম কি এসবের সম্পুর্ণ ব্যাতিক্রম?
নাকি তারও দাশর্নিক, অর্থনীতিবিদ,তাত্বিক তথা ইন্টেলেকচুয়াল গোষ্ঠির দরকার আছে?
আমার মতে,নিশ্চয়ই আছে। আপনারও হয়ত দ্বিমত পোষণ করবেন না।
সম্ভবত আমরা ইসলামী ‘জ্ঞানতত্বের’ প্রশ্নে যথেষ্ট সংকীর্ন মানসিকতার পরিচয় দিয়ে থাকি। জ্ঞানী বলতে শুধু ফকীহ,মুফাসসীর,মুহাদ্দিসদেরই আমরা বুঝে থাকি।একথা অবশ্যই সত্য যে ফকীহ,মুফাসসীর,মুহাদ্দিসদের গুরুত্বই ইসলামী সমাজ বিনির্মাণ কিংবা রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ।তবে এছাড়াও আমাদের সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান, দর্শনসহ সকল বিষয়ে স্পেশালিষ্ট গড়ে তোলার প্রকল্প হাতে নেয়া উচিৎ অর্থাৎ ‘সামগ্রিক বিজ্ঞানে’ আমাদের ভূমিকা থাকা চাই। কারন প্রত্যেকটি বিষয়ই সমাজ গঠন ও পরিবর্তনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
সুতরং ইসলামি সমাজ বিনির্মাণের জন্য সবার আগে প্রয়োজন একটি সামগ্রিক ‘নলেজ মুভমেন্ট’।
আমাদের আবারও প্রয়োজন- ইবনে সিনা, আল-কিন্দি, আহমেদ সিরহিন্দি, আল বিরুনি, আল্লামা ইকবাল, আল ফারাবী, ইবনে তুফায়েল, ইবনে রুশদ, হাসান আল বান্না, ইবনে খালদুন, আবুল আলা মওদুদী,গাজ্জালী, শায়খ অয়ালীউল্লাহ,ইবনে তাইমিয়ার মত ইসলামের মহান ইন্টেলেকচুয়ালদের।
আর একটি বিষয় খেয়াল করা দরকার একটি সামগ্রিক বিপ্লবের জন্য প্রয়োজন সার্বিক সমন্বয়। কিছু লোক রাজনীতি করবে আবার কিছু লোক ইন্টেলেকচুয়ালি ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দলনে সহযোগিতা করবে।
বিবেচনার বিষয় হোল প্রত্যেক রাজনৈতিক কর্ম বাস্তবায়নের দুটি পর্যায় থাকে- ১- পরিকল্পনা প্রণয়ন ২- বাস্তবায়ন। যিনি বা যারা পরিকল্পনা প্রনয়নের কাজ করবেন তারা হলেন ‘পলিসি মেকার’ বা ‘ইন্টেলেকচুয়াল’, আর যারা তা কর্মে পরিণত করবেন তারা হলেন ‘ওয়ার্কার’ বা ‘পলিটিশিয়ান’।
লক্ষ্য করুন দার্শনিকগন নিজেরা কিন্তু তাদের দর্শন কিংবা তত্ত্বকে বাস্তবে রূপান্তরিত করতে পারেন নি, মার্কসের থিওরি বাস্তবায়ন করেছেন লেলিন, মার্কস নিজে নয়।
ইউসুফ আল কারজাভীকে এ পর্যন্ত কমপক্ষে তিনবার মুসলিম ব্রাদারহুডের সভাপতি পদ গ্রহনের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে, কিন্তু প্রত্যেকবারই তিনি সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন। তিনি মনে করেছেন রাজনীতি তার কাজ নয় বরং রাজনৈতিক নেতৃত্বকে মোটিভেট করা এবং ইসলামকে মানুষের সামনে তুলে ধরাই তার দায়িত্ব।
সুতরং যারা বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জ গ্রহনের হিম্মত বা মানসিকতা পোষণ করি তাদের ‘নলেজ মুভমেন্ট’ গড়ে তুলতে সচেষ্ট হতে হবে, গড়ে তুলতে হবে আগামীর ইন্টেলেকচুয়ালদের। যারা হবেন ইসলামী সমাজ বিনির্মাণের পলিসি মেকার।




