স্বপ্ন কি জিনিস সেটা কোনো দিন ঘুমঘুরেও ভাবিনি। আর বাস্তব জীবনে প্রতিফলন, তা তো আকাশ-কুসুম কল্পনা। সলিড স্মৃতিকে তো আর অস্বীকার করা যায় না। গ্রাম্য স্কুলের একদম শেষ বেঞ্চে বসে বসে ভাবতাম, এটাই বুঝি পৃথিবীর স্বর্গীয় বিদ্যাপীঠ! তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম-গন্ধও কোনো দিন অনিচ্ছাকৃতভাবেই শুনিনি। ক্যাম্পাসে ত্রিসীমানায় পা রাখব ভুল করে কোনো দিন স্বপ্নও দেখিনি! মা-বাবার তলাবিহীন সংসারে এসব চিন্তা করাটাও তো বামন হয়ে চাঁদে হাত দেওয়ার মতো!
প্রিয় ফরীদ আহমেদ রেজা ভাই, সম্প্রতি ‘শিবিরের ক্রান্তিকালঃ ১৯৮২ সালের কথকতা’ হেডলাইনে আপনার সিরিজ লেখাগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে পড়লাম। ফলে মনের অজান্তেই ব্যাপক রহস্য, প্রশ্ন, পাল্টা প্রশ্ন, অজানা উত্তরে দিকে দুর্দান্ত কৌতুহল তৈরি হয়েছে। তবে ভার্চুয়াল জগতে এই বোমা ফাটানো নিয়ে তর্ক-বিতর্ক, কানাঘোষা, মণিকোঠায় ভিন্ন চিন্তার ছাপ, ইতিহাসের চুলচেরা বিশ্লেষণের কমতি নেই। কাঁদা ছোড়াছুড়িও থামছে না। কে আগে ঢিল ছুড়েছে সে বিষয়ে না গিয়ে বলব, ইট মারলে পাটকেল তো আসবেই। এটাই হয়ত পথিবীর নিয়ম! তাছাড়া ঠান্ডা মেজাজ কিংবা কোমল ভাষায় কারো চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করে বিপরীতে পানির মতো সহজ ভাষা আশা করাটাও নতুন এক কৌশলী মেজাজ!
আমরা জানি আবেগ দিয়ে শুধুমাত্র সাময়িক আউটপুট পাওয়া যায়, দীর্ঘসূত্রীতায় যা চোখের জলেই জায়গা পায়। এর বেশি কিছু নয়। প্রিয় রেজা ভাই, আমরা নতুন প্রজন্ম নিশ্চয়ই ৮২’র গুপ্ত ইতিহাস জানি না কিন্তু ১৫ সালের ইতিহাস-ঐতিহ্য শুধু আমরাই জানি। আপনার জানার কথা নয়। একে তো দেশে নেই ১২ বছর ধরে, তার উপর ছাত্রশিবিরেও নেই। কাজেই ৮২’র আন্ডারওয়াল্ডের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আমরা কিছুই বলতে পারব না। তবে ১৫’র আন্দোলনের ভিতে দাঁড়িয়ে ঠিকই আপনার বক্তব্যের বিপরীতে নবীণের আলোকে যতটুকু সম্ভব কাঠামো দাঁড় করিয়ে যাব। আমরা সুস্পষ্ট ভাষায় জানাতে চাই, আমাদের অবস্থান একজন ফরীদ রেজার চারিত্রিক অবয়বের বিরুদ্ধে নয়, শুধুমাত্র ৮২’র অবহেলিত, অভিমানী, সহযোগিতা বঞ্চিত, আক্ষেপ-কান্নার সুরের লেখা ভাষার বিরুদ্ধে। আরও ক্লিয়ার করলে, আমাদের কলম শুধুমাত্র ৮২’র আবেগতাড়িত ও খন্ডিত স্মৃতিচারণ এবং অন্ধভক্ত মহোদয়ের প্রশ্নবিদ্ধ অট্টহাসির বিরুদ্ধে।
আপনার লেখার হাত অনেক সুন্দর, মার্জিত, কিছুটা আবেগপ্রবণ, ইমোশনাল কলমের কালিও হয়তবা বাদ যায়নি। শুরুতেই একটি প্রশ্ন রাখতে চাই, আপনার লেখাগুলো কি ১৫’র স্মৃতিশক্তি থেকে নেয়া নাকি ৮২’তে নোট করা ডাইরি থেকে? যদি ১৫’র স্মৃতি হয়, তাহলে তো যথেস্ট আবেগ ঢুকে গেছে। সেটা সুনিশ্চিত। সবাই তো আর এ. কে .এম ফজলুল হক নয়। একদিকে বই পড়ে অন্যদিকে বইয়ের পাতা ফেলে দেয়। আর যদি ৮২’র নোট হয় তবে আপনি ভবিষ্যতে লিখবেন এমনটা কি আগেবাগেই ঠিক করে রেখেছেন? প্লিজ এই প্রশ্নটা এড়িয়ে যাবেন না। নতুন প্রজন্ম হিসাবে এটা আমাদের জানার রাইট আছে। আপনি বার বার বলেছেন, এই লেখা আপনার আত্নকথা। আমাদেরও কোনো আপত্তি নেই। শুধু নবীণ হিসাবে একটু বলতে চাই, ৮২’র ঐ ৬ মাসই কি আপনার স্মৃতিচারণ? এর আগে তো অনেকদিন আপনি সংগঠনে ছিলেন। তাহলে বাকী স্মৃতিচারণ মহাসাগরের তলদেশে কেন? সেটাও ক্লিয়ার হওয়ার দাবি উঠতেই পারে। মজার বিষয় হচ্ছে সেই ইতিহাস নিশ্চয়ই খুবই ভালো ছিল। তা আপনার লেখাই বলে দিচ্ছে‘ বাইরে ছিলাম, অনেক ভালো ছিলাম। অনেক স্বপ্ন ছিল, অনেক সুধারণা ছিল, অনেক আশা ছিল (১ম পর্ব)। যদিও ইহা আপনার একান্ত নিজস্ব ব্যাপার। তবে এই স্মুতিচারণকে আত্নকথা না বলে ‘ ষান্মাসিক বা খন্ডিত আত্নকথা বললে কি বেশি ভালো হতো না?,
শ্রদ্ধাভাজন রেজা ভাই, স্মৃতিকথা পোস্টিং থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রশ্নের জবার পর্যন্ত আপনার অবস্থানটা ছিল চমৎকার, দেখার মতো। একদম ডিফেনসিভ মোড। হয়ত এটা একজন রেজা সহজ করে নিয়েছেন, বাকী লক্ষ লক্ষ যুবক কিভাবে নিবে সেটাও মাথায় রাখাটা সহজের আরও সহজ হতে পারত। মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে একটু বলে নিই, ৮২’র ইতিহাস নিয়ে আক্ষরিক অর্থে আমার কিছু বলার যুক্তিকতা হয়ত অনেকের কাছে নেই। কারণ আমার জন্মই তো ৯২’এ! কাজেই ঐ সময়কালীন কোনো তথ্য, রেফারেন্স, ডকুমেন্টের কপি কিছুই আমার জানা নেই! জবাবটা ৮২’র কোনো দায়িত্বশীল দিলে ভালো হতো। যেমনটা আপনি ও আমরা নতুন প্রজন্মও আশা করি। তারপরও অনেক কিন্তু থেকেই যায়! সম্ভবত আপনি যেমন ৮২’র স্মুতিচারণ করেছেন ৩৩ বছর পর, তারাও হয়ত ১৫’তে আপনার লেখার জবাবটা আগামী ৬৬ বছর বা ৩৩ বছর পরই দিবেন! থাকুক এসব, ঘটনার ১০ বছর পর জন্ম নেয়া আমরা তরুণরা তো শুধুমাত্র আপনার আলোচনার সূত্র ধরে, কিছু নবীন অভিজ্ঞতা, লেখার সাথে অতীতের কিছু ঘটনা ও রেফারেন্সের সাথে সামঞ্জ্য রেখেই বিতর্কের মঞ্চে টিকে থাকার চেষ্টা করব ইনশা-আল্লাহ। সাধারণত সংসদীয় বিতর্কে সরকার পক্ষ আলোচ্য বিষয়ের সংজ্ঞায়ন করার পরই বিপক্ষদল ঠিক করে কোনো প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে বিতর্ক চালিয়ে যাবে। আমাদের নতুন প্রজন্মের অবস্থানটা প্রায় সেইরকমই! বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আপনার লেখার ১ম পর্বটি পুরোপুরি চাপা ক্ষোভ ও বিস্তর অভিমান নির্ভর ছিল! চা-ব্যবসা নিয়ে আপনার মন্তব্যই সুস্পষ্ট প্রমাণ দিয়ে যায় ‘আসিনি, আছি, ‘ আমি কি চুরি করছি?, ‘আপনি না মানলেও আমি মেনে নিয়েছি’।
সাংগঠনিক জীবনের একটি ছোট্ট ঘটনা বলতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে, তখন আমি হল সেক্রেটারি ছিলাম। সভাপতি মহোদয় ছিলেন আমার ব্যাচমেট। আমার অনার্স তৃতীয় বর্ষের রেজাল্টও আলহামদুলিল্লাহ ভালো হলো।ব্ লগিং ও পত্রিকায় লেখালেখিও ভালো চলছিল। ক্যাম্পাসের দিকে বেশি ঝুকে পড়ছিলাম। উপায় নেই, কি করব। একাডেমিক পড়াশোনা, ক্যাম্পাসের ইতিহাসে বায়োকেমিস্ট্রিতে সবসময় পরীক্ষা থাকে, লেখালেখি, আবার পেট বাঁচাতে টিউশনি একসাথে আমাকে এটমবোমার মতো হামলা করে বসল। হঠাৎ হল সভাপতি ভাইয়ের তলব নট শাখা সভাপতি, আপনি তো দেখি সংগঠনের কাজকর্ম ঠিক মতো করছেন না, বাসায়ও কম কম আসছেন। রাগান্বিত হয়ে বললেন হল সভাপতি। আমি সবকিছু স্বীকার করে নিলাম। বললাম ভাই, টিউশনি ছেড়ে দিয়ে আগামী মাস থেকে ঐ সময়টুকু সংগঠনে দিব ইনশা-আল্লাহ। যদিও অনেক কষ্টে বললাম। তাছাড়া শুধু আমিই না, হল সভাপতি, শাখা সভাপতি এমনটি জনশক্তিরা সবাই জানে, টিউশনি ছেড়ে দিলে আমার কি হবে? হল সভাপতির কথা শেষ হয়নি। চলছে, পরক্ষণেই বলে উঠলেন, কাজ ঠিক মতো না করতে পারলে চলে যান। এতক্ষণ সভাপতির প্রতি আনুগত্যেই ছিলাম। কিন্তু টগবগে রক্তটা হঠাৎ ঝাঁকুনি দিয়ে গেল। মুখের উপর বলে দিলাম। আপনার জন্য সংগঠনে আসিনি কিংবা সদস্যও হয়নি আর আপনার কথায় জন্মেও সংগঠন ছাড়ব না। তারপরও চাপা আরও অনেক কষ্ট নিয়ে আজও আছি সেই প্রেরণার আন্দোলনে। কেন ছাড়ব আন্দোলন? ব্যক্তির কথায় কষ্ট পেয়ে, না অসম্ভব। কারণ এই কাফেলার কিছু ভাইয়ের সহানুভূতিতেই তো সেই অজপাড়াগায়ের মফস্বল এলাকা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রেখেছি।
একটা কথা বলা বাঞ্চনীয় যে, রেজা ভাইয়ের সিরিজ লেখায় একজন অভিমানী ও সাময়িক সুবিধা বঞ্চিত যুবকের বিপরীতে ব্যক্তিজীবনে অনেক কিছু পেয়েছে এমন একজনকে দিয়ে আমি উনার যুক্তি খন্ডন করতে যাচ্ছিনা। সম্পূর্ন সিরিজ পড়ে কতগুলো বিষয় আমাকে বার বার ভাবাচ্ছে। জি.এস নিয়োগে পরিষদের ভূমিকা কি হওয়া উচিত এটা ছাড়া সমগ্র সমালোচনা কেন ব্যক্তিকেন্দ্রিক ছিল? যাগগে এসব। যে ভাবেই উপস্থাপন করুক না কেন সেটার গ্রহনযোগ্যতার মাপকাঠি তো পাঠক সমাজ। আর একটা বিষয় হরহামেশাই আমাকে খটকায় ফেলে দেয়! একতরফা কিংবা ব্যক্তিপর্যায়ে সমালোচনা হোক সেটা তো মূখ্য বিষয় নয়! সমালোচনা হয়েছে সেটাই বড় বিষয়। সাথে সাথে সেই সমালোচনার আদৌ কি কোনো সমাধান বা সমাধানের রূপরেখা বা সমাধানের পদ্ধতি কিংবা রোডম্যাপ আছে?? সেটা তো চোখে পড়ছে না!
যাই হোক শুরুতেই আবেগ মশাইকে কিছুটা ঝালিয়ে নিচ্ছি, প্রভুর কৃপায় যাতে বিবেক ও যুক্তির ভিতে দাঁড়িয়ে সর্বাত্মক আওয়াজ দিতে পারি।
চলবে……………… ২য় পর্ব
প্রাসঙ্গিক লেখা : শিবিরের ক্রান্তিকালঃ ১৯৮২ সালের কথকতা-২
নোট: লেখাটি সম্পাদক কর্তৃক সম্পাদিত





রেজা ভাই ১০০% সত্য বলেছে। আপনার উচিৎ, “আমি আল বদর বলছি”। বইটি পড়া। সেই সাথে জামাত রিসার্স পর্ব। কে,এম, হাসান।