আন্তর্জাতিক তীব্র কূটনৈতিক চাপ উপেক্ষা করার যে নীতি আওয়ামীলীগ নিয়েছে, এর মানে হলো আওয়ামীলীগ কোনো কিছুর পরোয়া করে না। শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, কারো ফোনকে তিনি পাত্তা দেন না। ইতোমধ্যে জাতীয় নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৪ দলীয় জোট ১৫৪ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছে। তারপরও একতরফা নির্বাচন থেকে পিছিয়ে আসার কোনো লক্ষণ আওয়ামীলীগের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না।
বিপরীতে বিরোধী দল হিসেবে বিএনপি উপযুক্ত ভূমিকা রাখতে পারছে না বা রাখছে না। তারা আওয়ামীলীগের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের বিরোধী অধিকাংশ জনগণের ইচ্ছা-আকাঙ্খার প্রতি সম্মান না দেখিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতাকেই গুরুত্ব দিচ্ছে। এটা সেই কূটনৈতিক তৎপরতা, যে তৎপরতা বিএনপিকে আওয়ামীলীগের কাছে প্রস্তাব দিতে বাধ্য করেছে যে, তারা শেখ হাসিনার পরিবর্তে প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ, স্পিকার শিরিন সুলতানা কিংবা আওয়ামীলীগের সদ্য বিদায়ী মন্ত্রীসভার পরিকল্পনা মন্ত্রী এ কে খন্দকারকে সরকার প্রধান হিসেবে দেখতে চায়!! অথচ মাস দুয়েক আগেও খালেদা জিয়ার প্রস্তাব ছিলো, “১৯৯৬ ও ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্বে থাকা ২০ উপদেষ্টার মধ্য থেকে আওয়ামী লীগ পাঁচজন এবং বিএনপি পাঁচজনের নাম প্রস্তাব করবে। তাঁরাই হবেন নির্বাচনকালীন সরকারের উপদেষ্টা।”
কূটনীতিকদের উপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল বিএনপিকে এই কূটনীতিকরা খালেদা জিয়ার আগের অবস্থা থেকে সরিয়ে এনে আওয়ামীলীগের ‘প্ল্যান বি’ বিএনপিকে দিয়ে বলিয়ে ছেড়েছে!! স্মরণযোগ্য, স্পিকার ও রাষ্ট্রপতি নিয়োগের সময় দেশের সংবাদ মাধ্যমগুলো খবর দিয়েছিলো, শিরিন সুলতানা ও আবদুল হামিদ হচ্ছেন শেখ হাসিনার খুবই বিশ্বস্ত ও পরীক্ষিত লোক। বলাবাহুল্য, বিএনপির এই প্রস্তাবে আওয়ামীলীগ আপাত খুব একটা সাড়া দেয়নি। এটা অনেকটা কুরবানীর হাটে পছন্দের গরু কেনার সময় বিক্রেতার সামনে ক্রেতার কপট অপছন্দ দেখানোর মতো ব্যাপার 🙂
অন্যদিকে, জামায়াত চলছে উদ্দেশ্যহীনভাবে। নিজেদের নেতৃবৃন্দের মুক্তি এবং সরকার পতন ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি- এই দুই ইস্যুর দোলাচালে দুলতে দুলতে পার হচ্ছে দলটি। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের পর সহিংস প্রতিবাদ থামাতে সরকার রাষ্ট্রীয় বাহিনী দিয়ে নির্বিচারে দলটির নেতা-কর্মীদের হত্যা করছে। আল-জাজিরা ইতোমধ্যে বাংলাদেশে সীমিত মাত্রার গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হয়েছে বলে খবর দিয়েছে। আরেক খবরে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, শীর্ষস্থানীয় বিরোধী নেতা কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করার পর দেশের ব্যবসায়ী ও স্থানীয় অধিবাসীরা আশঙ্কা করছেন যে, সংঘাত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। নিরাপত্তা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক থাকলেও ৫ জানুয়ারির আগে সহিংসতা আরও বাড়তে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ভয়াবহতম পরিস্থিতি এখনও সামনে রয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বাংলাদেশ বিষয়ক গবেষক আব্বাস ফয়েস বলেন, বাংলাদেশ এখন ‘খুরের ফলার’ ওপর আছে। বাংলাদেশের বতর্মান অবস্থাকে গণঅভ্যুত্থান বা বিচ্ছিন্নতাবাদী (ইন্সার্জেন্সি) আন্দোলনের সঙ্গে তুলনা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক এম শহিদুজ্জামান বলেন, ‘ধীরে ধীরে আমরা এমন একটি অবস্থার দিকে যাচ্ছি যেখানে সহসাই ‘সিলেক্টেড কিলিং’ শুরু হতে পারে, যেটা দেখা যায় ইসরাইল ও আফগানিস্তানে।’ [আল-জাজিরা]

তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার হলো, বিএনপি’র প্রধান রাজনৈতিক সহযোগী জামায়াতের নেতা কাদের মোল্লার ফাঁসির ব্যাপারে দলটি অস্বাভাবিক নিরবতা পালন করেছে। তারপরেও খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাতের পর জামায়াত নেতা ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক এক বিবৃতিতে নেতা-কর্মীদের শান্ত থেকে শোক প্রকাশের আহ্ববান জানিয়েছেন। জামায়াত ও শিবিরের নেতা-কর্মীদের উপর এই মুহূর্তে সবচেয়ে প্রভাববিস্তারকারী এই নেতা এমন এক সময়ে এই আহ্ববান জানিয়েছেন, যখন নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সহযোগী হয়ে আওয়ামীলীগের নেতা-কর্মীরা জামায়াত-শিবির নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার ও হত্যার অভিযান শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে। এই ঘোষণার আগেই গত ৭২ ঘণ্টায় ৩৬ জনকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেছে জামায়াতে ইসলামী।
অন্যায়ভাবে নিজেদের ক্ষমতা স্থায়ী করতে আওয়ামীলীগের প্রতিটা পদক্ষেপ স্পষ্ট ও পরিকল্পনামাফিক। বিপরীতে বিএনপি ও জামায়াতের গন্তব্যহীন ও এলোপাতাড়ি কর্মসূচি তাদের রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার প্রমাণ। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন হয়ে গেলে কিংবা সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচন পেছালে বিএনপি’র আপাত ক্ষতি না হলেও জামায়াতের নেতাদের ফাঁসি হয়ে যাবে, এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। সেক্ষেত্রে বিএনপি বরাবরের মতো প্রতিক্রিয়াহীন থাকবে, তা বুঝাই যায়।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণে জামায়াত কি করতে পারে? আমি মনে করি, ট্রাইবুনাল ও সর্বোচ্চ আদালতের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে বিচার প্রক্রিয়া থেকে জামায়াতের সরে আসার ঘোষণা দেওয়া উচিত। আসামী পক্ষের কোনো যৌক্তিক কথাই এ ট্রাইবুনাল বিবেচনা করেনি। তারপরও এর পেছনে লেগে থেকে আওয়ামীলীগকে ‘বৈধ হত্যাকান্ডে’র সুযোগ করে দেওয়ার কোনো মানে হয় না। দ্বিতীয় কাজটি হলো, ময়দানে প্রতিপক্ষকে শক্তভাবে মোকাবেলা করা উচিত। এক পা এগিয়ে দুই পা পিছিয়ে গেলে ময়দান আওয়ামীলীগের পক্ষেই কথা বলবে।
জামায়াত না হয় গেলো, কিন্তু দেশের কী হবে? সমাধান কোন পথে? এই প্রশ্নের নিশ্চিত কোনো উত্তর না থাকলেও ইতিহাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, অতীতে রক্তের স্রোত স্বৈরাচারী ক্ষমতার মসনদকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। কখনো মজলুমের রক্তেই সমাধান এসেছে, কখনোবা অত্যাচারির নিজের রক্তেই ভিজে গেছে ক্ষমতার মসনদ। আমরা ঠিক জানি না কোন পথে সমাধান আসবে। অনিশ্চিত ও যন্ত্রণাদায়ক এই অপেক্ষা….




