প্রকৃতির নিয়ম হলো চক্রাকারে সে ঘুরতে থাকে অবিরাম। এর কোন ব্যতিক্রম ঘটে না। ইতিহাসেরও আবর্তন ঘটে। বার বার দুনিয়ার মানুষের সামনে একই ঘটনা হাজির হয়। সে একই ভুল করে এবং একই পরিণতি বরণ করে। ইতিহাস থেকে মানুষ শিক্ষা নেয় না বলেই এমনটি ঘটে থাকে।
রানী প্রথম মেরী। তার রক্ত পিপাসু চরিত্রের কারণে লোকে তাকে ‘ব্লাডি মেরী’ বলে ডাকতো। ১৫৫৩ সালে তিনি ইংল্যান্ডের সিংহাসনে আরোহন করেন। টিউডর বংশের কুখ্যাত স্বৈরশাসক ছিলেন তিনি। বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করার নিজস্ব কৌশল ছিল তার। বিরোধীদের আগুনে জ্বালিয়ে দিতেন লোকসমক্ষে। লোকে কেন তার বিরোধিতা করতো? এর জন্য কিছুটা ইতিহাস জানার প্রয়োজন রয়েছে।
ষোড়শ শতক ইউরোপকে অনেক দিক দিয়েই মহিমান্বিত করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ধর্মসংস্কার আন্দোলন। এই আন্দোলন ষোঢ়শ শতকের শুরু থেকে হলেও বিশের দশকে জার্মান যাজক মার্টিন লুথারের নেতৃত্বেই পূর্ণতা লাভ করে। তিনি ধর্ম যাজকদের বিভিন্ন অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেন। পরকালে জান্নাতের সার্টিফিকেট কেনা যেত সেসময়। উচ্চহারে কর দিতে হতো পোপকে। তিনি প্রশ্ন তুলেন, এই সার্টিফিকেটের মূল্য নিয়ে। পোপকে কর দেয়া কতটুকু নৈতিক। এসব বিষয় সামনে এনে তিনি বাইবেলের অনুবাদ করেন। ধর্মযাজকরাই কেবল এতদিন বাইবেল পড়তে পারতো। এবার জন সাধারণও তার অধিকার পায়। শুরু হয় ধর্ম সংস্কার আন্দোলন। ধর্ম যাজকদের অন্যায় এবং ধর্মীয় কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসে ইউরোপের মানুষ। ধর্ম সংস্কার আন্দোলন ইউরোপীয়ানদের জন্য কতটা লাভ হলো কিংবা ক্ষতি হলো, তা বিচার করার উদ্দেশ্য আমার নেই। এখানে কেবল ধর্মীয় নেতাদের অনাচারের বিরুদ্ধে জনসাধারণের সোচ্চার হওয়ার বিষয়টাই প্রাধান্য পাবার যোগ্য। জার্মানিতে শুরু হওয়া ধর্ম সংস্কার আন্দোলন ইংল্যান্ডেও প্রচার হতে থাকে। রাজা অস্টম হেনরীর সময় প্রোটেস্ট্যান্ট আন্দোলন ইংল্যান্ডে পরিপূর্ণতা পায়। রাজা অবশ্য নিজের সুবিধার জন্যই প্রোটেস্ট্যান্টদের সমর্থন করেছিলেন। ইংল্যান্ডে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল অ্যাংলিকান চার্চ। রাজা অস্টম হেনরীর পর রাজা ষষ্ঠ এডওয়ার্ড সিংহাসনে আরোহন করেন ১৯৪৭ সালে। এরপরই রানী মেরী ক্ষমতায় আসেন। এসেই তিনি খড়গহস্ত হন প্রোটেস্ট্যান্টদের উপর। কেন তিনি প্রোটেস্ট্যান্টদের বিরোধিতা করেছিলেন? কেন তাদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিলেন? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখা যাক।
আরাগনের ক্যাথারিন ছিলেন অস্টম হেনরীর প্রথমা স্ত্রী। এই ক্যাথারিনই রানী প্রথম মেরীর মা। ১৫৩২ সালে রাজা অস্টম হেনরী গোপনে বিয়ে করেন অ্যান বোলিনকে। এই নিয়ে পোপ সপ্তম ক্লেমেন্টের সঙ্গে হেরনীর দ্বন্দ্ব হয়। এরপরই প্রোটেস্ট্যান্টদের আধিপত্য বেড়ে যায় ইংল্যান্ডে। অ্যাংলিকান চার্চ প্রতিষ্ঠা করে হেনরী নিজেকে এর প্রধান হিসেবে ঘোষণা দেন। তবে ক্যাথারিন কোন সময়ই হেনরীকে চার্চের প্রধান হিসেবে স্বীকৃতি দেননি। সেই সঙ্গে সারা জীবনই নিজেকে অস্টম হেনরীর প্রধান স্ত্রী হিসেবে ভেবেছেন। রানী প্রথম মেরীর মা ক্যাথারিন ১৯৩৬ সালে কিম্বলটন ক্যাসলে মৃত্যূবরণ করেন। রানী মেরী সব সময়ই মায়ের এই মৃত্যূর জন্য দায়ী করেছেন প্রোটেস্ট্যান্টদের। মায়ের অবমাননা তার একদমই সহ্য হয়নি। এ কারণে ক্ষমতায় আরোহন করার পর প্রথমেই তিনি প্রোটেস্ট্যান্টদের ক্ষমতা খর্ব করেন। পুনরায় রোমান ক্যাথলিকদের আধিপত্য স্থাপন করেন। পুরনো চার্চ ও মঠগুলোকে সংস্কার করে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনেন।
মেরীর দৃষ্টিতে প্রোটেস্ট্যান্টরা ছিল বিশ্বাসঘাতক ও দেশের শত্রু। তিনি ধর্মদ্রোহীতামূলক অ্যানটিললার্ড আইনগুলো পুনঃপ্রবর্তন করেন। এই আইনের অধীনে প্রোটেস্ট্যান্টদের নাস্তিকতার অভিযোগে জীবন্ত দগ্ধ করেন। ১৫৫৫ সালে তিনি রোজারস ও হুপার নামক দুজন বিখ্যাত প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্ম যাজককে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করেন। এরপর ল্যাটিমার ও রিডলে নামক দুজন খ্যাতনামা ধর্ম যাজককে হত্যা করেন একই কায়দায়। ইংল্যান্ডে কথিত আছে, বধ্য ভূমিতে আসার পর রিডলের চোখে ভয় ফুটে উঠতে দেখে ল্যাটিমার বলেছিলেন, মানুষের মতো দন্ডাদেশ গ্রহন করুন, মাস্টার রিডলে। অগ্নিশিখায় প্রাণ দিয়ে আজ আমরা দেশময় যে আলোকসম্পাত করব, তা আর কখনোই নির্বাপিত হবে না।
রানী মেরী তিন বছরে ৫০৯ জন প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্ম যাজককে হত্যা করেছিলেন। আরো অনেককে কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে নিক্ষেপ করেছিলেন। তবে এসব অপরাধে তার হৃদয় ভাড়াক্রান্ত হয়ে পড়ে। তিনি রক্ত পান করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। একসময় ভগ্ন হৃদয়েই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে তিনি মাত্র ৪২ বছর বয়সেই মৃত্যূবরণ করেন। শেষ জীবনে তিনি অনেকটাই পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। ক্যান্সারেও নাকি আক্রান্ত ছিলেন তিনি।
রানী মেরীর সঙ্গে আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বড্ড মিল চোখে পড়ে। তিনি তার বিপরীত মতাদর্শের লোকদের বাড়িঘর পুরিয়ে দিচ্ছেন। নির্বিচারে হত্যা করছেন বিরোধী দলের নেতা কর্মীদের। আর ঠিক রানী মেরীর সময় যেমন তার অন্যায়ের কোন বিরোধিতা করেনি কোন বুদ্ধিজীবী। শেখ হাসিনার সময়ও সব বুদ্ধিজীবীরা চুপ। যেন, এই হত্যাকান্ডগুলো সবই বৈধ। শেখ হাসিনাকে হন্তারকের লাইসেন্স দেয়া হয়েছে! গত কয়েক মাসে কত শত রাজনৈতিক নেতা-কর্মী হত্যার শিকার হয়েছে? এর পরিসংখ্যান সুস্পষ্টভাবে দেয়া সম্ভব নয়। পত্রিকাওয়ালারা চোখে হাত এবং কানে আঙ্গুল দিয়ে বসে আছে। তারা কিছু দেখতে পাচ্ছে না। শুনতেও পাচ্ছে না। মিডিয়া এখন উট পাখি হয়ে গেছে! তবে ইতিহাস থেকে যারা শিক্ষা নেয় না তাদের পরিণতি ইতিহাসের মতোই ভয়ঙ্কর হয়ে থাকে।
শেখ হাসিনার পরিণাম কি হবে? এই প্রশ্নের উত্তর কেবল আল্লাহ রাব্বুল আলামীনই জানেন। তবে মেরীর সঙ্গে যার এতকিছুর মিল রয়েছে, তার পরিণাম মেরীর মতোই হওয়া উচিত। ইতিহাস তো তাই বলছে!




