১. এটা অত্যন্ত পষ্ট যে জামায়াত-শিবিরের ভাইবন্ধুরা বিপুল আত্মত্যাগের মাধ্যমে হলেও তাদের নেতাদের প্রাণ বাঁচাতে চান। তারা মনে করেন, একমাত্র শেখ হাসিনার পতন হলেই তাদের নেতারা ফাঁসিতে নিহত হওয়ার বদলে বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাবেন। এ কারণে তারা গত কয়েক মাস ধরে শেখ হাসিনার পতনের জন্য মরণপণ আন্দোলন করছেন। এ আন্দোলনে গত এক বছরে তিন শতাধিক জামায়াত-শিবির কর্মী নিহত হয়েছেন। ১০ হাজারেরও বেশি লোক আহত হয়েছেন। দেশের জেলখানাগুলোতে ১৫ হাজারের মতো বন্দি আছে। ঘরবাড়ি ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে ব্যাপকহারে।
কিন্তু আন্দোলনের ফলাফল কী? শেখ হাসিনার পতন ঘটেনি। তিনি ঠিকই আরো ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়ে গেছেন। এটি কিভাবে হলো তা বুঝতে হবে। তাহলে জামায়াত-শিবির বুঝতে পারবে যে তাদের আন্দোলনের আসল সঙ্কটটি কি।
২. শেখ হাসিনা এতো দিন প্রচার করে বেড়িয়েছেন যে জামায়াত নেতাদের ফাঁসি দেয়ার জন্য যেকোনো উপায়ে ক্ষমতায় থাকা তার অধিকার। আবদুল কাদের মোল্লাকে ফাঁসিতে নিহত করার পর তার এই অধিকারকে দেশি-বিদেশি সেক্যুলাররা একাট্টাভাবে মেনেও নিয়েছেন। মেনে নেয়ার ফল হলো তিনি অবাধে একটি এক তরফা নির্বাচন করতে পেরেছেন। যার মাধ্যমে তিনি ৫ বছরের জন্য ক্ষমতায় থাকার ম্যান্ডেট আদায় করে নিয়েছেন। এই ম্যান্ডেট নিয়ে আমরা যা কিছু প্রশ্ন করি না কেন কারাবন্দি বাকি জামায়াত নেতাদের ফাঁসি কার্যকর করে তিনি ঠিকই ম্যান্ডেটের ন্যায্যতা আদায় করে নিতে পারবেন। শেখ হাসিনা যখন বাকি লোকদের ফাঁসি কার্যকর করবেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই জামায়াত-শিবির শেখ হাসিনা পতনে আরো আন্দোলন করবে। যার প্রেক্ষিতে শেখ হাসিনা বলবেন সন্ত্রাসী দল হিসেবে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে হলে তাকে পুরো ৫ বছরই ক্ষমতায় থাকতে হবে। তখন দেশি-বিদেশি সেক্যুলাররা বলবে ঠিক আছে আপনে ৫ বছরই ক্ষমতায় থাকুন।
৩. আমাদের স্বীকার করতেই হবে যে ১৯৭১ ইস্যুতে জামায়াত নেতাদের বিচারের বিষয়টিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে বড় ধরণের বিপর্যয় ঘটেছে। এখানে সবাই বলে বসতেছে যে আমরাও জামায়াত নেতাদের বিচার চাই। আমরা বিচারের বিরোধী নই। কিন্তু তারা কেউই বলছে না যে রাজনৈতিক মতলব হাসিলের এই বিচারের নামে আসলে প্রতিশোধপরায়ণতা চরিতার্থ করা হচ্ছে। প্রতিশোধপরায়ণতার বিষয়টি নিয়ে এখন কারো মধ্যে সন্দেহ থাকারও কথা না। তারপরেও এ ব্যাপারে সবাই চুপ আছে। প্রতিশোধপরায়ণতার ব্যাপারে চুপ থেকে ‘আমরা বিচার বিরোধী নই, আমরাও বিচার চাই’ বলার মাধ্যমে আসলে সবাই কিন্তু এটাই বলে যে আমরাও প্রতিশোধ সমর্থন করি। অথচ বিনাবাক্যে যদি মেনে নিই যে একাত্তরে জামায়াত নেতারা অপরাধ করেছিলেন, তারপরেও কিন্তু প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ নাই। শুধু মাত্র তাদের বিচার করা যায়। যেই বিচারটিতে সত্য উদ্ঘাটন, সংঘটিত ঘটনার প্রতিকার ও ইনসাফ কায়েমের নিশ্চয়তা থাকতে হবে। আর এটি বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দৃশ্যমান হতে হবে।
দুঃখজনক হলো না বিএনপি, না দেশের নাগরিক সমাজ এমনকি মানবাধিকার সংস্থাগুলোও জামায়াত নেতাদের বিচার ইস্যুতে ন্যায্য কথা বলছে না। বেশি দরদীরা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও স্বচ্ছতার কথা বলে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও স্বচ্ছতা বলতে তারা কী বুঝান, কখনোই পষ্ট করেন না। সবাইকে আইসিটি অ্যাক্ট-১৯৭৩, সাক্ষ্য-প্রমাণ-দলিলের আইনী ন্যায্যতা, রাষ্ট্র ও আসামীপক্ষের সমসুযোগ এবং আসামী পক্ষের সাংবিধানিক নাগরিক অধিকার ও মানবাধিকারের ব্যাপারে পষ্ট করে কথা বলতে হবে। এটি জামায়াতকে সমর্থন করার জন্য বলতে হবে বিষয়টি এমন নয়। এখানে রাষ্ট্রের চরিত্র ঠিক রাখার ব্যাপার আছে। সমাজে বিচার-ইনসাফ কায়েমের ব্যাপার আছে। এক ক্ষতের বদলে আরেক ক্ষত তৈরির বিপদ সম্পর্কে হুঁশিয়ার হওয়ার প্রশ্ন আছে।
দুঃখজনক ব্যাপারে শুধু মাত্র ইসলাম বিদ্বেষের জায়গা থেকে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও স্বচ্ছতাপন্থী লোকেরাও চুপ থাকতেছে।
পাশাপাশি জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মুসলিম দেশগুলোও জামায়াত নেতাদের বিচার ইস্যুতে শুধু শুধু বক্তব্য দিয়ে আসলেও কার্যত কোনো কাজের কাজ করে না। বরং আমরা দেখতে পেয়েছি তারা সরকারকে বিচারের নামে প্রতিশোধপরায়ণতা চরিতার্থ করার কাজে সব সময় সমর্থন দিয়ে গেছে। যা নিয়ে অনেকে বিতর্ক করলেও আমি আইসিটি অ্যাক্ট-১৯৭৩ প্রসঙ্গে তাদের অবস্থান সম্পর্কে সবাইকে মনোযোগী হতে বলবো। পাকিস্তানী সেনাদের বিচারের জন্য করা আইনে বাংলাদেশের বেসামরিক নাগরিকদের বিচার করা হচ্ছে এই আইনে। যা পষ্টত জুলুম, অথচ এ ব্যাপারে তারা কেউ কিছু না বলে উল্টো বলে আসছে যে তারা বিচারের পক্ষে। গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বিচার প্রশ্নে দেশ-বিদেশের এই অবস্থানকে অত্যন্ত জোরালোভাব বিএনপি সমর্থন করছে। এবং বিএনপি ক্ষমতায় যেতে এদের সমর্থন পাওয়ার জন্য বিচার ইস্যুতে চুপ থাকতেছে। অথচ রাষ্ট্রপরিচালনায় প্রবল আগ্রহী হিসেবে তাদের বিচার প্রশ্নে ইনসাফের পক্ষাবলম্বন করার দরকার আছে।
৪. আমি মনে করি শেখ হাসিনা পতন আন্দোলন প্রশ্নে বিএনপির অবস্থানটিও সবার বিবেচনা করা দরকার। দলটি সব সময় পষ্ট করে আসছে যে শেখ হাসিনার পতনের মাধ্যমে জামায়াত নেতারা মুক্তি পাক, জামায়াতের এমন অবস্থানের সাথে তারা একমত নন। তারা চান শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, যার অধীনে নির্বাচন হলে তারা ক্ষমতায় যাবেন। জামায়াতের ব্যাপারে ভারতের যে বৈরি অবস্থান তাতেও বিএনপির সায় আছে। জামায়াত ভারতের সাথে যে মতাদর্শিক ও রাজনৈতিক লড়াইয়ে লিপ্ত তাও বিএনপি সমর্থন করেনা। বিএনপি মনে করে ভারতের সাথে সমঝোতা করেই তাকে পথ চলতে হবে। কিন্তু জামায়াতের প্রচারণাবিদরা সব সময় ভারতবিরোধী বক্তব্য দিয়ে আসছে।
৫. সত্য কথা হলো শেখ হাসিনার পতন হওয়া বা না হওয়ার সাথে জামায়াত নেতাদের বিচার হওয়া বা না হওয়ার প্রশ্ন নাই। এই বিচারটি সামরিক ব্যাপার। জরুরি অবস্থার সময় এই বিচারের ইস্যুকে সামনে এনেছিল সেনাপ্রধান মঈন উ আহমেদ। এবং এই ইস্যুতে সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের নামে সাবেক সেনা কর্মকর্তারা মাঠে নেমেছিলেন। আরো পষ্ট করে বললে এই বিচার করতে ওয়াদা করার কারণে ২০০৮ এর ২৯ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসতে যা যা করণীয় তা সেনাবাহিনী করেছে। তারা বাংলাদেশের স্বাভাবিক ভোট দেয়ার হারকে কমপক্ষে ১০ ভাগ বেশি দেখিয়ে আওয়ামী লীগকে ধ্বংসাত্মক বিজয় দিয়েছিল। যারা জামায়াত নেতাদের বিচারকে সামরিক ব্যাপার হিসেবে অস্বীকার করতে চান তাদের আমি আহ্বান জানাই যারা কারাবন্দি আছেন এবং এখনো যারা একাত্তর ইস্যুতে নজরদারির মধ্যে আছেন তাদের সাথে যোগাযোগ করুন। তারপর তাদের জিজ্ঞেস করুন যে, তাদেরকে নিয়মিত নজরদারি করা ও গ্রেফতারের সাথে কোন সংস্থা জড়িত?
জামায়াত নেতাদের বিচার সামরিক ব্যাপার হওয়ার কারণেই এই ৫ জানুয়ারির নির্বাচনেও সামরিক বাহিনী সর্বাত্মকভাবে সরকারকে সমর্থন করেছে। তাদের সহযোগিতার কারণেই সরকার বিরোধী দলের ব্যাপক সহিংস আন্দোলনকে উপেক্ষা করতে পারছে। এখানে সবাইকে খেয়াল রাখতে বলি, এই যে সারা দেশে জামায়াত-শিবির অভিযান হচ্ছে যাতে বিজিবি ও র্যাবের নেতৃত্ব অত্যন্ত পষ্ট। এসব বাহিনীর নেতৃত্বে কিন্তু সামরিক বাহিনীর সদস্যরাই নিয়োজিত আছেন। এমনকি অভিযান পরিচালনাকারী দলের নেতৃত্ব দেন সামরিক বাহিনীর সদস্যরাই। কাজেই বিচারের ব্যাপারটি সামরিক হওয়ার কারণে কোনো দলের বা ব্যক্তির ক্ষমতায় থাকা না থাকা কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নয়।
৬. আমি মনে করি জামায়াত-শিবিরের আন্দোলনের বাস্তবতাও উপলব্ধি করার দরকার আছে। তারা গত এক বছর ধরে নিয়মতান্ত্রিকভাবে আন্দোলন করার সুযোগ পাচ্ছে না। অফিস বন্ধ, মিটিং-মিছিলের অধিকার রহিত। রাস্তায় নামলেই তাদের গুলি করা হচ্ছে। তালিকা ধরে ধরে গ্রেফতার করা হচ্ছে। রিমান্ডের নামে যৌনাঙে ইলেক্ট্রিক শক দেয়াসহ বর্বর নির্যাতন করা হচ্ছে। এর ফলাফল হলো দিনে দিনে জামায়াতের আন্দোলনে লোক সংখ্যা কমে যাচ্ছে। ঢাকায় প্রতি হরতাল বা অবরোধের দিনে সর্বোচ্চ পাঁচ শ’র বেশি লোক নামাতে পারছে না তারা। দেশের অন্যত্রও পরিস্থিতি এর চেয়ে খুব একটা ব্যতিক্রম নয়। ককটেল বিস্ফোরণ ও ঝটিকা মিছিলের কারণে এই চিত্র অনেকের চোখ এড়িয়ে যায় অবশ্য।
আরো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে জামায়াত-শিবিরের ফান্ড সঙ্কট। ট্রাইব্যুনাল, আন্তর্জাতিক মহল ও গ্রেফতার নেতাকর্মীদের জন্য বিপুল পরিমাণে খরচ করতে গিয়ে দলটি এখন তীব্র তহবিল সঙ্কটে ভুগছে। জামায়াত-শিবিরকে যে সব ব্যবসায়ীরা টাকাপয়সা দিতেন তাদের বেশির ভাগই এখন ব্যবসায়িক মন্দার শিকার। বিশেষ করে রিয়েল স্টেট ব্যবসার ধ্বস তাদের এমন কাবু করছে যে তারা এখন অফিস খরচও যোগার করতে পারছেন না।
গ্রাম পর্যায়ে জামায়াতের লোকেরা বেশির ভাগই আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হওয়ায় তারাও ব্যাপক আর্থিক সঙ্কটের মধ্যে পড়েছেন। দোকানপাট,কৃষি, ব্যবসায় সব কিছুই একে একে বন্ধ হয়ে গেছে। এর সাথে রয়েছে মামলা ও থানাপুলিশ বাবদ খরচ। যা এসব মানুষের পক্ষে বয়ে বেড়ানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে গেছে। জামায়াতের তহবিল সঙ্কট অনেকে শিকার না করলেও দলটির তিনটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে আমরা এটি সহজে বুঝতে পারবো। দৈনিক নয়াতিগন্তে নিয়মিত বেতন হচ্ছে না। সরকার বন্ধ করে দেয়ার পর দিগন্ত টিভি ও আমার দেশ কর্মীদের ছাটাই ও বিনাবেতনে বাধ্যতামূলক ছুটি দিতে বাধ্য হচ্ছে।
৭. সামগ্রিক এই পরিস্থিতিতে জামায়াত-শিবিরকেই ভাবতে হবে তারা কী করবেন। সরকার যেই লেবেলে লড়ছে, তাতে করে সরকার পতনের আন্দোলন এখন চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। এটি এখনে আন্দোলন নয় যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। আর যুদ্ধে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয় শক্তির মাধ্যমে। আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি না যে জামায়াত-শিবির যুদ্ধ না করার ঘোষণা দিলেও সরকার তাদের হত্যা-গুম-নির্মূল-গ্রেফতার-নির্যাতন বন্ধ করবে কি না। যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তাতে করে সরকারের দিক থেকে নিপীড়ন বাড়বে বলেই মনে হয়।
এ অবস্থায় বিবেচনায় নিতে হবে যে প্রচলিত আন্দোলন জামায়াত-শিবিরকে ক্ষতিগ্রস্তই করবে। কারণ তাদের উপর পরিচালিত নিপীড়ন সারা দুনিয়াই উপভোগ করে, খুশি হয়। বিশেষ করে এতে সেক্যুলার মানুষদের মধ্যে মানবিকতা জাগে না বরং তারা পুলকিত হয় যে ইসলামপন্থীদের রক্ত ঝরছে। আমরা দেখি মুনতাসির মামুন এখন সংবাদপত্রে কলাম লিখে দাবি জানাচ্ছেন যে, দুই লাখ লোককে হত্যা করতে হবে। জাফর ইকবালও বললেন যে প্রয়োজনে হত্যা করতে হবে। রক্ত পিপাসা কত জঘন্য হয়েছে আশা করি এটা সবাই বিবেচনা করবেন। এখন কথা থাকে যে প্রচলিত আন্দোলন বাদ দিয়ে জামায়াত-শিবির কি স্বশস্ত্র আন্দোলন করবে। আমি যতদূর খোঁজখবর জানি দলটির হাতে অস্ত্র নাই। আন্তর্জাতিকভাবে কোথাও থেকে অস্ত্র যোগার করার সামর্থ ও যোগাযোগও তাদের নাই। আর অস্ত্রের আন্দোলন করতে হলে দরকার হলো আন্তর্জাতিক কোনো না কোনো শক্তির মদদ। জামায়াত-শিবিরের জন্য এমন কোনো মদদ নাই।
সবাইকে খেয়াল করতে বলি জামায়াতের তিনটি লবি থাকার কথা আমরা জানি। ১. যুক্তরাষ্ট্র, ২. সৌদি আরব, ৩ পাকিস্তান। যুক্তরাষ্ট্র জামায়াতকে নিয়ে স্রেফ খেলতেছে। সৌদি আরব সর্বাত্মকভাবে জামায়াত বিরোধী অবস্থান নিয়েছে। এটা জেএমবি দমনের সময় সালাফী ও আহলে হাদীসের লোকদের নির্বিচারে নিপীড়ন করার কারণে এবং রোহিঙ্গাদের জন্য দেয়া তহবিলের অস্বচ্ছতার কারণে। সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো তুরস্ক-ব্রাদারহুড লাইনের সাথে যোগাযোগ রাখায় সৌদি আরব জামায়াতের উপর ব্যাপক বিরক্ত ও রুষ্ট। যারা সৌদি গোয়েন্দাগিরি সম্পর্কে ধারণা রাখেন তারা বুঝবেন যে দেশটি কিভাবে তার মিত্রদের উপর নজর রাখে। পাকিস্তানের বিষয়টি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি এখন চীনা লবিতে অবস্থান করছে। বলা যায় দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র-ভারত মিতালীর পাল্টা লবি হলো চীন-পাকিস্তান। পাকিস্তান নানা ভাবে জামায়াতকে সহযোগিতা করে ঠিক। কিন্তু জামায়াতের মাত্রাতিরিক্ত যুক্তরাষ্ট্রপ্রীতি ও চীন বিদ্বেষের কারণে এই সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারছে না, যা কৌশলগত কিছুর জন্ম দিতে পারে।
আমি মনে করি সামগ্রিক পরিস্থিতিতে জামায়াতের সামনে দুটি পথ খোলা-
১. বর্তমান পরিস্থিতি
গণতান্ত্রিক ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করা। সহিংসতা থেকে দূরে সরে যাওয়া। ঘোষণা দিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় সমবেত হওয়ার চেষ্টা করা। বিক্ষোভ, মিছিল, মানববন্ধ ও অনশনের মতো কর্মসূচি পালন করা।
সব কিছুর আগে তাদের ১৯৭১, নতুন সংবিধান ও জনগণের অধিকার-সুযোগের ব্যাপারে এমন বিস্তারিত অবস্থান ঘোষণা করতে হবে যার ফলে তাদের আন্দোলন জামায়াত-শিবিরের আন্দোলনের বদলে জনগণের আন্দোলনে পরিণত হতে পারে।
২. দমনের পরের পরিস্থিতি
জামায়াত যদি তার অবিবেচক অবস্থান বহাল রাখে বা না রাখে সরকার আগামী ছয় মাস একটা দমনাভিযান চালাবে এটা নিশ্চিত। এর মধ্যে জামায়াত নেতাদের ফাঁসি, সন্ত্রাসবাদী দল হিসেবে নিষিদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের নির্মূল বা গ্রেফতারের ব্যাপার রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে আত্মরক্ষার আত্মগোপন ও রাজনৈতিক দল ভিত্তিক আন্দোলন ছেড়ে গণসংগঠন ভিত্তিক আন্দোলন করতে হবে। যার রূপরেখা সম্পর্কে গতকাল আমি ধারণা দিয়েছি, এ নিয়ে চিন্তা করা যেতে পারে।





”সব কিছুর আগে তাদের ১৯৭১, নতুন সংবিধান ও জনগণের অধিকার-সুযোগের ব্যাপারে এমন বিস্তারিত অবস্থান ঘোষণা করতে হবে”
জামায়তকে বিস্তারিত কথা বলতে হবে, এটা দীর্ঘদিনেরই দাবি। কিন্তু জামায়াত কথা বলছে না। অনেক গবেষকরাই ৭১ সালে জামায়াতের অবস্থানের বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এ ব্যাপারে জামায়াতকে অফিশিয়ালি একটা ব্যাখ্যা দিতে হবে। জামায়াত যে পাকিস্তানপন্থী ছিল, এটা একটা বাস্তবতা। কেন তারা পাকিস্তানের পক্ষে ছিল? এই প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর তাদের দিতে হবে। যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা দিলেও অনেকে হয়ত তা প্রত্যাখ্যান করবে। কিন্তু একেবারে চুপ থাকার চেয়ে এই আওয়াজ তোলাটা ঢের ভাল হবে।
জামায়াতকে বলতে হবে, একাত্তরের ভূমিকা ছিল পাকিস্তান আন্দোলনকে টিকিয়ে রাখার জন্য। তবে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেই আন্দোলনের যথার্থতা ফুরিয়ে গেছে। এক্ষেত্রে তারা ইতিহাসের কিছু ঘটনা সামনে আনতে পারে। আমেরিকান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় অনেক আমেরিকানই ব্রিটেনের আনগত্য করেছিল, তাই বলে তাদেরকে স্বাধীনতার পর অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়নি।
এসব কথা তুলতে যতটা দেরি হবে ততোটাই ক্ষতি হবে।
সমস্যা হল, জামায়াতের মূল লিডারশীপের পক্ষে এতদিক চিন্তা করে নীতি নির্ধারণ করাটা কঠিন। দোয়া করি, যেন তারা সময় উপযোগী সিন্ধান্ত নিতে পারেন।