আমি মনে করি ইসলামের সম্ভাবনা সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে ‘পলিটিক্যাল ইসলাম’ এর সীমাবদ্ধতা ও ভ্রান্তির বিষয়ে পষ্ট ধারণা তৈরি করা দরকার। এক্ষেত্রে ‘ইসলামের পলিটিক্স’ ও ‘পলিটিক্যাল ইসলাম’ কেন এক ব্যাপার নয় তা পষ্ট করতে হবে।
এরপর গুরুত্বপূর্ণ হলো ইসলামের নাম করে ‘পার্টি’ আর জামায়াত গঠনের মধ্যে তফাত কি? ইসলাম কি পার্টি গঠন অনুমোদন করে কি না, পার্টি গঠন কিভাবে শেষ পর্যন্ত গোত্রবাদ ও রাজতন্ত্রের ফেতনা তৈরি করে তার হদিসটাও আমাদের আমলে নিতে হবে।
ইসলামে পার্টি তৈরি হওয়ার মুশকিল বুঝতে হলে নবীর পর আনসার ও মুহাজিরদের ক্ষমতার দ্বন্দ্বের সময় আনসরার কিভাবে পার্টি না হয়ে সমাজকেই ধারণ করেছেন তা আমাদের জানা দরকার। একই সাথে মুহাজিররা কিভাবে পার্টি মানে গোত্রে বিভক্ত হয়ে যেতে থাকলো এবং সেই বিভক্তি কিভাবে নতুন মুসলমানদেরও প্রভাবিত করলো তাও আমরা জানবো নিশ্চয়।
এই বহুত আগের ইতিহাসকে আমরা সহজ করেই বুঝতে পারবো যদি জামায়াতে ইসলামী গঠন, এর মধ্যে ভিন্নমতের অপসারণ ও পার্টি আমলাতন্ত্রের আধিপত্য অর্জনের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় আনি।
পার্টি আমলাতন্ত্র ইসলামী আন্দোলনের সবচেয়ে বড় গলতির দিক।এই আমলাতন্ত্রকে ‘নেতৃত্ব’ তকমা দিয়ে শুধু আড়ালই করা হয় না। ‘নেতৃত্বের’ নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখেত চরম প্রতারণা করা হয়। দাবি করা হয় পার্টির ‘নেতৃত্ব’ নাকি ‘উলিল আমর’। এবং ‘উলিল আমরের’ আনুগত্য করার আদেশকে নেতৃত্বের আনুগত্য করার দলিল হিসেবে হাজির করা হয়।
আমরা যদি পার্টি ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করি তবে দেখতে পাই মুসলমানদের মধ্যে কোনো পার্টির দুর্বল নেতৃত্বকে উলিল আমর বলা হচ্ছে, অথচ একই সময়ে মুসলিম সমাজে পার্টি নেতৃত্বের চেয়েও বেশি পরহেযগার, জ্ঞানী ও যোগ্য লোক রয়েছেন। শুধু পার্টি না করার কারণে তাদের ‘উলিল আমর’ মনে করা হয় না। পার্টি নেতৃত্বের বাইরে উলিল আমর নাই মনে করার কারণেই পার্টি ইসলাম কখনোই মুমিনদের তথা উম্মার ইত্তেহাদ কায়েম করে না, বরং নিজেরা অনৈক্য তৈরি করে অন্যদের উপর দায় চাপায়।
পার্টি আমলাতন্ত্রকে উলিল আমর হিসেবে হাজির করাটা কেন প্রতারণা বলছি তাকে আমরা ১৯৭১ দিয়ে বিবেচনায় নিতে পারি। মুক্তিযুদ্ধর আগে কেন্দ্রীয় জামায়াত বলেছে জনগণ যা চায় সমর্থন করুন। এ জন্য পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতকে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। এমনকি ২৪ মার্চ পর্যন্ত শেখ মুজিবকে জামায়াত সমর্থন করেছে। পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের শুরা বৈঠকে এমন সিদ্ধান্তও হয়েছে যে দুই পাকিস্তানের স্বাধীন সত্ত্বা ও কনফেডারেশনের পক্ষে থাকবে দলের নেতাকর্মীরা।
কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি ২৫ মার্চের হত্যাযজ্ঞের পর পার্টি আমলাতন্ত্র একক সিদ্ধান্তে টিক্কা খানদের দরবারে চলে গেল! এরপর পুরো ৯ মাস যা কিছু সিদ্ধান্ত হয়েছে, তাও নেয়া হয়েছে আমলাতন্ত্রের খায়েশ অনুসারে। শুরা ও দলের সবার সম্মতি নেয়া হয়নি। সব কিছুই তো চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। কোনো কার্যবিবরণী নাই, লিখিত সিদ্ধান্ত নাই। অথচ এখতিয়ার বহির্ভূতভাবে ছাত্রসংঘের আমলাতন্ত্রের সাথে যোগসাজশ করে সংগঠনটিকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর অপব্যবহারের শিকার করা হলো।
অথচ অনেক জায়গাতে জামায়াত ও ছাত্রসংঘের লোকজন মুক্তিযুদ্ধে শামিল হয়ে গিয়েছিল। তারা সেই যে ১৯৭১ এ পার্টি আমলাতন্ত্রের সিদ্ধান্তে বাইরে গেছে তো এখনও বাইরেই আছে।
আমি মনে করি ইসলামী রাজনীতিতে পার্টি আমলাতন্ত্রের অভিজ্ঞতা আমাদের সবাইকে বিবেচনায় নিতেই হবে। আপনি ইসলামের জন্য কতজন শহীদ হয়েছে বলে মুমিনদের বডি কাউন্ট করে আত্মতৃপ্ত থাকবেন আর বলবেন না যে ১৯৭১ এ জামায়াতের ২৮শ’ লোক প্রাণ হারিয়েছিল। এই ধামাচাপা কেন?
আমার সব শেষ কথা হলো জামায়াতের নেতৃত্বের আচরণ, কান্ডজ্ঞান ও এলেমের সীমাবদ্ধতাকে চিহ্নিত করে একটি সংস্কারবাদী চিন্তা গঠনের চেষ্টা চলছে। এই সংস্কারবাদ জামায়াতের ভেতরকার ভিন্নমত চর্চা ও সংগঠনটির আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে সামনে রেখে কিছু কৌশলের কথা বলছে। যা দিয়ে তারা স্মার্ট নেতৃত্ব কায়েম ও সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করার আশা করেন।
আমি মনে করি এই সংস্কারবাদী চিন্তা সফল হবে না। কারণ এই চিন্তা রণনৈতিক সঙ্কট উত্তরণের করণকর্তব্যকে আড়াল করে। ভুল রণনীতি বহাল রেখে রণকৌশলগত সংস্কার দুর্বল রণকৌশলের অসুবিধা হয়তো দূর করবে। কিন্তু ভুল রণকৌশলের চেয়ে বেশি ক্ষতি করে যেই ভুল রণনীতি তার ক্ষতি থেকে কিভাবে রক্ষা হবে?
আমরা তো দেখছি যে জামায়াতে ইসলামীর মতো নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতা না থাকা সত্ত্বেও ব্রাদারহুডসহ অন্যান্য পলিটিক্যাল ইসলামী পার্টিগুলানও ব্যর্থ হচ্ছে, পরাজিত হচ্ছে। আজকে বাংলাদেশের সংস্কারবাদীরা যা যা প্রস্তাব করছেন বা চিন্তা করছেন তা তো অন্যরা ব্যাপকভাবে করে ব্যাপক গণভিত্তি অর্জন করেছেন তারপরেও তাদের কিন্তু ক্লিনজিংয়ের শিকার হতে হচ্ছে।
সত্যিকারের ব্যাপার হলো রণনীতির পুনর্গঠনের পরই সংস্কারপন্থার জনসেবা বা খেদমত প্রস্তাব গ্রহণ করা চলে। তার আগে এসব প্রস্তাবকারী মুমিনদের মেহনত ও ত্যাগ বর্তমানের পার্টি ইসলামিস্ট ভাইদের মেহনত ও ত্যাগের মতোই বৃথা ব্যাপারে পরিণত হবে




