জামায়াতে ইসলামীর সংস্কার নিয়ে গত কয়েক বছরে প্রচুর আলাপ-আলোচনা হয়েছে। ব্যাপারটা এমন একটা পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে যে, জামায়াতের মধ্যে এখন দুইটা গ্রুপ আছে বলা যায়। মোটা দাগে এদেরকে নব্য সংস্কারপন্থী গ্রুপ, আর সংস্কারবিরোধী গ্রুপ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। বলাবাহুল্য, জামায়াতে সংস্কারবিরোধী গ্রুপই মেইনস্ট্রিম। সংস্কারপন্থীরা সেখানে কোনঠাসা অবস্থায় আছে।
জামায়াতের সংস্কার ইস্যু আসলে নতুন কোনো বিষয় নয়। স্বাধীনতার পর মাওলানা আব্দুর রহীমের নেতৃত্বে আইডিএল গঠনকে এক ধরনের সংস্কার প্রক্রিয়া বলা যেতে পারে। তারপর ১৯৮২ সালে ইসলামী ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সভাপতি আহমদ আব্দুল কাদের বাচ্চুর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুতে জামায়াতের ভূমিকা পর্যালোচনা করতে যে কমিটি হয়েছিল, সেটাকেও এক ধরনের সংস্কার প্রক্রিয়া বলা যায়। তবে সাম্প্রতিককালে জামায়াতের সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা উসকে দিয়েছে ২০০৯ সালের শিবিরের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নির্বাচনের ঘটনা। অভ্যন্তরীন কোন্দলের জের ধরে শিবিরের মেধাবী ও তুলনামূলক যোগ্যতাসম্পন্ন নেতারা একযোগে পদত্যাগ করে। জামায়াত নেতৃত্বের অনুগত নেতারা শিবিরের নেতৃত্বে পাকাপোক্তভাবে গেড়ে বসে। তারপর থেকে সংস্কারপন্থীরা অনলাইনে সংস্কারের পক্ষে তাদের মতামত তুলে ধরতে থাকে। তবে জামায়াতের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সংস্কারপন্থীরা ধীরে ধীরে কোনঠাসা হয়ে পড়ে।
এদিকে, জামায়াতের মধ্যেও একটা গ্রুপ সংস্কারের পক্ষে নানা সময়ে কাজ করেছে। বিশেষত, জামায়াত শিবিরের যেসব জনশক্তি দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষা কিংবা জীবিকার জন্যে গিয়েছে, তারা সংস্কারের পক্ষে কাজ করেছে। তারা দেশের বাইরে গিয়ে অন্যান্য দেশগুলোর ইসলামী আন্দোলনের তৎপরতা, কর্মকৌশল দেখেছে। দেশের ক্ষুদ্র গন্ডির বাইরে গিয়ে ‘বিশ্ব-ব্যবস্থা’র (World Order) তারা সাথে পরিচিত হচ্ছে। ফলে নিজ দলের সাথে এসব অভিজ্ঞতার তুলনা করতে পেরেছে। এসবের ফলে তারা জামায়াত-শিবিরকেও যুগোপযোগী করতে উদ্যোগী হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় জামায়াতের নেতৃবৃন্দের মধ্যে যারা সংস্কারপন্থার পক্ষে ছিল, তারাও একাধিকবার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্ব একে কখনোই ভালো চোখে দেখেনি। ফলে সংস্কারপন্থীদের আশা বার বার দূরাশায়ই পরিণত হয়েছে।
‘কামারুজ্জামানের চিঠি এবং জামায়াতের সংস্কার প্রসঙ্গ’ শিরোনামের বইটার একটা বিশেষত্ব হচ্ছে, পুরো বইটা জামায়াতের সংস্কারের পক্ষে ও বিপক্ষে দলটির নেতৃবৃন্দ ও বুদ্ধিজীবীদের লেখা, বক্তব্য ও চিঠির সংকলন। কামারুজ্জামানের মৃত্যুর পর তাঁর চিঠির একটা আবেদন নিঃসন্দেহে রয়েছে। জামায়াতের নেতৃবৃন্দের উদ্দেশ্যে লেখা এই চিঠিতে তিনি তাঁর অবস্থান বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। এই চিঠির পাল্টা হিসেবে কামারুজ্জামানেরই সম্পাদিত সাপ্তাহিক সোনার বাংলায় জামায়াতের মহিলা বিভাগের প্রধান ও জামায়াত আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর স্ত্রী শামসুন্নাহার নিজামী দুই পর্বে কলাম লিখেছিলেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, প্রায় পাঁচ বছর আগে কামারুজ্জামান যা যা বিশ্লেষণ করেছেন, তার সবগুলোই সময়ের ব্যবধানে সত্যে পরিণত হয়েছে। আমি ভাবি যে, কামারুজ্জামানের শাহাদাতের পর এই চিঠি কি মিসেস নিজামী কিংবা সংস্কারবিরোধী জামায়াত নেতৃত্বের সামনে ধ্রুব সত্য হয়ে বার বার ফিরে আসে না? তারা কি তাদের অবস্থানের জন্যে বিন্দুমাত্রও লজ্জিত হয় না?
সংস্কারের উদ্যোগ কেন ব্যর্থ হচ্ছে?
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, সংস্কারপন্থীদের ব্যক্তিগত লাভালাভের ব্যাপার না থাকা সত্ত্বেও জামায়াত সংস্কারের উদ্যোগ কেন ব্যর্থ হচ্ছে? জামায়াতের সংস্কার না হওয়ায় কারা লাভবান হয়েছে- এরমধ্যে এই প্রশ্নের আংশিক উত্তর নিহিত আছে। বইটার ভূমিকায় সংকলক একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন,
“জামায়াত কখনো স্বতঃস্ফূর্ত ও স্থায়ী সংস্কারে ব্রতী হবে না- আজ থেকে পাঁচ/সাত বছর আগে খুব কম লোকেই তা বিশ্বাস করতো। আমি তাদের অন্যতম। ২০১০ সালে আমি ‘সোনার বাংলাদেশ’ ব্লগে জামায়াত সম্পর্কে আমার বক্তব্য তুলে ধরেছিলাম, যা ‘ফোর পয়েন্টস’ হিসাবে পরিচিত। তখন আমার বিভিন্ন লেখায় নানাভাবে তা তুলে ধরেছি। এর মূল কথা হলো:
(ক) জামায়াত কখনো কোনো স্বতঃস্ফূর্ত ও মৌলিক পরিবর্তনকে গ্রহণ করবে না।
(খ) নানা কারণে এই মুহূর্তে বিকল্প জামায়াত প্রতিষ্ঠার চেষ্টাও বাস্তবসম্মত নয়।
(গ) ‘ইসলামী আন্দোলনে’র ধারণা মোতাবেক ‘দেখি না কী হয়’, ‘অন্যরা করুক’, ‘আমি তো বলেছি’ বা ‘সবাই করলে আছি নয়তো নাই’– এই ধরনের মনোভাবও গ্রহণযোগ্য নয়।
(ঘ) অতএব, সংশ্লিষ্টদের উচিত নতুন শতাব্দীর প্রেক্ষাপটে ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের ধারণাকে পুনর্গঠনের কাজ করে যাওয়া।
শেষ পর্যন্ত কী হবে– তা সময়ই বলে দিবে।”
তারমানে, বইটা জামায়াতের সংস্কার প্রসঙ্গে হলেও সংকলক মোটামুটি নিশ্চিত যে, জামায়াত কখনোই প্রয়োজনীয় সংস্কার করবে না। অতএব, সংস্কারপন্থীদের করণীয় কী? শুধুই সমালোচনা করে যাওয়া? সংকলন সে পথও বাতলে দিয়েছেন। তিনি অনাহুত সমালোচনার পরিবর্তে বরং নতুন শতাব্দীর প্রেক্ষাপটে ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের ধারণাকে পুনর্গঠনের কাজ করে যেতে আহ্বান করেছেন। এই পয়েন্টটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
বইটার আরেকটা গুরুত্ব হচ্ছে, সংস্কার নিয়ে এ যাবৎ সকল কথাবার্তা মূলত অনলাইন কেন্দ্রিক ছিল। এই বইয়ের মাধ্যমে জামায়াতের সংস্কার প্রসঙ্গ বই আকারে অফলাইনে আসলো। এবং এ সংক্রান্ত একটা দলীল হয়ে থাকলো। এতে হয়তো সংস্কার প্রক্রিয়ার কোনো অগ্রগতি হবে না, তবে কামারুজ্জামান যে ‘নতুন প্রজন্মে’র কথা বলে গেছেন, ভবিষ্যতে তাদের জন্যে হয়তো বইটা কোনোভাবে কাজে লাগবে!
…………………………………………………………….
কামারুজ্জামানের চিঠি এবং জামায়াতের সংস্কার প্রসঙ্গ
সম্পাদনা: মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক
প্রথম প্রকাশ: এপ্রিল ২০১৫
দাম: ২২০ টাকা।
প্রাপ্তিস্থান:
ঢাকা: রিভেরি পাবলিকেশন, কাঁটাবন।
চট্টগ্রাম: চকবাজার ও আন্দরকিল্লার বইয়ের দোকানসমূহ




