আওয়ামী লীগ চায় অনন্ত কাল ধরে মুক্তিযোদ্ধা-রাজাকার বাইনারিটা ধরে রাখতে। এই কাজটা তারা করে ৭১ এর rhetorics আর সিম্বলিজম ব্যবহার করে। এই পালে হওয়া দেয় মিডিয়া আর অনলাইন এক্টিবীরেরা। আওয়ামী লীগের জন্য এই ব্যবস্থা উত্তম কেননা এর মাধ্যমে তারা বিপর্যয়কর ব্যর্থতা আড়াল করতে পারে। মিডিয়া, অনলাইন এক্টিবীরেরা অবশ্য শুধু এই জন্য পালে হওয়া দেয় না – তারা ইসলামিস্টদের (ইসলামিস্ট বলতে পলিটিকাল ইসলামের কথা বলছি, এই মুহুর্তের বাস্তবতায় জামাত) ঠেকানোর জন্যেও ফিদা।
আপনি যদি আগামী এলেকশানে আওয়ামী লীগ জিতুক – শুধুমাত্র এই নিয়তে অনলাইনে বিচরণ করেন তাহলে অন্তত ড্যামেজ কনট্রোলে আপনার দলকে সার্ভিস দিচ্ছেন – সেজন্য আপনাকে অভিবাদন কিন্তু আপনি যদি ইসলামিস্টদের ভয়/ঘৃণা/অপছন্দ করেন তাহলে আপনি আপনার বিপর্যয় ডেকে আনছেন – কিছুদিন অপেক্ষা করেন, নিজেই বুঝতে পারবেন।
শাহবাগ কার্যকারিতার দিক থেকে ব্যর্থ হোলো কেন? মূলত চার কারণে: যে দাবী নিয়ে তারা শুরু করেছিলো সেই দাবীতে তারা দাড়ায়ে থাকতে পারে নি, পুরা শাহবাগ আওয়ামী লীগের দখলে চলে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ উৎসাহ হারায়, আন্দোলনটা লীডারলেস হওয়ায় (যদিও লীডারলেস হওয়ার জন্যেই ইনিশিয়াল মোমেন্টাম পায়) এবং রাজীবকে own করতে গিয়ে (শাহবাগ ব্যর্থ হওয়ার মানে কিন্তু আবার এই না যে সাধারণ জনগণ এখন আর রাজাকারদের ফাঁসি চায় না; আন্দোলন হিসাবে শাহবাগ ব্যর্থ, কিন্তু ফাঁসির দাবী জোড়দার করায় ব্যর্থ না)। তবে এই ব্যর্থ হওয়াটা অকুপাই ওয়াল স্ট্রিটের মতো নিজে নিজে স্তিমিত হয়ে যায় নি, একটা প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হয়েছে। প্রতিক্রিয়াটা কার?
ইসলামিস্টদের। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম শিক্ষিত আরবান মিডল ক্লাস য়ুথের আন্দোলন thwart করেছে ইসলামিস্টরা। কীভাবে করেছে, কেন করতে পেরেছে এ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হতে পারে কিন্তু ফ্যাক্ট অফ দা ম্যাটার ইজ – অর্থের জোড়ে হোক, আমার দেশের কারণে হোক, ধর্মবিষয়ে মানুষের অজ্ঞতার কারণে হোক কিংবা আওয়ামী বিদ্বেষের কারণেই হোক, জাতীয়তাবাদের কার্ড ওভারট্রাম্প হয়েছে ইসলামের কার্ড দিয়ে।
৭১ এর rhetorics আর সিম্বলিজম যে এখন আর কাজ করছে না, এটাই তার প্রমাণ – আমার দেশ, নয়া দিগন্ত ছাড়া পুরা মিডিয়া এই প্রকল্পে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করার পরও। শহুরে শিক্ষিত লোকেরা চাঁদে সাইদী দেখা নিয়ে হাসাহাসি করছেন কিন্তু এর গুরুত্ব এবং বিপদটা অনুধাবন করতে পারছেন না। যে এই মাস-হিস্টিরিয়ায় আক্রান্ত সে আপনাকে কী মনে করছে? সে মনে করছে আপনি যে সাইদীকে দেখছেন না এর কারণ আপনি নামাজ পড়েন না কিংবা আপনার ঈমান নাই। অর্থাৎ সাইদীকে দেখা-নাদেখার মধ্যে ইসলাম প্রশ্নে নিজের অথেনটিসিটি প্রমাণ করতে চায়। মনে রাখবেন সাইদীকে চাঁদে না দেখলে সে গ্রামে একঘরে হয়ে পড়তে পারে দেখে সাইদীকে “চাঁদে দেখতে বাধ্য” হয়। প্রথমে সে বাধ্য হয় তারপর সে “আসলেই” দেখে – স্কিজফ্রেনিকরা এভাবেই বাথরুমের মধ্যে ডাইনোসর দেখতে পায়। আপনি কার্টুন আঁকেন, সনি লিওন – সাইদীকে নিয়ে তামাশা করেন ঠিক আছে, সেই ছবিতে লাইক দেয় ৫০০ জন (এর মধ্যে আবার ২০০ জন প্রবাসী – মানে ভোট দিবে না) – মনে করেন যে বিশাল গণসচেতনতা সৃষ্টি হচ্ছে। এই দিকে গ্রামে যে এক ডাকেই এক হাজার ভোটার চাঁদে সাইদীকে দেখা শুরু করলো – এই দিকে কোনো চিন্তাই নাই। আপনার আগ্রহ absolute truth নিয়ে কিন্তু statistics, absolute truth এর ধার ধারে না।
মাঠের বাস্তবতা হোলো এই যে আপনি যতো বেশী ৭১ এর rhetorics আর সিম্বলিজম ব্যবহার করবেন ততো বেশি ইসলামিস্টদের সার্ভিস দিবেন। কীভাবে? আপনার ডিভাইসিভ পলিটিক্সের অডিয়েন্স যারা সে তো আগের থেকেই “আলোকপ্রাপ্ত” – মানে আপনার ভাষায় আওয়ামী লীগ – বিএনপি- বাম রাজনীতি করে। ইসলামিস্টরা তো এই মুহুর্তে আর আপনার ভোট আশা করে না, (খুব বেশি হলে সে চায় আপনি এতোটুকু মানেন যে আমি অন্তত আর সবার মতো দুর্নীতিগ্রস্থ না)। তার যে অডিয়েন্স (মানে অশিক্ষিত মেজরিটি), সেইখানে তো সে “নতুন” পপুলার সাপোর্ট তৈরী করতে পারছে, যেটা আগে পারে নি। তার অডিয়েন্সকে তো সে বোঝাতে পারছে যে আপনার ঈমান নাই, আপনি নাস্তিকদের পক্ষে। মোদ্দা কথা হোলো আপনার ডিভাইসিভ পলিটিক্সের রিঅ্যাকশনএ সে এমন একটা ডিভিশন তৈরী করছে যেটা রাজনীতির প্রশ্নে আগে উপস্থিতই ছিলো না। আপনি আবারও সমালোচনা করবেন যে এই যে জামাতি প্রপাগান্ডার মাঝে না আছে সত্য, না আছে ইসলাম (not that it matters), না আছে সভ্যতা – কিন্তু পপুলার সাপোর্ট তো আর লিগ্যালিটি-মোরালিটির ধার ধারে না। মনে রাখবেন আপনার ডিভিশনে আওয়ামী লীগের ভোট যাবে বিএনপিতে কিংবা উল্টাটা হবে (কিন্তু কখনোই জামাতের ভোট বাম কিংবা আওয়ামী লীগে যাবে না) । অন্য দিকে সে যেই ডিভিশন তৈরী করছে তাতে নিজে তো একটাও ভোট হারাবে না উল্টা আওয়ামী লীগকে যে আগে ভোট দিয়েছিলো কিন্তু এখন চাঁদে সাইদীকে দেখে – তার ভোটও কাটবে (আলাদা এলেকশান করলে পরিস্থিতি পুরা ভিন্ন কিন্তু এই ডিভিশনে জামাতের হারানোর কিছু নাই) ।
জেহাদী জোশে এসে আপনি মনে করছেন যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মুক্তিযোদ্ধা-রাজাকার এসব দিয়ে ইসলামিস্টদের নির্মূল (আক্ষরিক অর্থে না) করবেন। বাস্তবতা হোলো ইসলামিস্টদের কন্টেন করা সম্ভব, এলিমিনেট করা অসম্ভব (আপনার তো আবার আমার মতো জানের মায়া অনেক, মানে জেহাদী জোশ হয় ফেসবুকে, নয় তো পুলিস প্রোটেকশানে – এমন কি ছাত্রলীগের সমানও না। ইসলামিস্টরা আবার বেহেস্তে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব। মরার জন্য এন্তেজার মানুষদের সাথে ব্যাটল জিতা সম্ভব, যুদ্ধ জিতা সম্ভব না – কারণ আপনি যেইটারে আপনার বিজয় মনে করছেন সে সেইটারেও নিজের বিজয় মনে করছে – তার জন্য এইটা ultimate win-win scenario)।
মনে রাখবেন, এই দেশে জাতীয়তাবাদ আর মুক্তিযুদ্ধের কার্ডকে শুধু একটাই কার্ড ওভারট্রাম্প করতে পারে: ইসলাম কার্ড – এটা রিয়ালিটি। চিরকাল এমন থাকবে তার কোনো নিশ্চয়তা নাই, কিন্তু এই মুহুর্তে আপনি যদি সেটা অস্বীকার করেন, সরি টু সে, আপনি খুব বেশি সময় ফেসবুকে কাটাচ্ছেন। ইসলামিস্টদের কন্টেন করার দুইটাই উপায়: good governance এবং তার ইসলাম কার্ড খেলতে না দেয়া। গত বিশ বছরে জামাতের ভোট কমে আসার কারণ: সে তার নিজের মত করে ইসলাম কার্ড খেলতে পারছিলো না যেটা এখন পারছে। আপনি এবং যদি আপনি আওয়ামী লীগ করেন তাহলে আপনার দল যেহেতু যুদ্ধাপরাধীদের বিচারটাকে বিচার রাখেন নাই, রাজনীতি বানিয়েছেন সেও রায়টাকে আর রায় রাখে নাই, ধর্মযুদ্ধ বানিয়েছে – এতে কি আশ্চর্য হওয়ার কিছু আছে?
যারা জাতীয়তাবাদ দিয়ে জামাতকে নির্মূল করবেন বলে মনস্থির করছেন তারা সম্ভবত তাদের শক্তিশালীই করছেন।




