২৩ অক্টোবর’১৪ তারিখে দিবাগত রাত ১১.০০টার দিকেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে অধ্যাপক গোলাম আযম এর মৃত্যুর খবর। মৃত্যুর কথা প্রচারের সাথে সাথেই লোক জড়ো হতে শুরু করে উনার বাসাসহ হাসপাতালের চারপাশে। ২৪-অক্টোবর শুক্রবারে লাশ দেখার জন্য বাসার চারপাশে এক ধরণের অঘোষিত বা অর্ধঘোষিত জন সমাবেশ ঘটে। ২৫ অক্টোবর বায়তুল মোকাররমে জানাজার সময় উপস্থিত হয় লক্ষ লক্ষ কিংবা হাজার হাজার জনতা। জানাজায় জন-উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়। বায়তুল মোকারম তার জন্মাবধি কোন জানাজায় এমন উপস্থিতি লক্ষ্য করার কথা নয়। সচিবালয়ের কর্ণারের পল্টনের চার মাথা থেকে কাকরাইল পর্যন্ত, সামনে বায়তুল মোকারমের উত্তর-গেট সংলগ্ন রাস্তায়, দক্ষিণ গেট হতে গুলিস্তানের চারপাশ-শুধু লোক আর লোক। অবিশ্বাস্য। নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা সত্যিই কঠিন। এত লোকের উপস্থিতি একদিকে যেমন আনন্দের, তেমনি ভয়ের কারণ। কারণ এই উপস্থিতি যেমন পারে কর্মীবাহিনীকে উদ্বেলিত করতে, তেমনি পারে মিসলিড করতে। এই উপস্থিতির সম্যক বিশ্লেষণ পলিসি মেকারদের জন্য অত্যাবশ্যক।
উপস্থিতি মোট কত হাজার কিংবা কত লক্ষ তা সঠিক ভাবে নির্ণয় করা না গেলেও- কোন নেতার জানাজায় উপস্থিতির সংখ্যা হিসাবে তা যে নিকট-ইতিহাসের একটি রেকর্ড এটি নিয়ে কাউকে বিন্দুমাত্র সন্দেহ পোষণ করতে দেখা যায়নি। দেশ-বিদেশের প্রিন্টিং এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াগুলোর আলোচনাতেও এর স্বাক্ষ্য মেলে। পজেটিভ কিংবা নেগেটিভ, যে দৃষ্টিকোণ থেকেই করা হোক না কেন- বাংলাদেশের মিডিয়ায় জানাজা পরবর্তী কয়েক দিন ছিল বাংলাদেশের টিভি-টক-শো’র প্রধানতম আলোচনার বিষয়। এই আলোচনা মিডিয়াগুলো তাদের দায়বদ্ধতা থেকে করেনি বরং তারা করতে বাধ্য হয়েছে। আর বলতে গেলে এর সিংহভাগ কৃতিত্ব সাবেক এই আমীর-এ জামায়াত এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর।
জানাজায় উপস্থিত এই লোকদের উপর একটি সীমিত গবেষণা পরিচালনা করা হয়। নমুনায়ন পদ্ধতিতে। অনুসরণ করা হয় এদনোগ্রাফিক বা এ্যানথ্রোপলোজিক্যাল পদ্ধতি। কারো সাথে ডাইরেক্ট কোন প্রশ্ন জিজ্ঞেস না করে বরং গল্প বা কথাচ্ছলে জানার চেষ্টা করা হয় গবেষণার কাংখিত বিষয়গুলি। এদের নির্বাচন করা হয় এদের বয়স, শিক্ষা এবং অন্যান্য আর্থ-সামাজিক অবস্থার ভিত্তিতে। মূলত শিক্ষার বিষয়টি নির্বাচনের সময় দুটো বিষয়ের উপর লক্ষ্য রাখা হয়- একটি শিক্ষার ধরণ এবং অন্যটি শিক্ষার স্তর। শিক্ষার ধরণ মূলত জেনারেল শিক্ষা এবং মাদ্রাসা শিক্ষা-ব্যবস্থা । আর উভয়ই শিক্ষার ক্ষেত্রেই খেয়াল রাখা হয় তাদের অর্জিত শিক্ষার স্তরের দিকে। বয়সের ভিত্তিতে এদের কে বিভক্ত করা হয় তরুণ/যুবক, প্রাপ্ত বয়স্ক, বৃদ্ধ। সকল বয়স গ্রুপের ক্ষেত্রেই লক্ষ্য রাখা হয় এদের আর্থ-সামাজিক অবস্থান এবং শিক্ষাস্তরের দিকে।
এই গবেষণার মূল উদ্দেশ্য ছিল যারা এ জানাজায় উপস্থিত তাদের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্ক জ্ঞাত হওয়া এবং জামায়াতের রাজনীতির বাইরে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি সনাক্তকরণের চেষ্টা করা। তাছাড়া কারা কি উদ্দেশ্যে এই জানাজায় উপস্থিত হয়েছে তা জানতে চেষ্টা করা এবং ভবিষ্যতে এই ডাটা বা তথ্যকে অন্যান্য প্রক্রিয়ায় কাজে লাগানো।
তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণঃ
ক) উপস্থিত তরুণদের (বয়স সীমা ৩০ এর নীচে) অধিকাংশই বর্তমান কিংবা সাবেক সময়ে ‘শিবির’ এর সাথে জড়িত। এক্ষেত্রে শিবিরের সমর্থক হতে সদস্য সব পর্যায়ের লোক জনই ছিল। এর একটি অংশ ছিল মাদ্রাসা হতে যারা সরাসরি শিবিরের সাথে জড়িত না হলেও হেফাজত আন্দোলনের কারণে জামায়াত-শিবিরের সাথে সম্পর্কিত। এবং এদের কয়েক জন এসেছে এদের হুজুরদের সাথে। দু-এক জন পাওয়া গেছে যারা সরাসরি শিবিরের সাথে জড়িত না থাকলেও পারিবারিক কারণে সংগঠনের সাথে সম্পর্কিত।
খ) আলেম বা হুজুরদের (প্রচলিত অর্থে) একটি অংশ জামায়াত এর সাথে জড়িত সরাসরি। আরেকটি অংশ সরাসরি জড়িত না হলেও জামায়েতের ইসলামাইজেশন প্রক্রিয়ার সাথে পরিচিত এবং এর কারণে তাদের সাথে আত্মিক সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ।
গ) আধুনিক শিক্ষিতদের একটি অংশ সাবেক শিবিরের সাথে জড়িত ছিলেন। বর্তমানে অধিকাংশদের জামায়াতের সাথে সরাসরি সাংগঠনিক সম্পর্ক নেই।
ঘ) কেউ কেউ ছাত্র জীবনে শিবিরের সাথে জড়িত না হলেও জামায়াতের কার্যক্রম কে পজিটিভ দৃষ্টিকোণ হতে দেখে থাকেন এবং ভোটের রাজনীতিতে তারা আগে থেকেই জামায়াতের সমর্থক।
ঙ) বৃদ্ধদের পুরো অংশটাই জামায়াতের নিজস্ব ভোট বাক্সের (কেউ প্রত্যক্ষভাবে জড়িত, কেউ বা পরোক্ষভাবে) ।
এক কথায়- যারা উপস্থিত ছিল তাদের অধিকাংশই বর্তমানে জামায়েতের রাজনীতির সাথে সরাসরি জড়িত, একটি অংশ বর্তমানে সরাসরি জড়িত নয় কিন্তু কখনো না কখনো তারা অন্য কোন ইসলামি আন্দোলন কিংবা শিবির বা জামায়াতের আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিল। অন্য অংশটি ধর্মীয় কারণেই জামায়াতের রাজনীতির সমর্থক (প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ, দৃশ্যমান কিংবা অদৃশ্যমান) এবং স্বাধীনতা পূর্ব কিংবা পরবর্তী- সময় থেকেই তারা জামায়াতের ভোট বাক্সের অন্তর্ভুক্ত।
ফাইন্ডিংসঃ
পর্যবেক্ষণমুলক এই গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে– বাংলাদেশে ভোটের রাজনীতিতে বিভিন্ন সময়ে জামায়েতের যে হিস্যা (৫-৭%) তার বাইরে থেকে খুব কম সংখ্যক লোকই এই জানাজায় উপস্থিত ছিল যা সমাজ পরিবর্তন প্রত্যাশী কোন সংগঠন বা দলের জন্য অবশ্যই হতাশাজনক। এবং ভবিষ্যত কর্ম-পরিকল্পনায় এর প্রতিফলন থাকা আবশ্যক।
জানাজায় উপস্থিত জন সমাবেশের এই পর্যবেক্ষণমূলক বিশ্লেষণ গণতান্ত্রিক ভোটের রাজনীতিতে করণীয় নির্ধারণে ভবিষ্যতে জামায়াতকে একটি বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহায্য করুক- এটাই প্রত্যাশা।





