আবদুল কাদের মোল্লার সময় বলেছি, কামারুজ্জামানের সময়েও বলছি, জামায়াতই তাদের মেরে ফেলছে। প্রতিটি হরতাল, আইনী পদক্ষেপ ও কথাবার্তা স্রেফ হত্যাকাণ্ড আড়াল করার অপচেষ্টা।
কিন্তু ইতিহাস একদিন সাক্ষ্য দেবে কেন তারা নিহত হলেন। যারা মনে করছেন তাদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে নিজেদের রক্ষা করবেন তারা ভুল করছেন। আপনারাও এই পরিণতি ভোগ করবেন। আপনারা আল্লাহকে ভয় করে জনগণের কাছে যাননি, গিয়েছেন বিদেশী প্রভূদের কাছে, যাদের কুবুদ্ধিতে আপনারা ১৯৭১ এ বেঠিক কাজ করেছিলেন, পরে তাদের সামরিক নীতির অধীনে আপনারা নিজেদের সাময়িকভাবে রক্ষা করতে পেরে প্রকৃতি ও ইতিহাসের নিয়ম উল্টে দেওয়ার কুবাসনা করেছিলেন। কিন্তু মোসলমানদের ইতিহাসে এজীদ কখনোই নিজেকে রক্ষা করতে পারে না। তার পতন হবেই। নিশ্চিতভাবে।
১.
আজ একটা সত্য উচ্চারণ করতে চাই, জামায়াত-শিবিরের যে সব লোক কথায় কথায় ১৯৭১ ইস্যুতে অপরিণামদর্শীভাবে লাফালাফি করেন, তারা সবাই জামায়াতের লোকদের এই সব মৃত্যুদণ্ডের জন্য দায়ী। কয়েকজন লোক ৭১ এ যে ভুল করেছিলেন, তা থেকে নিজেদের রেহাই দিতে তারা অবশ্যই ভূমিকা রাখতেন যদি না আপনারা এই লোকদের নির্দোষ বলে বলে উস্কানি না যোগাতেন। কারণ পরিণাম জেনেবুঝে তারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেননি, বরং লোভ-কুচক্রী মানসিকতা-হীনমন্যতা-নির্বুদ্ধিতার কারণে ফাইস্যা গেছিলেন। তাই তারা নিজেদের মু্ক্তিযুদ্ধ বিরোধিতার জন্য ১৯৭১ এই যুদ্ধ করতে করতে মারা যাননি বা চীনের জাতীয়তাবাদীদের মতো আকড়ে ধরে দেশের কোনো একটা প্রান্তে পালিয়ে গিয়ে চিরকাল মুক্তিযুদ্ধের পর বিরোধিতাকে অব্যাহত রাখেননি। বরং তারা প্রথমে পালিয়ে গিয়ে আত্মগোপন করেন, পরে সুযোগ পেয়ে আবার গর্ত থেকে বের হয়ে আসেন এবং চালাকি করতে করতে নিজেদের সেয়ানা হিসেব হাজির করেন। এসবই সম্ভব হয়েছে আপনাদের অন্ধ আনুগত্য, ইসলাম সম্পর্কে অল্পবিদ্যা এবং হীনমন্য মানসিকতার কারনে। আপনাদের অন্ধ সমর্থ পেয়ে পেয়ে তারা পাহাড়ের চূড়ায় উঠে গিয়ে আজ আছাড় খেয়ে খেয়ে পড়ছেন আর মরছেন।

ধরেন আবদুর রাজ্জাক, তাজুল ইসলাম বা শিশির মনিরের কথাই বলি, তারা যদি সৎ হতেন তবে কারাবন্দি জামায়াত নেতাদের বলতেন আইনগতভাবে কিছুই করার নাই। যা আইন ও বিচারিক কাঠামো তাতে করে ফাঁসি বা যেকোনো দণ্ড হবেই। এ থেকে উদ্ধারের কোনো সুযোগ নাই। বেস্ট স্ট্রাটেজি হবে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধিতার জন্য জনগণের কাছে দুঃখপ্রকাশ ও ক্ষমা চাওয়া এং আল্লাহর কাছে তওবা করা। এটা করলে তাদের পরিণতি অন্যরকম হতো। কিন্তু এই বেঈমানেরা কারাবন্দিদের বারবার মিথ্যা আশ্বাস দিয়েছে যে আইনগতভাবে তাদের রক্ষা করা সম্ভব হবে।
২০১১ সালের নভেম্বরে আবদুর রাজ্জাক তার নেতাদের কাছে স্বীকার করেছেন আইনগতভাবে কোনো সুযোগ নাই। রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করার কথা বলেছিলেন তিনি। যদিও জামায়াতের লোকেরা জানতেন রাজনৈতিকভাবে কতখানি কী করার ক্ষমতা আছে। তারপরেও তারা হুঙ্কার দিলেন। এখানেও প্রতারণা ও কুবাসনা ছিল। তারা ভেবেছিলেন চক্রান্ত করে বিএনপিকে ব্যবহার করবেন। এ জন্য তারা বিএনপিপন্থী কিছু বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীকে উপঢৌকন দিয়েছিলেন। কিন্তু বিএনপি এই ফাঁদে পা দেয়নি। ফলে তাদের হুঙ্কারও মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। শিবিরের সাবেক সাথী-সদস্যদের যারা সামরিক বাহিনীতে কাজ করে তাদের মিথ্যা আশ্বাসেও গত বছর বহু কিছু উল্টেফেলার আশা করেছিল জামায়াত নেতৃবৃন্দ। কিন্তু তারা কি নিজেদের চরিত্র সম্পর্কে জানতো না যে নিজেদের পদপদবী ও ভবিষ্যতকে ঝুঁকিমুক্ত রেখেই তারা কাজ করেন। ফলে এত প্রাণহানি হল, এত মানুষ পঙ্গু হলো, কিন্তু জামায়াত শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হলো।
২.
এখন আর ভাবতে অবাক লাগে না যে কতখানি ইতর এই জামায়াত-শিবির। তারা মুক্তিযুদ্ধের কোনো ইতিহাস, আইনী ও সামরিক ব্যাখ্যা সম্পর্কে জানতো না। প্রায় সব বইপত্র, দলিল দস্তাবেজ আমার কাছ থেকে নিল। পরে এই খাতে যখন বিপুল অঙ্কের তহবিল চলে আসলো তখন তারা ভাবলো সব কিছুই যখন হাতে চলে এসেছে তখন নিজেরো একা একা খেতে পারবো। কিন্তু আইনের কিছু আদর্শলিপি পড়লেই তো আপিন স্ট্রাটেজি ও আর্গুমেন্ট হাজির করতে পারবেন না। আল্লাহ আপনাদের এই যোগ্যতা ও দক্ষতা দেয়নি। মনে রাখবেন এরা আদালতে বা বাইরে বক্তৃতায় মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুতে কোনো আর্গুমেন্ট বা রিজনিং দাঁড় করাতে পারেনি। এমন সব হাস্যকর কথা বলেছে যে এদের ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিতে অসুবিধা হয়নি রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও রাজনৈতিক বক্তাদের।
আর প্রত্যেকটি মামলার বিষয়ে ছিল দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র। কামারুজ্জামানের মামলার বিষয়ে মাঠগবেষণা করতে পাঠানো হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিবিরকর্মীকে। তাদের জনপ্রতি ১২ হাজার টাকা করে দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু তারা সবাই মাত্র দুই-তিন হাজার টাকা পেয়েছে। বাকি টাকা মেরে দেওয়া হয়েছে। অনেক স্ট্রাটেজিক ব্যাপার নিয়ে জামায়াতের লোকেরাও চুরিধারি করেছে। এই সব চুরিকে জায়েজ করতেই তারা ট্রাইব্যুনালের ঝাড়ুদার-পিয়নদেরও ঘুষের খাতে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। টকশোর লোকেরা বা গোলটেবিলঅলারা খামোখাই টাকা পেয়েছে।
৩.
আমি নিজের যে কোনো পরিণতির জন্য প্রস্তুত আছি। তারপরেও বলতে চাই, ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় আমি কুয়া থেকে বের হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। ফলে আমি ক্ষমতা কী, কিভাবে ক্ষমতা গঠিত হয় এবং কোনো কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার মধ্য দিয়ে ক্ষমতা জারি থাকে তা বুঝতে পেরেছিলিাম। এই বোঝাপড়ার জার্নির মধ্য দিয়ে আমার যা কিছু উপলব্ধি হয়েছে তা আমি জামায়াত-শিবিরের লোকদের সাথে শেয়ার করেছি।
তারা আজ নিজেদের রক্ষা করার মিথ্যা বলতেই পারে। কিন্তু আমি ও তারা জানে যে ২০০৪ সাল থেকে তাদেরকে আমি পরামর্শ দিয়েছি। নিজেদের নিরাপদ রেখে এগিয়ে যাওয়ার পথ বাতলে দিয়েছিলাম। ২০০৭ সালের মার্চ মাসে তাদেরকে যুদ্ধপরাধের বিচারের ব্যাপারে অবহিত করেছিলাম। তাদের বলেছিলাম যে অভিযুক্ত সবাইকে ধরা হবে এবং শাস্তি দেয়া হবে। ওই সময় এই সঙ্কট থেকে উত্তরণে উপায়টাও জানিয়েছি। কিন্তু তারা বেঈমানী করেছিল। এই বেঈমানী আমার সাথে নয়, জামায়াত-শিবিরের নেতাকমীদের সাথে নয়, বাংলাদেশের জনগণের সাথে করেছিল।
আপনারা মনে রাখবেন জেনারেল মতিন ও ব্যরিস্টার মঈনুল হোসেন জামায়াতকে পিঠ চাপড়াইছিল। এটার কারণে তারা খুশিতে গদগদ হয়ে গেল। পরে শাহ আবদুল হান্নানেরর ভাতিজা ব্রিগেডিয়ার আমিনের উদ্যোগে চক্রান্ত হয়, এতে সজ্ঞানে যোগ দেন নিজামী ও মুজাহিদ। তারা অপ্রস্তুত অবস্থায় বিএনপিকে নির্বাচনে যেতে বাধ্য করে। এতে এমন বেঈমানরাও জড়িত ছিল যাদের পরবর্তীতে বাংলার সবচেয়ে বড় দেশপ্রেমিক হিসেবে হাজির হতে দেখেছি। খুবই হাস্যকর লাগে জরুরি অবস্থার সময়ে যারা ক্ষমতা দখলকারীদের তৃতীয় স্তরের অফিসারদের দালালী করতো তারাই কিনা এখন গণতন্ত্র উদ্ধারের সিন্দাবাদ।

আমার কথা হলো নির্বাচনের আগেই তো নিজামী-মুজাহিদ তখনকার ও এখনকার ক্ষমতাবানদের সাথে রফা করে নিয়েছেন। তারা তো জানতেন কী হতে যাচ্ছে। সেই মতে সব কিছু হচ্ছে নাকি হচ্ছে না তার কিছুই না জানিয়ে তারা কিভাবে নাটক অব্যাহত রাখছেন এবং দেশকে ক্রমাগত অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন? তারা যদি প্রতারিত হয়ে থাকেন তবে তা বলুন। না হলে দলের কাকে কাকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নিছেন তাও বলুন।
৪.
সবশেষে একটা কথা বলি, সমাজের তলানিতে উঠে আসা জামায়াত-শিবিরের লোকেরা ইসলামপন্থার মধ্য দিয়ে নিজেদের আখের গোছাতে পারলেও রাষ্ট্র ও রাজনীতি তাদের কাউন্ট করে না। তাদের মেরে ফেলা ও বাঁচিয়ে রাখা খুবই তুচ্ছ ব্যাপার। এনিয়ে কেউই ভাবে না। কাজেই নিজেদের জীবন ও সম্মানকে গুরুত্বহীন মনে করে গাধার পেছনে ঘুরে বেড়ানো ভেড়ার মতো তারাও ঘুরে বেড়াতে পারে। কিন্তু আমরা মনে করে জীবন ও সম্মান আল্লাহর নেয়ামত। একে অপচয় করার এখতিয়ার আমাদের কারোরই নাই। ভুল, মিথ্যা ও চক্রান্তের পেছনে প্রজন্মান্তরে শয়তানের দাস হিসাবে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ নাই। সবাইকে জামায়াত-শিবির থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যারা ১৯৭১ এ ভুল করেছে তারাই গোয়ার্তুমি করুক। নতুন প্রজন্মের সামনে সুযোগ আছে।
তাদের সামনে পথ একটাই জামায়াত-শিবির ছেড়ে দিতে হবে। ব্যক্তি ও সামাজিক পরিসরে আমল ও আখলাক ঠিক রাখবেন এবং রাজনৈতিক পরিসরে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করুন। একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ইনসাফ ভিত্তিক বাংলাদেশ কায়েম করুন। দেখবেন ভুল ও গ্লানি থেকে মুক্ত হয়ে আপনিও মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপনের সুযোগ পাচ্ছেন।





