Adnan Yusuf Hasan
বলা যায়, ফরহাদ মজহারের কলাম পড়ে আমি বেড়ে ওঠেছি। কৈশোরে পত্রিকায় ছাপা হওয়া তাঁর কলামগুলো কেটে ফাইলে গুছিয়ে রাখতাম। বোধকরি, আরো অনেকেরই সে অভিজ্ঞতা আছে। তার লেখা বইগুলোর মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ‘মোকাবিলা’। বইটা আমি কয়েকবার পড়েছি।
কমিউনিস্ট মানেই নাস্তিক নয়। এটা হচ্ছে মূলত আশির দশকে শুরু হওয়া মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী প্রচারণা। অবশ্য বাংলাদেশে কমিউনিস্টদের ব্যাপারে এই নেতিবাচক ধারণা থাকার পেছনে বামদের ধর্মবিদ্বেষও দায়ী। মোকাবিলা বইয়ে ফরহাদ মজহার এসব দাবি করেছেন। বাংলাদেশের প্রচলিত নাস্তিকতার চর্চাকে তিনি খুবই নিম্নমানের বলেও মত দিয়েছেন। বৃহত্তর স্বার্থে কমিউনিস্ট ও ইসলামিস্টদের মধ্যে কৌশলগত ঐক্য কিভাবে করা যায়, তিনি এ বইয়ে সে প্রস্তাবনা দিয়েছেন। আমার কাছে বিষয়গুলো ছিল খুবই অপ্রত্যাশিত। একজন কমিউনিস্টের লেখায় ইসলামের ব্যাপারে কোনো বিদ্বেষ নেই। অথচ বাংলাদেশে সচরাচর আমরা তাই দেখে আসছি। একজনকে ব্যতিক্রম পেলাম। অতএব, ফরহাদ মজহারের একটা প্রভাব আমার মধ্যে তৈরি হলো।

২০১৩ সালের শাহবাগ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটা টার্নিং পয়েন্ট। ফরহাদ মজহার শাহবাগের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিলেন বাংলাদেশের তাবৎ বুদ্ধিজীবীর বিপরীতে। শাহবাগের প্রতিক্রিয়ায় হেফাজতের উত্থান ঘটলো। হেফাজতের সাথে ফরহাদ মজহারের সম্পর্ক নিয়ে আমি বেশ কৌতুহলী ছিলাম। একজন কমিউনিস্টকে বাংলাদেশের রক্ষণশীল আলেম সম্প্রদায় কীভাবে গ্রহণ করেন, তা জানার আগ্রহ ছিল।
শুরুতে হেফাজতের লক্ষ্য ছিল খুবই অরাজনৈতিক, মানে সরকারবিরোধী কোনো অবস্থান তাঁদের ছিল না। লক্ষ্য করলাম, ফরহাদ মজহার হেফাজতকে তাঁর মতো করে ব্যবহারের প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। সরকারবিরোধী পক্ষগুলো যথাক্রমে জামায়াত ও বিএনপিও হেফজতকে ব্যবহারের চেষ্টা চালায়। এই তিন পক্ষের নিজ নিজ স্বার্থে হেফাজতকে ব্যবহারের প্রচেষ্টা ও হেফাজতের আঁনাড়িপনার পরিণতিতে সরকার নৃশংসভাবে হেফাজতকে দমনের পদ্ধতি বেছে নেয়। ফলাফল হলো অসংখ্য নিরীহ মানুষের লাশ, হাজারো আহতের রোনাজারি। এ বিষয়ে এই এক প্যারায় সব বলা সম্ভব নয়। আলোচ্য বিষয়ও তা নয়। আমরা বরং ফরহাদ মজহার প্রসঙ্গে ফিরে যাই।
ফরহাদ মজহারের রণকৌশল লেনিনিস্ট ধারার হলেও তাঁর কোনো পার্টি নেই। তাঁর অনুসারীদের সাথে কথাবার্তা বলে জেনেছি, বাংলাদেশে কমিউনিস্ট বিপ্লব করার জন্য তিনি পার্টি থাকাকে প্রয়োজনীয় মনে করেন না। মজলুম শ্রেণীকে যথাযথভাবে নেতৃত্ব দিয়ে, গাইড করে জালিম শাসক শ্রেণীকে উৎখাত করতে পারলে পার্টি করার হাঙ্গামায় যাওয়ার দরকার কি?!
ফরহাদ মজহারের এই অনুমান খুব গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। এটা ধরতে পারলে আমরা সহজেই বুঝবো, প্রচলিত বামপন্থার বিপরীত স্রোতে গিয়ে ইসলামিস্টদের সাথে তাঁর ঘনিষ্টতার মাজেযা কী।
ফরহাদ মজহার মনে করেন, এই কালে, বিশেষত বাংলাদেশে; যারা মজলুম, ইসলামিস্টরা তাদের অন্যতম। তারা এ কালে মার্কসের শ্রমিক শ্রেণীর সমতুল্য। কিন্তু শ্রমিক শ্রেণীর মতো্ই তাদের যেহেতু এস্টাবলিশমেন্টের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতি কিংবা যোগ্যতা নেই, তাই তাদেরকে বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব দিয়ে, প্রয়োজনে ময়দানের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়ে জালিম শাসক শ্রেণীকে উৎখাত করতে হবে। এটা হলো গ্র্যান্ড প্রজেক্টের প্রথম ধাপ। হেফাজতের উত্থানে ফরহাদ মজহার সেই মাহেন্দ্রক্ষণের সম্ভাবনা অনুমান করে আন্দোলনকে কব্জা করার চেষ্টা করেন। ফলশ্রুতিতে হেফাজত তাদের শুরুর অবস্থানে আর থাকতে পারেনি। ‘গ্রাম দিয়ে শহরকে ঘিরে ফেলা’ গেছে ঠিকই, কিন্তু রক্তাক্ত পরিণতিতে আপাতত ক্ষ্যান্ত দিতে হয়েছে; ‘জালিম শাসক শ্রেণী’কে উৎখাত করা আর হয়ে উঠেনি। এভাবেই একটি গ্র্যান্ড প্রজেক্ট তথা কমিউনিস্ট বিপ্লবের প্রথম ধাপ ভেস্তে যায়।
কিন্তু ফরহাদ মজহার যথেষ্ট এনার্জেটিক মানুষ। এই ৭০ বছর বয়সেও তিনি হতোদ্যম হয়ে পড়েননি। ইসলামিস্টদের দিয়ে কমিউনিস্ট বিপ্লব করার গ্র্যান্ড প্রজেক্ট তিনি ত্যাগ করেননি। সম্প্রতি তিনি ব্রিটেন গিয়েছেন। সেখানে জামায়াত ও হেফাজত নেতা-কর্মীদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত একাধিক সমাবেশে তিনি বক্তৃতা করেছেন। এইসব দৃশ্যমান তৎপরতার বাইরেও নানাভাবে কাজ করছেন। ফল হিসেবে তিনি ইসলামপন্থীদের একটা অংশকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছেন। দেখা যাক, জল কতদূর গড়ায়… তো সাম্প্রতিক পাবলিক স্পিচ হিসেবে আমরা যদি ব্রিটেনে দেওয়া তার বক্তব্যগুলো পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখবো ইসলামকে তিনি কিভাবে তার মনগড়া চিন্তা অনুযায়ী কাঁটাছেড়া করেছেন। তিনি বলেছেন, ইসলামকে দুই ভাবে ব্যাখ্যা করা যায়: এক. থিওলজিক্যালি, দুই. ফিলোসফিক্যালি। তিনি নিজে দার্শনিক দৃষ্টিকোন থেকে ইসলামকে ব্যাখ্যার পক্ষে।
[লন্ডনের ওয়াটার লিলিতে ফরহাদ মজহারের বক্তব্য]
থিওলজিক্যালি ইসলামকে ব্যাখ্যার মানে হচ্ছে, ইসলাম স্বয়ং নিজেকে যেভাবে উপস্থাপন করতে চায়, তা। কিন্তু ফিলোসফিক্যাল ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে এই নিয়ম খাটে না। ফিলোসফার কিংবা যিনি এই দৃষ্টিকোন থেকে ইসলামকে ব্যাখ্যা করতে চান, তিনি তার চিন্তা ও যুক্তি যে কোনো আঙ্গিকে উপস্থাপন করতে পারেন। ইসলামের নিজস্ব বর্ণনার সাথে তার মিল থাকলো কি থাকলো না, তাতে কিছু আসে যায় না। তো ফরহাদ মজহার ফিলোসফিক্যাল আসপেক্ট থেকে ইসলামের এমনসব ব্যাখ্যা দিয়েছেন, যার সাথে ইসলামের নিজস্ব বর্ণনার যথেষ্ট বৈপরীত্ব রয়েছে। তিনি মূলত ইসলামের মোড়কে কমিউনিজমের তত্ত্বই গেলানোর চেষ্টা করছেন।
যেমন তিনি বলেছেন, ‘ইসলামের কিছু দার্শনিক প্রস্তাবনা আছে, যেগুলো এর পূর্ববর্তী গ্রিক-খ্রিস্টিয় সভ্যতা থেকে ভিন্ন। এর উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি একটি অদ্ভূত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, মুহাম্মদ (সা)-এর রাজনৈতিক মিশন ছিল সমগ্র মানবজাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা। তো মুহাম্মদ (সা)-এর সময় যখন এই ঐক্যবদ্ধ করা নিয়ে তর্ক উঠলো, তখন তিনি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে চেয়ে জেরুজালেম থেকে কা’বার দিকে ক্বেবলা ফিরিয়ে দিলেন।’ অথচ ক্বেবলা পরিবর্তন হওয়ার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা কোরআনে বলা আছে। ফরহাদ মজহারের এই ব্যাখ্যার সাথে কোরআনের ব্যাখ্যার কোনো সম্পর্কই নেই।
তিনি আরো বলছেন, ‘আমরা তো কোরআনকে কোনোদিন দর্শনের বই আকারে পড়িনি। পড়েছি আইনের বই হিসেবে। কিন্তু কোরআন তো আইন আকারে আসে নাই। …. কোরআনকে আমরা শুধু ঈমান-আক্বিদার জায়গা থেকে পড়েছি, দর্শন আকারে পড়িনি।’
আপনি যখন দর্শন আকারে কোরআন পড়বেন, তখন কোরআনের আলোকে কোরআন পড়তে আপনি বাধ্য নন। তখন কোরআনের মনগড়া ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। ফরহাদ মজহার আমাদেরকে সেই জায়গায় নিয়ে যেতে চাচ্ছেন। আপনি যখন কোরআনকে শুধু দর্শন আকারে পড়তে রাজি হবেন, তখন আপনি ইসলামের মৌলিক যে কোনো বিষয়ে ইসলামের নিজস্ব ব্যাখ্যার বাইরে অন্য কোনো ব্যাখ্যা মেনে নেয়ার ব্যাপারেও রাজি থাকতে বাধ্য। কারণ, আপনি তো থিওলজি আকারে কোরআনকে পড়ছেন না। ফরহাদ মজহার প্রায়ই বলে থাকেন, ইসলামে রাষ্ট্র ধারণার কোনো অস্তিত্ব নাই। ইসলামে বরং আছে উম্মাহ’র ধারণা। ব্রিটেনেও তিনি বলেছেন, ইসলামে কোনো রক্ত, বংশ- এ সবের সম্পর্ক নাই। অথচ ইসলাম এসব ব্যাপারে কখনোই নেতিবাচক নয়। বরং কমিউনিজম এ সব সম্পর্ককে অস্বীকার করে।
ফরহাদ মজহার মনে করেন, এখনকার বাস্তবতায় চাইলেই একটি কমিউনিস্ট বিপ্লবের চূড়ান্ত ধাপ সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তার আগে বেশ কয়েকটা ধাপ আছে। বাংলাদেশে বুর্জোয়াদের বিকাশই ঠিক মতো হয়নি। ফলে বুর্জোয়া রাষ্ট্রে শ্রেণী সংগ্রামের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়, তা বাংলাদেশে নাই। এ জন্য ‘গণতান্ত্রিক রূপান্তরের’ মাধ্যমে বাংলাদেশকে প্রথমে কার্যকর বুর্জোয়া রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে, যেখানে অন্তত বিরুদ্ধ মত প্রকাশে বাধা থাকবে না। তারপর শুরু হবে পরবর্তী ধাপ। তো এই গ্র্যান্ড প্রজেক্টের প্রথম ধাপ সফল করতে ইসলামিস্টদের ব্যবহার করতে চাইছেন তিনি। আমাদের হীনমণ্য ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে দেওলিয়া বেকুব ইসলামিস্টরা দলে দলে ফরহাদ মজহারের পতাকা তলে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুতি নিচ্ছেন, আফসোস।
মানুষের মধ্যে এমন লোক আছে পার্থিব জীবনে যার কথা তোমার কাছে বড়ই চমৎকার মনে হয় এবং নিজের সদিচ্ছার ব্যাপারে সে বারবার আল্লাহকে সাক্ষী মানে। কিন্তু আসলে সে সত্যের নিকৃষ্টতম শত্রু। [সূরা বাকারা: ২০৪]
Source: একটি কমিউনিস্ট বিপ্লবের গ্র্যান্ড প্রজেক্ট: হ্যামিলিয়নের বাঁশিওয়ালা ও ইঁদুরের গল্প





আমার কাছে বিষয়টি ভিন্ন রকম মনে হয়েছে । চূড়ান্ত ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষে ‘গণতান্ত্রিক রূপান্তরের’ মাধ্যমে বাংলাদেশকে প্রথমে এমন এক রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে, যেখানে অন্তত বিরুদ্ধ মত প্রকাশে বাধা কম থাকে ,এই লক্ষে এক দল ইসলাম পন্থীকে ফরহাদ মজহারের সাথে আপাত দেখা যাচ্ছে ।