একদিন কলেজের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সংগ্রহশালা দেখতে গিয়ে চোখ আটকে যায় প্রথমেই। খুব বড়ো করে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি ও তার পাশেই লেখা- তিনি স্বাধীনতার ঘোষক। আমি খুব আগ্রহ নিয়ে খুঁটিনাটি পড়োছিলাম। এমন সময় সংগ্রহশালার ইনচার্জ আমার সামনে এসে বলেন- “তুমি খুব গভীরভাবে পড়ছো- এসো আমি তোমাকে সবগুলো বিষয় বিস্তারিত বলি”।
আমিঃ আসলে… একটা জায়গায় সমস্যা দেখছি। মানে, আমি যা জানি তার বিপরীতটা দেখছি। এখানে মুজিবুর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক বলা হয়েছে কিন্তু ঘোষক তো জিয়াউর রহমান।
(উনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে) আসলে তুমি যা জানো সেটাই সত্য। ঐ দেখো! (ঘরের এক কোনায় নিচ দিয়ে) সেখানে তোমার কথাটাই লেখা আছে (ছোট করে)। যেটা সত্য। তুমি যা জানো সেটা ঠিক। সরকারি চাকরি করি, তাই মুখ বন্ধ করে আছি…
আর এই সঠিক ইতিহাস লিখেছেন বলেই মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার হয়েও এ. কে. খন্দকারকে আওয়ামী লীগ ‘রাজাকার’ বলেছে।
ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণে শেখ মুজিবুর রহমান প্রকৃতই যে ‘জয় বাংলা’ বলার শেষে ‘জয় পাকিস্তান’ বলেছিলেন এবং সেই সাথে স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে উনার অনিহা তুলে ধরতে লেখক বলেন-
“তিনি গ্রেফতার হয়েছেন অথচ গ্রেফতারের আগে কোনো আদেশ, নির্দেশ বা উপদেশ দেন নি। তাজউদ্দিন আহমেদকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাস করায়- তিনি বলেন- না, আমি কোনো নির্দেশ পাই নি।… দলের নেতৃত্ব কি হবে তাও তিনি কাউকে বলে যান নি। এদিকে, ২৫ই মার্চ রাত ১০টা ড. কামাল হোসেন ও ব্যারিষ্টার আমীর উল ইসলাম বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যান, তিনি তাদের তাৎক্ষণিক সরে যেতে বলেন। তিনি নিজে কি করবেন, সেটা তাদের বলেন নি। … এদিকে, তাজউদ্দিন আহমেদ বলেন- ‘যেখানে আন্দোলনের সর্বোচ্চ নেতা, যাকে এতবার করে বলছি, আজকে সন্ধ্যাতেও বলেছি, তিনি কোথাও যেতে চাইলেন না এবং তাকে স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য যে সংক্ষিপ্ত একটা বর্তা টেপরেকর্ডে ধারণ বা ঐ কাগজে স্বাক্ষর করার জন্য বলায়, তিনি বললেন- এটাতে পাকিস্তানিরা তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করতে পারে। উনি এতটূকুও যখন করতে রাজি নন, তখন এক আন্দোলনের কি বা ভবিষ্যত’?
এদিকে অবাক করার মতো বিষয় যে খসড়াটি স্বাধীনতার ঘোষণা হিসাবে তাজউদ্দিন আহমেদ তৈরি করেছিলেন- সেই ছোট খসড়াটি আওয়ামী লীগ দেশ বিদেশে শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা হিসাবে প্রচার করে, অথচ তিনি তো এমনটি করেন নি। ২৫ই মার্চ রাতেই যেখানে তিনি গ্রেফতার হয়ে যান- সেখানে এই ঘোষণা কিভাবে উনার নামে প্রচার পায়?
এদিকে, বর্তমান সরকার খন্দকার সাহেবের ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছেন আরেকটি কারণে- যেখানে তিনি ওনার বইতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত, প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ বলে উল্লেখ করেছেন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বাদ দিয়ে যারাই সেই সময়কার দুই দেশের সামরিক অস্ত্রভাণ্ডার সম্পর্কে অবগত- তারা এটা জানেন যে- সামরিক দিক দিয়ে ভারতের চেয়ে পাকিস্তানের অবস্থা উন্নত ছিলো। আর এ. কে. খন্দকার বিমানবাহিনীতে কর্মকত থাকায়- তিনি এ বিষয়ে অবগত ছিলেন। আর ’৭১ এর যুদ্ধের আগে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সামরিক বিষয়ে ভারতের জানাটা খুব প্রয়োজন ছিলো। তাই ভারত সেখানে অবস্থানরত অফিসারদের পাকিস্তান বিষয়ে প্রশ্ন করে। এ প্রসঙ্গে, খন্দকার সাহেব বলেছেন- “আমরা যারা সামরিক লোক ভারতে গিয়েছিলাম, তারা ভারতীয় বাহিনীকে পাকিস্তান সম্পর্কে যতটা সামরিক তথ্য দিয়েছি, ভারত তা পঞ্চাশ বছরেও জানতে পারতো না”।
এদিকে আওয়ামী লীগ নিজেকে সবসময় মুক্তিযুদ্ধের দল বলে দাবি জানালেও এ কে খন্দকার উনার বইতে উল্লেখ করেছেন- “…যদি কেউ বলেন যে, তখন আওয়ামী লীগ নেতারা যুদ্ধের নির্দেশনা দিয়েছিলেন, তবে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলতে হয় যে, তা সঠিক নয়। অন্তত আমি কোনো নির্দেশনা পাই নি”।
এদিকে যুদ্ধে নেতাদের নেতৃত্ব না থাকলেও ছিলো দূর্নীতি। ভারতে প্রশিক্ষণ নিতে যেখানে বাংলাদেশ থেকে সাধারণ যুবকেরা যেতে শুরু করে, তখন আওয়ামী নেতারা বিশেষ করে নূরে আলম সিদ্দিকি, আ স ম আব্দুর রব ও তোফায়েল আহমেদ শুধু নিজেদের সমর্থকদের ও ছাত্রলীগের ছেলেদের গেরিলা হিসাবে রিকুট করা শুরু করেন। এ বিষয়ে খন্দকার সাহেব লিখেছেন- “আমি (দলীয় লোকদের নেয়ার) বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করে ওসমানী স্যারকে বলি- স্যার, শুধু আওয়ামী লীগ সমর্থকদের প্রশিক্ষণে অন্তর্ভুক্ত করা ঠিক হবে না। বহু ছাত্র, সরকারি কর্মচারী, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী ভারতে এসেছেন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে দেশকে স্বাধীন করতে। আমি কর্নেল ওসমানীসহ সংশ্লিষ্টদের অবহিত করেও বিশেষ ফল পাই নি”।
এদিকে চট্টগ্রাম বন্দর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের তেল ডিপোতে সফল অভিযানের কথা উল্লেখপূর্বক তখনকার কিছু লুটপাটের ঘটনাও বর্ণনা করেছেন। সীমান্ত অতিক্রম করে যারা ভারতে প্রশিক্ষণ নিতে আসতো তাদের নিয়ে “যুব শিবির” গঠন করা হয়। যাদের কার্যক্রম বর্ণনা করে- তিনি বলেন- শতকরা ১০-১৫ % ছেলে সত্যিকার অর্থে যথাযথ অভিযান পরিচালনা করেছে। …ছেলেদের একটা বড় অংশ একেবারে তাৎপর্যহীন কিছু কাজ করেছে, যা যুদ্ধে কোনো সাহায্য করেনি, যেমন- টেলিফোনের তার কেটে দেওয়া। …কিছু গেরিলা ভিতরে গিয়েছে মূলত অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে, যেমন লুট, হত্যা, ডাকাতি ইত্যাদি এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রচন্ড ক্ষতি করেছে। …এদিকে সংবাদ আসতো ভারতীয় সেনাবাহিনীর কিছু নিম্ন পদস্থ কমান্ডরের নির্দেশে কিছু সংখ্যক গেরিলা লুটপাটের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। আবার কিছু গেরিলা তাদের কথায়, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করা ব্যক্তিদের কাছ থেকে সরাসরি বা তাদের ব্যবসা ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ সম্পদ লুট করতো। …গেরিলারা অভিযানের নামে বিভিন্ন জলাশয়ে গ্রেনেড দিয়ে মাছ মারতো। গেরিলাদের এসব অনৈতিক কাজে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিতো। মেজর খালেদ মোশাররফ এর মন্তব্য ( ৯ অগাষ্ট, ১৯৭১)- “ ওই সেক্টরে (চট্টগ্রাম) অতীতের সাধারণ দূর্বলতা ছাড়াও সৈনিকদের দূর্নীতি এবং স্থানীয় উপজাতীয় জনসাধারণের প্রতি বৈরী আচরণ ছিলো অবাধ। অহেতুক গ্রেনেড নিক্ষেপ করে পালিয়ে যেতো”।
এদিকে ’৭১ এ পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর ২৫ মার্চের আকষ্মিক আক্রমণের আগে অর্থাৎ অযৌক্তিক ও অন্যায়ভাবে ইয়াহিয়া খান ৩ই মার্চ যখন জাতীয় অধিবেশন অনির্দিষ্টকাল মুলতবি ঘোষণা করলে, এর প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ দেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেয়। বাংলাদেশের মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। তবে সেই ক্ষুব্ধ মনোভাবে মূলত নিজ দেশেই যেন লুটপাট শুরু করে বাঙ্গালিরা। যেটা স্বীকার করে লেখক বলেন- “আমরা সবাই যে ফেরেশতা, তা তো নয়। অবাঙ্গালিরা নিরাপত্তাহীনতার জন্য ঢাকা ছেড়ে যখন অপেক্ষাকৃত নিরাপদ এলাকা বা পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যাচ্ছিলো, তখন রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে তাদের সোনার গয়না, টাকাপয়সা ও মূল্যবান দ্রব্যসামগ্রী লুট করে নিয়ে গিয়েছিলো বাঙ্গালিরা। … আমি এ ধরণের লুটপাটের চরম বিরোধী ছিলাম। পাকিস্তানের কুকীর্তির উত্তর এটা হতে পারে না বরং এ কাজটি একই রকম অন্যায় বা অপরাধ ছিলো। মুক্তিযুদ্ধকালেও এ ধরণের কিছু অপরাধমূলক কাজে বাঙ্গালি দুষ্কৃতিকারীদের সংবাদ আমরা পেতাম”।
{আর এই একই ঘটনার উল্লেখ- তথা অবাঙ্গালিদের ওপর অপমানজনক ঘটনার কথা, মার্চের শুরুতে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিশেষ করে ঢাকা চট্টগ্রামসহ বড় বড় শহরে অগ্নিসংযোগের কথা উল্লেখ করা হয় হামদুর রহমান কমিশনেও (পৃষ্ঠা-১৫৪ ,১৬ই ডিসেম্বর ২০১৪ বইটি প্রকাশিত হয়, অনুবাদিত ও সংক্ষেপিত আকারে)}।
এদিকে মুজিব বাহিনী ও রক্ষীবাহিনী গঠন প্রসঙ্গে লেখক বলেন- “মুজিব বাহিনী সৃষ্টি হয়েছিলো ভারতীয় ‘র’ এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে। প্রশিক্ষক ছিলেন মে. জে. সুজন সিং উবান। এদিকে যেসব ছেলেকে মুজিব বাহিনীতে ভর্তি করা হতো, সে সম্পর্কে কাউকে কিছু জানানো হতো না। …প্রশিক্ষণ ফেরত যুবকদের নিজের কাছে নিয়ে নিতো। …এদিকে স্বাধীনতার পর উবান দেশে এসে রক্ষীবাহিনী গঠন করেন। মুজিব বাহিনীর বেশ কিছু সদস্য নতুন গঠিত রক্ষীবাহিনীতে যোগ দেয়। তারা মুক্তিযুদ্ধে ভেদাভেদ ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। …এদিকে মুক্তযোদ্ধা ও মুজিব বাহিনীর মধ্যে বৈরী সম্পর্ক, গোলাগুলি হয়েছে। সেই সময় মুজিব বাহিনী প্রচার চালাচ্ছিলো যে তারাই বঙ্গবন্ধু মনোনিত আসল মুক্তিযোদ্ধা। … দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই মুজিব বাহিনীর কিছু সদস্যই লুটপাটে নেতৃত্ব দিয়েছিলো”।
অপরদিকে ‘১৯৭১, ভিতরে-বাইরে’ বইটি জুড়ে আমাদের কর্ণেল ওসমানীকে বেশ রহস্যজনক অবস্থায় দেখা যায়। ভারতীয় সেনাবাহিনীর অনুপ্রবেশ উনি ভালোভাবে দেখেন নি, তবে উনার চরিত্রটি ফুটে উঠেছে বেশ ‘ভাবুক’ হিসাবে। এ বিষয়ে লেখক বলেন-“…আমি মুক্তিবাহিনীর কর্মকান্ড পরিদর্শনে গেলে, পরিদর্শন শেষ করার আগেই জরুরি ভিত্তিতে উনি ডাক দিতেন অথচ এসে দেখতাম কোনো কাজ নেই। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের আহবানে যেতে চাইলে উনি নিজেও যেতেন না, যেতে দিতেন না। পুরো সময় থিয়েটার রোডে তার অফিস ঘরের ভেতরে বসে থাকতেন”।
সুতরাং যাই হোক- পুরো বইটি অধ্যয়নে বুঝা যায়- লেখক আমাদের মুক্তিযুদ্ধের একটি প্রকৃত চিত্র তরূণ সমাজের সামনে তুলেছেন। যার শেষ তিনি করেছেন এভাবে- “আজ স্বাধীনতার ৪৩ বছরে পা রেখে নিজের মনের ভেতর প্রশ্ন জাগে, কতটুকু আলোকিত হয়েছে প্রিয় মাতৃভূমি?” – যে প্রশ্নটা আমাদের সবার…





