ফেব্রয়ারী মাসের ২ তারিখ সোমবার কুষ্টিয়ায় নিজস্ব বাসভবনে এডভোকেট সাদ আহমাদ সাহেব ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিঊন। আল্লাহুম্মা আজিরনা ফী মুসীবাতিনা, ওয়াখলুফ লানা খায়রান মিনহা।
তিনি জামাআতে ইসলামির প্রথম দিক কার একজন নেতা ছিলেন। পাকিস্থান আমলে সুপ্রিম কোর্টের খুব ই খ্যাতনামা আইনজীবি ছিলেন। এবং একজন পড়ালেখা করা ইসলামি রাজনীতিবিদ ছিলেন। আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাড তিনি। কুষ্টিয়ার বড় বড় কেইসে তিনি বিচারকদের সামনের আইনের ধারা ব্যাখ্যা করলে তা নিঃসংকোচে গৃহিত হত। তার সম্মান ছিলো আকাশ সমান, এবং তাকে দেখা হত পর্বতের মত দৃঢ় হিসেবে। বেশ আগে তার লেখা একটা ইতিহাস পড়েছিলাম, যেখানে তার জীবনী যেমন এসেছে, এসেছে পূর্ব পাকিস্থান থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত সাধারণ রাজনীতি নিয়ে অনেক আলোচনা। আবার ইসলামি রাজনীতির খানা-খন্দ গুলোও তিনি ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন।
তার কাছ থেকেই প্রথম জানতে পারি বাংলাদেশের ব্যক্তি মানস ও সমাজ মানসের একটা ভালো ধারণা। অধ্যাপক সাজ্জাদ স্যার একাত্তরের স্মৃতিতে বাংলাদেশের মানুষের দুইটা বড় বড় মানসিক দূর্বলতার কথা বলে গেছেন। একঃ এরা ইতিহাস স্মরণে রাখেনা। এদের ব্রেইন খুব শর্ট সময়ের জন্য রেকর্ড রাখে। দুইঃ এরা খুব আবেগি। আবেগের ঠেলায় এর কাজ করে বেশি। যাকে ১৯৬৯ এ মানুষ খোদার পরের আসন দিলো, ৬ বছর পর তাকে মেরে ফেললো না শুধু, জানাজা নামাজ ও পড়তে চাইলো না তারা।এড সাদ সাহেব এই দ্বিতীয় রোগ টাকে বাংগালি জাতির একটা চরিত্রগত বৈশিষ্ট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, এবং এর সাথে এখানের আলোবাতাস ও রক্তের ধারাবাহিকতা কে কারণ হিসেবে ধরে নেবার জন্য উকালতি করেছেন।
পাকিস্থান আমলে জামায়াতে ইসলামির যে শাখা পূর্ব পাকিস্থানে ছিলো, তাকে বাংগালি করণে তিনি ছিলেন বরাবরই মাওলানা আব্দুর রহীমের (র) সাথে। ১৯৭১ সালে যুদ্ধের বিরোধিতা করতে যেয়ে তিনি প্রচন্ড ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। সারা বাংলাদেশের নামকরা আইনজীবি হয়েও তাকে খুব অত্যাচারের মুখোমুখি হতে হয়। কুষ্টিয়ার কোন একজন লোক ও তার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, ফলে জামায়াতের বড় নেতা, শান্তি কমিটির বড় দ্বায়িত্ব পালন করলেও তাকে কুষ্টিয়া তে পরবর্তি পর্যায়ে শান্তিপূর্ণ ভাবে জীবন যাপনে তেমন বাঁধার মুখোমুখি হতে হয়নি।
আমার বড় চাচা ডঃ ইয়াহইয়ার রহমানের মাধ্যমে জীবনে একবার মাত্র এই বরেণ্য আইনজীবির সাথে দেখা করতে পেরেছি। অনেক প্রশ্নের জবাব আমি জানতে চেয়েছিলাম। কিছু পেয়েছিলাম, কিছু পাইনি। একবার মাওলানা ইউসুফ সাহেব (র) মদীনাতে যান। তিনি বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েন ওখানে। ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হওয়ায় তার পাশে থাকার সুযোগ হয় আমার। এবং ইতিহাসের বেশ কিছু ভয়ংকর কাহিনির শ্রোতা হওয়ার ও সুযোগ ও আল্লাহ করে দেন তখন। এডভোকেট সাদের প্রতি আমার ভালোবাসা সেখান থেকেই।
১৯৭১ এ বাংলাদেশ হয়ে গেলে জামায়াতে ইসলামি আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যায়। ১৯৭৫ এর পট পরিবর্তনের পর কিভাবে ইসলাম পন্থীরা কাজ করবে তার একটা রূপরেখা তৈরি হয়। এড সাদ, মাওলানা আব্দুর রহীম, খতীবে আ’যম সিদ্দিক আহমাদ, মাওলানা আতাউর রহমান সহ অনেক আলিম উলামা ও ইসলামি চিন্তাবিদদের উদ্যোগে আইডিএল বা ইসলামিক ডেমক্রেটিক লীগ নামে সব ইসলাম পন্থীদের একটা জামায়াত কায়েম হয়। জিয়াউর রহমানের আমলে প্রথম ভোটে আইডিএল ৬টা আসন পেয়ে সংসদীয় দল হিসাবে স্বীকৃতি পায় এবং ইসলামি আন্দোলন এক নতুন দিক রচনার দিকে মোড় নেয়।
বহুদলীয় গণতন্ত্রের এই মহাসুযোগে ইসলামি আন্দোলন যে স্বাদ পাচ্ছিলো, তার কবর রচনা হয় ঐ সময় থেকেই। মাওলানা ইউসুফ সাহেবের ভাষায়ঃ “এই সময় জামায়াতের কর্মীদের সামনে দুইটা বিষয় খুব খারাপ বিবেচনা হলো।
একঃ রাজনীতির ময়দানে জামায়াতের লোকদেরই পদচারণা ছিলো বেশী। এরাই বড় বড় সভা সমাবেশ বা প্রোগ্রাম চালানোর কাজ করতো। টাকা খরচ করে মঞ্চ মাইক ঠিক করতো। প্রচার প্রসার ঘটিয়ে মানুষ জড়ো করতো। আর অন্যান্য দলের মাওলানা ও রাজনীতিকরা ওখানে যেয়ে শুধু মঞ্চ কাঁপিয়ে বক্তৃতা করেই চলে যেতো। আমাদের কষ্ট হবে, আর তারা সুযোগ নেবে, এটা কি ঠিক?
দুইঃ জামায়াতের নেতা কর্মীরা দেখলো এই ধরণের রাজনৈতিক মঞ্চ করে মাওলানা মাওদূদির যে চিন্তা চেতনার আলোকে দল চলার কথা ছিলো তা আর হচ্ছে না। কর্মী গঠন, ব্যক্তি গঠন ও নেতৃত্বের যে নিয়ম মাওলানা মাওদূদি শিখাতে চাচ্ছেন, তা থেকে দলের লোকেরা দূরে সরে এই সব মাওলানা সাহেবদের দেখানো অবৈজ্ঞানিক পথে ইসলামি আন্দোলন করতে যাচ্ছে। এই পথে কখনো দ্বীন কায়েমে সফলতা আসবেনা। যেহেতু সুযোগ তৈরি হয়েছে। কাজেই জামায়াতের নামেই আন্দোলনের কাজ আবার করতে হবে”।
অধ্যাপক গোলাম আযম (র) ও এই রকম তথ্যই দিয়ে গেছেন জীবনে যা দেখলামে।
এই বিষয় নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হলো। মাওলানা আব্দুর রহীম, এড সাদ সহ অন্যান্য আলিম উলামারা দেখেলেন একটা ভুল ধারণা তৈরি হচ্ছে। ইসলামের কাজ করতে যেয়ে ‘জামায়াতে ইসলামি’ নামেই কাজ করতে হবে এটা জরুরি নয়। যে নামেই হোক ইসলামের কাজ করলেই হলো। তাছাড়া আলিম উলামাদের যে বিরল ঐক্য তৈরি হয়েছে, তা আবার ভেংগে গেলে আল্লাহর কাছে জবাব দেয়া যাবেনা। তৈরি হলো জামায়াতের মধ্যে দুইটা মোর্চা। মাওলানা আব্দুর রহীম ও প্রখ্যাত উলামাদের নিয়ে একটা গ্রুপ। এড সাদ ছিলেন এদের খুব বলিষ্ঠ এক কণ্ঠস্বর। আরেকদিকে ছিলেন অধ্যাপক গোলাম আযম সহ আধুনিক শিক্ষিতদের বিশাল গ্রুপ। শেষে শুরার বৈঠকে ভোট হলো বিষয়টা নিয়ে। যেহেতু গণতন্ত্রের বিবেচনায় গোলাম আযম সাহেবগন ছিলেন সংখ্যা গরিষ্ঠ। কাজেই তাদের চিন্তা ‘জামায়াতের নামে রাজনীতি’ জয়যুক্ত হলো, জয়যুক্ত হলো, জয়যুক্ত হলো।
আর আইডিএল নামক ঐক্যের চারা গাছটা পানি হীন, বায়ুহীন, জড় হীন, কায়া হীন, পাতাহীন, অবশেষে দাঁড়ানোর মত শক্তিহীনতার কারণে সড় সড় সড় সড় এবং পরিণতিতে ধপাস করে পড়ে গেলো। চারিদিকে মানুষ রাজাকারদের আরেক পতন বলে ‘হর্ষধ্বনি’ তুললো। জামায়াতের কাজ চললো জামায়াতের গতিতে। উনারা সাবাই সরে পড়লেন, ছিটকে পড়লেন এবং ইনেক্টিভ হয়ে গেলেন চিরতরে। গোলাম আযম সাহেবের (র) কাছে একবার জিজ্ঞেস করেছিলামঃ “উস্তায মাওলানা আব্দুর রহীম সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি”? তিনি বলেছিলেনঃ
“তিনি ছিলেন উত্তাল সমুদ্রে পাহাড় ভাঙ্গা ঢেওয়ের মত। সমুদ্রে থাকতেই তিনি ঢেও তুলতেন। এখন একটা পুকুরে যেয়ে পড়েছেন। তার থেকে মৃদু তরংগই ওঠে এখন”
এড সাদ সাহেব বলেছেনঃ আলিম উলামাদের দৃষ্টিভংগীটাই ভালোছিলো। তখন যদি আমাদের ঐক্যটা ধরে রাখতে পারতাম তাহলে আমাদের ৬টা আসনের সাথে সাথে জনগনের সম্পৃক্ততা আমাদের সাথেই বাড়তো। এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে আমাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে যে কালো তকমা আমাদের কপালে লাগায়ে দেয়া হত, তা থেকে রাজনৈতিক ভাবে মুক্তি পাওয়া যেতো। কিন্তু হলো কৈ। সামান্য দেখা ও আলাপ চারিতায় এড সাদ আইডিয়াল ভেংগে দেয়ায় যে ভয়টা করেছিলেন, তা তিনি দেখেই ইন্তেকাল করেছেন।
তিনি আবার জামায়াতে ফিরে এসেছিলেন, তবে কাজ তিনি আর করতে পারেন নি। তার নিরবে চলে যাওয়ায় রুগ্ন হৃদয়ের একটা যায়গায় ব্যাথা পাচ্ছি। কত গভীর রাত এখন, ঘুমাতে পারছিনা তার চেহারাটা মনে পড়ায়। আল্লাহ তুমি এই ভালো মানুষটাকে আদর করে জান্নাতের উন্নত ইল্লিয়্যীনে থাকার ব্যবস্থা করে দাও। মাওলানা ইউসুফ, মাওলানা আব্দুর রাহীম, খতীবে আযম, মাওলানা আতাউর রহমান ও অধ্যাপক গোলাম আযম রাহিমাহুমুল্লাহ গনের সাথে তাকে একত্রে হাস্যোজ্জ্বল করে রাখো। তার পরিবারের সদস্যদের উপর তোমার রহমাত অবারিত করে দাও। আমীন।
লেখাটি বিডি টুডে ব্লগে প্রকাশ হওয়ার পর ব্লগার তারাচাঁদ নিন্মোক্ত মন্তবে সাদ আহমেদ সম্পর্কে আরো কিছু তথ্য সংযোগ করেন;
আপনার লেখা পড়ে আমাদের প্রায়-অজানা ইসলামী ব্যক্তিত্ব সম্বন্ধে ভাল ধারণা পাওয়া যায় । আমরা যারা নতুন প্রজন্মের মানুষ, তারা এক বা দুই প্রজন্ম আগের ইসলামপন্থীদের সম্বন্ধে কমই জানি । তার চেয়েও কম জানি তাদের ত্যাগ ও কুরবানির ইতিহাস । পূর্রসুরীদের ত্যাগ, কুরবানী এবং কর্মকৌশল আমাদের নতুনদের জন্য প্রেরণা হয়ে থাকতে পারে । আমাদের কাছে শহীদ আবদুল মালেক অনেক বেশী স্মরণীয়; কারণ তিনি তার নিজের জীবনকে বিলিয়ে দিয়ে গেছেন । কিন্তু অধ্যাপক গোলাম আযম, আবুল কালাম মুহাম্মাদ ইউসুফ, শামসুর রাহমান, সাদ আহমদরা যা দিয়ে গেছেন, তা শহীদ আবদুল মালেকের চেয়ে কম কিসে ? আবদুল মালেক শহীদ হননি, তাকে শহীদ করা হয়েছে । আর গোলাম আযম, আবুল কালাম মুহাম্মাদ ইউসুফ, শামসুর রাহমান, সাদ আহমদরা সারা জীবন শুধু সত্যের সাক্ষ্য দিয়ে গেছেন ।এঁদেরকে শহীদ করা না-হলেও এঁরা সারা জীবনই শহীদি ময়দানে থেকে তিলে তিলে জীবনকে ক্ষয় করে গেছেন ।
মরহুম সাদ আহমদ সাহেব ১৯৪৭ সালে ভারতের আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিকম প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান লাভ করেন । ১৯৪৯ সালে থেকে এমএ (অর্থনীতি) প্রথম শ্রেণীতে দ্বিতীয় এবং একই বছর এলএলবিতে প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হন। একই বছর পরীক্ষা দিয়ে অর্থনীতিতে এমএ এবং এলএলবি, উভয় পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণী পাওয়ার মত মত মানুষ নিঃসন্দেহে খুবই বিরল । তিনি ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৫০ থেকে ’৫২ সাল পর্যন্ত জগন্নাথ কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন।
সাদ আহমদ সাহেব বেশ কিছু বই লিখেছেন । এর মধ্যে– # হজরত মোহাম্মদ সা:-এর দাওয়াত ও আজকের মুসলমান, # ইসলামের অর্থনীতি, # সূরা আল আসরের আলোকে আমাদের সমাজ, # আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় মহানবী সা:, # আমার দেখা সমাজ ও রাজনীতির তিন কাল, # ইসলামে মসজিদের ভূমিকা, # আদর্শ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় মোহাম্মদ সা:, # কোরবানীর শিক্ষা, # দারিদ্র্য বিমোচনে জাকাতের ভূমিকা ।




