ইন্ডিয়া সিভিলাইজেশন, গ্রীক সিভিলাইজেশন কিংবা ওয়েস্টার্ণ সিভিলাইজেশন ইত্যাকার সবই যদি সিভিলাইজেশন হয় তাহলে আইয়ামে জাহেলিয়াহ কি? আর স্রষ্টার চিন্তা ব্যতিরেকেই যদি সিভিলাইজেশনের উৎপত্তি কিংবা টিকে থাকা সম্ভব হয় তাহলে একত্ববাদি এসব চিন্তা চেতনার কিংবা দর্শনের প্রয়োজনীয়তা কি? আর ইসলামি বা মুসলিম সিভিলাইজেশনের পার্থক্যই বা কি?
বর্তমান ওয়েস্ট প্রচলিত ডিসকোর্স অনুসারে, ইসলামি সিভিলাইজেশনের অস্তিত্ব খুবই ক্ষীণ। অনেকে আবার একে ‘ডার্ক এজ’ বলে ক্রিটিসাইজও করেন।
আসলে সিভিলাইজেশন কি? বড় বড় বাড়ী, অট্টালিকা, প্রাসাদ, কিংবা মারণাস্ত্র, বা প্রযুক্তির নামই কি সিভিলাইজেশন? আচ্ছা, যে দর্শনে “মানুষ” তার অস্তিত্ত্বের স্বীকৃতি পায়না, সকল মানুষ তাঁর বাঁচার স্বীকৃতি পায়না, তার সার্বভৌম স্বীকৃতি পায়না, সেই দর্শন এবং দর্শনোদ্ভাবিত প্রযুক্তি কি মানবতার সার্বজনীন কল্যাণে কিংবা সার্বজনীনভাবে সকল মানুষের কল্যাণে আসতে পারে?
আর যেই সিভিলাইজেশনের নির্মাতা দর্শনে “মানুষের সার্বজনীনতাকে” কিংবা পৃথিবীর সকল মানুষের অস্তিত্বকেই স্বীকৃতি দেয়া হলোনা, সেই জাতির অনুসারি বা সে দর্শনাশ্রয়ী বিজ্ঞানীদের পক্ষে কিভাবে সম্ভব হবে তাদের সকল প্রযুক্তির উদ্ভাবনকে সকল মানুষের কাজে লাগানো।
আর যেই সিভিলাইজেশন, মানুষকে তার সার্বজনীনতার, তার অস্তিত্বের স্বীকৃতি দেয়না, তাতে মানবসভ্যতার বা মানবজাতির কি বা আসে যায়?
ওরা বলে, বর্তমান সিভিলাইজেশঅন নাকি মানুষের জীবনযাত্রার আয়ুস্কাল বাড়িয়ে দিয়েছে, জীবনযাত্রার স্ট্যান্ডার্ড অনেকগুণ বৃদ্ধি করেছে।
আমি বলি কি, যেই দর্শনে আমার অস্তিত্বেরই স্বীকৃতি নেই, সেখানে আমার আয়ুস্কাল বাড়িয়ে লাভ কি বাবা? দীর্ঘ গোলামির বা দাসত্বের জীবনের চেয়ে স্বল্পায়ু মানবিক, স্বীকৃত-সম্মানীয় জীবনই তো আমি চাই।
আমি কতটুকু প্রযুক্তির কল্যাণ পেলাম তা জানা আমার দরকার নেই, কারণ আমি জানি, এই তথাকথিত প্রযুক্তির কল্যাণ ধারণাটি একটি “কুহেলিকা” স্বরুপ, এটি অনন্ত, অসীম। কাজেই প্রথমত আমি যা চাই, তা হচ্ছে আমার, আমার কর্তাসত্ত্বার, আমার অস্তিত্বের স্বীকৃতি। এই স্বীকৃতি দেয়ার পর যতটুকু পার্থিব পরিবর্তন বা পার্থিব উপাদান আমার জীবনের জন্য ব্যয়িত হবে আমি তাতেই সন্তুষ্ট। আমি সুখি।
কারণ আমি জানি, আমি মানুষ। আমার জীবন ক্ষণস্থায়ী। আমি একটি আত্মাকেন্দ্রিক (Soul-centric creature) জীব। আমি একটি ত্যাগি সত্তা। ত্যাগেই আমার ভালবাসা, দানেই আমার মানবিক ও মানসিক সন্তুষ্টি। কাজেই অযথা আমি এই অনন্ত, সীমাহীন এই ভোগের পেছনে কেন ছুটব, কেন আমকে ছূটতে বাধ্য করা হবে?
আমি তাই এই সভ্যতার নিকট কিছুই চাইনা। চাইনা আমি সীমাহীন ভোগবাদিতার পেছনে ধাওয়া করতে। আমাকে মুক্তি দেয়া হোক এই ভোগের এই লালসা থেকে। আমার আত্মার স্বীকৃতি দেয়া হোক। দেয়া হোক আত্মাময় জীবন-যাপনের সূযোগ। আমার দৈহিক উন্নয়নের নয় বরং আমার আত্মার উন্নয়নের সঠিক সূযোগ। তবেই আমি কেবল এই সভ্যতাকে “সভ্যতা/সিভিলাইজেশন” হিসাবে আখ্যায়িত করতে পারি, নতুবা নয়।




