পুঁজিবাদি দুনিয়ায় আমাদের চারপাশটা এমনভাবে পুঁজিবাদীদের নিয়ন্ত্রিত যে, যে দিকেই তাকায় সে দিকেই পুঁজিবাদি প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব। গত কয়েকশ বছরে এসব পুঁজিবাদি তত্ত্ব ব্যক্তিক ও সামাজিক জীবনের চারপাশে এমন সব সাব-তত্ত্ব (উপ-তত্ত্ব) হাজির করেছে যে, এসব উপ/সাবতত্ত্বের বেড়াজাল ছিন্ন করে পুঁজিবাদের গায়ে আঁচড় কাটার সময় কিংবা ফুরসত-ই পাওয়া যায়না।
পুঁজিবাদি এসব সাব তত্ত্বের মাঝে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাবতত্ত্ব হচ্ছে- জিডিপি তত্ত্ব- যা দিয়ে সারা দুনিয়ার সকল দেশের অর্থ সম্পদের একটা আপাত হিসাব নিকাশের অংক দাঁড় করানো হয়। এই সাবতত্ত্বের আরেকটি শাখা হলো-সার্ভিস সেক্টর। সকল দেশের অর্থ সম্পদ পরিমাপের ক্ষেত্রে এই সার্ভিস সেক্টরের অনুপাত/হার এমনভাবে বেড়ে যাচ্ছে যে, যে মৌলিক প্রডাকশানের (এগ্রিকালচার ও ইন্ড্রাস্ট্রি সেক্টর) উপর এই সার্ভিস সেক্টরের ভিত্তি দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই ভিত্তিই মনে হয়ে ভেংগে পড়ার উপক্রম।
সি আই এর “বিশ্ব তথ্যপুস্তিকা” (CIA’s World Fact Book) ২০১৩ অনুসারে বিশ্বের মোট উৎপাদন প্রায় ৭৪.৩১ ট্রিলিয়ন (পিপিপি হিসাবে) এবং বিশ্বব্যাংকের মতে এই উৎপাদন ৭৫.৫৯ ট্রিলিয়ন। এই উৎপাদনের ৬৩.৬%-ই আসছে সার্ভিস সেক্টর হতে। বিশ্বব্যাপি সকল দেশেই এই সার্ভিস সেক্টরের হার ক্রমাগত বেড়ে চলছে।
টোটাল জিডিপিতে সার্ভিস সেক্টরের এই ক্রমাগত বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে সার্ভিস সেক্টরের অতিমূল্যায়ন। সার্ভিস সেক্টরের এই অতিমূল্যায়ন কাজ করছে বিশ্বব্যাপি গড়ে উঠা পুঁজিপতিদের গরীব-শ্রমিক-কৃষকদের শাসন শোষণের হাতিয়ার হিসাবে। তাই জিডিপি গণণার এই রীতি এবং সার্ভিস সেক্টরের অতিমূল্যায়নের চক্র হতে বের হতে না পারলে, কোন ভাবেই শাসকচক্রের বেড়াজাল হতে বের হয়া সম্ভব হবেনা। Howmuch.net এর একটি মানচত্রে বিশ্বব্যাপি জিডিপি এবং এতে সার্ভিস সেক্টর, কৃষি ও শিল্প সেক্টরের চিত্র ফুটে ঊঠেছে।
একটি উদাহরণ দিলে সার্ভিস সেক্টরের এই অতিমূল্যায়নের কূট-কৌশল সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এর একটি উদাহরণ হচ্ছে- একজন কৃষক এক সিজনে (গড়ে দু-তিন মাস) সারাদিন পরিশ্রম করে যে শস্য উৎপাদন করছে তার দাম মণ প্রতি যদি “ক” (ধানের ক্ষেত্রে ৪০০-৬০০ টাকা, সবজির দাম- ৪০০-৭০০ টাকা, ধরা যাক) হয় তাহলে দেখা যাচ্ছে, বাজারে আসার পর বিভিন্ন স্তরে এক দিন/ দুদিনেই এর দাম বেড়ে হয়ে যাচ্ছে “৩ক” টাকা। আর যদি এই শস্য যদি কোন কারাখানায় উঠার সুযোগ লাভ করে তাহলে এর দাম হয়ে যায় “৫/৬/৭ক”। স্তরে স্তরে অযৌক্তিকভাবে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত এই মূল্যমান কে ধরেই হিসাব করা হয় সকল দেশের জিডিপি। এইভাবে একজন উৎপাদক মাসের পর মাস, দিনের দিন পরিশ্রম করে, তাতে জীবনের সকল আশা-আকাংখা ও ভালবাসা ঢেলে দিয়ে যে উৎপাদন খরচ পায়, তার চেয়ে ঢেরগূণ বেশি আয় করে শহরের শাসক শোষকরুপি পুঁজিপতি ও ভুঁইফড় ব্যবসায়ীরা একদিন বা এক সপ্তাহেই। তথাকথিত এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে রয়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক পুঁজিবাদি সমাজের অর্থনীতিবিদ, সমাজবিদ, রাজনীতিবিদ, সমরবিদ, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার প্রমুখ। কারণ তারা জানে এর ব্যত্যয় ঘটলেই তাদের তথাকঠিত প্রতিষ্ঠিত ভোগবাদি জীবনধারায় টান পড়বে। তাই যে কোন ভাবেই টিকিয়ে রাখতে এই সিস্টেম, শাসন-শোষণের এই যন্ত্র।
পশ্চিমা অর্থনীতি কিভাবে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অভিশাপ হয়ে দেখা দিচ্ছে এবং কিভাবে ইসলামি অর্থনীতি এই অভিশাপ হতে কিভাবে মুক্তি দিতে পারে তার এক আশাবাদ ও স্বপ্ন আমরা দেখতে পাই, পাকিস্তানের জনক কায়েদে আযম আলি জিন্নাহর এক বক্তব্যে। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান স্টেট ব্যাংকের উদ্বোধণী বক্তব্যে তিনি বলেন-
“The Economic System of the west has created almost insoluble problems for the humanity, and to many of us it appears that only a miracle can save it from the disaster that is now facing the world. It has failed to do justice between man and man and to eradicate friction from the international field. On the contrary, it was largely responsible for the two world wars in the last half-century. The western world in spite of its advantages, of mechanisation and industrial efficiency, is today in a worse mess than ever before in history. The adoption of western economic theory and practice will not help us in achieving our goal of creating a happy and contented people. We must work our destiny in our own way, and present to the world an economic system based on the true islamic concept of equality of mankind and social justice. We will thereby be fulfilling our mission as muslims and giving to humanity the message of peace which alone can save it and secure the welfare, happiness, and prosperity of mankind.”
“পশ্চিমা ধাঁচের অর্থনীতি আজকে মানব জীবনে সমাধানহীন কতগুলো সমস্যার সৃষ্টি করেছে। আমাদের অনেকে মতে, কোন একটি অলৌকিক ঘটনা ছাড়া বর্তমানে পৃথিবী যে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে তার থেকে মুক্তি পাবেনা। এই অর্থনীতি মানুষে মানুষে সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সংঘর্ষ বন্ধ করতে ব্যার্থ হয়েছে। অপরদিকে এই অসাম্যই গত ৫০ বছরে বিগত দুটি বিশ্ব যুদ্ধের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পশ্চিমা জগৎ তার যান্ত্রিক উন্নতি, ও শিল্প ক্ষেত্রে দক্ষতা সত্বেও আজকে ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা বিশৃংখল অবস্থায় নিপতিতি হয়েছে। পশ্চিমা ধাঁচের অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ ও অনুসরণ, আমাদের যা লক্ষ্য- এক্টী সুখি ও পরিতৃপ্ত জাতি গঠন কোনভাবে তার সহায়ক হবেনা। আমাদের জাতির ভাগ্য আমাদের নিজেদের ইস্পিত পথেই গড়ে তুলতে হবে। আমরা জগতের কাছে এমন একটা অর্থনীতি উপস্থাপন করব যেটি ইসলামিক ন্যায়নীতি, মানবকল্যাণ ও সামাজিক ন্যায়পরায়নতার উপর ভিত্তি করে রচিত হবে। এই পথে আমরা মুসলমান হিসাবে এমন একটি আদর্শকে রুপ দেব যা মানবজাতিকে শান্তির পথ প্রদর্শন করবে। একমাত্র সেই পথেই আসবে মানব জাতির নিরাপত্তা, কল্যাণ, সুখ ও সমৃদ্ধি ” [দেশ বিভাগ রাজনীতি, এম এ মোহাইমেন, পৃষ্ঠা-২৩৬]
ইসলামি অর্থনীতি যে কল্যাণকর অর্থনীতির কথা বলে তার মর্মার্থ বুঝতে হলে প্রথমেই শাসন-শোষণের হাতিয়ার হিসাবে প্রতিষ্ঠিত এই দেশীয়/আঞ্চলিক/ বৈশ্বিক সম্পদ গণনার পদ্ধতি হতে বের হতে হবে। কারণ এই পদ্ধতির মধ্যে থেকে কোন ভাবেই কল্যাণকর বা নাগরিক বান্ধব অর্থনীতির কর্ম-কৌশল নির্ধারণ করা সম্ভব হবেনা। কল্যাণকর অর্থনীতির কলা-কৌশল বুঝতে হলে মানব সমাজের কল্যাণ কিভাবে আসবে তা সুনির্দিষ্টভাবে বুঝা দরকার। আর মানব সমাজের কল্যাণের পথ-পদ্ধতি বুঝার জন্য দরকার হবে বর্তমানে সামাজ কাঠামোর অসঙ্গতি তুলে ধরা। যে ইন্ডিকেটর বা মানদন্ড দ্বারা বর্তমান সমাজের কল্যান-অকল্যাণ বা স্থিতিশীলতা মাপা হয় তার ভুল বা ত্রুটি-বিচ্যুতি সুক্ষ্মভাবে ধরা না গেলে সামাজিক অসঙ্গতি বুঝা সম্ভব হবেনা। সম্ভব হবেনা ইসলামি সমাজের বৈশিষ্ট্য অনুধাবন করা। কথায় আছেনা – “শর্ষের ভেতর ভূত থাকলে সেই তেলে অসুখ সারেনা” । এটি করতে না পারলে আমরা যুগ যুগ ধরে ইসলামি সমাজ, ইসলামি ব্যাংক বা ইসলামি অর্থনীতির কোশেস করে যাবার পর যা দেখব তা হচ্ছে, “আসলে বুঝে না বুঝে আমরা পুঁজিবাদেরই সেবা করে যাচ্ছি”।
তাই বর্তমানে প্রচলিত জিডিপি সিস্টেম এবং এর ভেতর লুক্কায়িত বা সার্ভিস সেক্টরের অতিমূল্যায়নের এই রহস্য (!) উদ্ঘাটন করাই হবে ইসলামি বা মানব কল্যাণকামি অর্থনীতিবিদদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। এই ক্ষেত্রে ফয়দর দস্তয়ভস্কির একটি কথা প্রণিধানযোগ্য- “Nothing is easier than to denounce the evildoer; nothing is more difficult than to understand him.”
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কিছুটা কাজ করে যাচ্ছে- হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইন্ডেক্স (Human Development Index) এর আবিস্কারক ড. মাহবুবুল হক ও ড অমর্ত্য সেন এবং অন্যরা। তবে এই উদ্যোগ যথেষ্ঠ নয়। এগিয়ে আসতে হবে আরো অনেক কে। প্রচলিত অর্থনীতির আরো গভীরে গিয়ে বিশ্লেষণ করতে হবে। কেবল তবেই সম্ভব হবে মানবকল্যাণকামি অর্থনীতির প্রতিষ্ঠা, এবং সোনালী যুগের সেই সামাজিক অগ্রগতি, মূল্যবোধ ফিরিয়ে এনে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানময় সমাজ (A Society full of Peaceful Coexistence) উপহার দেয়া।




