عن أبي هريرة رضي الله عنه : عن النبي صلى الله عليه و سلم قال ( سبعة يظلهم الله تعالى في ظله يوم لا ظل إلا ظله إمام عدل وشاب نشأ في عبادة الله ورجل قلبه معلق في المساجد ورجلان تحابا في الله اجتمعا عليه وتفرقا عليه ورجل دعته امرأة ذات منصب وجمال فقال إني أخاف الله ورجل تصدق بصدقة فأخفاها حتى لا تعلم شماله ما تنفق يمينه ورجل ذكر الله خاليا ففاضت عيناه ) أخرجه البخاري، كتاب الزكاة، باب الصدقة باليمين
অর্থ: হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত,রাসুল (সাঃ) বলেন: সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর (আরশের) নিচে ছায়া দান করবেন যে দিন তাঁর ছায়া ব্যতীত অন্য কোন ছায়া থাকবেনা।(তারা হলেন):ন্যয়পরায়ণ শাষক,ঐ যুবক যে আল্লাহর ইবাদতে বেড়ে ঊঠেছে,ঐ ব্যক্তি যার হৃদয় সর্বদা মসজিদের সাথে সম্পৃক্ত ,ঐ দুই ব্যক্তি যারা একে অপরকে ভালবাসে আল্লাহর সস্তুষ্টির নিমিত্তে এবং পরস্পরে মিলিত ও পৃথক হয় তাঁরই নিমিত্তে,ঐ ব্যক্তি যাকে সম্ভ্রান্ত পরিবারের এক সুন্দরী নারী ( অশ্লীল কর্মের দিকে) আহবান করেছে, অতপর: সে বলল: আমি অবশ্যই আল্লাহকে ভয় করি,ঐ ব্যক্তি যে এমন গোপনে সদকা দান করেছে যে,তার বাম হাত ও টের পায়নি তার ডান হাত যা দান করেছে,আর ঐ ব্যক্তি যে নিরবে নিভৃতে আল্লাহকে স্মরণ করেছে অতপর: অশ্রু বিসর্জন দিয়েছে ।(বুখারী,কিতাবুয্ যাকাত,বাবুস্ সাদাকাহ্ বিল ইয়ামিন,সহীহ)।
রাবী চরিতঃ অত্র হাদীসের রাবী হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ)। (হাদীসের বর্ণনাকারী বিখ্যাত সাহাবী আবু হুরায়রা (রাঃ)। তাঁর জীবনের শিক্ষনীয় দিকগুলো পাঠকবৃন্দ সু্যোগ করে পড়ে নিবেন।
)
)
ওলামাদের নিকট হাদীসটির মর্যদা:
ইমাম যাহাবী (রহঃ) বলেন: আরশের ছায়া স¤পর্কিত এমন সংখ্যক হাদীস বর্ণিত হয়েছে ,যা মুতাওয়াতিরের পর্যায়ে পোঁছে।( মুখতাসারুল উলু : ১০৫ পৃষ্ঠা)
আল্লামা ইবনু আবদিল বার (রহঃ) বলেন: আমলের ফযিলতের ক্ষেত্রে বর্ণিত হাদীস সমুহের মধ্যে এই হাদীসটি সর্বাপেক্ষা উত্তম, ব্যপক ও বিশুদ্ধ ইনশা আল্লাহ। মর্যাদার জন্য ইহাই যথেষ্ট। কেননা এ কথা সর্বজ্ঞাত যে, কিয়ামতের দিন যে ব্যক্তি আল্লাহর আরশের নিচে স্থান পাবে সে কিয়ামতের দিন ভয়াবহ উপবিষ্টতার স্বীকার হবেনা। (আত্তামহীদ,খন্ড: ২,পৃষ্ঠা: ২৮২ )
শাব্দিক বিশ্লেষণ:
প্রথমত:সাত ব্যক্তি: আল্লামা ইবনে হাজার আল আসকালানী (রঃ) বলেন: এই হাদীসে পুরুষের উল্লেখ করণের কোন বিশেষত্ব নেই: বরং যে বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে তাতে পুরুষের সাথে নারীরাও অংশীদার। তবে ইমামত দ্বারা ইমামতে উজমা তথা সর্ববৃহৎ নেতৃত্ব উদ্দেশ্য। অন্যথায় এখানে নারীর অংশগ্রহণও সম্ভব। যেমন: যদি কোন মহিলা কোন পরিবারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং পরিবারের সদস্যদের মাঝে সমতা বিধান করেন। কেননা নামাজ ব্যতীত সবগুলোতেই মহিলার অংশ গ্রহণ রয়েছে। আর মহিলার জন্য নামাজ মসজিদের অপেক্ষা ঘরে পড়াই উত্তম।(ফাতহুল বারী,খন্ড: ২,পৃষ্ঠা: ১৭৩ )
শাইখ আতিয়্যাহ সালিম বলেন: মসজিদের সাথে হৃদয়ের সম্পৃক্ততার দিকটা মহিলার ক্ষেত্রেও সম্ভব। যদি আমরা ধরে নিই যে, মহিলার ঘরে তার নামাজের জন্য একটি নির্ধারিত স্থান রয়েছে। আর যথা সময়ে নামাজ আদায়ের আগ্রহে তার অন্তর সর্বদা নামাজের স্থানের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে আছে। এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো: হাফসা বিনতে সিরিন (রাঃ) ত্রিশ বছর নামাজের স্থানে অবস্থান করেছেন। বিশেষ প্রয়োজন কিংবা কায়লূলা ছাড়া সে স্থান থেকে বের হতেন না। (ফি যিলালি আরশির রহমান পৃষ্ঠা: ৬৪)
দ্বিতীয়ত: ন্যায়পরায়ণ শাসক: ইবনে হাজার আসকালানী (রঃ) বলেন: আদেল তথা ন্যায়পরায়ণের সর্বোত্তম সংজ্ঞা হলো: যে ব্যক্তি কোন প্রকার বাড়াবাড়ি কিংবা শৈথিল্য ছাড়াই প্রত্যেকটি বস্তুকে তার যথোপয্ক্তু স্থানে রাখার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ পালন করেন। এমন শাসকের কল্যাণের ধারা অতি ব্যাপক হেতু তাকে উক্ত হাদীসের সর্বাগ্রে উল্লেখ করা হয়েছে। (ফাতহুল বারী ,খন্ড: ২,পৃষ্ঠা: ১৬৯,১৭০)
ইবনে আবদিল বার বলেন: এর মধ্যে এমন ব্যক্তিও শামিল হবেন, যিনি দু’জনের মাঝে ফয়সালা বিধানের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন। কেননা রাসুল (সাঃ) বলেন: “তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।
তৃতীয়ত: নারীর আহবান: ইবনে হাজার (রঃ) বলেন: এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: অশ্নীলতার দিকে ডাকা। ইমাম কুরতুবী এই অর্থকেই দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেন। (ফাতহুল বারী,খন্ড: ২,পৃষ্ঠা: ১৭০,১৭১ ) অনুরুপভাবে কোন পুরুষ যদি কোন নারীকে অশ্নীলতার দিকে ডাকে সেও এর মধ্যে শামিল হবে।
চতুর্থত: আমি আল্লাহকে ভয় করি এ কথা বলা: আল্লাহকে ভয় করার বহিঃপ্রকাশ মৌখিক ও আন্তরিক উভয়ভাবে করা যেতে পারে। তবে আহবান কারী নারীকে অশ্নীলতা থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যেই অথবা নিজের পক্ষ থেকে ওযর পেশ করার লক্ষ্যে মৌখিকভাবে বলাই শ্রেয়।
পঞ্চমত: একাকী আল্লাহকে স্মরণ করে অশ্র“ বিসর্জন দেয়া: আল্লাহ তায়ালার যিকির (স্মরণ) মৌখিক,আন্তরিক,এবং অন্যান্য পন্থায় করা যায়। তবে অন্তরের স্মরণ ও অনুভূতি ব্যতীরেকে মৌখিক যিকিরের উপকারিতা খুবই ক্ষীণ। আর মানুষের দৃষ্টির আড়ালে নিরবে নির্জনে যিকির করার মাধ্যমে লৌকিকতা (যা নেক আমলকে নষ্ট করে দেয়) থেকে দূরে থেকে (ইখলাস) একনিষ্ঠতা অর্জন খুবই সহজ। আর এতে আল্লাহ তায়ালাকে অধিকতর নিকটে পাওয়া যায়।
হাদীসের অর্থগত ব্যাপকতা:
উল্লেখিত হাদীসটি মুসলিম সমাজের সকল দিককে অর্ন্তভূক্ত করেছে। একজন সমাজপতির ব্যক্তিসত্তার আদালত (ন্যায়নিষ্ঠা) ও অন্যদের মাঝে মীমাংসা বিধানে আদল (ন্যায়পরায়ণতা), একজন যুবকের ক্রমান্বয়ে প্রবৃদ্ধি, সমাজের মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, নারী ও পুরুষের চারিত্রিক পরিশুদ্ধতা, ধনী-গরীবের কাছাকাছি সম্পর্ক, একজন মানুষের দুনিয়া-আখিরাতের সকল কাজে আল্লাহকে স্মরণ রাখা এবং তাঁর থেকে অমনোযোগী না হওয়া, এ সকল দিককে হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়;বরং সমাজের উঁচু-নিচু সকল শ্রেণীকে অর্ন্তভূক্ত করেছে অত্র হাদীসখানি। এমনকি সেই ব্যক্তিকেও যে আন্তরিকভাবে আল্লাহকে স্মরণ করছে আর নীরবে নিভৃতে আল্লাহর ভয়ে অশ্র“ ঝরাচ্ছে, অথচ তার সম্পর্কে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না।
হাদীসে উল্লেখিত সাতটি গুণের আভ্যন্তরীণ সম্পৃক্ততা:
প্রথমত: উক্ত সাত শ্রেণীর লোকের মধ্যে দু’টি গুণ সক্রিয়ভাবে কাজ করছে:
(১) আল্লাহ তায়ালার প্রতিদানের আশা ও তাঁর শাস্তির ভয়।
(২)তাকে সর্বদা স্মরণ ও পর্যবেক্ষণে (মুরাকাবায়) রাখা এবং মানুষের অগোচরে নেক আমল করা।
দ্বিতীয়ত: এই সাতটি গুণ একটি অপরটির দ্বারা প্রভাবিত ও প্রভাব সৃষ্টি কারী। অর্থাৎঃ একটি অপরটির তুলনায় পূর্বশত, পরিণিতি ও কারণের স্থলাভিষিক্ত।
তৃতীয়ত: এই সাতটি গুণের পারস্পরিক সম্পৃক্ততার স্বরপ হচ্ছে: ইমাম (শাসক, সমাজপতি কিংবা রাষ্ট্রপতি) তার ব্যক্তিসত্তায় আদালত (ন্যায়নিষ্ঠা) স¤পন্ন হয়ে অন্যদের মাঝে আদলের (ন্যায়পরায়ণতার) বিধান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সুন্দর ও সুশীল একটি সমাজ কায়েম করবেন, যে সমাজে আল্লাহর ইবাদতকারী যুবক সৃষ্টি হবে। আর এমন একজন ইবাদতকারী যুবকের অন্যতম গুণ হলো: নামাজ প্রতিষ্ঠার জন্য বারবার মসজিদের পানে ছুটে যাওয়া। আর স্বাভাবিকভাবেই এমন যুবকের মন সর্বদা মসজিদের সাথে লেগেই থাকবে। আর এমন মুসল্লীর আবশ্যকীয় একটি গুণ হলো তারা সকলেই পারস্পরিক পরিচিতি গ্রহণ করে থাকে এবং এ পরিচিতিও বারংবার সাক্ষাতের মাধ্যমে তাদের মাঝে এক প্রকার ভালবাসার সৃষ্টি হয়। তারা সকলেই আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির জন্যই মসজিদে আসেন এবং এর একটা প্রভাব সমাজের মানুষের মাঝে পড়ে। এই প্রভাব সমাজ সংসারে ফলদায়ক ভূমিকা পালন করে। ঠিক অনুরুপভাবে যে ব্যক্তি কোন নারী কর্তৃক অপরাধের দিকে আহুত হয়ে প্রবৃত্তির প্রবলতা সত্তেও কেবলমাত্র ঈমানের চেতনা ও আল্লাহর ভয়েই বিরত থাকে। আর এমন ভয় সৃষ্টি হয় বারবার মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায়ের অভ্যাস থেকেই। আল্লাহ তায়ালা বলেন: “নিশ্চয়ই নামাজ অশ্নীলতা ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে”।(সূরা আল আনকাবুত: আয়াত: ৪৫)
তেমনিভাবে সম্পদের লোভ ও কৃপণতা থাকা সত্তেও কোন প্রকার বিনিময় ব্যতীরেকে আল্লাহর পথে সম্পদ ব্যয় করা তাঁর ভয় ও বিনিময়ের আশা ছাড়া সম্ভব নয়। আর যে ব্যক্তি কু-প্রবৃত্তির উপর বিজয়ী হয়েছে, সে অন্যান্য সকল প্রবৃত্তির উপর বিজয়ী। তবে এ সকল ত্যাগ কেবল মাত্র আল্লাহকে প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে সর্বাবস্থায় ভয় করার মাধ্যমেই সম্ভব। এ ভাবে এই সাতটি গুণ একটি অপরটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর এই সুন্দর ও শৃঙ্খলিত ও সাজানো বক্তব্য পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানব রাসূল (সাঃ) এর ভাষার অলংকারীত্বের এক উজ্জল দৃষ্টান্ত। (ফি যিলালি আরশির রাহমান,পৃষ্ঠা: ৬২,৬৩)
চতুর্থত: উক্ত সাত শ্রেণীর ব্যক্তিই তাদের কুপ্রবৃত্তির বিরোধিতা করে সুন্দর চরিত্রের অধিকারী হয়েছেন। আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেম (রঃ) বলেন: আরশের নীচে ছায়াপ্রাপ্ত উক্ত সাত শ্রেণীর ব্যাপারে চিন্তা-গবেষণায় বুঝা যায় যে, তারা সকলেই এ মর্যাদা অর্জন করেছে তাদের কুপ্রবৃত্তির বিরোধিতার মাধ্যমে। (ফি যিলালি আরশির রাহমান, পৃষ্ঠা: ৬৩)
বিস্তারিত ব্যাখ্যা: আরশের ছায়াপ্রাপ্ত সাত ব্যক্তি:
প্রথম ব্যক্তি: ন্যায় পরায়ণ শাসক:
কিয়ামতের কঠিন মূহুর্তে আল্লাহ আরশের নীচে ছায়াপ্রাপ্ত সাত ব্যক্তির প্রথম ব্যক্তি হলেন ন্যায়পরায়ণ শাসক। মুসলিম সমাজকে বিভিন্নভাবে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা হতে পারে। কিন্তু অত্র হাদীসে এককভাবে (ইমামে আদেল) ন্যায়পরায়ণ শাসক উল্লেখের কিছু কারণ রয়েছে: তা হলো:
(১) তার ন্যায় প্রতিষ্ঠার সুফল সকল মানুষকে শামিল করে।
(২) তিনি সমাজ থেকে অত্যাচার বিতাড়িত করেন।
(৩) তিনি তাঁর ন্যয়পরায়ণতার মাধ্যমে সমাজে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা করেন।
অন্যায়ের অশুভ পরিণিতি: হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) বলেন: যে ব্যক্তি অন্তত দশজনের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছে কিয়ামতের দিবসে সে শিকলের বেড়ীতে আবদ্ধ অবস্থায় উপবিষ্ট হবে। যদি ন্যায়পরায়ণ হয় তাহলে বেড়ী থেকে মুক্তি পাবে, আর অন্যায়কারী হলে এই বেড়ীই তাকে ধ্বংস করবে। (বায়হাকী ,(হাসান)
দ্বিতীয় ব্যক্তি: যে যুবক ইবাদতে গড়ে উঠেছে:
হাদীস শরীফে এসেছে, রাসূল (সাঃ) বলেন:“ নিশ্চয় তোমার রব এমন যুবকের ব্যাপারে আর্শ্চযান্বিত হন (তাকে সওয়াব দান করেন অধিকতর), যার প্রবৃত্তির প্রতি ঝোঁক নেই।” অর্থাৎ: যে যুবক প্রবৃত্তির তাড়নায় অন্যায় কাজে লিপ্ত হয় না।
যৌবনে আমলের গুরুত্ব: যৌবন কালে আমলের গুরুত্ব সম্পর্কে রাসূল (সাঃ) বলেন: কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট পাঁচটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হওয়া ব্যতীরেকে কোন বনী আদম এক কদমও পা সরাতে পারবে না। (সে পাঁচটি বিষয় হলো) তার জীবন সে কোথায় অতিবাহিত করেছে, তার যৌবন কোথায় সে কাটিয়েছে, তার সম্পদ কোথা থেকে উপার্জন করেছে এবং কোথায় ব্যয় করেছে। আর তার জ্ঞান অনুযায়ী কতটুকু সে আমল করেছে। (তিরমিযী ,(হাসান))
ইসলামের সূচনালগ্নে যুবকের অবদান: যে মুমিন কাফেলাটি দারুল আরকামে অবস্থান করেছে, যাদের হাতে দ্বীন বিজয়ী হয়েছে এবং দ্বীনের পতাকা উড্ডীন হয়েছে সে কাফেলার সবাই ছিল যুবক। দ্বীনের পথে প্রথম আহবান কারী বিশ্ব শ্রেষ্ঠ মানব রাসুলুল্লাহর (সাঃ) বয়স ছিল চল্লিশ বছর। আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) এর বয়স সাইত্রিশ বছর। ওমর ফারুক (রাঃ) এর বয়স ছাবিবশ বছর, আলীর (রাঃ) বয়স ছিল আঠার বছর। হযরত উসমানের (রাঃ) বয়স ছিল বিশ বছর, স’াদ বিন আবি ওয়াক্কাসের (রাঃ) বয়স ছিল সতের বছর, সুহাইব আর রুমীর বয়স উনিশ বছর, যায়িদ বিন হারিসার বয়স বিশ বছর, আবু উবায়দা ইবনুল র্জারাহ এর বয়স সাতাইশ, আবদুর রহমান ইবনে আউফের বয়স বিশ বছর, বিলাল ইবনে রাবাহের বয়স ত্রিশ বছর, আরকাম ইবনে আবিল আরাকামের বয়স ছিল এগার বছর। তার বাড়ীতেই ইসলামের সর্বপ্রথম বিদ্যাপীঠ প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
যুবকের আদর্শ:
১. আল্লাহর এক প্রিয় যুবক আলী (রাঃ)। তার জন্য জান্নাত ছিল আকুল। রাসূল (সাঃ) বলেন: নিশ্চয়ই জান্নাত তিন ব্যক্তির জন্য আকুল , তারা হলেন আলী, আম্মার এবং সালমান (রাঃ)। (তিরমিযী,(হাসান) আলী তো সেই যুবক নামাজ অবস্থায় যার তীর খুলে ফেলল অথচ তিনি টের ফেলেন না।
২. আরেক যুবক ছিল ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রাঃ), একুশ বছর বয়সে তিনি হাদীসের পাঠ দান করার জন্য বসতেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে শরীয়তের সমাধান তথা ফতোয়া প্রদান করতেন।
৩. ইমাম শাফেয়ী (রঃ) পনের বছর বয়সে তাঁর উস্তাদ মুসলিম ইবনে খালিদ আয্ যানজীর অনুমতিক্রমে পাঠদান করতেন এবং ফতোয়া দিতেন।
৪. ইমাম বুখারী নিজেই বলেন: ষোল বছর বয়সে আমি ইবনুল মোবারক ও ওয়াকী এর সকল কিতাব মুখস্থ করি। আঠার বছর বয়সে সাহাবায়ে কিরাম ও তাবেয়ীদের বিভিন্ন বিষয়ে রচনা করি।
আল্লাহর প্রিয় যুবকদের থেকে আমরা কোথায়: আমরা কোথায় আজ সে সকল যুবকদের থেকে?আমরা কি বয়সে ও শারিরিক অবয়বে তাদের মত নই? হ্যাঁ, অবশ্যই তাদের মত। কিন্তু জ্ঞানে ও গুণে কি তাদের মত হতে পেরেছি? তাহলে কোথায় ব্যয় করছি আমাদের মহামূল্যবান এই যৌবন? আল্লাহর ইবাদাতে কি ব্যয় করতে পেরেছি? আমার যৌবন থেকে কি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সন্তুষ্ট? যদি এমন না হয়, তাহলে আজই সেই মহান প্রভূর দিকে ফিরে যাই।
তৃতীয় ব্যক্তি: যার হৃদয় সদা মসজিদের সাথে সম্পৃক্ত:
হযরত আবুদ্ দারদা (রাঃ) তার ছেলেকে লক্ষ্য করে বলেন: হে প্রিয় বৎস মসজিদই হবে তোমার ঘর। নিশ্চয় আমি রাসূলকে (সাঃ) বলতে শুনেছি, নিশ্চয় মসজিদ সমূহ হচ্ছে মুত্তাকীদের (আল্লাহভীরূদের) ঘর স্বরুপ। আর মসজিদ যার ঘর হবে আল্লাহ তায়ালা তার জন্য প্রশান্তি, করুণা ও পুলসিরাত পার হয়ে জান্নাতে যাওয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। (জুহুদ,হান্নাদ বিন আস্ সারি )
মসজিদের সাথে অন্তরের সম্পৃক্ততার আলামত:
১. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে পড়তে অধিক আগ্রহী হওয়া।
২. ফজরের পর সালাতুদ্ দোহা পর্যন্ত নিজস্ব নামাজের স্থানে বসে অপেক্ষা করা।
৩. প্রথম তাকবীর (তাকবীরে উলা) এর সাথে জামাতে অংশ গ্রহণ কর।
৪. মসজিদে প্রবেশ করা মাত্র সালাতুত তাহিয়্যাহ পড়া। (মসজিদে প্রবেশ করলেই দু’রাকাত নামাজ পড়া সুন্নাত, এ নামাজকেই সালাতুত্ তাহিয়্যাহ বলা হয়)
৫. বিপদ সংকুল অবস্থাতেও মসজিদে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করা।
৬. নামাজের সময়ের আগেই মসজিদে গিয়ে অপেক্ষা করা।
৭. এক নামাজের পর অপর নামাজের জন্য অপেক্ষা করা।
৮. প্রথম সারিতে এবং ইমামের ডান পার্শ্বে দাড়ানো।
৯. বিশেষ কাজে ফজরের পর মসজিদ থেকে বের হয়ে গেলে পুনরায় সালাতুদ্ দোহা আদায়ের জন্য মসজিদে যাওয়া।
উপরোক্ত গুণাবলীর প্রতি উৎসাহকল্পে হাদীস শরীফে এসেছে, হযরত আবু উমামা হতে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) বলেন: যে ব্যক্তি পবিত্র অবস্থায় ফরজ নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে (মসজিদের পানে) বের হল,তার প্রতিদান ইহরাম পরিধানকারী হজ্জ আদায় কারীর মত, যে ব্যক্তি একমাত্র সালাতুত দোহা (মুমিনের আমল ও মৃত্যুর পর তার রুহকে আরশের উপরে একটি নির্দিষ্ট স্থানে রাখা হয়,তাই ইল্লিয়ীন) আদায়ের উদ্দেশ্যে বের হল, অন্য কোন কারণে নয়, তার প্রতিদান ওমরা পালনকারীর মত। আর দু’নামাজের মধ্যখানে যদি কোন অনর্থক কথা বা কাজ না করা হয় তাহলে এর প্রতিদান ইল্লিয়ীনে লিপিবদ্ধ করা হবে। (আবু দাউদ,হাসান)
যাদের হৃদয় মসজিদের সাথে সম্পৃক্ত তাঁরা কেমন:
১. সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রাঃ) বলেন: চল্লিশ বছর যাবত আমি জামাত বর্জন করিনি।
২. ওয়াকী বিন র্জারাহ বলেন: আ’মাশ প্রায় সত্তর বছর যাবত তাকবীরে উলা বর্জন করেননি।
৩. নাফে বলেন: আবদুল্লাহ ইবনে ওমর যদি কখনও জামাতে এশার নামাজ পড়তে না পারতেন তাহলে বাকী পুরো রাত জাগ্রত থেকে ইবাদত করতেন। (হিলইয়াতুল আউলিয়া,খন্ড: ১,পৃষ্ঠা: ৩০৩)
মসজিদ থেকে আমরা কোথায়: যুগ যুগ ধরে যারা সফল হয়েছেন তাঁদের জীবনই ছিল এমন। আমরাও তাঁদের উত্তরসূরী হয়ে তেমন সফল হতে চাই। কিন্তু তাঁদের মত কি আমাদের জীবনকে কাটাতে পেরেছি? পাচ ওয়াক্ত নামাজ কি জামাতে আদায় করতে পেরেছি? মনটাকে কি মসজিদের সাথে ঝুলাতে পেরেছি? যদি ঝুলিয়েছি মনে করি তাহলে তার প্রমাণ কি আমাদের বর্তমান অবস্থা? না! আর দেরী না করে আরশের ছায়া লাভের আশায় এখনি মসজিদের পানে ছুটে যাই!
চতুর্থ ব্যক্তি: এমন দুই ব্যক্তি পরস্পরকে ভালবাসে আল্লাহর জন্য:
ঐ দু’ব্যক্তি যারা একে অপরকে ভালবাসে আল্লাহর সন্তুষ্টির নিমিত্তে এবং পরস্পরে মিলিত হয় তাঁরই নিমিত্তে। ভ্রাতৃত্বের এই ভালবাসা মহান আল্লাহর অপর নিয়ামত। ইরশাদ হচেছ: “আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের অন্তর পরস্পরের সাথে জুড়ে দিয়েছেন। হে নবী! তুমি সারা দুনিয়ার সমস্ত সম্পদ ব্যয় করলেও এদের অন্তর জোড়া দিতে পারতে না। কিন্তু আল্লাহ তাদের অন্তুর জুড়ে দিয়েছেন। অবশ্যই তিনি বড়ই পরাক্রমশালী ও জ্ঞানী।”(সূরা আল আনফাল,আয়াত: ৬৩)
ভ্রাতৃত্ব ও ভালবাসার মর্যাদা: হাদীসে কুদসীতে এসেছে, উবাদাহ বিন সামিত থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) বলেন: “আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আমার সন্তুষ্টির নিমিত্তে যারা পরস্পরে ভালবাসবে (কিয়ামতের দিন) তারা নুরের আলোকিত উঁচু মঞ্চে অবস্থান করবে। তাদের এই মর্যাদা দেখে নবী, সাহাবা, ও শহীদগণ (গিবতাহ) ঈর্ষা করবে।” (হাকেম,সহীহ)
ভালবাসার সংবাদ দেয়া: আবু জর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) বলেন: যখন তোমাদের কেউ তার কোন সাথীকে ভালবাসে সে যেন তার বাড়ীতে গিয়ে জানিয়ে দেয় যে, সে তাকে ভালবাসে। (আহমদ,সহীহ)
আল্লাহর জন্য যারা ভালবাসেন তারা কেমন:
১. ওমর বিন খাত্তাব (রাঃ) বলেন: আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির নিমিত্তে এক হাজার ভাইকে ভালবেসেছি। তাদের সবার নাম, পিতার নাম, গোত্রের নাম, বাড়ীর ঠিকানা আমি জানি।
২. মুজাহিদ বলেন: আবদুল্লাহ বিন আব্বাসের পাশ দিয়ে এক ব্যক্তি অতিক্রম করছিল। তখন তিনি বললেন, এই লোকটি আমাকে ভালবাসে। তাঁকে বলা হল, আপনি কিভাবে জানেন যে, সে আপনাকে ভালবাসে? জবাবে ইবনে আব্বাস বললেন (এর প্রমাণ হল) আমি তাকে ভালবাসি।
পঞ্চম ব্যক্তি: যে অশ্লীল কাজের আহবান প্রত্যাখান করে আল্লাহর ভয়ে:
এমন লোক যাকে সম্ভ্রান্ত এক সুন্দরী নারী (অশ্নীলতার দিকে) আহবানজানালে জবাবে “আল্লাহ ভয় করি” বলে বিরত থাকে। অশ্নীলতা থেকে মুক্তির উপায়: আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেম অশ্নীলতা ও অন্যান্য অপরাধ প্রবণতা থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে অনেকগুলো উপায় উল্লেখ করেন,(দেখুন: রাওদাতুল মুহিব্বীন: পৃষ্ঠা: ২৮২) তম্মধ্যে উল্লেখযোগ্য উপায়গুলো হলো:
১. অপরাধ ত্যাগে দৃঢ় সংকল্প করা।
২. অপরাধ ত্যাগের তিক্ত মূহুর্তে ধৈর্য ধারণ করা।
৩. আল্লাহ ও মানুষের নিকট তার মর্যাদাকে অক্ষুন্ন রাখার চেষ্টা করা।
৪. পরিশুদ্ধতার স্বাদকে অপরাধে জড়ানোর স্বাদের উপর প্রাধান্য দেয়া।
৫. কুপ্রবৃত্তির অনুসরণের অশুভ পরিণিতি ভেবে দেখা।
৬. অপরাধের পর কি অর্জন ও কি হারানো তা পূর্বেই ভেবে দেখা।
৭. অপরাধের ব্যাপারে নিজের দ্বীন ও বিবেককে প্রশ্ন করা।
৮. পরকালীন জাহান্নামকে ভয় করা।
৯. প্রবৃত্তির অনুসরণ আল্লাহর তাওফীককে বাধা দেয় এবং লাঞ্চনার দ্বার উম্মুক্ত করে, তা অনুধাবন করা।
১০. প্রবৃত্তির অনুসরণে আকল নষ্ট হয়ে যায় তা ভালভাবে অনুধাবন করা।
আরশের ছায়া যারা পাবেন তারা কেমন: সম্ভ্রান্ত ও সুন্দরী নারীর আহবান যারা প্রত্যাখ্যান করে আল্লাহর আরশের ছায়াতলে স্থান করে নিয়েছে তাদের এক উজ্জল দৃষ্টান্ত আবু বকর আল মিসকী (রঃ)। তাকে তার সাথীবর্গ বলল: আমরা সর্বদা তোমার থেকে মিসকের ঘ্রাণ পাই। এর কারণ কি?অতপর তিনি বললেন: আল্লাহর শপথ! অনেক বছর যাবত মিস্ক ব্যবহার করি না। তবে এই সুঘ্রাণের কারণ হলো: একদা একটি নারী ফন্দি করে আমাকে তার ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। আর আমাকে প্রলোভন দিতে শুর করল। আমি বিষন্ন হয়ে উঠলাম, আমি কোন উপায় খুজে পাচ্ছি না। এরপর তাকে বললাম: আমার পবিত্রতা অর্জন করা প্রয়োজন। অতপর সে তার এক সেবিকাকে বলল আমাকে নিয়ে বাথরুমে যেতে। বালিকাটি আমাকে সেখানে নিয়ে গেল। আমি বাথরুমে প্রবেশ করে সেখানকার ময়লা কর্দমা নিয়ে আমার সমস্ত শরীরে মেখে নিলাম। আর এই অবস্থায় আমি তার নিকট ফিরে আসি, সে আমাকে দেখে হতভম্ব হয়ে সাথে সাথে আমাকে বের করে দিতে নির্দেশ দিল। এভাবে আমি অশ্নীলতা থেকে মুক্তি পেয়ে যাই, অতপর গোসল সেরে পবিত্র হই। ঐ রাত্রিতে আমি স্বপ্ন দেখতে পেলাম: আমাকে কে যেন বলছে: তুমি এমন কাজ করেছ যা তুমি ব্যতীত কেউ করে নাই। অবশ্যই আমি তোমাকে দুনিয়া ও আখিরাতে সুগন্ধি দান করব। এরপর সকালে উঠে দেখি আমার দেহ থেকে মিসকের সুঘ্রাণ বের হচ্ছে। আর সেই সুঘ্রাণ এখনো অব্যাহত রয়েছে। (আল মাওয়ায়েয ওয়াল মাযালেস- ইবনুল জাওযী ,পৃষ্ঠা: ২২৪)
ষষ্ঠ ব্যক্তি: যে ব্যক্তি সংগোপনে আল্লাহর পথে ব্যয় করে:
ঐ ব্যক্তি যে অতি সংগোপনে আল্লাহর পথে ব্যয় করে,তার বাম হাতও টের পায় না ডান হাত যা ব্যয় করেছে। ইবনে হাযার আল আসকালানী (রঃ) বলেন: এর দ্বারা অতি গোপনে আল্লাহর পথে ব্যয় করাকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে।( ফি যিলালি আরশির রাহমান: পৃষ্ঠা: ১৭৬)
সদকার ব্যাপকতা: শুধুমাত্র অর্থ-সম্পদ ব্যয়ের মধ্যে সদকা ও এর প্রতিদান সীমাবদ্ধ নয়; বরং একজন মুমিনের প্রতিটি কাজই সদকার সমতুল্য, যদি এর মাধ্যমে আল্লাহর সন্তোষ কামনা করে। এমনিভাবে একজন মুমিনের সুন্দর একটি কথা, মুখের মুচকি হাসি, পরোপকার সবগুলোই সদকার অর্ন্তভূক্ত। হুযাইফা রাঃ হতে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) বলেন: প্রত্যেকটি ভাল কাজই সদকা। (মুসলিম,আহমদ, আবু দাউদ,(সহীহ) আবু যর রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) বলেন: প্রতিদিনি সকালে তোমাদের শরীরের প্রত্যেক জোড়ার উপর সদকা আপতিত হয়। (আর আদায়ের পন্থা হলো) প্রতিটি তাসবীহ সদকা সমতুল্য, প্রতিটি হামদ,প্রতিটি তাহলীল, প্রতিটি তাকবীর সদকা। সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজ হতে বারণ সদকা সমতুল্য। আর এই সবগুলোর জন্য যথেষ্ট হবে দু’রাকআত সালাতুত দোহা। (মুসলিম,আহমদ,সহীহ),(সুর্যোদয়ের পর থেকে সূর্য মধ্যাকাশে আসার পূর্ব সময়ে দু’রাকআত কিংবা চার রাকআত নামাজ পড়া সুন্নাত। ইহাই সালাতুদ্ দোহা)
সপ্তম ব্যক্তি: এমন ব্যক্তি যে আল্লাহকে স্মরণ করে,নীরবে নিভৃতে অশ্র“ ঝরায়:
যিকির আল্লাহর ভালবাসার এক সুদৃঢ় বন্ধন। যে তার রবকে স্মরণ করার নিয়ামত লাভ করে, তার সাথে রবের সম্পর্ক স্থাপিত হয়। আর যে তাকে স্মরণ করে না, সে তার ভালবাসার পরশ থেকে বহুদূরে। মুমিনের হৃদয়ের খোরাক হচ্ছে এই যিকির। যিকির তথা আল্লাহ তায়ালার স্মরণের নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন: “ হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে বেশী করে স্মরণ করো এবং সকাল সন্ধ্যায় তাঁর মহিমা ঘোষণা করতে থাকো। (সূরা আল আহযাব: পৃষ্ঠা: ৪১,৪২) ইবনে আব্বাস বলেন, আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের উপর নির্দিষ্ট সীমায় সকল ফরজ ইবাদাত আপতিত করেছেন, এবং অক্ষমতার (ওযরের) অবস্থাতে (ওযরকে) অক্ষমতাকে গ্রহণ করেছেন, শুধুমাত্র যিকির ব্যতীত। আল্লাহ তায়ালা এর জন্য কোন সীমা নির্ধারণ করেননি এবং আকল বিকৃত অবস্থা ব্যতীত অন্য কোন অবস্থাতে অক্ষমতাকে গ্রহণ করেননি। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: “তারপর তোমরা নামাজ শেষ করার পর দাড়িয়ে, বসে ও শুয়ে সব অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করতে থাকো। আর মানসিক প্রশান্তি লাভ করার পর পুরো নামাজ পড়ে নাও। আসলে নামাজ নির্ধারিত সময়ে পড়ার জন্য মুমিনের উপর ফরজ করা হয়েছে।”(সূরা আন্ নিসা: আয়াত:১০৩)
দিনে ও রাত্রিতে, জলে ও স্থলে, সফরে ও সাভাবিক অবস্থানে, প্রাচুর্যে ও অভাবে, সুস্থতায় ও অসুস্থতায়,গোপনে ও প্রকাশ্যে সর্বাবস্থায় যিকির করতে বলা হয়েছে। যখন তোমরা তা করবে তিনি তোমাদের উপর রহমতের বারি বর্ষণ করবেন এবং তাঁর ফিরিশতারা তোমাদের জন্য তাঁর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে। (তাফসীরে তাবারী: খন্ড: ২২,পৃষ্ঠা: ১৩)
মুয়াজ ইবনে যাবাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) বলেন: আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম আমল হচ্ছে, তাঁর স্মরণে (যিকির করতে করতে) জিহ্বা সিক্ত অবস্থায় মৃত্যু বরণ করা।(ইবনে হিব্বান, তাবরানী ফিল কাবীর, বায়হাকী ফি শুয়াবিল ঈমান (হাসান)
হযরত ইয়াসিরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) বলেন: তোমাদের উপর তাসবীহ, তাহলীল, তাকদীস তথা আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করা কর্তব্য। আর তোমরা যিকিরের সময় আঙ্গুলের গিরা গুণে যিকির কর; কেননা (কিয়ামতের দিন) আঙ্গুল গুলোকে প্রশ্ন করা হবে এবং কথা বলতে বলা হবে। তোমরা আল্লাহর যিকির হতে গাফেল হয়ো না। তাহলে আল্লাহর রহমত তোমাদেরকে ভূলে যাবে। (তিরমিযী,হাকেম, হাসান)
যিকিরের ব্যাপকতা: যিকির সকল ইবাদাত হতে অধিকতর ব্যাপক। মহান আল্লাহর যিকির শুধু মৌখিক যিকিরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ইবাদাত ও আদত তথা দৈনন্দিন কাজ-কর্ম ইত্যাদি সর্বক্ষেত্রে, সর্বাবস্থায় ও সর্বদা যিকির করা মুমিনের কর্তব্য। সকল প্রকার ইবাদতেই যিকির রয়েছে। কোন একটি ইবাদতও যিকির থেকে খালি নয়।
প্রাত্যাহিক কাজ-কমে (আদতে) যিকির: একজন মুমিনের সকল কাজই মূলত আল্লাহর নামেই শুরু করতে হয়। তবেই তাতে বরকত আসে। পাশাপাশি প্রতিটি কাজেই আল্লাহকে স্মরণ করা উচিত এভাবে যে, কাজটি আল্লাহ তায়ালা হালাল করেছেন না হারাম, আর সকল কাজে এই অনুভূতি জাগ্রত করাই প্রকৃত যিকির। অন্যথায় শুধুমাত্র মৌখিক যিকির বান্দার কোন উপকারেই আসবে না।( সংক্ষিপ্তভাবে,তারতীবুল আফওয়াহ,খন্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৮৬-৮৯)
সাঈদ ইবনে যুবাইর (রাঃ) বলেন, যিকির হচ্ছে আল্লাহর আনুগত্য। সুতরাং যে আল্লাহর (আদেশ নিষেধ মেনে চলার মাধ্যমে ) আনুগত্য করল, সে আল্লাহকে স্মরণ করল। আর যে তাঁর আনুগত্য করল না, সে যিকিরকারী নয়; যদিও অধিক তাসবীহ পাঠ এবং কুরআন তিলাওয়াত করে।
যিকিরের প্রকারভেদ: ইমাম নববী (রঃ) বলেন: জেনে রাখ! নিশ্চয় যিকিরের ফযিলত তাসবীহ,তাহলীল, তাহমীদ, তাকবীর, ইত্যাদির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আল্লাহর অনুগত প্রত্যেক ব্যক্তিই তাদের আনুগত্যের মাধ্যমে আল্লাহর যিকির করে। (অর্থাৎ: তার আনুগত্যই আল্লাহর যিকির)।
যিকিরের প্রকারসমুহ:
১. আল কুরআন তিলাওয়াত, শিক্ষা দান, এর গবেষণা ও বাস্তবায়ন করা।
২. আল্লাহ তায়ালার নাম ও সিফাত (গুণবাচক নাম) সমূহ উল্লেখ করা।
৩. তাঁর প্রশংসা করা।
৪. আল্লাহ তায়ালার আদেশ-নিষেধ মেনে চলা।
৫. তাঁর আদেশ-নিষেধ আলোচনা করা ও শিক্ষা দেয়া।
৬. তার নিয়ামত রাজির স্মরণ করা।
৭. তার নিকট দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা করা।
৮. এ কথা স্মরণ রাখা যে, আল্লাহ তায়ালা সর্বদা সাথে আছেন।
ভাগ্যবান এই সাত ব্যক্তি থেকে আমরা কোথায়: উক্ত হাদীসে উল্লেখিত সাত শ্রেণীর ব্যক্তি তাদের উল্লেখিত আমলের মাধ্যমে কিয়ামতের কঠিন মূহুর্তে মহান আল্লাহ তায়ালার আরশের ছায়ায় স্থান লাভের মাধ্যমে সে দিনের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা পাবেন, পরিশেষে জান্নাত লাভে হবেন ধন্য। কি মহৎ ছিল তাদের আমল! যারা পৃথিবীতে ক্ষমতা লাভের পর দাম্ভিকতা প্রদর্শন না করে প্রতিষ্ঠা করেছেন ন্যায়ের শাসন। যৌবনের উম্মাদনাকে পদ্দলিত করে যৌবনকে অতিক্রম করেছেন আল্লাহর দাসত্ব ও গোলামীর মাধ্যমে, যাদের হৃদয় দুনিয়ার ব্যস্ততাকে এড়িয়ে ছুটে যেত মসজিদের পানে। যারা একে অপরকে ভালবাসতেন দুনিয়ার কোন স্বার্থসিদ্ধির জন্য নয়; বরং শুধুমাত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির নিমিত্তেই। যাদেরকে সভ্রান্ত বংশের সুন্দরী নারী অশ্নীলতার দিকে আহবান জানালেও তাকে প্রত্যাখ্যান করে মহান রবের ভয়কে প্রাধান্য দেয়। যারা তাঁরই নিমিত্তে অতি সংগোপনে তার পথে দান করে। যারা তাকে অতি প্রেম ভরে স্মরণ করে এবং নিরবে নিভৃতে অশ্র“ ঝরায় দু’নয়নে। অথচ আমরা আজ কোথায়? আমরা কি তাদের মত হতে পেরেছি? আরশের ছায়াতলে কি আমার স্থান মিলবে? কোন সে আমল আমি তার জন্য করেছি? উক্ত সাতটি আমলের কোন একটিও কি আমি পূর্ণাঙ্গভাবে পালন করতে পেরেছি? আমি কি এখনও অপরাধের সময় আমার রবকে স্মরণ করে পরিত্যাগ করি। যদি তাই না হয় তাহলে এখনি তওবা করে নেই। বিশ্বস্রষ্টা আল্লাহ তায়ালার দিকে সকল প্রকার অপরাধ বর্জন করে ফিরে যাই। তাহলে তাঁর আরশের ছায়ায় আশা করা স্বার্থক হবে।
হাদীসের বাস্তব শিক্ষা:
মহাপ্রলয় সৃষ্টিকারী কিয়ামত দিবসে নিরাপত্তা পেতে হলে উপরোক্ত সাতটি গুণে গুণান্বিত হওয়ার বিকল্প নেই। বিশেষত: সাতটির যে কোন একটিও যদি উল্লেখযোগ্যভাবে নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় তাহলে আশা করা যায়, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের আরশের ছায়াতলে নিরাপদে অবস্থান করা সম্ভব হবে। বস্তুত: এই সাতটি গুণের প্রতিটি গুণই ছিল উল্লেখিত সাত ব্যক্তির বিশেষ আমল, যার ওয়াসিলায় আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে জান্নাতবাসী করবেন। সুতরাং প্রতিটি মুমিনের সকল সৎ আমলের পাশাপাশি একটি বিশেষ আমল থাকা অবশ্যই জরুরী, যা হবে একশতভাগ ইখলাস সহকারে। আর সেই গুণ যদি হয় উপরোক্ত গুণাবলীর একটি তবেই কিয়ামতের ভয়াল চিত্রের সম্মুখীন হতে হবে না;বরং আল্লাহ তায়ালা তাঁর আরশের নীচে ছায়া দানের মাধ্যমে সকল প্রকার ভয় থেকে নিরাপত্তা দান করবেন এবং পরিশেষে জান্নাত দান করবেন। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সেই সাতশ্রেণীর অর্ন্তুভুক্ত করুন। আমীন




